শুক্রবার | আগস্ট ০৭, ২০২০ | ২২ শ্রাবণ ১৪২৭

সাক্ষাৎকার

ঢাকা ব্যাংক যুগযুগান্তরের পথ পাড়ি দিতে চায়

এমরানুল হক। মার্চের শুরুতে দায়িত্ব নিয়েছেন ঢাকা ব্যাংক লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে। দেশ-বিদেশের নানা ব্যাংকে দায়িত্ব পালনের পর ২৩ বছর আগে তিনি যোগ দিয়েছিলেন ব্যাংকটিতে। দেশের দ্বিতীয় প্রজন্মের ব্যাংকটির নিজস্ব কর্মীদের মধ্য থেকে তিনিই প্রথম শীর্ষ নির্বাহী। ঢাকা ব্যাংকের নানা দিক নিয়ে সম্প্রতি তিনি কথা বলেছেন বণিক বার্তার সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন হাছান আদনান

রজতজয়ন্তীর বর্ষে পা রাখল ঢাকা ব্যাংক। দীর্ঘ ২৫ বছরের পথযাত্রা নিয়ে আপনার মূল্যায়ন কী?

ঢাকা ব্যাংক লিমিটেডের যাত্রা হয়েছিল ১৯৯৫ সালের জুলাই। সে হিসেবে আমরা সিলভার জুবিলি বা রজতজয়ন্তীর বর্ষে পদার্পণ করেছি। যেকোনো আর্থিক প্রতিষ্ঠানের জন্যই ২৫ বছরের পথচলা একটি বড় অর্জন। ঢাকা ব্যাংকের জন্য এটি আরো গৌরবের, কারণ দীর্ঘ পথপরিক্রমা ছিল সাফল্যে ভরপুর। শুরু থেকেই রক্ষণাত্মক অবস্থানে পথ চলেছি আমরা। সম্প্রসারণের জন্য কখনই আগ্রাসী ভূমিকায় ছিলাম না। আমাদের পথচলায় বড় কোনো উত্থান-পতন না থাকলেও ধারাবাহিকভাবে ক্রমাগত উন্নতির পথেই রয়েছি। গত ২৫ বছরের পথযাত্রায় ঢাকা ব্যাংকের কোনো দুর্নাম নেই। কোনো কর্মকাণ্ড নিয়ে কখনই বিতর্কের কথাও শোনা যায়নি। বাংলাদেশ ব্যাংকের পর্যবেক্ষণেও এখন পর্যন্ত ব্যাংকের বড় কোনো ত্রুটির কথা শোনা যায়নি। রজতজয়ন্তীর বর্ষে কথাটি আমরা জোর গলায় বলতে পারছি। বিগত সময়ে ঢাকা ব্যাংক নিজেকে একটি উজ্জ্বল ব্র্যান্ড হিসেবে দাঁড় করাতে পেরেছে।

ঢাকা ব্যাংক এমন একটি সময়ে রজতজয়ন্তীর বর্ষে পদার্পণ করল, যখন সারা পৃথিবী মহামারীতে কাঁপছে। তার পরও বছরটিকে স্মরণীয় করে রাখতে আপনাদের পরিকল্পনা কী?

রজতজয়ন্তী উদযাপনের জন্য বছরব্যাপী নানা ধরনের কর্মসূচি ছিল। এজন্য আমরা দীর্ঘ প্রস্তুতিও নিয়েছিলাম। কিন্তু গৌরবের বছরটি এমন সময়ে এল, যখন মানুষের জীবন জীবিকা উভয়টিই ভয়াবহ ঝুঁকির মুখে। অবস্থায় আমাদের কর্মসূচিতে কাটছাঁট করতে হয়েছে। তবে বড় কর্মসূচিগুলো আমরা বাতিল করিনি। আল্লাহ যখন আমাদের ভালো সময় ফিরিয়ে দেবেন, তখন আমরা রজতজয়ন্তী উৎসব উদযাপন করব। তখন ঢাকা ব্যাংকের গ্রাহক, উদ্যোক্তা, শুভাকাঙ্ক্ষীসহ সব শ্রেণী-পেশার মানুষকে সে আয়োজনে সম্পৃক্ত করা হবে। আপাতত আমরা স্বাভাবিক সুন্দর পৃথিবীর প্রত্যাশায় থাকলাম।

ঢাকা ব্যাংক নামকরণ কেন?

একঝাঁক সৎ সজ্জন ব্যবসায়ীর উদ্যোগে দেশের দ্বিতীয় প্রজন্মের ব্যাংক হিসেবে ঢাকা ব্যাংকের জন্ম হয়েছিল। ব্যাংকের উদ্যোক্তারা একত্রিত হয়েছিলেন দীর্ঘদিনের বন্ধুত্ব ব্যবসায়িক পরিচিতির ভিত্তিতে। তবে উদ্যোক্তাদের বিশেষ আরেকটি পরিচিতি হলো, তাদের বেশির ভাগের জন্মস্থান ঢাকায়। ঢাকা ব্যাংকের নামকরণের ক্ষেত্রে দিকটি বিশেষ ভূমিকা রেখেছে।

ঢাকা ব্যাংকের গর্বের একটি দিক হলো, ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ। শুরু থেকেই ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ শতভাগ স্বাধীনতার সঙ্গে কাজ করতে পেরেছে। ব্যাংকের অভ্যন্তরে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় পরিচালকরা ছিলেন অগ্রণী ভূমিকায়। ঢাকা ব্যাংক প্রতিষ্ঠার দুই বছরের মাথায় আমি এখানে যোগদান করেছিলাম। সে হিসেবে ব্যাংকে আমার ক্যারিয়ার ২৩ বছরের। আমার নিজের জীবনের লক্ষ্য, স্বপ্ন কর্ম সবই ঢাকা ব্যাংকের সঙ্গে মিশে আছে। আমি গর্বের সঙ্গে বলতে পারি, দীর্ঘ কর্মজীবনে আমি কখনো অনৈতিক কোনো প্রস্তাব পর্ষদ থেকে পাইনি।

গত ২৫ বছরে ঢাকা ব্যাংক কতটুকু সম্প্রসারিত হয়েছে?

ঢাকা ব্যাংকের যাত্রা হয়েছিল ১০ কোটি টাকা পরিশোধিত মূলধন দিয়ে। গত ২৫ বছরে মূলধন বেড়ে ৮৫৩ কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে। আমাদের কাছে সুরক্ষিত আছে গ্রাহকদের সাড়ে ১৯ হাজার কোটি টাকার আমানত। আমরা ঠিক সমপরিমাণ অর্থ ঋণ হিসেবে বিতরণ করেছি। সব মিলিয়ে ঢাকা ব্যাংক এখন ২৮ হাজার কোটি টাকা সম্পদের একটি প্রতিষ্ঠান। দুটি ইসলামী ব্যাংকিং শাখাসহ এখন পর্যন্ত ঢাকা ব্যাংকের শাখা সংখ্যা ১০১। এসব শাখার পাশাপাশি তিনটি এসএমই সেন্টার ৫৬টি এটিএম বুথ, ২০টি এডিএম দুটি অফশোর ইউনিট নিয়ে ঢাকা ব্যাংক কার্যক্রম পরিচালনা করছে। কলেবর বৃদ্ধির জন্য শাখা সংখ্যা বাড়ানোয় আমরা জোর দিতে চাই না। বরং সর্বাধুনিক প্রযু্ক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করে আমরা দেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে ঢাকা ব্যাংকের সেবা পৌঁছে দিতে চাই।

ঢাকা ব্যাংকের আর্থিক প্রতিবেদন বলছে, ২০১৯ সালের মার্চের তুলনায় বছরের মার্চে আমানত বিনিয়োগ দুটিই কমেছে। এর কারণ কী?

হ্যাঁ, এটি ঠিক গত এক বছরে ঢাকা ব্যাংকের আমানত ঋণ কিছুটা কমেছে। এটি আমাদের পরিকল্পনার কারণেই হয়েছে। যে কোনো প্রতিষ্ঠানকে মাঝে মধ্যে ব্যবসার নীতিতে কিছু পরিবর্তন আনতে হয়। আমরাও সে ধরনের কিছু পরিকল্পনা নিয়েছি। ব্যালান্সশিটের অবাঞ্ছিত দিকগুলো আমরা ঝেড়ে ফেলতে চেয়েছি। ব্যালান্সশিটের শক্তি বাড়ানোর জন্যই এটি করা হয়েছে। উচ্চ সুদের আমানতগুলো ছেড়ে দিয়ে আমরা নিম্ন সুদের আমানতে জোর দিয়েছি। এতে ব্যাংকের কস্ট অব ফান্ড কমে এসেছে। ঋণ বিতরণের ক্ষেত্রে আমরা বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করেছি। যেসব খাতের বিনিয়োগে ঝুঁকি বেশি, সেখান থেকে নিজেদের গুটিয়ে নিয়েছি।

এটি সত্য, পথচলায় আমাদের গতি কিছুটা ধীর। ঢাকা ব্যাংক জেনে-বুঝে সতর্কতার সঙ্গে সামনে এগোতে চায়। গত ২৫ বছরে ঢাকা ব্যাংক গ্রাহকদের আস্থা অর্জনের মাধ্যমে শক্ত ভিত তৈরি করতে পেরেছে। রাতারাতি চমক সৃষ্টি করে আমরা হারিয়ে যেতে চাই না। ঢাকা ব্যাংক যুগ-যুগান্তরের পথ পাড়ি দিতে চায়।

২৩ বছর ধরে আপনি ঢাকা ব্যাংক পরিবারের সদস্য। আপনার দৃষ্টিতে ব্যাংকের শক্তির জায়গাগুলো কী?

ঢাকা ব্যাংক শুরু থেকে তিনটি বিষয়ে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে সামনে এগিয়েছে। এগুলো হলো, গুণগত মান নিশ্চিত করে ব্যবসার সম্প্রসারণ, মানবসম্পদের মান করপোরেট গভর্ন্যান্স। তিনটি মানদণ্ডে কোনো আপস কিংবা ছাড় দেয়া হয়নি। এতে ঢাকা ব্যাংকের ভিত মজবুত হয়েছে। ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার শতাংশের নিচে। যদিও দেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের হার ১০ শতাংশের বেশি। ঢাকা ব্যাংকের গর্বের বড় জায়গা হলো এর মানবসম্পদ। শুরু থেকে জনবল নিয়োগের ক্ষেত্রে কোনো আপস করা হয়নি। শুরুতে যাদের নিয়োগ দেয়া হয়েছে, এখন তারা ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন পর্যায়ে দায়িত্ব পালন করছেন। ব্যাংকের মানব সম্পদ আন্তর্জাতিক মানের। এছাড়া যোগ্য পরিচালনা পর্ষদ ডাইনামিক ব্যবস্থাপনা ব্যাংকের অন্যতম শক্তি।

ঢাকা ব্যাংক কতটা ডিজিটাল? করোনাকালে প্রযুক্তিনির্ভর ব্যাংকিং সেবার প্রয়োজনীয়তা কতটা উপলব্ধি করেছেন?

যাত্রার পর থেকেই ঢাকা ব্যাংক প্রযুক্তিতে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছে। ডিজিটাল ব্যাংক হিসেবে ঢাকা ব্যাংকের সুনামও অনেক। গ্রাহকদের সর্বাধুনিক ব্যাংকিং সেবা দিতে পারাটা তৃপ্তির। আমরা গ্রাহকদের জন্যঢাকা ব্যাংক গোনামে একটি অ্যাপ চালু করেছি। গর্বের সঙ্গে বলতে পারি, অ্যাপটি এখন পর্যন্ত বাজারের সেরা। গ্রাহকরা ঘরে বসেই সব ধরনের লেনদেন করতে পারছেন। গ্রাহকদের আমরা ঘরে বসে ব্যাংক হিসাব চালু করার সেবাও দিচ্ছি। চেকের ব্যবহার ছাড়াই ঢাকা ব্যাংকের গ্রাহকরা ঘরে বসে যে কোনো পেমেন্ট দিতে পারছেন। এজন্যঢাকা ব্যাংক সি-সলিউশনচালু করা হয়েছে। এছাড়া গ্রাহকদের জন্যঢাকা ব্যাংক ট্রেডক্লুড’, ‘ঢাকা ব্যাংক বিলস-টু-ক্যাশ’, প্রিপেইড কার্ড, ‘ঢাকা ব্যাংক টিউশন ফি সলিউশননামে অনলাইন সেবা চালু করা হয়েছে। প্রযুক্তি সম্পৃক্ত সব লেনদেনে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়েছে। বিশ্বের সর্বাধুনিক ওরাকল সুপার ক্লাস্টার প্রযুক্তির কোর ব্যাংকিং সফটওয়্যার আপডেট করা হয়েছে। ক্রেডিট ডেবিট কার্ড ব্যবস্থাপনা একটি পদ্ধতির আওতায় আনা হয়েছে। গ্রাহকদের জন্য চালু করা হয়েছেভার্চুয়াল কার্ড তার পরও করোনা পরিস্থিতি প্রযুক্তির দুর্বলতাগুলো চিহ্নিত করার সুযোগ করে দিয়েছে। মহামারী থেকে নেয়া শিক্ষা আমরা কাজে লাগাতে চাই।

চলমান দুর্যোগ মোকাবেলায় আপনাদের পরিকল্পনা কী?

নভেল করোনাভাইরাসে সৃষ্ট দুর্যোগ উত্তরণের জন্য সব প্রতিষ্ঠানেরই নিজস্ব অ্যনালাইসিস থাকে। আমরাও ঢাকা ব্যাংকের জন্য সেটি করেছি। ধরে নিচ্ছি, পরিস্থিতি ছয় বা নয় মাস থাকবে। অবস্থায় ব্যাংকের ব্যয় কমানোর জন্য যা যা করা দরকার, সব পরিকল্পনাই করা হয়েছে। আমাদের লক্ষ্য হলো ব্যাংকের ব্যয় ২০-২৫ শতাংশ কমিয়ে আনা। তবে সেটি কর্মীদের বেতন কমিয়ে নয়। ঢাকা ব্যাংকের কর্মীদের বেতন-ভাতা কমানো হবে না। দেশের যে কোনো ভালো ব্যবসায়ীর জন্য ঢাকা ব্যাংকের দরজা উন্মুক্ত। ভালো উদ্যোক্তাদের আমরা সর্বাত্মক সহযোগিতা করতে চাই। তবে ধূর্তদের বিষয়ে আমরা সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করব।

শীর্ষ নির্বাহী হিসেবে ঢাকা ব্যাংকের জন্য কী ঝুঁকি দেখছেন?

একটি পূর্ণাঙ্গ ব্যাংকের সব উপাদান ঢাকা ব্যাংকের রয়েছে। সূচনালগ্ন থেকেই ব্যাংক আন্তর্জাতিক স্ট্যান্ডার্ড নিয়ে চলছে। ঢাকা ব্যাংকের ছোটখাটো কিছু ঝুঁকি থাকলেও বড় মাঝারি কোনো ঝুঁকি আমি দেখছি না। উল্লেখ করার মতো ঝুঁকি একটাই, সেটি হলো যেসব মানবসম্পদ তৈরি করা হয়েছে, তাদের ধরে রাখা। দক্ষ যোগ্য কর্মীরা যাতে কোনো দিকে চলে না যায়, সেটি খেয়াল রাখতে হবে। পাশাপাশি কোনো ঋণ যাতে খেলাপি না হয়, সেদিকেও নজর দিতে হবে।

রজতজয়ন্তী উপলক্ষে বিশেষ কোনো বার্তা দিতে চান?

উদ্যোক্তা, গ্রাহক, গণমাধ্যম দেশবাসীর আস্থা, ভালোবাসা উৎসাহে ঢাকা ব্যাংক আজকের অবস্থানে দাঁড়াতে পেরেছে। মহামারীতে বিধ্বস্ত বিপর্যস্ত সময়েও যারা আমাদের পাশে দাঁড়িয়েছে, তাদের প্রতি ভালোবাসা কৃতজ্ঞতা। অন্ধকার কেটে যাক, সবার জীবন আলোয় আলোয় ভরে উঠুকএটিই প্রার্থনা।

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন