রবিবার | জুলাই ১২, ২০২০ | ২৮ আষাঢ় ১৪২৭

সম্পাদকীয়

নতুন অর্থবছরের যাত্রা

করোনার প্রভাব মোকাবেলায় প্রতিটি সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিত হোক

করোনাকালে বৃহৎ বাজেটের যাত্রা হলো আজ। বিগত অর্থবছরের ধারাবাহিকতায় এবারো বড় বাজেট, বড় লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। করোনা মহামারীর মধ্যেও বড় বাজেট বাস্তবায়নে আশাবাদী অর্থমন্ত্রী। স্বাভাবিক সময়েও যেখানে বাজেট বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি, পরিবর্তিত তথা সংকটকালে কীভাবে বাজেট বাস্তবায়ন হবে, তার কার্যকর রূপরেখা মেলেনি বলেই দাবি করছেন বিশেষজ্ঞরা। মহামারীতে জনগণের একটি অংশ আবারো দরিদ্র হয়ে পড়ছে, বাড়ছে বেকারত্ব। বৈষম্য মোকাবেলায় বলা যায় আগের বাজেটগুলো সফল হয়নি। এমন পরিস্থিতিতে আলোচ্য বাজেট দিয়ে নতুন দারিদ্র্য মোকাবেলা কর্মসংস্থান কীভাবে সৃষ্টি হবে, তা- এখন দেখার বিষয়। বাংলাদেশের করোনাজনিত সংকট কত দূর এবং কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়, সে সম্পর্কে অনুমান করা কঠিন। তবে সংকট অর্থনীতির ওপর যতটা ক্ষতিকর প্রভাব ফেলবে বলে প্রাথমিকভাবে মনে করা হয়েছিল, তার চেয়ে প্রভাব অনেক গভীর হবে। শুধু সরকার নয়, পুরো দেশের মানুষকে এর প্রভাব কাটাতে সক্রিয় করতে না পারলে সংকট উত্তরণ কঠিন হতে পারে। নভেল করোনাভাইরাসের বড় চ্যালেঞ্জ হলো মহামারীর মৃত্যু ঠেকানো এবং ক্ষুধা অনাহার থেকে হতদরিদ্র জনগোষ্ঠীকে রক্ষা করা। সামনে রাষ্ট্রীয় সামাজিকভাবে সম্পদের প্রবাহে ঘাটতি দেখা দিলে পরিস্থিতির অবনতি হতে পারে। এক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ হলো সরকারের অনুসৃত নীতির ত্রুটি অসংলগ্নতা দূর করা। দেশে করোনার বিস্তার যখন উচ্চহারে ঘটছে, তখনই সব খুলে দেয়া হয়েছে। এতে লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে আক্রান্ত আর মৃত্যুর সংখ্যা।

বাংলাদেশে কর্মসংস্থানের বড় অংশ হয় দেশের অভ্যন্তরে কৃষি, শিল্প সেবা খাতে। এর মধ্যে কৃষি ছাড়া বাকি দুই খাতে কর্মসংস্থানে বড় ধরনের সংকট দেখা দিতে পারে। শিল্পের পাশাপাশি স্বাস্থ্যসেবা শিক্ষা খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোও বড় ধরনের চাপে রয়েছে। ব্যবসা-বাণিজ্য, হোটেল-রেস্তোরাঁ এবং নির্মাণ খাতের অবস্থাও বেশ নাজুক। সার্বিকভাবে কর্মসংস্থানে বড় ধরনের সংকট তৈরি হতে পারে। বাজেটে সবচেয়ে বেশি বরাদ্দ রাখা হয়েছে জনপ্রশাসন পরিচালনায়। কৃষি আছে পঞ্চম অবস্থানে। স্বাস্থ্য, যেটা এক নম্বরে থাকার কথা, সেটা আছে তিন নম্বরে। আর সামাজিক সুরক্ষা খাত আছে নবম অবস্থানে। কিন্তু মনে রাখা জরুরি করোনা মহামারী মোকাবেলায় আমাদের দুটো অস্ত্র। একটি হলো স্বাস্থ্যসেবা জোরদার করা, অর্থাৎ করোনা পরীক্ষা করোনার চিকিৎসা নিশ্চিত করা। সেজন্য চিকিৎসক-নার্স-স্বাস্থ্যকর্মী বা ফ্রন্টলাইনে যারা কাজ করছেন, তাদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা। আরেকটি অস্ত্র হলো, মানুষ যাতে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলে, সমাজে শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখতে পারে, সেই ব্যবস্থা করা। জীবিকার তাগিদে যদি মানুষ পথে নেমে আসে, তাহলে সেটা হবে না। অর্থাৎ জীবিকার ঝুঁকিতে থাকা মানুষের খাদ্য নগদ অর্থ বা অন্যান্য সহায়তা নিশ্চিত করা।

নভেল করোনাভাইরাসের সংক্রমণ বিশ্বব্যাপী হওয়ার কারণে বিশেষত বাংলাদেশের রফতানি পণ্যের বাজার ইউরোপ আমেরিকা এর প্রধান শিকার হওয়ার ফলে রফতানি চাহিদা সেসব দেশে বিশেষভাবে কমে গেছে। কারণে এবার বাংলাদেশের রফতানি আয়ে বড় ধরনেরনেতিবাচক প্রবৃদ্ধিহওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বাংলাদেশের বিদেশ কর্মসংস্থানের প্রধান ক্ষেত্র হলো মধ্যপ্রাচ্য। সেখানে করোনা সংক্রমণ জ্বালানি তেলের দাম কমে যাওয়ায় উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে স্থবিরতা নেমে এসেছে। ফলে বেশির ভাগ দেশই বিদেশী শ্রমিক জনবলকে দেশে পাঠিয়ে দেয়ার নীতি গ্রহণ করেছে। বাংলাদেশের এক কোটির বেশি প্রবাসীর একটি অংশ এর মধ্যে দেশে চলে এসেছে। আরেকটি বড় অংশকে ফিরে আসতে হতে পারে। ফলে রেমিট্যান্স আয়ের ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে বড় রকমের চাপে পড়তে হতে পারে। সরকার ব্যক্তি খাতউভয়কে দায়বদ্ধ হতে হবে। 

রাজস্ব আহরণে বড় ধরনের গুণগত সংস্কার ছাড়া অর্থনীতিকে আয় স্থবিরতার খাদ থেকে উদ্ধার করা কঠিন। সরকারের এসব কৌশল একেবারে গতানুগতিক। সরকার কত টাকা ব্যয় করবে, তা ধরেই মূলত বাজেট প্রণয়ন করা হয়। ব্যয়ের বাজেট ঠিক করেই সরকার আয়ের বাজেট করে। এতে ব্যয়ের বাজেট বড় হওয়ায় হিসাব মেলাতে রাজস্ব আহরণের টার্গেটও বড় হয়। এটি ঠিক, ‘সরকারের ব্যয় মানেই অর্থনীতির আয় কিন্তু সেজন্য টাকার সংস্থান আছে কিনা, তা না দেখে ব্যয়ের বাজেট বাড়ানো হলে দেখা দেয় বিপত্তি। এনবিআরকে একটি অবাস্তব লক্ষ্যমাত্রা দেয়ার পর তারা তা অর্জন করতে না পারলে ব্যয় মেটাতে সরকারকে দেশী-বিদেশী উৎস থেকে ঋণ নিতে হবে। অতিরিক্ত সেই ঋণের বোঝা বহন করতে হবে জনগণকে। এভাবে দিন দিন জাতির ঘাড়ে বেড়ে যাচ্ছে ঋণের মাত্রা।

একসময় অর্থ বিভাগ থেকে দেশের সব ভিক্ষুক, সব প্রতিবন্ধী সামাজিক সুরক্ষাবেষ্টনীর সুবিধাভোগীদের তালিকা প্রণয়নের এবং তালিকাকে জাতীয় পরিচয়পত্রের সঙ্গে সংযুক্ত করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল। তালিকাগুলো হয়ে থাকলে এই করোনাকালে তাদের কাছে যেকোনো সাহায্য পৌঁছানো অনেক সহজতর হতো। আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার করে তালিকাগুলো প্রণয়ন সহজতর হবে। বর্তমানে থানা জরিপ পাঁচ বছর অন্তর হচ্ছে। দেশের শ্রম জরিপ প্রতি মাসে, খানা জরিপ প্রতি বছরে করা সম্ভব। যথাযথ নীতি প্রণয়ন সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহারে তা আশু প্রয়োজন। রাজস্ব বাজেটের কর্মসূচির আওতায় তা বাস্তবায়ন হতে পারে।

বাজেট বাস্তবায়ন যত না প্রবৃদ্ধিমুখী হবে, তার চেয়ে বেশি হতে হবে কল্যাণমুখী। মানুষের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড চালু রাখা, নতুন বিনিয়োগ করা, শিক্ষাকে এগিয়ে নেয়া, স্বাস্থ্যসেবা গণমুখীকরণ প্রয়োজন। এক্ষেত্রে থোক বরাদ্দ বাদেও ব্যয় করতে হতে পারে। সবার আগে গুরুত্ব দিতে হবে করোনার প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণে রাখায়। নইলে অর্থনীতি সচল করার সব কলাকৌশল বিনষ্ট হয়ে যেতে পারে। বাজেট বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ যত শক্তিশালী করা যাবে, ততই সম্পদের কার্যকরী ব্যবহার নিশ্চিত করা যাবে। পাবলিক মানি বাজেট ম্যানেজমেন্ট অ্যাক্টে যে ত্রৈমাসিক বাজেট বাস্তবায়ন প্রতিবেদন সংসদে উপস্থাপনের কথা বলা হয়েছে, সেই কার্যক্রমকে আরো জোরালো অর্থবহ করা আবশ্যক।

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন