শনিবার | আগস্ট ১৫, ২০২০ | ৩১ শ্রাবণ ১৪২৭

আন্তর্জাতিক খবর

৫ সপ্তাহে ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল শেষ করে ভ্যাকসিন বাজারে আনার রেকর্ড গড়বে ভারত!

বণিক বার্তা অনলাইন

স্বাধীনতা দিবস অর্থাৎ আগামী ১৫ আগস্টের মধ্যে দেশে আবিষ্কৃত করোনার ভ্যাকসিন বাজারে আসার ঘোষণা দিয়েছে ভারত। হায়দরাবাদের ভারত বায়োটেক ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেডের (বিবিআইএল) সঙ্গে কোভ্যাক্সিন নামে এই প্রতিষেধক আনছে ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অব মেডিক্যাল রিসার্চ (আইসিএমআর)।

ভ্যাকসিনটির হিউম্যান ট্রায়ালের অনুমতি দেয়ার চার দিনের মাথায় গত বৃহস্পতিবার আইসিএমআর সেটি বাজারে আনার ডেডলাইন ঘোষণা করেছে। স্বাধীনতা দিবসে লালকেল্লা থেকে এই টিকা আবিষ্কারের ঘোষণা দিতে পারেন খোদ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি।

আর সত্যি সত্যিই এটি ঘটলে ভারত বিশ্বে প্রথম দেশ হিসেবে করোনার টিকা আবিষ্কারের ইতিহাস গড়বে। আর ইতিহাসে এতো দ্রুত কোনো রোগের ভ্যাকসিন বাজারে আসার রেকর্ডও নেই!

এদিকে আইসিএমআরের প্রধান বলরাম ভার্গব ওই টিকা দেশের ১২টি সংস্থাকে ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল বা মানুষের দেহে পরীক্ষা করার জন্য ছাড়পত্র দিয়ে চিঠি দিয়েছেন। 

চিঠির বক্তব্য অনুযায়ী, হাতে সময় মাত্র পাঁচ সপ্তাহ। এর মধ্যে মানবদেহে পরীক্ষা শেষ করে, সব যাচাই বাছাই করে ১৫ আগস্টের মধ্যে এ ভ্যাকসিন বাজারে ছাড়তে হবে ভারত বায়োটেককে। 

সরকারের একেবারে শীর্ষ স্তর থেকে প্রকল্পটির নজরদারি চলছে। নির্দেশ না মানলে কঠোর মনোভাব দেখাবে সরকার- এমন কথাও বলেছেন ভার্গব। ৭ জুলাইয়ের মধ্যে স্বেচ্ছাসেবীদের নাম তালিকাভুক্ত করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

কিন্তু ভ্যাকসিন নিয়ে এই তাড়াহুড়া নিয়ে বিশেষজ্ঞ মহলে উঠেছে গুরুতর প্রশ্ন। কারণ একটি ভ্যাকসিন ব্যাপকভাবে ব্যবহারের আগে ন্যূনতম কিছু ধাপ থাকে। প্রতিষেধকটি মানুষের জন্য নিরাপদ কিনা সেটি যাচাই করতে তিনটি ধাপে ট্রায়াল চলে। মাত্র পাঁচ সপ্তাহে কী করে সেই ধাপগুলো সম্পন্ন করা হবে তা নিয়েই প্রশ্ন তুলেছেন বিশেষজ্ঞরা। 

স্বাধীন নিরপেক্ষ বিশেষজ্ঞরা আইসিএমআরের এই চিঠির সমালোচনা করেছেন। ইন্ডিয়ান জার্নাল অব মেডিক্যাল এথিক্স- এর সম্পাদক ও জনস্বাস্থ্য আন্দোলন কর্মী অমর জেসানি বলেন, আমার মনে হয় না পৃথিবীর কোথাও এভাবে আগে থেকেই ভ্যাকসিন বাজারে আনার ডেডলাইন ঘোষণা করা হয়। যেখানে এখনো ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালই শুরু হয়নি। বিজ্ঞান তো এভাবে চলে না!

একই প্রশ্ন তুলেছেন ভারতীয় ভাইরোলজিস্ট প্রদীপ শেঠ। তিনি বলেন, মাত্র পাঁচ সপ্তাহে প্রতিষেধক কীভাবে সম্ভব! ধরে নেয়া হচ্ছে ভারত বায়োটেক কোনো প্রাণির ওপরে ওই প্রতিষেধক প্রয়োগ করেছে। প্রথমেই দেখতে হবে, তাতে ওই প্রাণির দেহে নেতিবাচক না ইতিবাচক কী প্রভাব পড়েছে। সেই রিপোর্টের ভিত্তিতে মানবদেহে প্রয়োগের প্রশ্ন। সে ক্ষেত্রেও দেখতে হবে, প্রথম এবং দ্বিতীয় ধাপে ওই টিকা মানবদেহে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছে কিনা। ওই টিকা কোনো ক্ষতি করছে কি না, সেটাও দেখা দরকার। কোনও কোনও ক্ষেত্রে এই পুরো প্রক্রিয়া বুঝতে ২-৩ বছর পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয় বলেও জানান প্রদীপ শেঠ। তিনি ২০০৩ সালে নিজের বানানো এইচআইভি ভ্যাকসিন নিজের দেহে প্রয়োগ করেছিলেন।

যে ১২ প্রতিষ্ঠানকে ট্রায়ালের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে তারাও বিষয়টি নিয়ে ধন্দে পড়েছেন। এ তালিকায় আছে ওডিশার ইনস্টিটিউট অব মেডিক্যাল সায়েন্সেস অ্যান্ড এসইউএম হসপিটাল। সেখানে ট্রায়ালের দায়িত্বপ্রাপ্ত ভেঙ্কাটা রাও বলেন, ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল পরিচালনার জন্য কোনো স্বাধীন এথিকস কমিটির কাছ অনাপত্তি পাননি। তিনি বলেন, আমি অনাপত্তি না পাওয়া অবধি কোনো ট্রায়ালে যেতে পারবো না। আমাদের অবশ্যই নিয়ম মেনে চলতে হবে। সবার আগে অগ্রাধিকার থাকবে ট্রায়ালে যেন কেউ ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।

ভ্যাকসিন তৈরির পরীক্ষার ধাপ ও সময় বিষয়ে আন্তর্জাতিক মান হলো:


প্রি-ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল: বাঁদর, ইঁদুর বা গিনিপিগের শরীরে প্রতিষেধক প্রয়োগ 

ধাপ-১: সেফটি ট্রায়াল বা নিরাপত্তা যাচাই: খুব অল্প সংখ্যক মানুষের শরীরে প্রয়োগ করে অ্যান্টিবডি তৈরি হচ্ছে কি না দেখা। এটি ক্ষতিকর কিনা তা বুঝতে তিন মাস অপেক্ষা করতে হয়।

ধাপ-২ : এক্সপ্যান্ডেড ট্রায়াল (অ্যান্টিজেনকে নিষ্ক্রিয় করার সক্ষমতা যাচাই): ১০০ রোগীর দেহে প্রতিষেধক প্রয়োগ। প্রতিষেধক কতটা নিরাপদ ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা সৃষ্টিতে সক্ষম কিনা দেখা হয়। 

এর জন্য সাধারণত তিন মাস অপেক্ষা করতে হয়। দেখা হয় আক্রান্তরা সুস্থ হচ্ছেন কি না, বা শরীরে ক্ষতিকর প্রভাব পড়ছে কি না।

ধাপ-৩: এফিকেসি ট্রায়াল (কার্যক্ষমতা যাচাই) : হাজার জনের ওপর প্রয়োগ করে দেখা হয়, কত জন সংক্রমিত হয়ে সুস্থ হয়ে উঠলেন। এর জন্য তিন মাস অপেক্ষা করতে হয়।

ধাপ-৪: ফলাফল দেখে প্রতিষেধক তৈরির ছাড়পত্রের বিষয়ে বিবেচনা করে সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থা। 

অবশ্য বর্তমানে অনেক সংস্থাই ধাপ ১ ও ২-কে এক সঙ্গে করছে। ভারত বায়োটেক ৭ জুলাই থেকে এ প্রক্রিয়াতেই ট্রায়াল শুরু করবে। 

সে হিসাবে বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য, ধাপ ১ ও ২- একসঙ্গে করলেও তিন মাস অপেক্ষা করা উচিত। ধাপ ১ থেকে অনুমোদনের স্তরে পৌঁছতে অন্তত ছয় মাস প্রয়োজন। ভারত বায়োটেক পাচ্ছে মাত্র ৫ সপ্তাহ। 

এখানে উল্লেখ্য, অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় গত এপ্রিলে প্রায় হাজার জনকে পরীক্ষামূলক প্রতিষেধক দিয়েছে। তবে অক্টোবরের আগে তারা এ ভ্যাকসিন বাজারে আনার কথাই বলছে না।

সূত্র: স্ক্রল ডট ইন

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন

×