শুক্রবার | আগস্ট ১৪, ২০২০ | ৩০ শ্রাবণ ১৪২৭

কর্মবীর : আল্লাহ মালিক কাজেমী

নিরপেক্ষতা ও দক্ষতায় অতুলনীয়

ড. সালেহ্উদ্দিন আহমেদ

সম্প্রতি প্রয়াত আল্লাহ মালিক কাজেমীর সঙ্গে আমি কাজ করেছি। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর থাকাকালে তিনি ছিলেন অন্যতম ডেপুটি গভর্নর। আমরা সবাই একটা টিমওয়ার্ক হিসেবে কাজ করতাম। তিনি আমার পাশাপাশি কক্ষে বসতেন। তিনি  ছিলেন অত্যন্ত স্বল্পভাষী, কথাবার্তা কম বলতেন। ছিলেন বিনয়ী সজ্জন। ব্যক্তি হিসেবে, মানুষ হিসেবে তিনি সেরা মানুষ ছিলেন। বহু বিষয়ে তার দক্ষতা অভিজ্ঞতা ছিল। তিনি অত্যন্ত প্রখর জ্ঞান বুদ্ধিমত্তার অধিকারী ছিলেন। তিনি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিভিন্ন কার্যক্রমের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিলেন। শুধু বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রসঙ্গে বিষয়টি বলব না, তিনি বিশ্বের অন্যান্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রেক্ষাপটেও একজন দক্ষ প্রাজ্ঞ লোক ছিলেন। বিভিন্ন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাজ সম্পর্কে সবসময় হালনাগাদ থাকতেন। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের কার্যকলাপ সম্পর্কে তার জ্ঞান ছিল অনেক বেশি। শুধু জ্ঞানের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না, সেটা কীভাবে প্রয়োগ করতে হয়, তাও তিনি জানতেন। তিনি খুব গুছিয়ে, স্পষ্ট করে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো তুলে ধরতেন। ইংরেজি বাংলা দুটি ভাষায়ই পারদর্শী ছিলেন। বৈদেশিক মুদ্রা বিনিময়, মুদ্রানীতিসহ নীতিগত বিভিন্ন ইস্যু, বাণিজ্য প্রবৃদ্ধি, ব্রড মানি, মনিটারি টার্গেটগুলো সম্পর্কে অসাধারণ জ্ঞান ছিল তার। মুদ্রানীতি আমার কার্যকালেই ঘোষণার চল শুরু হয়েছিল। সেখানে তার অবদান ছিল অনেক বেশি। আমার সঙ্গে আলোচনা করে তিনি কী কী অধ্যায় হবে তা ঠিক করেছিলেন। সেই ফরম্যাট এখন পর্যন্ত বিশেষ পরিবর্তন হয়নি।

কাজেমীর আরেকটি বড় গুণ ছিল, তিনি পেছনে থেকে কাজ করতেন। কাজ করার পর বাহবা নেয়া বা আমাদের পর্যালোচনা বৈঠকে মুগ্ধ করার চেষ্টা করা, সেই ধরনের মনোবৃত্তি তার মধ্যে ছিল না। তিনি সবকিছু আগে থেকেই প্রস্তুত করে রাখতেন। বিশেষ করে ব্রিফিং কিংবা আইএমএফের সঙ্গে চূড়ান্ত আলোচনার ক্ষেত্রে খুব গুছিয়ে তুলে ধরতেন। আইএমএফের টিম বিভিন্ন ব্যাংক থেকে তথ্য সংগ্রহ করে নিয়ে আসত। সংস্থাটি তখন আমাদের অর্থায়ন করেছিল, এখন যেমন আবার বাজেট সাপোর্ট দেবে। তখন তিনি পেছনের কাজগুলো করতেন। আমাদের জবাব কী হবে, আমরা কী বলব, পদক্ষেপগুলো কী নেবসুস্পষ্টভাবে তিনি প্রস্তুত করে দিতেন; যেটি আমাদের জন্য বড় সহায়ক হতো।

আরেকটি বিষয় কাজেমীর মধ্যে ছিল। সেটি হলো, কথাবার্তা কম বললেও যুক্তির মাধ্যমে তার বক্তব্য প্রকাশ করতেন। পাশাপাশি কক্ষে থাকায় তিনি দ্রুতই যেকোনো নথি নিয়ে হয় নিজে আসতেন কিংবা কাউকে দিয়ে পাঠিয়ে দিতেন। তিনি সুনির্দিষ্ট নথি সম্পর্কে কিছু বলার থাকলে স্পষ্ট করে বলতেন। কিন্তু তিনি আগে থেকেই কোনো কিছু প্রভাবিত করতে চাইতেন না। তিনি লিখে নিয়ে আসতেন, আর বলতেন, পড়ে দেখেন ঠিক আছে কিনা। কোনো কিছু পরিবর্তন করতে হলে পরে করব। খুব বেশি কিছু পরিবর্তন করতে হতো না। খুব সংক্ষিপ্তাকারে গুছিয়ে সবকিছু তুলে ধরতেন। বলতে গেলে তার কার্যকলাপ, দক্ষতা সবকিছু মিলিয়ে তিনি একজন আদর্শ ব্যক্তি, আদর্শ কেন্দ্রীয় ব্যাংকার।

আরেকটি দিক হলো, তিনি তার সময়ে আর যারা ডেপুটি গভর্নর ছিলেন বা জুনিয়র কর্মকর্তা ছিলেন, তাদের কাছে খোলাখুলিভাবে নিজের মতামত তুলে ধরতেন। বৈঠকে পরিষ্কারভাবে বলতেন এসব হতে পারে। ডেপুটি গভর্নরের কাজটি তিনি খুব সম্মানের সঙ্গে করেছেন। তিনি শুধু সমালোচনা করতেন না, কীভাবে কী করতে হবে, সেটিও বলে দিতেন। এটি ছিল তার বিশেষ গুণ। তিনি ছিলেন রিয়েল ট্রেইনার ব্যবহারিক মানুষ। সহকর্মীরা তার কাছ থেকে অনেক শিখেছেন কিংবা তিনি শিখিয়েছেন। এটা সবাই স্বীকার করেন। এজন্য তারা তার শূন্যতা অনুভব করবেন।

২০০৮ সালে তার অবসর হয়েছিল। আর আমার মেয়াদ শেষ হবে ২০০৯ সালে। আমি মনে করেছিলাম, তার উপস্থিতি কেন্দ্রীয় ব্যাংকে দরকার। সেই সময় রাষ্ট্রক্ষমতায় ছিল তত্ত্বাবধায়ক সরকার। তখন কাজেমীকে বেশ কয়েকটি জায়গায় যোগদানের অফার করা হয়েছিল। এগুলোর ব্যাপারে তিনি খুব একটা আগ্রহী ছিলেন না। তাকে বললাম যে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে কাজ করবেন কিনা। তিনি বললেন, নিশ্চয়ই করব। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ছিলেন . ফখরুদ্দীন আহমেদ। তিনিও গভর্নর ছিলেন। তিনিও বহুদিন ধরে তার সঙ্গে কাজ করেছেন, তাকে ভালো করেই চিনতেন, তার কাজ সম্পর্কে ওয়াকিবহাল ছিলেন। তাদের সঙ্গে আলোচনা করে কাজেমীকে নিয়োগ দেয়া হয় বাংলাদেশ ব্যাংকের উপদেষ্টা হিসেবে। তিনি আবার কাজ শুরু করেছিলেন। শেষের দিকে তিনি কতগুলো গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেছেন। ফরেন এক্সচেঞ্জ রেগুলেশন অ্যাক্ট রিভাইজ করার জন্য কাজ শুরু করেছিলেন। দুঃখজনকভাবে সেটি এখনো চূড়ান্ত করা হয়নি। বহু আগে থেকে সেটি জমা দেয়া হয়েছিল। এর ওপর কাজেমী অনেক কাজ করেছেন। এছাড়া সিএসআর এমএফএস বিষয়ে গাইডলাইন তৈরির কাজের পাশাপাশি বাংলাদেশ অটোমেটেড ক্লিয়ারিং হাউজ, আরটিজিএস নিয়েও কাজ করেছেন। বলা যায়, ব্যাংকিং খাতে যেসব সংস্কার হয়েছে, সব ক্ষেত্রেই তার অবাধ বিচরণ ছিল। ব্যক্তিগতভাবে তিনি খুব সজ্জন ব্যক্তি ছিলেন।

সামাজিক অনুষ্ঠান কিংবা অফিশিয়াল পার্টিতে খুব একটা যেতেন না। তার অভ্যাস ছিল বাসায় গিয়ে পড়াশোনা করা। তিনি ব্যাংকের ওপর, আর্থিক ব্যবস্থাপনার ওপর একেবারে হালনাগাদ জ্ঞান রাখতেন। আবার একদম রাশভারিও ছিল না। তার কাছে যাওয়াটা কঠিন ছিল না। তার দরজা সবার জন্য খোলা ছিল। তিনি খুব পদ্ধতিগত ছিলেন। যথাসময়ে যথাযথ কাজটি করতেন। তাকে এখনো মিস করি। তাকে যে উপদেষ্টা করা হয়েছিল, সেই সিদ্ধান্ত যথাযথ ছিল কারণে যে পরবর্তী সময়ে গভর্নর হিসেবে যারা এসেছেন, তাকে কেউ ছাড়েননি।

কাজেমীর সততা, নিরপেক্ষতা ছিল তুলনাহীন। তার উদ্দেশ্য সম্পর্কে বিরূপ মন্তব্য করার কোনো অবকাশ ছিল না। তিনি বিদেশ ভ্রমণে খুব একটা উত্সাহিত ছিলেন না। তিনি নিভৃতে কাজ করতেন। কৃতিত্ব নেয়ার চেষ্টা করতেন না। তবে তার কৃতিত্ব সবাই স্বীকার করতেন। তিনি আড়ালে কাজ করতেন, কিন্তু সবাই বুঝতে পারতেন যে প্রতিটি কাজেই তার মেধা মননের ছোঁয়াটা আছে। আমার মনে হয়, পুরো ব্যাংকিং খাতই তাকে মনে রাখবে। তার কাজের মধ্য দিয়ে তিনি বেঁচে থাকবেন। পুরো আর্থিক খাতে যদি প্রয়োজনীয় সংস্কারগুলো আমরা করতে পারি, তাহলে সেটিই হবে তাকে সম্মান প্রদর্শনের সবচেয়ে যোগ্য উত্তম উপায়। তার বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করি।

. সালেহ্উদ্দিন আহমেদ: সাবেক গভর্নর, বাংলাদেশ ব্যাংক

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন