বৃহস্পতিবার | আগস্ট ১৩, ২০২০ | ২৯ শ্রাবণ ১৪২৭

সম্পাদকীয়

অ্যাগ্রো ফুড প্রসেসিং ইন্ডাস্ট্রি প্রমোশন পলিসি-২০২০

খাদ্য প্রক্রিয়াজাত শিল্পে অবস্থান শক্তিশালী করতে নীতিমালা দ্রুত চূড়ান্ত হোক

খাদ্য প্রক্রিয়াকরণপূর্বক রফতানি আয় বাড়ানো এবং খাদ্যের অপচয় রোধের অংশ হিসেবে সরকার অ্যাগ্রো ফুড প্রসেসিং ইন্ডাস্ট্রি প্রমোশন পলিসি, ২০২০ তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে। এরই মধ্যে নীতিমালায় কিছু বিষয় অন্তর্ভুক্ত করার আলোচনাও চলছে। সন্দেহ নেই, এটি বাস্তবায়ন করা গেলে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের পণ্যের চাহিদা বিক্রি বেড়ে যাবে। দেশের কৃষিজীবী মানুষের জন্য যেমন, তেমনি ব্যবসা-বাণিজ্য শিল্পায়নের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের জন্য এটি সুসংবাদ বৈকি। দেশ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে আরো এক ধাপ এগিয়ে যাবে। কৃষিপণ্য রফতানির সম্ভাবনা ক্রমে উজ্জ্বল হয়ে উঠছে। এজন্য বর্তমানের দুরবস্থা কাটিয়ে মানোন্নত খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ ব্যবস্থাকে বিজ্ঞানসম্মত করা জরুরি হয়ে পড়েছে। আমাদের কৃষিপণ্যের অভ্যন্তরীণ বাজার বেশি, আন্তর্জাতিক বাজার সীমিত। কৃষিপণ্যের আন্তর্জাতিক বাজার অত্যন্ত প্রতিযোগিতামূলক এবং অনেক কাঁচামাল বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। এতে দেশ প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্য রফতানির মাধ্যমে শতভাগ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের সুফল পায় না। তাই দেশের কৃষিজ জিডিপির পরিধি বাড়াতে হলে কৃষক পর্যায়ে মানসম্পন্ন উচ্চমূল্যের ফসল উৎপাদন এবং অধিক মূল্য সংযোজন করে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতামূলক কৃষিজাত পণ্যের রফতানি বাড়াতে হবে। মূল্য সংযোজন করার ক্ষেত্রে কাঁচামালের আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে দেশেই সেগুলোর উৎপাদন পর্যাপ্ত জোগান নিশ্চিত করতে হবে।

আমাদের কৃষি আজ উৎপাদন পর্যায়ে বেশ স্বাবলম্বী। অনেক মৌসুমি ফসল এখন উদ্বৃত্ত উৎপাদন হচ্ছে। কিন্তু উত্তম কৃষি পদ্ধতি এবং আধুনিক প্রক্রিয়াকরণ সংরক্ষণ ব্যবস্থাপনার অভাবে আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন রফতানিযোগ্য পণ্য উৎপাদন করা যাচ্ছে না। অপর্যাপ্ত সংরক্ষণ ব্যবস্থা, অদক্ষ কৃষিবাজার, সীমিত বৈদেশিক চাহিদা, প্রক্রিয়াকরণ শিল্পের অভাব ইত্যাদি কারণে উৎপাদিত কৃষিপণ্যের উল্লেখযোগ্য অংশ দেশের কৃষি জিডিপির আয়তন বৃদ্ধিতে অবদান রাখতে পারছে না। কৃষি জিডিপির আয়তন বাড়াতে হলে উত্তম কৃষি পদ্ধতির দিকে নজর দিতে হবে। এজন্য কৃষিপণ্যের আন্তর্জাতিক বাজার সম্প্রসারণের বিকল্প নেই। সম্প্রসারিত বাজারে প্রবেশ করতে হলে প্রয়োজন কৃষক পর্যায়ে রফতানিযোগ্য নিরাপদ ফসল উৎপাদন এবং শিল্প পর্যায়ে অধিক মূল্য সংযোজিত কৃষিপণ্য উৎপাদন। এটা এককভাবে সরকারি পর্যায়ে সম্ভব নয়, বেসরকারি উদ্যোক্তাদেরও এগিয়ে আসতে হবে।  কৃষিজ খাদ্যসামগ্রীর ভ্যালু চেইনের স্তরগুলো তথা প্রাথমিক কৃষিপণ্যের প্রি পোস্ট হার্ভিস্ট পর্যায়, প্যাকেজিং থেকে শুরু করে পরিবহন, সংরক্ষণসব পর্যায়ে ভোক্তার স্বাস্থ্যগত চাহিদাকে গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে না। এসব প্রাথমিক কৃষিজ পণ্য উৎপাদনে কৃষির ভালো প্র্যাকটিস অনুসরণ না করার ফলে খাদ্যমানের বিষয়টি অবহেলিত থেকে যাচ্ছে। শুধু তাই নয়, প্রয়োজনীয় বিষয়গুলো উপেক্ষিত। পচনশীল বা দ্রুত নষ্ট হয়ে যায় এমন প্রাথমিক কৃষিপণ্যের উন্নত পরিবহন সংরক্ষণে কৃষকরা কোনোভাবেই সক্ষম নন বলে বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ শিল্পে উৎপাদিত কৃষিজ খাদ্যের মূল্য মূলত বেশ কয়েকটি বিষয়ের ওপর নির্ভরশীল। এর মধ্যে রয়েছে বিপণনকারী প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা, বাণিজ্য সংগঠনের জোটবদ্ধ অবস্থা, পশ্চাৎ সংযোগ পণ্যের বিপণন প্রক্রিয়ায় মধ্যস্বত্বভোগীদের অপতত্পরতা। বাংলাদেশে পরিভোগের জন্য প্রস্তুত পর্যায়ের খাদ্যের বাজার এখনো ব্যাপকতা লাভ করেনি।

দেশী-বিদেশী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ শিল্পে বিনিয়োগের আগ্রহ ব্যক্ত করলেও সংশ্লিষ্ট নীতিমালার অভাবে এক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি আটকে ছিল। শুধু খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ শিল্প গড়ে তুললেই হবে না, প্রয়োজন এর আন্তর্জাতিক মান রক্ষা করা। বাংলাদেশের খাদ্য প্রক্রিয়াজাত শিল্প ক্ষেত্রে এখনো রয়েছে যথাযথ প্রযুক্তিগত সহায়তার অভাব। শিল্পের উন্নয়ন সম্প্রসারণে রয়েছে বিপুল সম্ভাবনা, যদি সহযোগিতা, অংশীদারিত্ব বিনিয়োগের মাধ্যমে অন্যান্য শিল্পের লিংকেজ স্থাপন করা যায়। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় নতুন নতুন উদ্ভাবন বিকল্প প্রযুক্তির মাধ্যমে আমাদের বহু ধরনের প্রক্রিয়াকরণ খাদ্যের উৎপাদন লক্ষণীয়। কেবল নতুন পণ্যের উন্নয়নই নয়, বরং আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার, গুণগত মানের উন্নয়ন, বায়োসেপ্টি প্যাকেজিং ব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং সেই সঙ্গে প্রক্রিয়াকরণ খাদ্যের বিপণন জোরদারের পাশাপাশি উৎপাদন পদ্ধতির ওপরও গুরুত্ব দিতে হবে। উন্নত যোগাযোগ পরিবহন ব্যবস্থা, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ, প্রাকৃতিক গ্যাসের সহজলভ্যতা ছাড়া ক্ষুদ্র, মাঝারি বৃহৎ কৃষিভিত্তিক শিল্পের উন্নয়ন সম্ভব নয়।

খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ শিল্প কৃষি উৎপাদনের ওপর বহুলাংশে নির্ভরশীল, যেহেতু এর কাঁচামাল মূলত কৃষিজাত পণ্য। কারণে শিল্পকে নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হয়, যার মধ্যে রয়েছে প্রকৃতির ওপর নির্ভলশীলতা এবং মৌসুমভিত্তিক ফসল উৎপাদন। প্রতিবন্ধকতা থাকা সত্ত্বেও খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ শিল্পের রয়েছে সর্বাধিক সম্ভাবনা। সম্ভাবনাকে সম্পূর্ণরূপে কাজে লাগাতে হলে প্রয়োজন টেকসই ফসল উৎপাদন, মূল্য সংযোজনের মাধ্যমে কৃষকের আয় বৃদ্ধি, অতিরিক্ত কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন এবং জনগণের পুষ্টিনিরাপত্তা নিশ্চিত করা। খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ শিল্প দেশে বিনিয়োগ, প্রযুক্তি রফতানির ভিত্তিতে নতুন সুযোগ সম্ভাবনা সৃষ্টি করছে। লাগসই প্রযুক্তি উন্নয়ন সহায়তার মাধ্যমে কৃষিভিত্তিক শিল্প উন্নয়ন করতে হলে বহুমুখী প্রতিযোগিতার মোকাবেলা করতে হবে। বাংলাদেশে বিভিন্ন গবেষণা উন্নয়ন প্রতিষ্ঠান অনেক খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ সংরক্ষণ প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছে। সেক্টরে যথাযথ বিনিয়োগ এর উন্নয়ন ঘটাতে পারে।

হতাশার বিষয় হলো, এত সম্ভাবনার পরও খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ নীতিমালাটি দীর্ঘ পাঁচ বছরের বেশি সময় ধরে পড়ে রয়েছে। এই সংশোধনী-সেই সংশোধনী করে সময় অতিবাহিত করা হচ্ছে শুধু। কভিডের প্রেক্ষাপটে সারা বিশ্ব যেখানে খাদ্যনিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কায় রয়েছে, সেখানে নীতিমালা নিয়ে সময়ক্ষেপণ না করে দ্রুত বাস্তবায়নে চলে যেতে হবে। কারণ বিশ্বে খাদ্য সংকট দেখা দিলে বাংলাদেশ যেন প্রক্রিয়াজাত খাদ্য রফতানি করতে পারে, তার প্রস্তুতি এখন থেকেই নিতে হবে। নীতিমালা তৈরির সঙ্গে মান রক্ষায় তদারকি জোরদার করতে হবে। কেননা বিশ্বে এক্ষেত্রে একবার ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হলে তা উদ্ধার করা কঠিন হয়ে পড়বে। খাদ্য নিয়ে উন্নত বিশ্ব খুবই সচেতন। কোনো ধরনের ছাড় তারা দেয় না। তাই আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করতে হলে মান রক্ষা করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ শিল্প গড়ে তুলতে সরকারের বিশেষ সহায়তাও প্রয়োজন। বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠা স্বল্প সুদে ঋণ দিতে হবে। অভ্যন্তরীণ খাদ্য অপচয় রোধ করার প্রেক্ষাপট থেকেও এটি জরুরি। খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ শিল্পে বাংলাদেশকে আলাদা অবস্থান করে নিতে হলে সক্ষমতা উন্নয়ন, প্রযুক্তি বিনিময়, উন্নত ব্যবস্থাপনা, তদারকি জোরদার করতে হবে।

কৃষিজাত পণ্য মধ্যপ্রাচ্য ইউরোপের বিভিন্ন দেশে রফতানি করতে হলে কৃষি প্রক্রিয়াকরণ শিল্পের উন্নয়ন ঘটাতে হবে, যাতে উৎপাদিত কৃষিপণ্যের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত হয়। এতে কৃষকরাও কৃষিপণ্য উৎপাদনের মাধ্যমে তাদের আয় জীবনমান উন্নয়নে অনুপ্রাণিত হবেন।

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন