বৃহস্পতিবার | আগস্ট ১৩, ২০২০ | ২৯ শ্রাবণ ১৪২৭

সম্পাদকীয়

মৎস্যজীবী সমিতির ১০৭ কোটি টাকা ঋণের ৯৭ শতাংশ অনাদায়ী

মামলা নয়, সহজে পরিশোধের উদ্যোগ নেয়া হোক

সমাজের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর একটি মৎস্যজীবী। এদের জীবন-জীবিকা উন্নয়নে সরকার জাতীয় মৎস্যজীবী সমিতির মাধ্যমে ১০৭ কোটি টাকা ঋণ হিসেবে প্রদান করলেও ফেরত আসেনি বড় একটি অংশ। গতকাল বণিক বার্তায় প্রকাশিত সংশ্লিষ্ট এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মৎস্যজীবীদের নৌকা মাছ ধরার বিভিন্ন সরঞ্জাম কেনার জন্য বিভিন্ন সময়ে দেয়া মোট ঋণের পরিমাণ ১০৭ কোটি ১৬ লাখ ৪৭ হাজার ৬০০ টাকা। এর মধ্যে এখন পর্যন্ত আদায় হয়েছে মাত্র কোটি ৩২ লাখ টাকার কিছু বেশি। বাকি অর্থের পুরোটাই অনাদায়ী বা খেলাপি হয়ে পড়েছে। বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগের ফলে মৎস্যজীবীরাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন। এসব দুর্যোগে অনেক মৎস্যজীবীই তাদের প্রাণ হারান। অনেকে ঋণের টাকায় কেনা সম্বল নৌকাটিও হারান। ফলে তাদের পক্ষে ঋণ পরিশোধ করা সম্ভব হয় না। আবার অনেক সময় অনেক সক্ষম ঋণগ্রহীতাও ঋণ পরিশোধে আগ্রহ দেখান না। ফলে ঋণের একটি বড় অংশই খেলাপি হয়ে গেছে। এক্ষেত্রে ক্ষতিগ্রস্তদের সরকারি প্রণোদনার আওতায় আনা বা ঋণ মওকুফের পদক্ষেপ নেয়া উচিত। একই সঙ্গে সক্ষমদের কাছ থেকে সুদ মওকুফ করে হলেও আসল আদায় করা যায় কিনা, তাও বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন। খবর মিলছে, ঋণ আদায়ে মৎস্যজীবিদের ওপর মামলার খড়গ নেমে আসছে, যা কাম্য নয়। ঋণ সঠিক ব্যক্তিকে দেয়া হয়েছে কিনা, তাও যাচাই-বাছাই প্রয়োজন। ঋণ প্রদান এবং তা আদায় কার্যক্রম তদারকির দায়িত্ব ছিল সমবায় অধিদপ্তরের। সংস্থাটি তাদের দায়িত্ব পালনে সফল হয়নি বলেই পরিস্থিতি এমন হয়েছে। তারও সংস্কার প্রয়োজন।

বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও সমবায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেটিভ অ্যালায়েন্স বা আইসিএর এক পরিসংখ্যান অনুযায়ী বিশ্বে মোট সমবায়ীর সংখ্যা বিলিয়ন এবং শীর্ষস্থানীয় ৩০০টি সমবায় সমিতির সম্মিলিত টার্নওভার ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার। আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারতে মোট ভোগ্যপণ্যের বড় অংশই সরবরাহ করে সমবায় সমিতিগুলো। জাপানের একটি সমবায় সমিতির বার্ষিক আয় বাংলাদেশের মোট জিডিপির ৫০ শতাংশেরও বেশি। অন্যদিকে জাতিসংঘের হিসাব মতে, বিশ্বের প্রায় ৩০০ কোটি মানুষ সমবায়ের মাধ্যমে তাদের জীবনযাত্রা নির্বাহ করে। জাপানে কৃষিকাজে নিয়োজিতদের বড় অংশই সমবায়ী। এছাড়া গণচীন, ভারত মালয়েশিয়ার জনগণের উল্লেখযোগ্য অংশ সমবায়ী। ধনী-গরিব সব দেশে সমবায় সমিতির সাফল্যগাথা নজিরবিহীন। কিন্তু বাংলাদেশে স্বাধীনতার পর সমবায় মডেল চালু হলেও আজ পর্যন্ত তা কাঙ্ক্ষিত সাফল্যের মুখ দেখতে পারেনি। গণমুখী অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, দারিদ্র্য বিমোচন, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, পরিবেশের বিপর্যয় রোধ এবং খাদ্যনিরাপত্তার বলয় সৃষ্টিতে অন্যতম উত্কৃষ্ট পদ্ধতি হচ্ছে সমবায়ী উদ্যোগ। এর মাধ্যমে গড়ে ওঠে নতুন উদ্যোক্তা সামাজিক সংহতি। তবে বড় দাগে আমাদের ব্যর্থতাগুলো হলো সমবায়ীদের মধ্যে সহযোগিতা, সহমর্মিতা গণতন্ত্রের প্রতি শ্রদ্ধার অভাব, অভ্যন্তরীণ অনিয়ম, দলীয়করণ, অসমবায়ীদের অনুপ্রবেশ, মুনাফা ঝুঁকি সমবণ্টনের মানসিকতা না থাকা ইত্যাদি। এছাড়া সমবায় সমিতির ব্যবস্থাপনা কমিটি গঠনে দুর্বলতা, নিরীক্ষা, বিরোধ নিষ্পত্তি, অবসায়ন, উন্নয়ন প্রশিক্ষণের প্রতি অবহেলাও সমবায় সমিতিগুলোর অনগ্রসরতার বড় কারণ। এসব প্রতিবন্ধকতা দূর এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা সুশাসন প্রতিষ্ঠা করে একে আরো অর্থবহ খাতে পরিণত করা আবশ্যক।

সন্দেহ নেই, মৎস্যজীবীদের কাছ থেকে খেলাপি ঋণ আদায়ের মানবিক দিকটিকেই প্রাধান্য দিতে হবে। তাদের অধিকাংশই ঋণের অর্থ পরিবারের জীবন ধারণের পেছনে ব্যয় করেছেন। এতে তাদের অবস্থার উন্নতি হয়েছে বলেও জানা যাচ্ছে না। ফলে যার কাছে সঞ্চয় নেই বা কোনো অর্থই নেই, তার কাছ থেকে ঋণের অর্থ আদায়ে মামলা দায়ের কোনো সমাধান নয়। এতে সংশ্লিষ্ট মৎস্যজীবি জীবন ধারণ থাক দূরে পরিবার আরো বিপদগ্রস্ত হয়ে পড়বে। এভাবে ঋণ দিয়ে জীবনমান উন্নয়ন বা ঋণ ফেরত আসার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ। ঋণ প্রদানের আগে যাচাই-বাছাই এবং ঋণ ব্যবহারের সঠিক দিকনির্দেশনার পাশাপাশি তদারকিও চালিয়ে যেতে হবে। নইলে এসব ঋণ ফেরত পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে না। রাজনৈতিক বিবেচনায় ঋণের অপব্যবহারও বন্ধ করতে হবে। মৎস্যজীবীদের কাছ থেকে ঋণের অর্থ আদায়ে কমিটি গঠনপূর্বক পরিস্থিতি বিবেচনায় ভিন্ন ভিন্ন ব্যবস্থা নিতে হবে। মামলার বিকল্প যেসব ব্যবস্থা আছে অর্থাৎ আপসরফা, সমঝোতা সচেতনতা বাড়াতে হবে। ঋণ আদায়ে আলাদা সেল গঠনও করা যেতে পারে। ২০১৫ সালের জানুয়ারিতে ছোট অঙ্কের ঋণগ্রহীতা কৃষকদের বিরুদ্ধে মামলার না করার নির্দেশ দেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ঠিক একই ভাবে মৎস্যজীবিদের বিরুদ্ধে মামলা না করার নির্দেশনা দেয়া প্রয়োজন।  গত কয়েক বছরে বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে মৎস্যজীবিরা। ফলে তারা স্বাভাবিকভাবেই ঋণ ফেরত দিতে পারেননি। উল্টো জীবন চালাতে নতুন করে ঋণ নেয়ার প্রয়োজন পড়ছে। আমরা চাইব, সমবায় অধিদপ্তর বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নিতে মৎস্যজীবী সমিতির সঙ্গে আলোচনাপূর্বক একটি সমাধানে উপনীত হবে। যারা ঋণ নিয়ে প্রকৃত কারণেই ফেরত দিতে পারেননি, তাদের জন্য বিশেষ সহায়তা প্রদানের মাধ্যমে উত্তরণের পথ বাতলে দিবে।

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন