বৃহস্পতিবার | আগস্ট ১৩, ২০২০ | ২৯ শ্রাবণ ১৪২৭

প্রথম পাতা

কভিড-১৯-এর প্রভাব

ব্যবসার কৌশল নির্ধারণে দোলাচলে বড় বড় করপোরেট

বদরুল আলম ও রাশেদ এইচ চৌধুরী

দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড স্থবির করে দিয়েছে নভেল করোনাভাইরাস (কভিড-১৯) মহামারী। কিন্তু সংক্রমণ থেমে নেই। কবে থামবে তারও কোনো ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে না। অবস্থায় ব্যবসার কৌশল নির্ধারণ নিয়ে দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়েছে দেশের বড় বড় করপোরেট।

বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্ণধাররা বলছেন, যেহেতু করোনাভাইরাস নির্মূলের কোনো পথ পাওয়া যাচ্ছে না, তাই স্থবির অর্থনীতিতে ভোক্তা চাহিদাও স্বাভাবিক হচ্ছে না। আর বিদ্যমান পরিস্থিতিতে ভোক্তা আচরণও ঠাহর করা যাচ্ছে না। সব মিলিয়ে ব্যবসা এগিয়ে নেয়ার কৌশল গ্রহণে বেগ পেতে হচ্ছে তাদের।

দেশের অন্যতম বৃহৎ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান আকিজ গ্রুপ। নির্মাণসামগ্রী, দুগ্ধপণ্য, পানীয়, কাগজ, এলপিজিসহ নানা খাতে ব্যবসা রয়েছে গ্রুপটির। করোনার এই সময়ে প্রতিষ্ঠানটির কিছু ব্যবসায়িক ইউনিট শতভাগ সচল ছিল, যেমন ফ্লাওয়ার মিল। আবার সিমেন্ট কারখানা ৪৫ থেকে ৫০ শতাংশ সক্ষমতায় চলেছে। কিছু কারখানা আছে ২৫ শতাংশ সক্ষমতায় চলেছে, কিছু কারখানায় উৎপাদন ছিল একেবারেই বন্ধ। তবে প্রতিষ্ঠানটি এখন পর্যন্ত কোনো ধরনের সংকোচনের দিকে যায়নি।

আকিজ গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শেখ বশির উদ্দিন বণিক বার্তাকে বলেন, আমার কাছে মনে হয় মুহূর্তে পরিকল্পনা করা কঠিন। তবে যারা অ্যাফোর্ড করতে পারছে তারা কার্যক্রম সচল রেখেছে। আমি এখন যে অর্থ খরচ করছি তাও অর্থনীতিকে সাহায্য করছে। কারণ আমি যদি এখন বন্ধ করে দিই তাহলে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড আরো সংকুচিত হয়ে যাবে।

একটা পর্যায়ে মানুষকে আটকে রাখা যাবে না বলেও মনে করেন ব্যবসায়ী। তিনি বলেন, জীবিকা থেকে মানুষ দূরে সরে থেকেছে মানব ইতিহাসে এমনটা ঘটেনি। কারণ জীবন ধারণ হয় জীবিকা দিয়ে। নিকট ভবিষ্যতে যখন যে অবস্থা আসবে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হবে। লার্ন অ্যাজ ইউ গো অ্যান্ড অ্যাক্ট। আমাদের বেশকিছু পণ্য রুরাল মার্কেটে ভালো বিক্রি হচ্ছে। অর্থাৎ রুরাল ইকোনমি ভালো করছে। ইকোনমি রিকভারির বিষয়টা আমার কাছে মনে হয় ভাইরাস নির্মূল করা গেলেই আমাদের জীবন স্বাভাবিক হয়ে আসবে। ভি-শেপ রিকভারি হবে বলে মনে হয়। প্রশ্ন হলো এইভিটা কবে আসবে? এটা কেউ জানে না।

বাংলাদেশে অবরুদ্ধ পরিস্থিতি শুরু হয় মার্চ মাসের শেষ সপ্তাহে। ওই সময় থেকে কার্যত মে মাসের শেষ পর্যন্ত অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড থমকে ছিল। গত এক মাস সীমিত আকারে কার্যক্রম শুরু হলেও সংক্রমণ আতঙ্কে ভোক্তা চাহিদা আচরণ পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। আর কভিড-১৯ নির্মূল না হওয়া পর্যন্ত অবস্থাই চলমান থাকবে বলে ধারণা করা যাচ্ছে। ভাইরাসের প্রভাবে পরিবর্তিত পরিস্থিতি স্বাভাবিক হিসেবে মেনে নিয়ে জীবন জীবিকা এগিয়ে নেয়ার মানসিকতা এখনো সবার মধ্যে তৈরি হয়নি। ফলে ব্যবসা এগিয়ে নেয়ার কৌশল নির্ধারণের ক্ষেত্রেও দ্বিধা রয়ে গেছে এখনো।

ভোগ্যপণ্য ব্যবসায় দেশের অন্যতম শীর্ষ প্রতিষ্ঠান টি কে গ্রুপ। নিত্যপণ্য ছাড়াও নির্মাণসামগ্রী, কাগজ টেক্সটাইল খাতে ব্যবসা রয়েছে তাদের। ১৯৭২ সালে যাত্রা শুরু করা টি কে গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে আছে ২৬টি প্রতিষ্ঠান।

প্রতিষ্ঠানটির কর্ণধাররা জানিয়েছেন, তারা কোনো পরিকল্পনা গ্রহণ করতে পারছেন না, কারণ পরিস্থিতি পরিষ্কার না। যেতে যেতে দেখতে হচ্ছে কী হয় না হয়। পরিস্থিতি যথাযথভাবে মোকাবেলা করা সম্ভব হচ্ছে না। হঠাৎ করেই আয় ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ কমে গেছে। এমন বাস্তবতায় যত ধরনের ব্যবসার পরিকল্পনা ছিল সেগুলো আপাতত স্থগিত রাখা হয়েছে। সম্প্রসারণের পরিকল্পনাগুলো ন্যূনতম এক প্রান্তিক পিছিয়ে নেয়া হয়েছে। আরো দুই-তিন মাস গেলে অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

টি কে গ্রুপের পরিচালক মোস্তফা হায়দার বণিক বার্তাকে বলেন, আমরা এখন একটি বড় চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। যতদিন এর সমাধান না হচ্ছে ব্যবসায়িক পরিকল্পনা একটা নির্দিষ্ট জায়গায় ঠিক করার সুযোগও নেই। আমরা হয়তো মনে করছি, আগস্টের মধ্যে ভীতি কমবে। কিন্তু দেখা যাচ্ছে একাধিক দেশে সংক্রমণ দ্বিতীয় দফায় শুরু হচ্ছে। তাহলে লক্ষ্যটা কিসের ওপর ভিত্তি করে নেয়া হবে। যেহেতু এটা বৈশ্বিক সমস্যা। এখন যেটা করা যাচ্ছে সেটা হলো সময়ে ইন্টারনাল এফিসিয়েন্সি বাড়াতে মনোযোগ দেয়া।

কৃষিজাত খাদ্যপণ্য, গৃহস্থালি প্লাস্টিক পণ্যসহ বিভিন্ন ব্যবসার সঙ্গে জড়িত প্রাণ গ্রুপ। প্রতিষ্ঠানটির কর্ণধার বলছেন, পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ রফতানিতে খুব ভালো করবে। যারা রফতানির সঙ্গে যুক্ত প্রতিষ্ঠান, তারা উত্তরোত্তর আরো ভালো ব্যবসা করতে পারবে। সামগ্রিকভাবে ব্যবসার ক্ষেত্রটি ভালো হবে। তবে অভ্যন্তরীণ ব্যবসাটা পর্যায়ক্রমে বাড়তে থাকবে। অভ্যন্তরীণ বাজারে চাহিদা ব্যাপক। জনগোষ্ঠী খুব সঞ্চয় করার মানসিকতা রাখে না। যত তাড়াতাড়ি অর্থনৈতিক কার্যক্রমগুলো শুরু করা যাবে ততই অভ্যন্তরীণ বাজারও সচল হবে।

প্রাণ আরএফএল গ্রুপের চেয়ারম্যান সিইও আহসান খান চৌধুরী বণিক বার্তাকে বলেন, মানুষকে কাজে না লাগানোর বিষয়ে আমি একমত নই। মানুষকে কাজে লাগাতে হবে, যেন মানুষের কর্মসংস্থান হয়। কর্মসংস্থান থাকলে মানুষের কাছে টাকা থাকবে, টাকা থাকলে তারা খরচ করবে। আমাদের ব্যয়গুলো অর্থাৎ কস্ট অব অপারেশনটা কমিয়ে আনতে হবে। আমাদের প্রধান কার্যালয়ে অনেক মানুষ কাজ করত। এই মানুষগুলোকে আমরা বলেছি যে আমরা যেন এখন আরো বেশি প্রডাক্টিভ হই, সেলসের সঙ্গে এখন আরো বেশি সম্পৃক্ত হই। আমরা যেন আরো বেশি মানুষকে সেবা প্রদানের বিষয়ে মনোযোগী হই। সেই সঙ্গে উৎপাদনেও যেন মনোযোগী হই।

এভিয়েশন, তৈরি পোশাক, বিদ্যুৎ, ইস্পাত, সিমেন্ট, সার, কাগজসহ বিভিন্ন খাতে ব্যবসা রয়েছে হাবিব গ্রুপের। করোনার কারণে ব্যাপকে অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে তাদের এভিয়েশন ব্যবসা। ক্ষতির শিকার তৈরি পোশাক ব্যবসাও। অবস্থায় ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে দ্বিধান্বিত প্রতিষ্ঠানটির কর্ণধাররা।

হাবিব গ্রুপের পরিচালক রিজেন্ট এয়ারওয়েজের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক সালমান হাবিব বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমাদের গ্রুপে ২৪ হাজার লোকবল কাজ করছে। এখন পর্যন্ত বেতন-ভাতা দিয়ে আসছি, কিন্তু ব্যবসা নেই। এরপর কী করব? পোশাক খাতের কথা যদি বলি, এমন একটি সময় সমস্যাটি এল যখন দুটি ঈদের বোনাসের বিষয় রয়েছে। এভিয়েশনের দিক থেকে বলতে গেলে সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া প্রভৃতি দেশে কখন ফ্লাইট চালু হবে তারও কোনো নিশ্চয়তা নেই। এতসব অনিশ্চয়তার মধ্যে ব্যবসা পরিচালনার ছক কিংবা পরিকল্পনা ঠিক করার সুযোগ নেই।

দেশের নির্মাণ খাতের অন্যতম বৃহৎ প্রতিষ্ঠান বিএসআরএম গ্রুপ। গ্রুপটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক আমের আলী হোসেইন বণিক বার্তাকে বলেন, কভিড-১৯ পরিস্থিতি মোকাবেলায় সরকার অনেক পদক্ষেপই বিচক্ষণতার সঙ্গে নিয়েছে। যেমন পার্শ্ববর্তী দেশের মতো পুরো লকডাউন করে দেয়নি। এপ্রিল-মে মাসের তুলনায় ধাপে ধাপে ব্যবসা ইমপ্রুভ করছে। অর্থনীতির গতি অনুযায়ী সবাই ধীরে ধীরে এগিয়ে যেতে হবে। পরিকল্পনাও সে অনুযায়ী ভারসাম্য রেখে করতে হবে। কিন্তু আমাদের বড় সমস্যা হচ্ছে ব্যবসা না থাকলেও আগাম কর দেয়া নিয়ে। এখানে বড় অংকের টাকা আটকে যাচ্ছে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে ব্যবসা করার ক্ষেত্রে কিছু সমস্যার কথা তুলে ধরেছেন প্রিমিয়ার সিমেন্ট মিলস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আমিরুল হক। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘কভিড-১৯ পরিস্থিতি আমাদের একটি কঠিন সময়ের মধ্যে ফেলে দিয়েছে ব্যবসায়িক গতিপ্রকৃতি ঠিক করার ক্ষেত্রে। কিন্তু এখান থেকে উত্তরণের জন্য আমরা কীভাবে এগোচ্ছি। আমি তিনটি বিষয়ের কথা উল্লেখ করব। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের যে নির্দেশনা রয়েছে বাস্তবে বেশির ভাগ ব্যাংকই এগুলো মানছে না। সুদহার নয়-ছয় মানা হচ্ছে না। বাংলাদেশ ব্যাংক অনেকগুলো সার্কুলারই দিয়েছে কিন্তু প্রকৃতপক্ষে ব্যবসায়ীদের কোনো কাজে আসছে না। সংকটময় সময়ে যেসব প্রণোদনা বা প্যাকেজের কথা বলা হচ্ছে সেটাও তো ব্যবসায়ীরা এখনো দেখেনি। সমন্বয়হীনতাগুলো কাটিয়ে উঠতে হবে। আরেকটি হলো ব্যবসা করার আগে কর আদায় করে ফেলার যে বিষয়টি তাতে আমরা কীভাবে ব্যবসা পরিচালনা করব। আমি লাভ করি আর লস করি ব্যবসার আগেই নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ জমা করে দিতে হবে। এভাবে ব্যবসা পরিচালনা করে কেউই অগ্রসর হওয়ার সুযোগ নেই। বর্তমান পরিস্থিতিতে বিদেশী ভালো ব্যাংকগুলোকে এখানে কাজ করার সুযোগ দিতে হবে। না হলে পরিস্থিতিতে চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করাটা অনেক কঠিন হবে।

যেকোনো ব্যবসার ক্ষেত্রে এর ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস গুরুত্বপূর্ণ একটি অনুষঙ্গ। পূর্ববর্তী বছরগুলোতে কোম্পানির পারফরম্যান্স কেমন ছিল সেটি বিশ্লেষণ করে বিনিয়োগকারীরা সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকেন। আর্থিক প্রতিবেদন নিরীক্ষার ক্ষেত্রে ব্যবসার ভবিষ্যৎ পূর্বাভাস বিবেচনায় নিতে হয়। ভবিষ্যতে ব্যবসা কেমন হবে সেটা আগেই অনুমান করার ক্ষেত্রে বরাবরই ঝুঁকি থাকে। কিন্তু কভিড-১৯-এর কারণে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ঝুঁকি আরো বেড়ে গেছে। কয়েক দশক ধরে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি অর্জন করা ব্যবসাও কভিড-১৯-এর প্রভাবে অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে। ফলে বিদ্যমান পরিস্থিতিতে পূর্ববর্তী বছরগুলোর পারফরম্যান্স পর্যালোচনা করে ব্যবসার পূর্বাভাস দেয়াটা আরো কঠিন হয়ে পড়েছে।

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন