বৃহস্পতিবার | আগস্ট ১৩, ২০২০ | ২৯ শ্রাবণ ১৪২৭

সম্পাদকীয়

অভিমত

পণ্য পরিবহনে নৌযান ব্যবহার প্রতিযোগিতামূলক হওয়া প্রয়োজন

মো. আলমগীর কবির

ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট সেল বা ডব্লিউটিসি কোনো সরকারি সংস্থা নয় অথবা কোনো আধা সরকারি সংস্থাও নয়। সরকারের কোনো এজেন্টও নয়। এতে প্রতীয়মান হয় যে তাদের আইনগত কোনো ভিত্তি নেই, যা দ্বারা তারা কোনো নৌযান মালিকের বিরুদ্ধে মামলা করতে পারবে। তবুও তারা তাদের নৌযানের মাধ্যমে পণ্য পরিবহনের নামে এক নৈরাজ্যকর অবস্থা তৈরি করে রেখেছে। আমরা যদি একটু পেছনে তাকাই তাহলে দেখতে পাব যে ২০০২ সালের পর থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত তারা যে নৈরাজ্য করেছে, তা ছিল কল্পনাতীত। যেমন কোনো পণ্যের মালিক নৌযান দিয়ে চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙর থেকে দেশের বিভিন্ন স্থানে পণ্য পরিবহন করতে হলে এই ডব্লিউটিসি নামের সংগঠন থেকে নৌযান ভাড়া নিতে হতো। তাদের নির্ধারিত ভাড়ায় বাধ্য হয়েই মালিকরা পণ্য পরিবহন করতেন। পণ্য গন্তব্যে পৌঁছার পর খালাস করতে যেকোনো কারণেই চারদিনের বেশি হলে পণ্যের মালিককে পেনাল্টি বা জরিমানা বহন করতে হতো। জরিমানার টাকা পরিশোধ না হওয়া পর্যন্ত ডব্লিউটিসি পণ্য পরিবহন করা থেকে বিরত থাকত। স্বাভাবিকভাবেই অতিরিক্ত ভাড়া জরিমানা পণ্যমূল্যের ওপরই প্রভাব ফেলত। শুধু তাই নয়, আন্তর্জাতিক নৌ আইন অনুযায়ী, যেকোনো বৈদেশিক জাহাজ বহির্নোঙরে অবস্থানের একটি সময় নির্ধারণ করা থাকে এবং ওই সময়ের মধ্যেই আমদানিকারকদের পণ্য খালাস করতে হয়। যদি দেরি হয় তাহলে বৈদেশিক মুদ্রায় পেনাল্টি বা জরিমানা আমদানিকারকদের বহন করতে হয়, যা ওই সময় অর্থাৎ ২০০২ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত সব পণ্যের আমদানিকারকদেরই বহন করতে হতো। এছাড়া বহির্নোঙরে লাইটার ভেসেলের মাধ্যমে গন্তব্যে পৌঁছার জন্য যে পরিমাণ নৌযান থাকার কথা, তার চেয়ে কিছুটা কম ছিল। সুযোগ কাজে লাগিয়ে নৌপরিবহন ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করত ডব্লিউটিসি নামের সংগঠনটি। উভয় ক্ষেত্রেই অর্থাৎ বহির্নোঙর থেকে সমুদ্রবন্দর পর্যন্ত এবং সমুদ্রবন্দর থেকে গন্তব্য স্থান পর্যন্ত আমদানিকারকরা বাধ্য হয়ে ডব্লিউটিসির মাধ্যমেই পণ্য পরিবহন করতেন। কিন্তু প্রতিযোগিতামূলক বাজারে শিল্পপণ্য এক বেকায়দা অবস্থায় পড়ে। একতরফা পরিবহন ব্যয় এটার মূল কারণ ছিল। পণ্যমূল্য এমন অবস্থায় পৌঁছে, যা সরকারকে পর্যন্ত দোলা দেয়। তখন বাণিজ্য মন্ত্রণালয় নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় যৌথভাবে উদ্যোগী হয়ে ওই ডব্লিউটিসি সিন্ডিকেট ভেঙে দেয় এবং পণ্য উৎপাদনকারী বৃহৎ মাঝারি শিল্প উদ্যোক্তাদের নিজস্ব কাঁচামাল পরিবহনের জন্য নৌজাহাজ তৈরি করার অনুমতি দেয়া শুরু করে। ফলে বাজারে পণ্যমূল্য প্রতিযোগিতামূলকভাবে আগের তুলনায় কমে আসে, যা ভোক্তাসহায়ক পণ্যমূল্যে পরিণত হয়।

বিআইডব্লিউটিএ যেমন নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের একটি অন্যতম নিয়ন্ত্রক সংস্থা, তেমনি তাদেরই আরেকটি নিয়ন্ত্রক সংস্থা হলো নৌপরিবহন অধিদপ্তর। তারা অভ্যন্তরীণ বৈদেশিক নৌচলাচল নিয়ন্ত্রণ করে। তারা নতুন নৌযান তৈরির অনুমোদনও দিয়ে থাকে। গত কয়েক বছরে প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত নৌযান তৈরির অনুমোদন দেয়া হয়েছে নৌযান ব্যবসায়ীদের। এছাড়া অনুমোদনবিহীন নৌযানও আমরা চলাচল করতে দেখি। বৈধ অবৈধ মিলিয়ে পাঁচ হাজারের মতো নৌযান দেখা যায়। এর মধ্যে আনুমানিক চার হাজার বৈধ এবং বাকি আনুমানিক এক হাজার অবৈধ নৌযান। বৃহৎ মাঝারি শিল্প মালিকদের নৌযানের সংখ্যা আনুমানিক ৮০০। উল্লেখ্য, এই ৮০০ নৌযান প্রতিটি শিল্পের লজিস্টিক সাপোর্ট হিসেবে অর্থাৎ ইন্ডাস্ট্রির অংশ হিসেবে ব্যবহূত হয়। এসব নৌযান কোনো ব্যবসায়িকভাবে বা কমার্শিয়ালি ব্যবহূত হয় না।

অবস্থায় অতিসম্প্রতি নৌপরিবহন অধিদপ্তর থেকে একটি সার্কুলার জারি করা হয়, যেখানে বলা হয়েছে, যেকোনো লাইটার ভেসেলকে সরকারি অনুমোদন থাকা সত্ত্বেও সমুদ্র অতিক্রমের (ক্রসিংয়ের) জন্য ডব্লিউটিসির অনুমোদন নিতে হবে। অন্যথায় ডব্লিউটিসি তাদের বিরুদ্ধে মামলা করতে পারবে। এই চিঠি পাওয়ার পর শিল্প মালিকরা সোচ্চার হন এবং নৌপরিবহন অধিদপ্তরের সঙ্গে সভা করেন। মহাপরিচালক নৌপরিবহন অধিদপ্তর স্বীকার করে যে ওই নোটিসে কিছুটা ভুল রয়েছে, যা পরবর্তীতে সংশোধন করে দেয়া হবে। তবে নৌপরিবহন অধিদপ্তর থেকে বলা হয় যে নিজস্ব লাইটার ভেসেলের পরও অতিরিক্ত নৌযানের প্রয়োজন হলে তা ডব্লিউটিসি থেকেই নিতে হবে।

শিল্পের প্রয়োজনে এবং ভোক্তাসাধারণের কাছে প্রতিযোগিতামূলকভাবে শিল্পপণ্য পৌঁছানোর স্বার্থে নৌবাজার থেকে অথবা নৌযান মালিকদের কাছ থেকে সরাসরি নৌযান ভাড়া নেয়ার সুযোগ তৈরি করে দেয়া উচিত। কারণ এতে দর কষাকষি করে ভাড়া নির্ধারণ করা যায়, যা উভয়ের জন্যই লাভজনক হয়। তাছাড়া এই নৌযান মালিকরা ডব্লিউটিসির সদস্য এবং তাদের বৈধ কাগজপত্র রয়েছে। শুধু ডব্লিউটিসি থেকে নৌযান ভাড়া নিতে হলে পরিবহন খরচ বেড়ে যাবে এবং লাইটার ভেসেল মাদার ভেসেল উভয় ক্ষেত্রেই ডেমারেজ বা জরিমানা দিতে হবে। প্রতিযোগিতামূলক পরিবহন খরচ না থাকায় পণ্যমূল্য বেড়ে যাবে, যা ভোক্তা তথা সরকারকে বেকায়দায় ফেলবে। সব ব্যবসাই যেমন প্রতিযোগিতামূলক, তেমনি নৌযান ভাড়া করাটাও প্রতিযোগিতামূলক হওয়া জরুরি। কেননা এখানে ভোক্তার স্বার্থ জড়িত।

 

মো. আলমগীর কবির: প্রেসিডেন্ট

বাংলাদেশ সিমেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিসিএমএ)

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন