বৃহস্পতিবার | আগস্ট ১৩, ২০২০ | ২৯ শ্রাবণ ১৪২৭

সম্পাদকীয়

আলোকপাত

নাইকোর পরাজয় দেশের বিজয়

ড. এম শামসুল আলম

গত মে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে সরকার তথা বিদ্যুৎ, জ্বালানি খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী আনুষ্ঠানিকভাবে দেশবাসীকে জানালেন, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ বিরোধ নিষ্পত্তি আদালতইকসিডকর্তৃক ঘোষিত রায় অনুযায়ী টেংরাটিলা গ্যাসফিল্ড বিস্ফোরণ ঘটানোর জন্য নাইকো দায়ী। ফলে এজন্য নাইকো বাংলাদেশকে বিলিয়ন ডলারের বেশি ক্ষতিপূরণ দেবে। সে ক্ষতিপূরণ আদায় এবং নাইকো চুক্তি তার স্বার্থরক্ষায় জড়িতদের যেন সুষ্ঠু বিচার হয়এমন প্রত্যাশা এখন দেশবাসীর। রায় যথাযথভাবে ব্যবহারের মাধ্যমে সব দুর্নীতি উচ্ছেদ করে বিদ্যুৎ জ্বালানি খাত সুরক্ষা নিশ্চিত করা হবেএমন প্রত্যাশা থেকেই লেখা। সঠিক দামে, সঠিক মানে সঠিক মাপে পণ্য বা সেবা পাওয়া দেশের মানুষের অধিকার হওয়া সত্ত্বেও দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে না থাকায় বিদ্যুৎ জ্বালানি ক্ষেত্রে মানুষ সে অধিকার থেকে বঞ্চিত। রায় সে অধিকার সুরক্ষা নিশ্চিত করার সুযোগ সৃষ্টি করেছে।

. নাইকোর পাওনা স্থগিত, গ্যসক্ষেত্র বিস্ফোরণের ক্ষতিপূরণ দাবি, সম্পদ বাজেয়াপ্ত এবং অবৈধ যৌথ উদ্যোগ চুক্তি (যেভিএ) গ্যাস ক্রয় চুক্তি (জিপিএ) জনস্বার্থে বাতিলের জন্য ২০১৬ সালে আমি উচ্চ আদালতে দুটি রিট আবেদন করি। রিট মামলায় আদালত চুক্তি দুটি স্থগিত, নাইকোর সব সম্পত্তি জব্দ এবং বাংলাদেশের কাছে নাইকোর গ্যাস বিক্রির অর্থ ২৭ মিলিয়ন ডলার প্রদানে স্থগিতাদেশ দেন। অবশেষে আদালত একটি মামলার চূড়ান্ত রায়ে উভয় চুক্তি বাতিল ক্ষতিপূরণ প্রদানের আদেশ দেন। অন্য মামলাটি নিষ্পত্তির অপেক্ষায় থাকে। ওই রায়ের বিরুদ্ধে নাইকো আপিল বিভাগে আপিল আবেদন করে এবং রায় স্থগিতের আদেশ চায়। কিন্তু আপিল বিভাগ স্থগিতাদেশ দেননি। ফলে রায় বহাল থাকে এবং নাইকোর উভয় চুক্তি কার্যকারিতা হারায়। নাইকো ওই চুক্তির আওতায় গ্যাস উত্তোলন গ্যাস বিক্রির অর্থপ্রাপ্তির অধিকার হারায় এবং বিস্ফোরণ ক্ষতিপূরণ দিতে বাধ্য থাকে। অতঃপর ইকসিডের ওই রায়ে আমাদের উচ্চ আদালতের রায় বাস্তবায়ন নিশ্চিত হয় এবং আদর্শিক মানদণ্ডে ক্ষতিপূরণ নির্ধারণ আদায়ের সুযোগ সৃষ্টি হয়।

অবৈধ নাইকো চুক্তি বাতিল ট্যাংরাটিলা তথা ছাতক (পশ্চিম) গ্যাসক্ষেত্র বিস্ফোরণ ক্ষতিপূরণ নাইকোর কাছ থেকে আদায়ের জন্য ২০০৬ সালে মানুষ রাস্তায় নামে। তেল, গ্যাস, বিদ্যুৎ, বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটি সে আন্দোলন সুসংগঠিত করে। সে সময় বলা হতো, বিদেশীদের সঙ্গে সম্পাদিত কোনো চুক্তি অবৈধ কিংবা দেশের স্বার্থবিরোধী হলেও বাতিল করা যায় না। একটা স্বাধীন সার্বভৌম সরকারের এমন সব বক্তব্যে জাতি তখন অসহায় বোধ করে এবং হতাশাগ্রস্ত হয়। সরকারের তরফ থেকে এসব বক্তব্য সক্ষম জাতি হিসেবে আমাদের জন্য বেদনাদায়ক ছিল। নাইকো চুক্তি অবৈধ হওয়ার পরও তা বাতিল না করে সরকার সেই চুক্তির আওতায় নাইকোকে সব দিক দিয়ে সুরক্ষা দেয়। এমন চুক্তি শুধু নাইকোতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। পরবর্তীকালে তেল, গ্যাস, কয়লা বিদ্যুৎ খাতে এমন সব চুক্তি সম্পাদন অব্যাহত থাকে। সরকার পরিবর্তন হলেও সেসব চুক্তিতে সরকারি সুরক্ষা ধারাবাহিকতা পায়। এটি এক ধরনের রীতি বা নীতিতে পরিণত হয়। তাই চুক্তি অন্যায় অবৈধ হলেও বাতিল হয় না। এটিই নিয়তি বলে দেশের মানুষ মেনে নেয়। কিন্তু ইকসিডের রায় বুঝিয়ে দিয়েছে আমরা জাতি হিসেবে কতটা সক্ষম। চুক্তি দেশী হোক বা বিদেশী, বৈধতার প্রশ্নে যদি তা বাতিলযোগ্য হয়, আমরা তা বাতিল করাতে সক্ষম। গণ আন্দোলনের মুখে গ্যাস রফতানির উদ্যোগ বাতিল হয়, সমঝোতা চুক্তির আওতায় টাটার অযাচিত বিনিয়োগ প্রস্তাব প্রত্যাহার হয় এবং এশিয়া এনার্জির চুক্তি বাতিল করার অঙ্গীকার করে সরকার ফুলবাড়ীর জনগণের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়। অবৈধ ঘোষণা করে আমাদেরই উচ্চ আদালত নাইকো চুক্তি বাতিল করেন এবং বিস্ফোরণ ক্ষতিপূরণ আদায়ের লক্ষ্যে নাইকোর সমুদয় সম্পদ জব্দ করেন। তারই ধারাবাহিকতায় ক্ষতিপূরণ আদায় মামলায় ইকসিডে নাইকো পরাজিত হয়। সরকার জয়ী হয়। এসব দৃষ্টান্তে প্রমাণিত হয়, বিশ্বদরবারে একটি সক্ষম জাতি হিসেবে আমরা পরিচিত প্রতিষ্ঠিত। পরিসরে তা অনুধাবন করে দেশবাসী বিশেষভাবে গর্বিত। 

. ২০১০ সালে নাইকোই প্রথম বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ইকসিডে দুটি মামলা করে। তাতে এই মর্মে আদেশ চাওয়া হয়—() ট্যাংরাটিলা গ্যাসফিল্ড বিস্ফোরণের দায় নাইকোর ওপর বর্তায় না এবং () সেজন্য নাইকো ক্ষতিপূরণ দিতে বাধ্য নয়। ফলে () নাইকো আটকে রাখা গ্যাস বিক্রি বাবদ প্রাপ্য বিল ছাড়ের আদেশ চায়। ২০১৪ সালের ১১ সেপ্টেম্বর মামলার রায় হয়। সে রায়ে গ্যাস বিক্রির মূল্য বাবদ ২৭ মিলিয়ন ডলার তিন মাস সময়সীমার মধ্যে পরিশোধ করার আদেশ হয়। মামলায় বাংলাদেশ পরাজিত হয় এবং নাইকো জয়ী হয়। ট্যাংরাটিলার গ্যাসকূপ খননকাজের বিপরীতে ব্যাংকে রাখা জামানতের অর্থ নাইকোকে তুলে নেয়ার সুযোগ দেয়া হয়। স্থলভাগে অবস্থিত নং গ্যাসব্লকের নাইকোর শেয়ার বিক্রির সুযোগও নাইকোকে দেয়া হয়। স্থানীয় আদালতে নাইকোর বিরুদ্ধে দুর্নীতি ক্ষতিপূরণ আদায়ের মামলার নিষ্পত্তি ছাড়াই ইকসিডে নাইকোর দায়েরকৃত মামলা নিষ্পত্তি হয় এবং বাংলাদেশ হেরেও যায়। সেই সঙ্গে নাইকোকে দেয়া হয় এমন সব অন্যায় অযৌক্তিক সুযোগ-সুবিধা।

. মামলার কাগজপত্র পর্যালোচনায় দেখা যায়, বাংলাদেশের পক্ষ থেকে মামলা পরিচালনায় ত্রুটি ছিল। মামলায় নিয়োজিত আইনজীবীদের ভূমিকা ছিল বিতর্কিত। সংবাদমাধ্যমে অভিযোগ ওঠে, তারা নাইকোর স্বার্থে নাইকোর পক্ষে কাজ করেছেন। শুনানিতে বাংলাদেশের বিপক্ষেও কথা বলেছেন। ফলে তাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। মামলায় দরকারি কাগজপত্র তথ্যপ্রমাণ পেট্রোবাংলা বা জ্বালানি বিভাগ থেকে সঠিকভাবে সরবরাহ করা হয়েছে কিনা অথবা স্বীয় স্বার্থে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র তথ্যপ্রমাণাদি আদালতে বাংলাদেশের পক্ষে সঠিকভাবে দাখিল করা হয়েছে কিনা, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, নাইকোর স্বার্থরক্ষায় ব্যাংক থেকে জামানতের টাকা তোলা গ্যাসব্লকের শেয়ার বিক্রির সুযোগ দেয়া হয়েছে।

. মাগুরছড়া গ্যাসফিল্ড বিস্ফোরণ তদন্ত রিপোর্টে বিস্ফোরণের জন্য অক্সিডেন্টালকে দায়ী করা হয়। রিপোটর্টি বিদ্যুৎ, জ্বালানি খনিজ সম্পদবিষয়ক সংসদীয় কমিটি চেয়েও পায়নি। তত্কালীন জ্বালানি সচিব রিপোর্টটি সংসদীয় কমিটিকে দিতে সরাসরি অস্বীকার করেন বলে জানা যায়। তখন মাগুরছড়া গ্যাসফিল্ড নিয়ে সম্পাদিত পিএসসির কার্যকারিতা না থাকায় অক্সিডেন্টাল মাগুরছড়া গ্যাসফিল্ডের স্বত্বাধিকার হারায়। ফলে অন্যায় অবৈধ সম্পূরক চুক্তি সম্পাদন করে সে স্বত্বাধিকার পুনরুদ্ধার করা হয় এবং বীমার অর্থ তুলে নিয়ে সে স্বত্বাধিকার ইউনিকলের কাছে বিক্রি করে ক্ষতিপূরণ আদায় ছাড়াই বাংলাদেশ থেকে অক্সিডেন্টালকে পালিয়ে যেতে দেয়া হয়। নাইকো চুক্তির মতোই এই সম্পূরক চুক্তিতেও দুর্নীতি ছিল।         

. বিদ্যুৎ, জ্বালানি খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের জ্বালানি খনিজ সম্পদ বিভাগে ট্যাংরাটিলা তথা ছাতক (পূর্ব), ফেনী কামতা গ্যাসফিল্ডগুলোকে প্রান্তিক তথা পরিত্যক্ত দেখিয়ে সেখান থেকে গ্যাস তোলার জন্য নাইকো ১৯৯৭ সালে অযাচিত প্রস্তাব পেশ করে। পিএসসির আওতায় গ্যাস উত্তোলনে নাইকো অযোগ্য অনুপযুক্ত গণ্য হলেও জ্বালানি বিভাগ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেনি। বরং তত্কালীন জ্বালানি সচিব প্রস্তাবটি প্রক্রিয়ায় আনেন। অভিযোগ রয়েছে, নাইকো দুর্নীতির সঙ্গে তার সংশ্লিষ্টতার সূত্রপাত এখান থেকেই। দুর্নীতি মামলার অন্যতম আসামি তার নিকটাত্মীয় বলে জানা যায়। ওই প্রস্তাবের আওতায় ২০০৩ সালে নাইকো-বাপেক্স যৌথ চুক্তি জেভিএ এবং গ্যাস ক্রয় চুক্তি জিপিএ সম্পাদিত হয়। কানাডার আদালতে ২০০৯ সালে দায়েরকৃত মামলায় এই উভয় চুক্তি দুর্নীতির মাধ্যমে সম্পাদিত বলে প্রমাণিত হয়। চুক্তি সম্পাদনে ঘুষ দেয়ার দায় স্বীকার করায় ২০১১ সালে ওই মামলায় নাইকোকে দশমিক মিলিয়ন ডলার জরিমানা করা হয়। তিনটি গ্যাসক্ষেত্র পরিত্যক্ত দেখিয়ে ক্ষমতার অপব্যবহার করে নাইকোর হাতে তুলে দেয়ার মাধ্যমে রাষ্ট্রের ১৩ দশমিক ৭৭ হাজার কোটি টাকা ক্ষতি করার দায়ে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে দুদক ২০০৭ সালে মামলা করে। ২০০৮ সালে অভিযোগপত্র দাখিল করে। মামলাটি বিচারাধীন। তাছাড়া ২০০৮ সালে সরকার নাইকোর কাছ থেকে বিস্ফোরণ ক্ষতিপূরণ আদায়ের জন্য আরেকটি মামলা করে। সে মামলাটিও বিচারাধীন। 

. অভিযোগে প্রকাশ, দুর্নীতিতে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করে সুইজারল্যান্ডে নিবন্ধিত কোম্পানি স্টার্টাম। কোম্পানির নেতৃত্বে ছিলেন সাবেক সংসদ সদস্য ঢাকা ক্লাবের সাবেক এক সভাপতি। নাইকোর স্থানীয় প্রতিনিধি ওই কোম্পানির মধ্যে মিলিয়ন ডলারের বিনিময়ে স্টার্টাম জেভিএ জিপিএ সই করাবে মর্মে এক চুক্তি সম্পাদিত হয়। শর্ত থাকে যে ছাতক পশ্চিমের সঙ্গে ছাতক পূর্ব গ্যাসফিল্ডও জেভিএভুক্ত হবে। চুক্তি মতে, জেভিএ জিপিএ সই হয় এবং ছাতক পূর্ব জেভিএভুক্ত হয়। নাইকোর স্বীকারোক্তিতে জানা যায়, চুক্তি মতে তারা মিলিয়ন ডলার পরিশোধ করে। তারা অর্থ দিয়েছে দেশের কয়েকজন ব্যক্তিকে।

. তিনটি গ্যাসফিল্ডকেপ্রান্তিকদেখিয়ে সেখান থেকে গ্যাস তোলার জন্য নাইকো-বাপেক্স যৌথ উদ্যোগ চুক্তি হয়। আসলেই কি এসব গ্যাসক্ষেত্র প্রান্তিক ছিল? প্রথমত, ছাতক (পশ্চিম) গ্যাসফিল্ডে প্রায় ৪৭৪ বিসিএফ গ্যাস মজুদ ছিল। আশির দশকে ২৫ বিসিএফ গ্যাস তোলার পর পানি বালি ওঠার কারণে গ্যাস উত্তোলন স্থগিত করা হয়। সুতরাং গ্যাস ফিল্ড পরিত্যক্ত বা প্রান্তিক হওয়ার প্রশ্নই উঠতে পারে না। পরবর্তীতে ওই ফিল্ড থেকে গ্যাস উত্তোলন শুরু হয়। নাইকোর মূল্যায়ন প্রতিবেদনে এসব তথ্য পাওয়া যায়। কারিগরি বিবেচনায় গ্যাসফিল্ডকে প্রান্তিক বা পরিত্যক্ত গণ্য করার মতো কোনো ব্যাখ্যা নেই। দ্বিতীয়ত, প্রথম যে খসড়া চুক্তি অনুমোদিত হয়, সেখানে ছাতক পূর্ব গ্যাসফিল্ড ছিল না। ছাতক পশ্চিম ছিল। ফেনী কামতা দুটি গ্যাসফিল্ড ছিল। কামতা ছিলপ্রান্তিকগ্যাসফিল্ড। চূড়ান্ত চুক্তিতে সেই কামতাই বাদ পড়ে। ভার্জিন গ্যাসফিল্ড ছাতক পূর্ব ব্যারিস্টার মওদুদ আহমেদের -ফার্মের আইনি ভেটিংয়ের ভিত্তিতে অন্তর্ভুক্ত হয়। খসড়া চুক্তিতে নাইকোর প্রস্তাব সুইচ চ্যালেঞ্জের মাধ্যমে যাচাই-বাছাই করার শর্ত ছিল। চূড়ান্ত চুক্তিতে সে শর্ত বাদ দেয়া হয়। নাইকোর প্রস্তাবে এসব গ্যাসফিল্ডকে প্রান্তিক বলে অভিহিত করে। আবার নাইকোই সেসব গ্যাসফিল্ড  মূল্যায়ন প্রতিবেদন দেয়। সে মূল্যায়নের ভিত্তিতেই নাইকো প্রস্তাব প্রক্রিয়াকরণ হয়।

১০. সরকারি নথিপত্রে এসব গ্যাসফিল্ড যে প্রান্তিক/পরিত্যক্ত, সে ব্যাপারে কোনো তথ্য-প্রমাণ নেই। তবে নাইকো প্রস্তাব প্রক্রিয়াকরণের অংশ হিসেবে ওই গ্যাসফিল্ডগুলো প্রান্তিক/পরিত্যক্ত কিনা, তা মূল্যায়নের জন্য তিন সচিবের সমন্বয়ে গঠিত কমিটি দ্বারা একটি প্রসিডিউর প্রণয়ন করা হয়। নাইকো চুক্তিতে প্রসিডিউরের ভিত্তিতে প্রস্তাবিত গ্যাসফিল্ডগুলোকে প্রান্তিক/পরিত্যক্ত গণ্য করা হয়। কিন্তু সে প্রসিডিউরে দেখা যায়, মূল্যায়নের ব্যাপারে কারিগরি মানদণ্ড বলে কোনো কিছু নেই। তাতে কোনো বিচার-বিশ্লেষণ বা মান-মাপ ছাড়াই ওই গ্যাসফিল্ডগুলোকে সরসরি প্রান্তিক/পরিত্যক্ত বলে অভিহিত করা হয়েছে। তাছাড়া প্রসিডিউরটি সরকারের অনুমোদিত কোনো আইন/বিধি/প্রবিধানমালা বা নীতিমালাও নয়। সুতরাং ওই প্রসিডিউরের ভিত্তিতে গ্যাসফিল্ডগুলোকে প্রান্তিক অভিহিত করাকে প্রহসন ছাড়া অন্য কিছু বলা যায় না। এর পেছনে দুরভিসন্ধি ছাড়া কোনো কারিগরি বা আইনি ভিত্তি ছিল না।

১১. ইকসিডের রায়ে বলা হয়, কূপ খননে স্ট্যান্ডার্ড ফলো না করায় বিস্ফোরণ ঘটে। বিস্ফোরণের দায় সম্পূর্ণভাবে নাইকোর। কূপ খননকাজের কোনো অনুমোদিত ডিজাইন ছিল না। নাইকোর অবহেলা, অদক্ষতা অযোগ্যতার কারণেই বিস্ফোরণ ঘটে। এর সুস্পষ্ট প্রমাণ আমাদের সরকারি তদন্ত প্রতিবেদনেও পাওয়া যায়। ক্ষমতার অপব্যবহার করে নাইকো চুক্তি করার অভিযোগে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি নাইকোর বিরুদ্ধে বিস্ফোরণ ক্ষতিপূরণ আদায়ের মামলা ২০০৭ সাল থেকে স্থানীয় আদালতে বিচারাধীন রয়েছে। ২০১১ সালে কানাডার আদালতে নাইকো চুক্তি দুর্নীতি সম্পৃক্ত বলে প্রমাণিত হয়। এমন সব প্রমাণ থাকার পরও নাইকো চুক্তি বাতিল না করে নাইকোর কাছ থেকে গ্যাস ক্রয় অব্যাহত রাখা হয়। ২০১৫ সালে ইকসিডের রায়ে নাইকোর বিজয় এবং পরবর্তীতে আমার দায়েরকৃত রিট মামলায় আমাদের উচ্চ আদালতের হস্তক্ষেপে প্রেক্ষাপট বদলে যায়।

১২. ২০১৫ সালে ইকসিডের রায়ে বাংলাদেশের পরাজিত হওয়ার প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণে অনুধাবন করি, চুক্তিই নাইকোর রক্ষাকবজ। সে চুক্তি বহাল থাকা অবস্থায় চুক্তি লঙ্ঘন করে নাইকোর বিরুদ্ধে গৃহীত ব্যবস্থা অকার্যকর। ফলে ইকসিডে নাইকোর দায়ের করা মামলায় বাংলাদেশ পরাজিত হয়েছে। অতিবিস্ময়ের সঙ্গে লক্ষ করি, নাইকো চুক্তি বাতিল করা নানা কারণে বাধ্যতামূলক হলেও তা না করে বছরের পর বছর ধরে নাইকোকে নানাভাবে সুযোগ-সুবিধা দেয়া হয়েছে এবং তা পরিকল্পিতভাবে অব্যাহত রাখা হয়েছে। অবশেষে অক্সিডেন্টালের মতো নাইকোও অনুরূপ অবৈধ সুবিধাভোগের সুযোগ পায়। অদৃশ্য কোনো শক্তি অক্সিডেন্টালের মতো নাইকোকেও সব দায়বদ্ধতার ঊর্ধ্বে রাখে। ফলে জনস্বার্থে নাইকো চুক্তি বাতিলের জন্য জনগণই এগিয়ে আসে। এবার আর আন্দোলন নয়, আদালতের আশ্রয় নেয়। ফলে অদৃশ্য শক্তি অক্সিডেন্টালকে সুরক্ষা দেয়ায় সফল হলেও নাইকোর ব্যাপারে সফল হয়নি। তত্কালীন জ্বালানি সচিব অক্সিডেন্টালকে সুরক্ষা দেন বলে অভিযোগ রয়েছে। নাইকো অক্সিডেন্টাল কেলেঙ্কারির সঙ্গে জড়িত সবার বিচার সরকার করবে কিনা, তাই এখন দেখার বিষয়। কাজটি সরকার করবে, নাকি নাইকো চুক্তি বাতিলের মতোই জনস্বার্থে জনগণকেই করতে হবে, সময়ই তা বলবে।  

১৩. নাইকো চুক্তি অসৎ উদ্দেশ্যে করা হয়, তা যেমন সত্যি, বর্তমান সরকারের আমলেও নাইকোকে নানাভাবে পৃষ্ঠপোষকতা দেয়া হয়, সেটিও তেমনি সত্যি। সেসব পৃষ্ঠপোষকতায় নাইকো সুরক্ষা পায়। সরকারের অভ্যন্তরীণ একটি ক্রিয়াশীল শক্তি বরাবরই নাইকোকে সুরক্ষা দিয়েছে। নাইকোর স্বার্থ সংরক্ষণ করেছে। নাইকো চুক্তি বাতিল না করে নাইকোর কাছ থেকে গ্যাস ক্রয় অব্যাহত রাখা, ইকসিডে মামলা করার সুযোগ দেয়া এবং মামলায় নাইকোর কাছে হেরে যাওয়াএসব ঘটনা তারই সুষ্পষ্ট প্রমাণ। এর দায়ভার সরকার অবশ্যই এড়াতে পারে না। তবে আমাদের দেখতে হবে এটি সরকারের প্রাতিষ্ঠানিক বার্থতা কিনা। দুর্নীতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে রাষ্ট্রের স্বার্থ বিপন্ন করে সম্ভাবনাময় গ্যাসফিল্ডকে প্রান্তিক বলে বিদেশী কোম্পানির হাতে তুলে দেয়ার মতো গুরুতর অপরাধের প্রতিকার প্রতিরোধ করার জন্য সরকারের যে সক্ষমতা থাকা দরকার ছিল, আমরা অনুধাবন করেছি, সরকার সেখানে সীমাবদ্ধতার শিকার। এটি কাঠামোগত সমস্যা। সমস্যা থেকে বেরিয়ে আসার জন্য প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা উন্নয়নে গুরুত্ব দিতে হবে। সেজন্য সার্বিকভাবে কাঠামোগত সংস্কার জরুরি। সেখানে সরকারি কর্মকর্তা রাজনীতিবিদদের বাইরে থাকা জনগণের অংশগ্রহণ ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে হবে।

১৪. নাইকো দুর্নীতির সঙ্গে যুক্ত সবাই এখনো বিচারের মুখোমুখি হননি। অনেকের বিরুদ্ধে দুর্নীতির সুস্পষ্ট প্রমাণ থাকলেও তারা বিচারের আওতায় আসেননি। আলোচ্য প্রেক্ষাপটে ন্যায়বিচারের স্বার্থে অভিযুক্ত সবাইকেই বিচারের আওতায় আনা দরকার। যদি তা সম্ভব না হয় তাহলে আমাদের সক্ষমতা হবে প্রশ্নবিদ্ধ এবং গর্ব খর্ব হবে। চুক্তিতে দুর্নীতি হয়েছে। কানাডিয়ান আদালতে ২০১১ সালে তা প্রমাণিত। অথচ এরপর দীর্ঘ ছয় বছরেও কোনো ব্যবস্থা না নিয়ে নাইকোকে যারা সুরক্ষা দিয়েছেন, জাতীয় ঐতিহ্য রক্ষার স্বার্থে তাদেরকেও দুর্নীতির মামলার আওতায় এনে বিচারের মুখোমুখি করতে হবে। যারা দেশের প্রাকৃতিক গ্যাস সম্পদ বিদেশী কোম্পানি নাইকোর হাত তুলে দিয়েছেন, তুলে দেয়ার ব্যাপারে যারা ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিলেন এবং পরবর্তীতে নাইকোকে যারা সুরক্ষা দিয়েছেন, তারা সবাই যে অপরাধ করেছেন, তা দেশদ্রোহিতার শামিল। তাদের বিচার গর্বিত দেশবাসীর অঙ্গীকার।

১৫. নাইকো দেউলিয়া। ক্ষতিপূরণ আদায় নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে। নাইকোর সম্পদ উচ্চ আদালতের আদেশে জব্দ করা আছে। সে সম্পদ বাজেয়াপ্ত করে যেমন ক্ষতিপূরণ সমন্বয় করা যাবে, তেমনি দুর্নীতি মামলাভুক্ত বা বহির্ভূত সব অভিযুক্তর সম্পদ জব্দ করা ক্ষতিপূরণে তা সমন্বয় করা আদালতের আরেকটি আদেশের ব্যাপার মাত্র। সে আদেশের জন্য সরকার আদালতে যাবে। নইলে জনগণ আদালতে যাবে। 

 

. এম শামসুল আলম: বিদ্যুৎ জ্বালানি বিশেষজ্ঞ

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন