শুক্রবার | জুলাই ১০, ২০২০ | ২৬ আষাঢ় ১৪২৭

প্রথম পাতা

সংসদে অর্থবিল পাস

অপ্রদর্শিত আয় বিনিয়োগের সুযোগে বড় ছাড়

নিজস্ব প্রতিবেদক

আগামী অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে ১০ শতাংশ কর দিয়ে অপ্রদর্শিত আয়ের অর্থ পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের সুযোগ দেয়ার কথা বলেছিলেন অর্থমন্ত্রী। তবে শর্ত ছিল, সেই টাকা তিন বছরের মধ্যে পুঁজিবাজার থেকে বের করা যাবে না। সেই শর্তে বড় ছাড় দিয়ে তিন বছরের স্থলে এক বছরলক ইন’-এর নিয়ম রেখে অর্থবিল পাস হয়েছে জাতীয় সংসদে।

গতকাল জাতীয় সংসদে স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে সংসদে স্থিরীকৃত আকারে অর্থবিল-২০২০ পাসের প্রস্তাব করেন অর্থমন্ত্রী মুস্তফা কামাল। পরে তা কণ্ঠভোটে পাস করা হয়। আজ সংসদে মূল বাজেট পাস হওয়ার কথা রয়েছে, যা আগামীকাল জুলাই থেকে কার্যকর করা হবে।

কয়েকজন সংসদ সদস্যের সংশোধনী প্রস্তাব গ্রহণের মধ্য দিয়ে সংসদে যে অর্থবিল পাস হয়েছে, তাতে বড় ধরনের কোনো পরিবর্তনের প্রস্তাব ছিল না। সেলফোন সেবার ওপর সম্পূরক শুল্ক ১০ থেকে বাড়িয়ে ১৫ শতাংশ করার প্রস্তাব প্রত্যাহারের যে দাবি ছিল, তাতেও কোনো পরিবর্তন আনা হয়নি। তবে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান আপিল হেরে ট্রাইব্যুনালে গেলে কর দিতে হবে না, সেটার ক্ষেত্রে আগের মতোই ২০ শতাংশ কর অব্যাহতি রাখা হয়েছে অর্থবিলে। এছাড়া সিএনজিচালিত অটোরিকশা রেজিস্ট্রেশনে সম্পূরক শুল্ক অব্যাহতি দেয়া হয়েছে এবং লোকাল অথরিটির উৎসে ভ্যাটের রিটার্ন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।

অর্থবিলের ওপর গতকাল জাতীয় পার্টির পীর ফজলুর রহমান, কাজী ফিরোজ রশীদ, মুজিবুল হক চুন্নু, আওয়ামী লীগের আবুল হাসান মাহমুদ আলী, আলী আশরাফ বিরোধীদলীয় প্রধান হুইপ মসিউর রহমান রাঙ্গার কয়েকটি প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়। পরে সেগুলো কণ্ঠভোটে পাসও হয়। অর্থবিল পাসের আগে বাজেটের ওপর নিজের সমাপনী বক্তব্য দেন অর্থমন্ত্রী। তার আগে বাজেট আলোচনায় অংশ নেন সংসদ নেতা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

প্রথা অনুযায়ী, অর্থবিলে কোনো পরিবর্তন আনতে হলে অর্থমন্ত্রীর সমাপনী বক্তব্য এবং অর্থবিল পাসের আগে প্রধানমন্ত্রী তার বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রীকে সে বিষয়ে অনুরোধ করেন। এরপর অর্থমন্ত্রী প্রধানমন্ত্রীর অনুরোধ আমলে নিয়ে সেসব বিষয়ে পরিবর্তন এনে অর্থবিল পাসের প্রস্তাব করেন। কিন্তু এবার প্রধানমন্ত্রী কোনো পরিবর্তন আনতে অর্থমন্ত্রীকে অনুরোধ করেননি।

বাজেট বাস্তবায়নে সক্ষম হব: আগামী অর্থবছরের জন্য প্রস্তাবিত বাজেট বাস্তবায়নে সক্ষম হবেন বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী মুস্তফা কামাল। গতকাল জাতীয় সংসদে বাজেট আলোচনার ওপর নিজের সমাপনী বক্তব্যে তিনি বলেন, সামনের দিনে এগিয়ে যাওয়ার মৌলিক খাত হবে কৃষি। আমাদের শিকড় হলো আমাদের কৃষি, আমাদের গ্রামীণ অর্থনীতি। বাজেটটি সবার, বাজেট থেকে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে বাদ দিতে পারিনি। কাউকে বাদ দিতে পারলে বাজেটের আকার অবশ্যই ছোট রাখা যেত, ছোট রাখা যেত বাজেট ঘাটতিও। সত্য যে বড় কঠিন, তাই সব জেনেশুনে আমরা এই কঠিনকেই ভালোবেসেছি।

অর্থমন্ত্রী বলেন, কেউ কেউ আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন বাজেটটি বাস্তবায়নযোগ্য নয়, কারণ এটি আকারে বড়। কিন্তু আমরা বাজেট বাস্তবায়নের ব্যাপারে আশাবাদী। বিগত পাঁচ বছরে আমরা বাজেটে জিডিপি প্রবৃদ্ধির যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছিলাম আমাদের প্রকৃত অর্জন প্রতি বছরই তার চেয়ে বেশি ছিল। বিগত ১০ বছরে জিডিপিতে আমাদের প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১৮৮ শতাংশ, যা বিশ্বে সবার ওপরে। আমাদের কাছাকাছি ছিল চীন, ১৭৭ শতাংশ নিয়ে এবং ভারত ১১৭ শতাংশ। গত ১১ বছরে আমাদের জিডিপির আকার বেড়েছে তিন গুণ।

বিভিন্ন রেফারেন্স তুলে ধরে মুস্তফা কামাল বলেন, দি ইকোনমিস্ট গত মে তাদের গবেষণামূলক একটি প্রতিবেদনে ৬৬টি উদীয়মান সবল অর্থনীতির দেশের তালিকা প্রকাশ করেছে, এতে বাংলাদেশ রয়েছে নবম শক্তিশালী অবস্থানে। ১১ জুন এই সংসদে আমরা বাজেট ২০২০-২১ উপস্থাপন করেছি। এর মাত্র সাতদিনের মাথায় ১৮ জুন এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক আগামী অর্থবছরের জন্য বাংলাদেশের জিডিপিতে প্রবৃদ্ধি প্রক্ষেপণ করেছে দশমিক শতাংশ, যা আমাদের লক্ষ্যমাত্রা দশমিক শতাংশের একেবারে কাছাকাছি। এতেই প্রতীয়মান হয় আমরা বাজেটটি বাস্তবায়ন করতে সক্ষম হব ইনশাআল্লাহ। এই বাজেটটি বাস্তবায়নে এগিয়ে আসবে আমাদের দেশের সব মানুষ, যারা আমাদের প্রাণশক্তি।

লাখ ৬৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট: অর্থমন্ত্রী মুস্তফা কামাল ১১ জুন ২০২০-২১ অর্থবছরের জন্য লাখ ৬৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট প্রস্তাব সংসদে উপস্থাপন করেন, যা দেশের মোট জিডিপির ১৭ দশমিক শতাংশের সমান। করোনাভাইরাস সংকটে পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে এবারের বাজেটে উন্নয়ন ব্যয় খুব বেশি না বাড়িয়ে ধরা হয়েছে লাখ ১৫ হাজার ৪৩ কোটি টাকা, যা বিদায়ী অর্থবছরের সংশোধিত উন্নয়ন বাজেটের প্রায়  দশমিক ২৭ শতাংশ বেশি।

অর্থমন্ত্রী ব্যয়ের যে পরিকল্পনা করেছেন তাতে তিনি আশা করছেন, নতুন অর্থবছরের সম্ভাব্য ব্যয়ের ৬৬ শতাংশ তিনি রাজস্ব খাত থেকে পাবেন। তার প্রস্তাবিত বাজেটে রাজস্ব খাতে আয় ধরা হয়েছে লাখ ৭৮ হাজার কোটি টাকা। এই অংক বিদায়ী অর্থবছরের সংশোধিত রাজস্ব আয়ের দশমিক শতাংশ বেশি। এর মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের মাধ্যমে কর হিসেবে লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা আদায় করা যাবে বলে আশা করছেন অর্থমন্ত্রী। ফলে এনবিআরের কর আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা বাড়ছে দশমিক ৮১ শতাংশ। টাকার ওই অংক মোট বাজেটের ৫৮ শতাংশের বেশি।

গতবারের মতো এবারো সবচেয়ে বেশি কর আদায়ের লক্ষ্য ঠিক করা হয়েছে মূল্য সংযোজন কর বা ভ্যাট থেকে, লাখ ২৫ হাজার ১৬২ কোটি টাকা। এই অংক বিদায়ী অর্থবছরের সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ১৩ দশমিক ৯৪ শতাংশের মতো। বিদায়ী অর্থবছরের বাজেটে ভ্যাট থেকে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য ধরা ছিল লাখ ২৩ হাজার ৬৭ কোটি টাকা। লক্ষ্য পূরণ না হওয়ায় সংশোধিত বাজেটে তা লাখ হাজার ৮৪৬ কোটি টাকায় নামিয়ে আনা হয়।

আয়কর মুনাফার ওপর কর থেকে লাখ হাজার ৯৪৫ কোটি টাকা রাজস্ব পাওয়ার আশা করা হয়েছে এবারের বাজেটে। বিদায়ী সংশোধিত বাজেটে এর পরিমাণ ছিল লাখ হাজার ৮৯৪ কোটি টাকা।

এছাড়া নতুন বাজেটে আমদানি শুল্ক থেকে ৩৭ হাজার ৮০৭ কোটি টাকা, সম্পূরক শুল্ক থেকে ৫৭ হাজার ৮১৫ কোটি টাকা, রফতানি শুল্ক থেকে ৫৫ কোটি টাকা, আবগারি শুল্ক থেকে হাজার ৬৮৬ কোটি টাকা এবং অন্যান্য কর শুল্ক থেকে হাজার ৫৩০ কোটি টাকা আদায়ের পরিকল্পনা করেছেন অর্থমন্ত্রী। বৈদেশিক অনুদান থেকে হাজার ১৩ কোটি টাকা পাওয়া যাবে বলেও বাজেট প্রস্তাবে আশা প্রকাশ করেছেন তিনি।

প্রস্তাবিত বাজেটে আয় ব্যয়ের হিসাবে সামগ্রিক ঘাটতি থাকছে প্রায় লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা, যা মোট জিডিপির শতাংশের মতো। সাধারণত ঘাটতির পরিমাণ শতাংশের মধ্যে রেখে বাজেট প্রণয়নের চেষ্টা হলেও এবার তা সম্ভব হয়নি। এই ঘাটতি পূরণে অর্থমন্ত্রীর সহায় অভ্যন্তরীণ এবং বৈদেশিক ঋণ। তিনি আশা করছেন, বিদেশ থেকে ৮০ হাজার ১৭ কোটি টাকা এবং অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে লাখ হাজার ৯৮৩ কোটি টাকা ঋণ করে ওই ঘাটতি মেটানো যাবে। অভ্যন্তরীণ খাতের মধ্যে ব্যাংকিং খাত থেকে ৮৪ হাজার ৯৮৩ কোটি টাকা, সঞ্চয়পত্র থেকে ২০ হাজার কোটি টাকা এবং অন্যান্য খাত থেকে আরো হাজার কোটি টাকা ঋণ নেয়ার লক্ষ্য ধরা হয়েছে বাজেটে। বিদায়ী অর্থবছরের দশমিক শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ধরা হলেও কভিড-১৯ দুর্যোগের মধ্যে তা সংশোধন করে দশমিক শতাংশে নামিয়ে আনা হয়।

 

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন