শনিবার | আগস্ট ১৫, ২০২০ | ৩১ শ্রাবণ ১৪২৭

আন্তর্জাতিক খবর

হংকং: ২৩ বছরেই প্রতিশ্রুতি ভাঙল চীন

অনিন্দ্য সাইমুম ইমন

দক্ষিণ চীন সাগর অভিমুখী বৃহত্তর পার্ল নদীর অববাহিকায় হংকংয়ের অবস্থান। এর শাখা শেনঝেন চীনের মূল ভূখন্ড থেকে প্রাকৃতিকভাবে পৃথক করেছে হংকংকে। ১ হাজার ১০৪ বর্গকিলোমিটারের হংকংয়ে ৭৫ লাখ মানুষের বাস। যাদের ৯২ শতাংশ চীনা বংশোদ্ভুত। বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ অঞ্চল হংকং। তবে হংকংয়ের আলাদা পরিচিতি সমৃদ্ধ অর্থনীতির জন্য। বিশ্বের অন্যতম বাণিজ্য কেন্দ্র এটি। মূলত বন্দরকে কেন্দ্র করে অনেক আগে থেকেই হংকংয়ে বণিকদের আনাগোনা। ধীরে ধীরে দক্ষিণ চীন সাগর ঘেষা হংকং বন্দর বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত সমুদ্র বন্দরে পরিণত হয়েছে। পরিচিতি পেয়েছে বৈশ্বিক পণ্য পরিবহণের অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে। 

তবে আজকের আলোচনা হংকংয়ের বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি নিয়ে নয়। বরং এখানকার অধিবাসীদের রাজনৈতিক দুর্ভাগ্য নিয়ে। হংকংয়ের ভূরাজনীতি বুঝতে হলে কিছুটা পেছনে যেতে হবে। প্রথম আফিম যুদ্ধের পরিণতিতে ১৮৪২ সালে হংকং চীনের হাতছাড়া হয়। শুরু হয় ব্রিটিশ উপনিবেশ। দ্বিতীয় আফিম যুদ্ধের পর হংকংয়ে ব্রিটিশ রাজের শাসন আরো পোক্ত হয়ে বসে। অবশেষে ১৮৯৮ সালে হংকংকে ৯৯ বছরের জন্য লিজ নেয় ব্রিটেন।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এশিয়া ও আফ্রিকায় ব্রিটিশ উপনিবেশ দূর্বল হতে শুরু করে। স্বাধীন হয় বিভিন্ন দেশ। তবে ওই সময় হংকংয়ের স্বাধীনতার দাবি হালে পানি পায়নি। আশির দশকে এসে হংকংয়ের ভবিষ্যত নিয়ে আলোচনা শুরু করে ব্রিটেন ও চীন। ১৯৮৪ সালে সিনো-ব্রিটিশ যৌথ ঘোষণায় সিদ্ধান্ত হয় হংকং চীনের মূল ভূখন্ডের অধীনে যাবে। সেই অনুযায়ী, ১৯৯৭ সালে ১ জুলাই হংকংয়ের শাসনভার বেইজিংয়ের হাতে তুলে দিয়ে বিদায় নেয় ব্রিটিশরা।

তবে এ হাতবদলে শর্ত ছিল। সিনো-ব্রিটিশ যৌথ ঘোষণায় বলা হয়েছিল, হস্তান্তরের পর ৫০ বছরের জন্য হংকং সাংবিধানিকভাবে চীনের বিশেষ অঞ্চলের মর্যাদা পাবে। সেই থেকে চীনা সংবিধানের ৩১নং অনুচ্ছেদ অনুযায়ী অঞ্চলটির অফিশিয়াল নাম হংকং স্পেশাল অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ রিজিওন অব দ্য পিপল’স রিপাবলিক অব চায়না।

সহজ ভাষায়, এ শাসন ব্যবস্থা চীনের ‘এক দেশ দুই নীতি’ নামে পরিচিত। অর্থাৎ, প্রশাসনিকভাবে হংকং চীনের শাসনাধীন। তবে বিচার ব্যবস্থা, বৈদেশিক বাণিজ্য, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, অর্থনীতির মতো অনেকগুলো বিষয়ে নিজেদের মতো সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করতে পারে হংকং। এ কারণে চীন সমাজতান্ত্রিক হলেও হংকং পুরোদস্তুর পুঁজিবাদী।

তবে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির সাথে সাথে বিভিন্ন সময় হংকংয়ের শাসন ব্যবস্থায় নিজেদের অবস্থান জোরদার করার চেষ্টা করেছে চীন। বিগত ২৩ বছরে হংকংয়ের সাথে বেইজিংয়ের আচরণ নব্য-উপনিবেশবাদের কথা বারবার মনে করিয়ে দিয়েছে। এর বিপরীতে বেড়েছে হংকংবাসীর চীনবিরোধী মনোভাব। স্বায়ত্ত্বশাসন ও স্বাধীনতার সুপ্ত আকাঙ্ক্ষা বারবার প্রকাশ্যে এসেছে। ২০১৯ সালে চীনবিরোধী তীব্র বিক্ষোভ হয়েছে হংকংয়ে। তবে চীন কখনোই চায়নি হংকং ফের হাতছাড়া হোক। তাই এসব দাবি প্রশাসনিকভাবে কিংবা বলপ্রয়োগ করে দমিয়ে রেখেছে বেইজিং।

হংকংয়ে গত ১ জুলাই ছিল ব্রিটিশ উপনিবেশ বিদায়ের ২৩ বছর পূর্তি। বিশেষ অঞ্চলের সাংবিধানিক মর্যাদার ওপর কুঠারাঘাত করার জন্য এ দিনটিকে বেছে নিয়েছেন চীনা শাসকরা। হংকংয়ের জন্য চীনা পার্লামেন্টে হঠাৎ করে পাশ হয়েছে বিশেষ নিরাপত্তা আইন। এ আইন কার্যকরের মধ্য দিয়ে হংকংয়ের বিশেষ সাংবিধানিক মর্যাদা ও স্বাধীনতার স্বপ্ন কার্যত ধূলিস্যাৎ হয়ে গেল বলে মনে করা হচ্ছে। বিশ্বজুড়ে সমালোচিত হয়েছে এ আইন। আইনটির বিরোধিতায় হংকংয়ে নতুন করে শুরু হয়েছে বিক্ষোভ।

নতুন আইনে বলা হয়েছে, হংকংয়ের মাটিতে চীনা সার্বভৌমত্ব ও কেন্দ্রীয় সরকারের নিয়ন্ত্রণ খর্ব করার চেষ্টা সন্ত্রাসবাদী অপরাধ বলে বিবেচিত হবে। একইসঙ্গে চীন বিরোধী বিক্ষোভ আয়োজন, গণপরিবহণ ও সরকারি সম্পত্তি ভাঙচুর, বিদেশী শক্তির সঙ্গে গোপন আতাত সন্ত্রাসবাদ হিসেবে বিবেচনা করা হবে। এসব কর্মকাণ্ডের জন্য নতুন আইনে আজীবন কারাবাসের বিধান রাখা হয়েছে। রয়েছে ব্যক্তি ও কোম্পানির জন্য অর্থদণ্ড। 

নতুন আইনের আওতায় হংকংয়ে নতুন একটি নিরাপত্তা দফতর স্থাপন করবে চীন। দফতরের চীনা আধিকারিকরা আইন লংঘনকারীদের খুঁজে বের করে শাস্তি নিশ্চিত করতে কাজ করবেন। নতুন আইনে হংকংকে নিজ উদ্যোগে ন্যাশনাল সিকিউরিটি কমিশন গঠনের সুযোগ দেয়া হয়েছে। তবে কমিশনে উপদেষ্টা নিয়োগ দেবে চীন। আইন লংঘনকারীদের বিচার করতে হংকংয়ের চীনপন্থী প্রশাসন বিচারক নিয়োগ দিতে পারবে। প্রয়োজনে বিচার হবে গোপন আদালতে। বিচার নিশ্চিত করতে স্থানীয় কোন আইনের সাথে সাংঘর্ষিক পরিস্থিতি তৈরি হলে চীনা আইন প্রাধান্য পাবে।

গত বছরের দীর্ঘ ও রক্তক্ষয়ী বিক্ষোভ থেকে শিক্ষা নিয়েছে বেইজিং। কোন ধরনের আলোচনা ছাড়া তড়িঘড়ি এ আইন পাশ করে কার্যত হংকংয়ে চীনবিরোধী কণ্ঠস্বর চাপা দেয়ার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। নতুন এ আইন কার্যকর হওয়ায় হংকংয়ের প্রশাসন ও বিচার ব্যবস্থায় চীনের নিয়ন্ত্রণ আরো বাড়বে। খর্ব হবে হংকংবাসীর মতপ্রকাশের স্বাধীনতা। সর্বোপরি সিনো-ব্রিটিশ যৌথ ঘোষণা অনুযায়ী হংকংয়ের সাংবিধানিক বিশেষ মর্যাদা সংকুচিত হয়ে আসবে। কেননা চীন কোনভাবেই শেনঝেন নদীর তীরে বেইজিংবিরোধী কোন মনোভাব মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে দেবে না। বাড়তে পারে দমন-পীড়ন। তাই বলা হচ্ছে, চীন প্রতিশ্রুতি ভেঙেছে। ৫০ বছরের জন্য বিশেষ মর্যাদার কথা বললেও ২৩ বছরের মাথায় তা কার্যত উঠিয়ে নিল বেইজিং।

হংকংয়ে নতুন এ আইনের প্রতিবাদে তাৎক্ষণিকভাবে বিক্ষোভ শুরু হয়েছে। আটক হয়েছেন শতাধিক। সমালোচনায় সরব হয়েছে পশ্চিমা দেশগুলোও। ব্রিটেন এ আইনকে সাইনো-ব্রিটিশ যৌথ ঘোষণার সুষ্পষ্ট লঙ্ঘন বলছে। পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন বলেছেন, হংকংয়ের সাড়ে তিন লাখ অধিবাসীর ব্রিটিশ পাসপোর্ট রয়েছে। এখন এখানকার আরো ২৬ লাখ অভিবাসী চাইলে পাঁচ বছরের জন্য ব্রিটেনে চলে আসতে পারবেন। এর পর তারা নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করার সুযোগ পাবেন। একই সুবিধা দিতে যাচ্ছে অস্ট্রেলিয়াও।  

হংকং বিষয়ে চীনের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা অনুমোদন করেছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি পরিষদ। এখন অপেক্ষা সিনেটের অনুমোদনের। দেশটি বলছে, নতুন এ আইন হংকংয়ের অধিবাসীদের স্বাধীনতা বঞ্চিত করবে, যা চীনের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের সামিল। তবে চীন বলছে, এটা তাদের অভ্যন্তরীণ ইস্যু। এরপরও কিউবাসহ অন্তত ৫০টি দেশ এ ইস্যুতে জাতিসংঘে চীনের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।

অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে, হংকং ইস্যুতে বিশ্ব রাজনীতি নতুন করে দুই মেরুতে বিভক্ত হতে যাচ্ছে। একদিকে ব্রিটেন-যুক্তরাষ্ট্র বরাবরের মতো হংকংয়ের বিক্ষোভকারীদের পক্ষে। অন্যদিকে চীনা অক্ষও বেশ মজবুত। করোনা মহামারীর কারণে পশ্চিমা দেশগুলোয় চীনের বিরুদ্ধে তুলনামূলক কঠোর মনোভাব আগে থেকেই রয়েছে। এখন হংকং ইস্যুকে কাজে লাগিয়ে নভেম্বরের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে বিশ্ব রাজনীতির মাঠ গরম রাখার চেষ্টা করা হতে পারে।

নতুন এ আইনের ফলে সবচেয়ে বিপদে পড়েছে হংকংয়ের অধিবাসীরা। কেননা চীনের উদ্দেশ্য সুস্পষ্ট। দেশটি হংকংয়ে আর কোন দীর্ঘমেয়াদি বিক্ষোভ ও বিচ্ছিন্নতাবাদী মনোভাব সহ্য করবে না। ধীরে ধীরে ভূখন্ডটিকে মূল চীনের সঙ্গে জুড়ে নিতে চাইবে। এর বিপরীতে চীনের প্রতি হংকংবাসীর বিরূপ মনোভাব হয়তো কমবে না, তবে তা বহিঃপ্রকাশের ভাষা বদলাতে হবে। কেননা প্রকাশ্য বিক্ষোভ করলেই ধরে নিয়ে জেলে ঢুকাবে চীনা প্রশাসন। এমনকি অনলাইনে চীনবিরোধী কর্মকাণ্ড খুঁজে খুঁজে শাস্তি দেয়া হবে। স্বাভাবিকভাবেই হংকংয়ে চীনবিরোধী কর্মকাণ্ড গতি হারাবে। নয়তো গোপনে তা পরিচালনা করতে হবে।

আপাতদৃষ্টিতে হংকংয়ের জন্য নতুন এ আইনের মাধ্যমে এক দেশ দুই নীতি থেকে অনেকটাই সরে এলো চীন। ১ জুলাই থেকে শেনঝেন নদীর তীরে বেইজিংয়ের নব্য-উপনিবেশ আগের তুলনায় আরো পোক্ত হলো। মাত্র ২৩ বছরের মধ্যে কোনঠাসা হয়ে গেল হংকংবাসীর স্বাধীনতা স্বপ্ন ও বিশেষ সাংবিধানিক মর্যাদা। এর পর হয়তো হংকংকে মূল ভূখন্ডের সঙ্গে যুক্ত করতে আরো বড় ও কঠোর কোন পদক্ষেপ হাতে নেবে চীনা শাসকরা। 

লেখক: সাংবাদিক

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন

×