বুধবার | জুলাই ১৫, ২০২০ | ৩০ আষাঢ় ১৪২৭

শেষ পাতা

কভিড-১৯

বদলেছে অপরাধের ধরন

নিহাল হাসনাইন

কভিড-১৯-এর প্রাদুর্ভাব বদলে দিয়েছে মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার অনেক কিছুই। পরিবর্তন এসেছে পেশায়। সেই সঙ্গে বদলে যেতে শুরু করেছে অপরাধের ধরন। সাধারণ অপরাধের তুলনায় আর্থিক প্রতারণামূলক অপরাধে সম্পৃক্ততা বেড়েছে অপরাধীদের। নভেল করোনাভাইরাস সংক্রমণের প্রভাবে সৃষ্ট আর্থিক সংকটই ধরনের অপরাধ সংঘটনের অন্যতম কারণ বলে মত বিশেষজ্ঞদের। আর পুলিশ বলছে, যে কোনো ধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার প্রস্তুতি তাদের রয়েছে।

করোনায় স্থবির হয়ে এসেছে দেশের অর্থনীতির চাকা। শ্রমিকদের বেতন-ভাতা দিতে না পারায় এরই মধ্যে বন্ধ হয়ে পড়েছে দেশের অনেক শিল্প-কারখানা। নতুন করে এসব কারখানা চালু করতে অর্থের প্রয়োজনীয়তা তৈরি হয়েছে ব্যবসায়ীদের। ঠিক সুযোগটি কাজে লাগাতে সক্রিয় হয়ে উঠেছে একশ্রেণীর প্রতারক চক্র। তারা বিদেশী বিনিয়োগ এনে দেয়ার কথা বলে উল্টো ব্যবসায়ীদের অর্থ আত্মসাৎ করছে। চলমান সংকট দীর্ঘ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ধরনের আর্থিক অপরাধ বেড়ে যাওয়া শঙ্কা বিশেষজ্ঞদের।

এক যুগেরও বেশি সময় ধরে ড্রেজিং ব্যবসা পরিচালনা করে আসছে ফার্স্ট এসএস এন্টারপ্রাইজ (প্রা.) লিমিটেড। নভেল করোনাভাইরাস সংক্রমণের মধ্যে পানি উন্নয়ন বোর্ডের বেশকিছু কাজ পেয়ে যায় প্রতিষ্ঠানটি। কিন্তু কাজের জন্য যে ড্রেজিং মেশিন দরকার, তা ওই প্রতিষ্ঠানের নেই। পরে প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আবু সাদেক ২২ কোটি টাকা মূল্যের ড্রেজিং মেশিন কেনার জন্য বেশ কয়েকটি ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কাছে প্রস্তাব নিয়ে যান। কিন্তু চলমান সংকটের মধ্যে সাড়া মেলেনি তার প্রস্তাবে।

ব্যবসায়ী আবু সাদেক জানান, এতে নতুন ড্রেজিং মেশিন কেনার কার্যক্রমে ছেদ পড়ে। অবস্থায় পূর্ব পরিচিত শেখর বড়ুয়া তাকে এক ব্যবসায়ী পরামর্শকের কাছে নিয়ে যান, যার নাম এমএম এহসান নিজামী ওরফে তানিম। তিনি নিজেকে ইএফআই (এসজি) লিমিটেড নামের সিঙ্গাপুরের একটি প্রতিষ্ঠানের কনসালট্যান্ট হিসেবে পরিচয় দেন। সব কাগজপত্র দেখে তানিম জানান, তার প্রতিষ্ঠান ড্রেজিং মেশিন কেনার জন্য ৮০ শতাংশ টাকা বিনিয়োগ করবে। তবে এর আগে ফার্স্ট এসএস এন্টারপ্রাইজ (প্রা.) লিমিটেডকে এলসি খোলার জন্য ২০ শতাংশ টাকা এবং ফাইল প্রসেসিংয়ের জন্য আরো কিছু টাকা দিতে হবে। সে অনুযায়ী কোটি ২৩ লাখ টাকা প্রদান করা হয়। কিন্তু পরে আর বিদেশী বিনিয়োগ বা মেশিন কোনোটিই আসেনি।

বিদেশী বিনিয়োগ পাইয়ে দেয়ার কথা বলে অর্থ আত্মসাতের ঘটনায় গুলশান থানায় মামলা করেছে ফার্স্ট এসএস এন্টারপ্রাইজ (প্রা.) লিমিটেড। প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আবু সাদেক বাদী হয়ে মামলাটি করেছেন। এজাহারে তিনি উল্লেখ করেছেন, ব্যবসায়িক পরামর্শক তানিমের কথামতো ইএফই (বিডি) লিমিটেডের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে কোটি ২৩ লাখ টাকা জমা দেয়া হয়। এর তিনদিন পর এলসি খোলার কথা থাকলেও পরবর্তী দুই সপ্তাহেও তা হয়নি।

গুলশান থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মো. আমিনুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠান ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হচ্ছে। তাদের কাগজপত্র যাচাই করে দেখে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে।

এর আগে আরেক স্পিনিং মিল মালিকের কাছ থেকে কোটি ২০ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয় আরেকটি প্রতারক চক্র। তারা মূলত স্পিনিং মিল কেনার কথা বলে নগদ অর্থের বদলে হাজার কোটি টাকা পে-অর্ডার প্রদান করে। একই সময়ে ওই স্পিনিং মিল মালিকের কাছ থেকে লোক হিসেবে কোটি ২০ লাখ নেয় ওই প্রতারক চক্র। পরে পে-অর্ডার নিয়ে ব্যাংকে গিয়ে ওই স্পিনিং মিলের মালিক জানতে পারেন এসব পে-অর্ডার ভুয়া।

শুধু বড় ব্যবসায়ীরাই নন, মাঝারি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদেরও নানা ধরনের আর্থিক প্রতারণার মুখে পড়তে হচ্ছে। পৈত্রিকভাবে মসলার ব্যবসা করেন চকবাজারের ইকবাল হোসেন। ব্যবসার প্রসারের জন্য অনলাইনেও মসলা বিক্রি করেন তিনি। গত ২০ জুন পাঁচ কেজি এলাচ এক কেজি কাজুবাদামের অনলাইন অর্ডার পান ইকবাল হোসেন। তাকে জানানো হয় ওয়েস্টিন হোটেলের জন্য মসলা অর্ডার করা হয়েছে। অর্ডার অনুযায়ী দ্রুত মাল নিয়ে গুলশান নম্বরে হোটেল ওয়েস্টিনের সামনে উপস্থিত হন ইকবাল হোসেন। এরপর মাল ডেলিভারির জন্য ফোন দিলে গাড়ি নিয়ে এক ব্যক্তি এসে মালগুলো নিয়ে তার গাড়িতে রাখেন। আর ইকবাল হোসেনকে হোটেলের ভেতরে নিয়ে যান বিল পরিশোধ করার জন্য। হোটেলের ভেতরে ইকবাল হোসেনকে বসিয়ে রেখে সটকে পড়েন ওই ব্যক্তি। ঘটনায় গুলশান থানায় একটি মামলা দায়ের করেছেন ব্যবসায়ী ইকবাল হোসেন।

এদিকে সোমবার দিনভর রাজধানীর মিরপুরে অভিযান চালিয়ে জাল নোট তৈরির কারখানার সন্ধান পায় র্যাব। সেখান থেকে বিপুল পরিমাণ জাল নোট তৈরির সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়। আসন্ন কোরবানির ঈদকে টার্গেট করে চক্রটি মিরপুরে জাল নোট তৈরির কারখানা স্থাপন করেছিল বলে জানায় র্যাব।

এর বাইরে মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল প্রতারণাও বেড়েছে করোনাকালে। সেই সঙ্গে যুক্ত হয়েছে এটিএম কার্ড জালিয়াতির মতো অপরাধ। জালিয়াতির অর্থ উত্তোলনের জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে বিভিন্ন ধরনের -কমার্স প্লাটফর্ম। কভিড-১৯-এর প্রাদুর্ভাব দীর্ঘ হলে দেশের আর্থিক অপরাধ বেড়ে যাওয়ার শঙ্কা প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধ বিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান . জিয়া রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, যে কোনো দুর্যোগ এলেই আইন-শৃঙ্খলা ব্যবস্থার কিছুটা পরিবর্তন আসে। বিশেষ পরিস্থিতি নিয়ে সবাই মনোযোগী থাকে। সুযোগে আর্থিক অপরাধ সংঘটিত করার জন্য অপরাধীরা সক্রিয় হয়ে ওঠে। মূলত মহামারীর সময় সৃষ্টি হওয়া তীব্র আর্থিক সংকট থেকেই ধরনের অপরাধ হয়ে থাকে বলেও জানান তিনি।

তবে পুলিশ বলছে, যে কোনো ধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় তাদের পর্যাপ্ত প্রস্তুতি রয়েছে। পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া) মো. সোহেল রানা বণিক বার্তাকে বলেন, অপরাধ নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে সবার জন্য নিরাপদ সমাজ গড়ে তোলার লক্ষ্যে বাংলাদেশ পুলিশ নিরন্তর দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছে। চলমান করোনাকালে জনগণকে মানবিক সেবা প্রদানের পাশাপাশি সাধারণ অপরাধসহ গুরুতর অপরাধ যেমন আর্থিক প্রতারণাসংক্রান্ত অপরাধ দমনে বিশেষভাবে কাজ করছে পুলিশ। বাংলাদেশ পুলিশের বিশেষায়িত ইউনিট সিআইডির একটি বিশেষ টিম আর্থিক প্রতারণাসংক্রান্ত অপরাধ উদ্ঘাটনে তত্পর রয়েছে। ধরনের অপরাধ উদ্ঘাটন এবং অপরাধীদের আইনের আওতায় আনতে টিমের যথেষ্ট সাফল্য রয়েছে।

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন