বৃহস্পতিবার | আগস্ট ১৩, ২০২০ | ২৯ শ্রাবণ ১৪২৭

প্রথম পাতা

কভিড-১৯

প্রতিষেধক কত দূর

বণিক বার্তা ডেস্ক

গত বছরের ডিসেম্বরের শেষদিকে এক রহস্যজনক ধরনের নিউমোনিয়া ছড়িয়ে পড়ে চীনের উহানে। অল্প সময়ের মধ্যেই চীনা বিজ্ঞানীরা রোগের জন্য দায়ী ভাইরাসটিকে এক জাতের করোনাভাইরাস ২০০৩ সালের মহামারীর জন্য দায়ী সার্স ভাইরাসের কাছাকাছি প্রজাতির ভাইরাস হিসেবে চিহ্নিত করেন।

ভাইরাস সংক্রমণ শুরুর পর ছয় মাস পেরিয়েছে। বিশ্বব্যাপী সংক্রমিত হয়েছে এক কোটিরও বেশি মানুষ। মৃতের সংখ্যাও লাখের বেশি। অন্যদিকে দিনরাত পরিশ্রম করে ভাইরাসটির প্রতিষেধক উদ্ভাবনের প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছেন গবেষকরা।

বিশ্বব্যাপী গবেষকরা এখন পর্যন্ত নভেল করোনাভাইরাসের ১৪৫টিরও বেশি প্রতিষেধক উন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছেন। এর মধ্যে মানুষের দেহে পরীক্ষামূলক প্রয়োগের পর্যায়ে যেতে পেরেছে মাত্র ২১টি। মানবদেহে ব্যাপক হারে প্রয়োগের উপযুক্ত হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার আগে যেকোনো ভ্যাকসিন বা প্রতিষেধককে কয়েক বছর ধরে পরীক্ষা-নিরীক্ষার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। কিন্তু বৈশ্বিক মহামারীর চলমান পরিস্থিতিতে এতটা সময় মানবজাতির হাতে নেই। তাই আগামী বছরের আগেই ব্যাপক মাত্রায় নিরাপদ কার্যকর ভ্যাকসিন উৎপাদনে যেতে রীতিমতো প্রতিযোগিতা করে কাজ করছেন বিজ্ঞানীরা।

ভ্যাকসিন নিয়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যে প্রাণান্তকর প্রয়াসের সূচনা গত জানুয়ারিতে। চীনা বিজ্ঞানীদের সার্স-কোভ- বা নভেল করোনাভাইরাসের জিনোম রহস্য উদ্ঘাটনের মধ্য দিয়ে শুরু হয় প্রতিষেধক উদ্ভাবনের কাজ। মানবদেহে ভ্যাকসিনের প্রয়োগ শুরু হয় মার্চে, যদিও সে সময় প্রয়াসকে সামনে এগিয়ে নেয়া প্রসঙ্গে বেশ অনিশ্চয়তার মধ্যে ছিলেন বিজ্ঞানীরা।

স্বাভাবিকভাবেই পরীক্ষামূলক প্রয়োগে অকৃতকার্যতা আসতে পারে। এমনকি নানা কারণে স্পষ্ট কোনো ফল অর্জনের আগেই থেমে যেতে পারে ভ্যাকসিন উদ্ভাবনের কার্যক্রম। দেহের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থায় ভাইরাসটিকে প্রতিরোধ করতে সক্ষম অ্যান্টিবডি তৈরিতে নেয়া অনেক প্রয়াসের মধ্যে সফল হতে পারে মাত্র অল্প কয়েকটি।

কোনো ভাইরাসের ভ্যাকসিন উদ্ভাবন করার সঙ্গে সঙ্গেই তা ব্যবহার করা যায় না। প্রতিষেধক তৈরির পর সেটিকে বেশ কয়েকটি পর্যায় বা ধাপ অতিক্রম করে যেতে হয়। অন্যথায় তা মানবদেহে ব্যাপক হারে প্রয়োগ করার বিষয়টি বিপজ্জনক হয়ে দেখা দিতে পারে।

গবেষণাগারে তৈরীকৃত ভ্যাকসিন মানবদেহে ব্যবহারের স্বীকৃতি পেতে হলে প্রথম যে ধাপটি অতিক্রম করতে হয়, তাকে বলা হয় প্রিক্লিনিক্যাল টেস্টিং। পর্যায়ে বিজ্ঞানীদের ইঁদুর বা বানরের ওপর ভ্যাকসিন প্রয়োগ করে দেখতে হয়, এটি আসলে সংশ্লিষ্ট ভাইরাসটির বিরুদ্ধে দেহের রোগ প্রতিরোধক্ষমতাকে শক্তিশালী করে তুলতে সক্ষম কিনা। এই ধাপে সফল হওয়ার পরই তা পরবর্তী ধাপে প্রয়োগের জন্য উপযুক্ত হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

পরের ধাপটিকে বলা হয় ফেজ সেফটি ট্রায়ালস। এক্ষেত্রে অল্প কিছু মানুষের ওপর ভ্যাকসিনটি প্রয়োগ করে এর নিরাপদ ব্যবহার ডোজের মাত্রা নির্ধারণ করা হয়। একই সঙ্গে তা মানবদেহের রোগ প্রতিরোধক্ষমতাকে ভাইরাসটির বিরুদ্ধে সক্রিয় করে তুলতে সক্ষম কিনা, সেটিও ধাপে নিশ্চিত করতে হয়।

ভ্যাকসিনের পরীক্ষামূলক প্রয়োগের পরের ধাপটিকে চিহ্নিত করা হয় ফেজ এক্সপান্ডেড ট্রায়ালস হিসেবে। এক্ষেত্রে বয়স-লিঙ্গ বা অন্যান্য মানদণ্ডের ভিত্তিতে কয়েকশ মানুষকে বিভিন্ন দলে ভাগ করে তাদের ওপর ভ্যাকসিনটি প্রয়োগ করা হয়। এক্ষেত্রে প্রতিটি দলের ওপর (যেমন শিশু বা বৃদ্ধদের ওপর) ভ্যাকসিনটির প্রভাব আলাদাভাবে খতিয়ে দেখতে হয় গবেষকদের। একই সঙ্গে রোগ প্রতিরোধক্ষমতাকে প্রতিষেধকটি কতটা নিরাপদ কার্যকরভাবে সক্রিয় করে তুলতে সক্ষম, বিজ্ঞানীদের সে বিষয়টি আরো গভীরভাবে খতিয়ে দেখতে হয়।

পরবর্তী ধাপ বা ফেজ এফিক্যাসি ট্রায়ালসের ক্ষেত্রে কয়েক হাজার মানুষের ওপর প্রতিষেধকটি প্রয়োগ করা হয়। এক্ষেত্রে প্ল্যাসেবো (প্রতিক্রিয়াহীন ওষুধ বা চিকিৎসা প্রক্রিয়া যা গ্রহণের মাধ্যমে মানুষ মানসিকভাবেই উপকৃত হয় বেশি) গ্রহণকারীদের সঙ্গে প্রতিষেধক গ্রহণকারীদের মধ্যে সংক্রমিত হওয়ার হার তুলনামূলকভাবে পর্যালোচনা করে দেখা হয়। উদ্ভাবিত ভ্যাকসিন আসলেই নভেল করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে কার্যকর কিনা, সেটি নির্ধারিত হয় পর্যায়েই।

পরীক্ষামূলক এসব পর্যায়ের ফলাফল যাচাই-বাছাইয়ের পরই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ প্রতিষেধকটি বাজারে উন্মুক্ত করার অনুমোদন দিতে পারে। তবে মহামারীকালীন জরুরি অবস্থায় আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেয়ার আগেই বাজারে প্রতিষেধক ছাড়ার অনুমতি দিতে পারে কর্তৃপক্ষ, সেক্ষেত্রেও প্রত্যেক পর্যায়ের ফলাফল যাচাই-বাছাই করার বিষয়টি অপরিহার্য।

এছাড়া মহামারীকালে ভ্যাকসিন দ্রুত উদ্ভাবনের স্বার্থে বর্ণিত ধাপগুলোর কয়েকটিকে একসঙ্গে সমন্বিতভাবে প্রয়োগ করা যায়। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, নভেল করোনাভাইরাসের কয়েকটি প্রতিষেধক এখন একই সঙ্গে ফেজ ফেজ -এর কার্যক্রম সম্পন্ন করছে, যেখানে প্রিক্লিনিক্যাল টেস্টিং  বা ইঁদুর/বানরের ওপর প্রয়োগের পরবর্তী পর্যায়েই কয়েকশ মানুষের ওপর ভ্যাকসিনের প্রয়োগ শুরু করে দিয়েছে উদ্ভাবক প্রতিষ্ঠানগুলো।

এখন পর্যন্ত যেসব প্রতিষ্ঠান ভ্যাকসিন গবেষণায় সবচেয়ে বেশি এগিয়ে আছে সেগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটির অগ্রগতি এখানে তুলে ধরে হলো

ভারতীয় ভ্যাকসিন নির্মাতা প্রতিষ্ঠান জাইডাস ক্যাডিলা এখন ফেজ ফেজ -এর সমন্বিত পর্যায়ে রয়েছে। একই পর্যায়ে কার্যক্রম শুরু করছে জাপানি কোম্পানি অ্যাঙ্গেস। পর্যায়ে প্রবেশ করতে যাচ্ছে ভারতীয় প্রতিষ্ঠান ভারত বায়োটেক। 

ফেজ ট্রায়ালে প্রবেশ করতে যাচ্ছে অস্ট্রেলীয় কোম্পানি ভেক্সিন।

তবে সবচেয়ে এগিয়ে চীনা কোম্পানি ক্যানসিনো বায়োলজিকস। প্রতিষ্ঠানটির উদ্ভাবিত ভ্যাকসিন এরই মধ্যে সামরিক বাহিনীতে পরীক্ষামূলক প্রয়োগের জন্য অনুমোদন দেয়া হয়েছে।

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন