সোমবার | আগস্ট ১০, ২০২০ | ২৬ শ্রাবণ ১৪২৭

সম্পাদকীয়

কৃষি বাজেটে জৈব সারে ভর্তুকির ব্যবস্থা, মাটি ও জনস্বাস্থ্য রক্ষায় কিছু প্রস্তাবনা

ড. মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন

দেশের মোট দেশজ উৎপাদনে কৃষি খাতের অবদান শতকরা প্রায় ১৪ ভাগ হলেও কৃষি উৎপাদনের মোট পরিমান প্রতি বছরই ক্রমাগতভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। কৃষি ক্ষেত্রে সৃজনশীল ও উদ্ভাবনী উন্নয়ন কার্যক্রম গ্রহণের মাধ্যমে উৎপাদন অব্যাহত রেখে সমগ্র কৃষি পণ্য উৎপাদনে স্বয়ম্ভরতা অর্জন ও টেকসই করার লক্ষ্যে প্রতি বছর এখাতে জাতীয় বাজেটে প্রায় ২.৫-৩.০ শতাংশ বরাদ্দ রাখা হয়। সে হিসাবে ২০২০-২১ অর্থবছরে এ বরাদ্দের পরিমান প্রায় ১৪৫০০ কোটি টাকা। গত বছরের তুলনায় বরাদ্দের পরিমান কিছুটা বাড়লেও সামগ্রিক কৃষি উন্নয়নে যথেষ্ট নয়। অধিকন্তু, কৃষি মন্ত্রনালয়ের তথ্যমতে বরাদ্দকৃত বাজেটের সিংহভাগ ব্যয় হয় ভর্তুকি খাতে। তন্মধ্যে মোট ভর্তূকির ৮৫ ভাগের বেশী ব্যয় হয় রাসায়নিক সার ব্যবস্থাপনায়। ফলস্বরুপ কৃষক স্বল্প মূল্যে রাসায়নিক সার ক্রয়পূর্বক জমিতে প্রয়োগ করে কৃষি উৎপাদনে ভূমিকা রাখছেন। ফলশ্রুতিতে বিগত কয়েক দশকে দেশ দানাদার খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ন সবজি, ফল, আলুসহ সব ধরনের ফসলের উৎপাদন/ফলন ৭০-২৫০ ভাগ বেড়েছে। এ অবদানে উন্নত সেচ ব্যবস্থাপনা (মুলত ভূর্গভস্থ), উচ্চফলনশীল জাতের প্রবর্তন, আধুনিক কৃষি প্রযুক্তির প্রয়োগ সর্বোপরি বাংলার প্রাণ কৃষকের নিরন্তর প্রচেষ্টা ও পরিশ্রম কৃষি খাতে ধারাবাহিক উৎপাদন এবং প্রবৃদ্ধির প্রক্রিয়াটিকে সুসংহত করেছে।

 ফসলের স্বাভাবিক জীবন চক্র সম্পাদন করতে ১৭টি খাদ্যোপাদান প্রয়োজন, অথচ গত ছয় দশক ধরে বিশ্বের অন্যান্য দেশের মত এদেশেও ৩টি উপাদান নাইট্রোজেন, ফসফরাস, পটাশিয়াম এর ব্যবহারকে লক্ষ্য রেখে রাসায়নিক সার ব্যবহার/প্রয়োগ করা হচ্ছে। এবছর প্রায় ৫০ লক্ষ মে.টন রাসায়নিক সারের চাহিদা নির্ধারণ করা হয়েছে। তন্মধ্যে নাইট্রোজেন সরবরাহকারী ইউরিয়ার পরিমান ২৬ লক্ষ মে.টন এবং ২৪ লক্ষ মে.টন নন-ইউরিয়া (টিএসপি, এমপি, ডিএপি-যদিও এতে নাইট্রোজেন আছে)। দেশে প্রয়োজনীয় এ সারের মধ্যে দেশে ৮ লক্ষ মে.টন ইউরিয়া উৎপাদিত হয়, বাকি ইউরিয়া সরকার বিসিআইসি এর মাধ্যমে আমদানি করে। নন ইউরিয়ার ৬০ ভাগ অর্থাৎ ১৪.৪ লক্ষ মে.টন বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন (বিএডিসি) আমদানি করে, অবশিষ্ট ৪০ ভাগ বেসরকারীভাবে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান আমদানি ও বাজারজাত করে। এছাড়া, কিছু অনুপুষ্টি সার বিশেষ করে সালফার, জিংক, মলিবডেনাম ইত্যাদির বাজার তৈরি হয়েছে, যার সিংহভাগ দেশে উৎপাদিত হয়। সরকার উৎপাদন বা আমদানি, সরবরাহ, খুচরা পর্যায় পর্যন্ত অর্থাৎ সবস্তরে ভর্তুকি প্রদান করে। সরকার বর্তমানে ভর্তুকিকৃত ইউরিয়া, টিএসপি, এমওপি, ডিএপি এর দাম নির্ধারণ করেছে যথাক্রমে ১৬, ২২, ১৬ ও ২২ টাকা। ফলে দেশের ৯৭ ভাগ জমিতে রাসায়নিক সারের ব্যবহার সম্ভব হয়েছে । নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে রাসায়নিক সারের একটি দক্ষ বিতরণ ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে, যা ফসল উৎপাদন ব্যবস্থাপনায় সহায়ক ভূমিকা পালন করছে। 

পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে যে, দেশে ৩ ধরনের পুষ্টি উপাদান কেন্দ্রিক রাসায়নিক সার ব্যবহার এর উপর গুরুত্ব দেয়া হয়েছে এবং ৩টি উপাদান এর বিভিন্ন ফসলে ব্যবহার মাত্রার উপর গবেষণা ও সম্প্রসারণ এমনকি  দেশের ৩০টি AEZ  এ বিভিন্ন ফসলে এদের মাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। উল্লেখ্য, ছয় দশক আগে হেক্টর প্রতি রাসায়নিক সারের ব্যবহার ছিল সুচনা ৮.৮ কেজি, বর্তমানে প্রতি হেক্টর ফসলী জমিতে প্রায় ৬৬০ কেজি রাসায়নিক সার ব্যবহার হচ্ছে, অর্থাৎ রাসায়িনেকর ব্যবহার সুচনা লগ্ন থেকে ৭৫ গুন বেড়েছে । এই বৃদ্ধির গতি অব্যাহত আছে কখনও কখনও স্থানীয় সার বিক্রেতার পরামর্শে কৃষকগণ মাত্রারিক্ত পরিমান ব্যবহার করছেন। অপরপক্ষে, সার ব্যবহার নির্দেশিকা পর্যালোচনা করে দেখা যায় যে, সময়ে সময়ে জৈব সারের ব্যবহার কমিয়ে ফসলের জাত ভেদে বেশী পরিমানে রাসায়নিক সার ব্যবহারের সুপারিশ করা হয়েছে, অর্থাৎ কৃষকদের রাসায়নিক সার ব্যবহারে ব্যাপক উৎসাহ প্রদান করা হয়েছে। এতে যদিও আশাতীত খাদ্য উৎপাদন বেড়েছে। কিন্তু দুঃখজনক যে, এ অপপ্রয়োগে জমির স্বাস্থ্য ও উর্বরতা হ্রাস পেয়েছে বহু গুণ। বিবিএস এ প্রকাশিত বাংলাদেশের ফসলি জমির উর্বরতা বিশ্লেষণ করে দেখা যায় যে, দেশে ৩০টি AEZ এর জৈব পদার্থের পরিমান প্রভূত হ্রাস পেয়েছে। কৃষি জমি হল গ্রহের বৃহত্তম কার্বনের আধার গুলির মধ্যে একটি এবং বর্ধিত কার্বন সিকোয়েস্ট্রেশন (সিএস) এর সম্ভাবনা রাখে এবং কার্বন-ডাই-অক্সাইড এর বর্তমান বায়ুমণ্ডলীয় ঘনত্বকে প্রশমিত করার একটি সম্ভাব্য উপায় সরবরাহ করে। অথচ স্বাধীনতা পরবর্তী কৃষি ব্যবস্থা বাংলাদেশে কৃষি জমি কার্বন সংবন্ধন তো করেনি, অধিকন্তু এর কার্বন ঋনাত্মক পর্যায়ে আছে। ফলে মাটির জৈব পদার্থ কমেছে ও এর স্বাস্থ্য আজ বিপন্ন।

 মাটির স্বাস্থ্য রক্ষা এবং এর সামগ্রিক মান সংরক্ষণ ও উন্নয়ন হল আন্তর্জাতিক লক্ষ্য। একসময় মাটির উৎপাদনশীলতায় অবদান রাখে এমন গুণগত মানের বৈশিষ্ট্যাবলি রক্ষায় কাজ করা হত, পরিবেশ নিয়ন্ত্রণ এবং মানব স্বাস্থ্যের জন্য প্রয়োজনীয় গুণগত মানকে খুব কম বিবেচনা করা হত। অথচ আজ এটা প্রমানিত যে, মাটি ইকোসিস্টেম পরিষেবাদি সম্পর্কিত বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কার্য সম্পাদন করে। মাটি মানব স্বাস্থ্যের জন্য সর্বাধিক উল্লেখযোগ্য কাজ, যেমন নিরাপদ এবং পুষ্টিকর খাদ্যোৎপাদন এবং পরিবেশ দূষণ থেকে রক্ষা করে আসছে। মানব স্বাস্থ্য মাটি-পানি-বায়ু পারস্পারিক মিথস্ক্রিয়ার ধারাবাহিকতার উপর নির্ভর করে, যা মাটিতে প্রাকৃতিকভাবে চলমান প্রক্রিয়াগুলির দ্বারা দৃঢ়ভাবে সংহত হয়। ফিল্টারিং, বাফারিং এবং রূপান্তরকরণের মতো মাটির কাজগুলি ভূগর্ভস্থ পানির  দূষণ এবং খাদ্যশৃঙ্খল বিনষ্টের বিরুদ্ধে মাটি মানুষসহ পরিবেশ রক্ষায় সহায়তা করে। মানুষের ক্রিয়াকলাপ মাটির বিভিন্ন প্রক্রিয়াগুলিকে প্রভাবিত করে, যা শরীরিক (ত্বকের ক্ষয়, মাটির কাঠামোর অবনতি, ক্রাস্টিং, দৃঢ়তা, কঠোর স্থাপনা), রাসায়নিক (পুষ্টির হ্রাস এবং ভারসাম্যহীনতা, অ্যাসিডিকেশন, লবণাক্তকরণ) এবং জৈবিক (মাটির জৈব পদার্থের হ্রাস, জীববৈচিত্র্য এর  ক্ষতি) মাটির অবক্ষয়। মাটির অবক্ষয় ফসলের ফলন হ্রাস, তাদের পুষ্টিমান হ্রাস এবং উপকরণ ব্যবহারের দক্ষতা হ্রাসের মাধ্যমে খাদ্য সুরক্ষাকে সরাসরি প্রভাবিত করে। মাটিতে খনিজ পুষ্টিসমুহ উদ্ভিদ গ্রহণ করে তা মানুষের খনিজ সরবরাহের প্রধান উৎস। এ পর্যন্ত  ৪৯ টি পুষ্টি উপাদান মানুষের শরীরবৃত্তীয় কার্যক্রম সম্পাদন করতে চিহ্নিত হয়েছে। মাটি থেকে যে খনিজগুলি শোষণ করে, মানুষ সরাসরি তা খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করে বা প্রাণীকে  খাওয়ানো হয়,  যা পরে মানুষের খাদ্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়।  আবার মানুষের অন্ত্রে নানান ধরনের অনুজীব রয়েছে, এ অনুজীবসমূহ নিদিষ্ট ধরণের অনুপুষ্টি নির্ভর, আর এ অনুজীবসমূহ যথাযথ পুষ্টি না পেলে তাদের কার্যক্রম ব্যাহত হয়, দীর্ঘ মেয়াদে শারীরবৃত্তীয় কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হয়ে তীব্র ঘাটতি হলে রোগ আকারে প্রকাশ পায় । ফলে বিজ্ঞানীরা মাটির স্বাস্থ্য ও মানুষের স্বাস্থ্যের সরাসরি সম্পর্ক চিহ্নিত করতে সক্ষম হয়েছেন।

নগরায়ন ও শিল্পায়ন এর ফলে মানুষের জীবনযাপন (অন্তজ কর্ম) ও খাদ্য ব্যবস্থার ব্যাপক পরিবর্তন হয়েছে, অসমপুষ্টি গ্রহণের কারনে বিশ্বব্যাপী মানুষের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমেছে, তার ফলাফল হিসেবে মারাত্মক সংক্রমণব্যাধী কোভিড ১৯ সহ অন্যান্য অসংক্রমণশীল রোগ; হৃদরোগ, ক্যান্সার ইত্যাদির প্রকোপ বেড়েছে। জাতিসংঘ এর উন্নয়ন কর্মসূচীর বিশেষজ্ঞরা বৈজ্ঞানিক উপাত্তসহ  অনেক কারণ উল্লেখ করেছেন, তন্মধ্যে মাটির স্বাস্থ্য বিশেষ করে অতিমাত্রায় কিছু খাদ্য উপাদান প্রয়োগকে চিহ্নিত করেছেন এবং মাটিতে জৈব উৎস থেকে পুষ্টি উপাদান সরবরাহের সুপারিশ করেছেন। এর সাথে এগ্রো-ইকোলজিক্যাল ফার্মিং এর উপর জোর দিয়েছেন।

অনেক সময় অযথা তর্ক করা হয় যে, বাংলাদেশে এত জৈব উৎসের সার কোথায় পাওয়া যাবে বা কৃষকদের পক্ষে এটা গ্রহণ করা সম্ভব না ইত্যাদি। এ প্রশ্নের  উত্তর খুঁজতে জৈব সারের উৎসসমূহের যথার্থতা যাচাই করা হয়। দেখা যায় যে, শহরাঞ্চলের জৈব বর্জ্য, পশুপাখির মল (গরু, মুরগী, হাঁস), গৃহস্থালির আবর্জনা, কাঁচা বাজার এর বর্জ্য, নিটিং শিল্পের  বর্জ্য, চিনি কলের বর্জ্য ইত্যাদি এবং সেখান থেকে ১৩০-১৫০ মিলিয়ন মে. টন জৈব সারের কাঁচামাল পাওয়া সম্ভব তা হতে ৪৫-৫৫ মিলিয়ন  মে. টন (১০-১২ শতাংশ আদ্রতা ভিত্তিতে) জৈব সার উৎপাদন সম্ভব।

দেশে জৈব সার উৎপাদনের প্রক্রিয়া এখনও প্রাচীন, অর্থাৎ বেশীর ভাগ ক্ষেত্রেই কোন রকম যত্ন ছাড়াই খোলা জায়গায় স্তুপাকারে ফেলে রেখে এদের কম্পোস্ট করা হয়, এর ফলে জৈব সারের কাঁচামালে থাকা গাছের জন্য প্রয়োজনীয় পুষ্টি নষ্ট হয়। তবে আশার কথা হল সাম্প্রতিক সময়ে বেশ কয়েকটি ছোট-বড় কোম্পানী বাণিজ্যিকভাবে জৈব সার উৎপাদন করছে, এদের সংখ্যা প্রায় ৪০-৫৫টি। এখাতে বিনিয়োগ করার জন্য নতুন নতুন উদ্যোক্তাও এগিয়ে আসছে। দেশে গ্রামীণ পর্যায়ে অসংখ্য কেঁচো চাষি রয়েছে এবং সারা দেশে এদের সংখ্যা প্রায় ২০-২২ হাজার। এসব চাষী বছরে প্রায় ২৫-৩০ হাজার মে.টন কেঁচো সার উৎপাদন করে যার বাজার মূল্য আনুমানিক ২০-২৫ কোটি টাকা।

দেশে এখন অনেক নামে বানিজ্যকভাবে উৎপাদন ও বিপনন হয়, এমন অনেক জৈব সার পাওয়া যায়,  যাদের কাঁচামাল হিসেবে  পশু-পাখির বিষ্টা, বসতবাড়ি বা কিচেন মার্কেট এর আবর্জনা ব্যবহার হয়। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক জার্নাল এ প্রকাশিত প্রবন্ধসমূহ যাচাই বাছাই করে এ সমস্ত কাঁচামাল থেকে উৎপাদিত প্রতি মে. টন জৈব সার বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদিত বিভিন্ন রাসায়নিক সার এর সমতুল্য পুষ্টি উপাদানের পরিমান বিশ্লেষণ (শুষ্ক নমুনা) করে দেখা যায় যে, গোবর, কেঁচো সার, মুরগীর বিষ্টা  আবর্জনা/কিচেন মার্কেট কম্পোস্ট সারে ৩০-৭০ কেজি ইউরিয়া, ১৭-৯০ কেজি টিএসপি, ১০-৪২ কেজি এমওপি, ক্যালসিয়াম সালফেট ৩-১৩ কেজি, ম্যাগনেসিয়াম সালফেট ১.০-১.৬ কেজি, জিপসাম ১১-২০ কেজি পরিমান পাওয়া যায়। তাছাড়া, অনুপুষ্টি সার যেমন জিংক সালফেট ০.০৫-১.৮ কেজি, কপার সালফেট ৪০-৩৬৬ গ্রাম, মাঙ্গানিজ সালফেট ৩৫-৯৫ গ্রাম, বরিক এসিড ১৪৫-২৪০ গ্রাম, এমোনিয়াম মলিবডেট ২৪-৯৫ গ্রাম পাওয়া যায়। অধিকন্তু, প্রতি গ্রাম সারে মোট ব্যাকটেরিয়া, একটিনুমাইসিটিজ, ছত্রাক, এজোটোব্যাক্টর, রাইজোবিয়াম, ফসফেট সলিবুলাইজার, নাইট্রোব্যাক্টর ১০২-১০৬ লগ থাকে।  যদি এ সমতূল্য রাসায়নিক সারকে বাজার মূল্যে রপান্তর করা হয়, তাহলে প্রতি মে.টন পরিপক্ক গোবর, কেঁচো সার, মুরগীর বিষ্টা, আবর্জনা কম্পোস্ট এর গড়ে টাকা ৭০০০টাকা মূল্যের ১৭টি পুষ্টি উপাদান এর যোগান পাওয়া সম্ভব। এছাড়া, কার্বন ও অনুজীবের মূল্য ধরলে তা আরও বাড়বে। 

বাংলাদেশে ফসল উৎপাদন হয় ৮.৫ মিলিয়ন হেক্টর জমিতে, সেখানে প্রায় তিনশত ধরনের ফসলের নানান জাতের (যদিও কৃষির আধুনিক রুপান্তরে ফসল ও জাত বৈচিত্র কমে গেছে) চাষ হয়। বিগত ছয় দশকে দেশের সব AEZ এর জৈব পদার্থ কমেছে অকল্পনীয় পরিমান। তবে সব  জমিতে এ মুহুর্তে জৈব সার দেয়ার হয়ত তেমন প্রয়োজন নেই। সব AEZ এর জমি উঁচু, মাঝারী উঁচু, মাঝারী নিচু, নিচু, খুব নীচু হিসেবে ভাগ করা হয়েছে, এ মুহুর্তে ৩ ধরনের (জমি উঁচু, মাঝারী উঁচু, মাঝারী নিচু) জমি যা মোট ফসলী জমির শতকরা ৭৫ ভাগ এবং সে হিসেবে ৬.৩ মিলিয়ন হেক্টর জমিতে বছরে হেক্টর প্রতি ১০ টন মাত্রায় জৈব সার (১০-১২ % আদ্রতা ) প্রয়োগ করলে মোট ৬০-৬৫  মিলিয়ন মে. টন জৈব সারের প্রয়োজন হয়। দেশে বর্তমান কাঁচামালের বিদ্যমান সংস্থান অনুযায়ী ৬০-৭০ ভাগ জমির জৈব সার এর চাহিদা মেটানো সম্ভব। এ মুহুর্তে দেশে ৫০ লক্ষ মে. টন রাসায়নিক সারের চাহিদা নির্ধারিত আছে। যদি জাতীয় পর্যায়ে এরুপ সিদ্ধান্ত নেয়া হয় যে, ২৫ ভাগ রাসায়নিক সারের চাহিদা জৈব উৎস থেকে প্রয়োগ করা হবে, তবে সে জন্য প্রায় ১০ মিলিয়ন মে.টন জৈব সারের প্রয়োজন হবে। সার উৎপাদন, সরবরাহ, বিপণন কৃষক কর্তৃক সুলভ মূল্যে প্রাপ্তির জন্য দেশে মোট ৮০০০ কোটি  টাকা ভূর্তুকি দেয়া হয়, সেখান থেকে ২০০০ কোটি জৈব সার খাতে খরচ করলে একদিকে যেমন ২৫ ভাগ রাসায়নিক সার কম ব্যবহার হবে, জমিতে ৩-৪ টি পুষ্টি উপাদানের পরিবর্তে ফসলের জন্য অত্যাবশ্যক ১৭টি পুষ্টি উপাদান প্রয়োগ করা  সম্ভব হবে, মাটির অনুজীবীয় কার্যাবলী বৃদ্ধিসহ জমিতে জৈব পদার্থ বাড়বে ও মাটির স্বাস্থের উন্নতি হবে। 

তবে একসাথে এক বছরে এ বিপুল পরিমান জৈব সার উৎপাদন ও ব্যবহার এর সক্ষমতা হয়ত রাতারাতি হবে না। এ প্রক্রিয়াটি উৎসাহিত করার জন্য এ মুহুর্তে প্রয়োজন কৌশলগত পরিকল্পনা গ্রহণ। পাশাপাশি এর উৎপাদন, সরবরাহ ও ব্যবহার বিষয়ক একটি সুষম কাঠামো তৈরি করা দরকার যা দীর্ঘমেয়াদী ও ভবিষ্যতে জৈব সার এর ব্যবহার স্থিতিশীল করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। 

রাসায়নিক উৎপাদনের জন্য বড় বড়  শিল্প কারখানা বিশাল বিনিয়োগ করে স্থাপন করা হয়েছে, কিন্তু জৈব সার উৎপাদন ও বিপননের কোন স্থায়ী কাঠামো নেই । যদিও দেশে ইতোমধ্যে বেশ কয়েকটি বৃহৎ কোম্পানী এ ব্যবসায় সম্পৃক্ত হয়েছে, এরা প্রায় এক লক্ষ টন জৈব সার যোগান দিতে সক্ষম । এদের সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য উৎপাদন পর্যায়ে যেমন; মিউনিসিপালিটিস কর্তৃক বিনামূল্যে জৈব-বর্জ্য সরবরাহ, ইকুইিট ফান্ড হতে ঋণ, কর মওকুফ, উৎপাদন প্লান্ট তৈরীতে সহজ লিজ ইত্যাদি ও বিপননে প্রনোদনা দেয়া যেতে পারে। দেশে বেশ কিছু মাঝারি ধরনের বিনিয়োগকারী রয়েছে, এদের বিনিয়োগ খুবই কম, কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া এদের কারিগরী জ্ঞানের অভাব রয়েছে । তবে এদের শক্তিকে কাজে লাগিয়ে ও সক্ষতা বাড়িয়ে জৈবসার ব্যবহার বাড়ানো যাবে। তবে খুবই গুরুত্বপূর্ন ও কার্যকর ব্যবস্থা হল, ব্লক পর্যায়ে চাষির বাড়িতে বা স্ব-উদ্যোগী তরুনদের মাধ্যমে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জৈব সার প্লান্ট স্থাপন করে কেঁচোসার, কম্পোস্ট সার তৈরী এবং প্রতিটন সার উৎপাদনে কারিগরি সহায়তা ও প্রনোদনা প্রদান করা । তরুনদের উদ্ভুদ্ধ করতে, মাঠ পর্যায়ে  জৈবসারের কাঁচামাল এর জন্য ৪-গরুর-খামার কর্মসূচী চালু করা যেতে পারে । এ কর্মসূচীর একটি সহজ হিসাব যেমন, একটি মাধ্যম আকৃতির গরু সারা বছর প্রায় ৬ টন গোবর ও দুই টন চেনা দেয়। একজন কৃষক বা একজন তরুন উদ্যোক্তার যদি ৪টি গরু থাকে, তাহলে বছরে ২৪ টন গোবর ও ৮ টন চেনা পাওয়া যাবে। যদি গরু চড়ানো সময় অপচয় (পদ্ধতিগত) শতকরা ৪০ ভাগ ধরা হয় তবে ১৫  টন গোবর ও ৫  টন চেনা পাওয়া সম্ভব। এ পরিমান গোবর হতে বছরে সহজেই ২০০ কেজি নাইট্রোজেন, ৯০ কেজি ফসফরাস ২০০ কেজি পটাশিয়ামসহ সব ধরনের অনুপুষ্টি ও পর্যাপ্ত পরিমানে অনুজীবও পাওয়া যাবে । জৈব সারের ওজন নিয়ে এক ধরনের বিভ্রান্তি আছে, যেমন ১ ভাগ আদ্রতা বাড়লে প্রতি টনে ১০ কেজি ওজন বেড়ে যায়, সেখানে কৃষকগণের  প্রতারিত হওয়ার সুযোগ থাকে, সে জন্য জৈব সার ভলিয়ম বা আয়তন আকারে বিক্রি করা যেতে পারে। জৈব সার নিয়ে আরও একটি নেতিবাচক ধারণা আছে যে, এর ফলাফল প্রদর্শন বিলম্ব হয়, তবে গবেষণার মাধ্যমে এর উন্নয়ন করা সম্ভব। পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে যে, প্রয়োজনের তুলনায় জৈব সারের কাঁচামাল কম, তবে প্রণোদনার আওতায় আনা হলে কাঁচামালের যোগান আরও বেড়ে যাবে। কারণ, পশুপালন, মৎস্য চাষ, আগাছা বা সামুদ্রিক আগাছা সংগ্রহে নতুন নতুন উদ্যোক্তা আসবে। এটা একটা ক্ষুদ্র শিল্পে পরিনত হবে।

জৈব সারের ব্যবহার নিশ্চিত করার জন্য বিভিন্ন সরকারী সংস্থার সক্রিয় উদ্যোগ গ্রহন করা দরকার, যেমন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর এর একটি স্থায়ী কর্মসূচী থাকবে, যার মাধ্যমে জৈব সার ব্যবহার করার জন্য  কৃষকদের ব্যাপক উদ্ভুদ্ধুকরন কর্মকান্ড থাকবে, উদ্যোগী তরুনদের সম্পৃক্তকরণ কার্যক্রম, জৈব সার ব্যবহার নিশ্চিত করার জন্য ২৫ ভাগ রাসায়নিক সার কম দেয়ার নিমিত্ত রাসায়নিক সার ক্রয়ের বেলায় মূল্য-প্রণোদনার সুযোগ কার্যকর করা, পাশাপাশি জমিতে ব্যবহার নিশ্চিত করতে জমির GPS তথ্য সংগ্রহ করে তা কৃষি তথ্য সার্ভিস এর কেন্দ্রীয় সার্ভারে আপলোড করা। তাছাড়া মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউট তালিকাভুক্ত চাষিগণের জমির মাটির নমুনা সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করবে। এছাড়া, গবেষণা প্রতিষ্ঠানসমূহ কার্যকর জৈব সার উৎপাদন প্রযুক্তি উদ্ভাবন করার উদ্যোগ গ্রহণ করবে। প্রক্রিয়াটির সঙ্গে বেসরকারি সংস্থাকে সম্পৃক্ত করা যেতে পারে। প্রক্রিয়াটি প্রণোদনা বা ভর্তুকি খাত থেকে ব্যয় করার ব্যবস্থা থাকবে।

সারা বিশ্ব আজ খাদ্য বাজার থেকে সৃষ্ট কোভিড ১৯ নামক ভাইরাসের আক্রমন আশংকায় স্থবির প্রায়। অদৃশ্য এ অনুজীবটি ধনী-দরিদ্র, উচু-নিচু, উন্নত-অনুন্নত, বিলাসী-অবিলাসী, অহংকারী-নিরাহংকারী ইত্যাদি সকল জিতি গোষ্ঠী মানুষকে গত কয়েক মাস যাবৎ ঘরবন্দি করেছে , যার আধুনিক নাম লক-ডাউন। মানব সভ্যতার ইতিহাসে মানুষের এ ধরনের পরিস্থিতি সম্মুখীন হওয়া অভূতপূর্ব। এহেন পরিস্থিতি কত দিন বিরাজ করবে কেউ হলফ করে বলতে পারছে না। তবে নানান স্তরের বিজ্ঞানীগণ একটি বিষয়ে একমত হয়েছেন যে, মানুষের গড়পড়তা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমেছে । এর কারণ হিসেবে আধুনিক জীবনাচরণ ও কমপুষ্টিকর খাদ্য গ্রহন তথা খাদ্য-ব্যবস্থার তথাকথিত আধুনিকায়নকে চিহ্নিত করা হয়েছে । খাদ্য ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করে মানব দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে জৈব সারের ব্যবহার বাড়ানোকে গুরত্বদিয়ে কৃষি জমিতে জৈব সারের ব্যবহার নিশ্চিত করা করার  জন্য রাসায়নিক সারের ভূর্তকি হতে ২৫ ভাগ জৈব সারের উৎপাদন ও প্রয়োগ পর্যন্ত প্রদানের নিম্নবর্নিত প্রস্তাব প্রদান করা হল; জৈব সার উৎপাদনে বড়, মাঝারী ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা শ্রেনী তৈরী ও তাদের কারিগরি-আর্থিক প্রনোদনা প্রদান,  মাঠ পর্যায়ে বাস্তবায়নে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর এর একটি স্থায়ী কর্মসূচি থাকা, স্ব-উদ্যোগী তরুণদের সম্পৃক্ত করে প্রতিটি কৃষি ব্লকে জৈব সারের কারখানা গড়ে তোলা, সকল স্তরে  ICT ও GPS ব্যবহার করে জৈব সার প্রয়োগ নিশ্চত করা, জৈবসারের মান উন্নয়নে গবেষণা জোরদার করা। সর্বোপুরি মাটিতে জৈব সার প্রয়োগকে সামাজিক আন্দোলনে রুপান্তর করার জন্য প্রচার মাধ্যমকে কাজে লাগানো । প্রস্তাবসমূহ বাস্তবায়ন হলে মাটির স্বাস্থ্য, জন স্বাস্থ্য এর উন্নয়ন হবে, শহরের বর্জ্য কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করায় বর্জ্য কমে যাবে ও পরিবেশদুষন কমবে, উদ্যোমী তরুণদের কর্মসংস্থান এর মাধ্যমে দেশের সামগ্রীক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হবে ও পাশাপাশি পরিবেশের  উন্নয়ন হবে ।

ড. মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন, উর্ধতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, জৈব কৃষি গবেষক

বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট, গাজীপুর

ই-মেইল: [email protected]

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন