শুক্রবার | জুলাই ১০, ২০২০ | ২৬ আষাঢ় ১৪২৭

আন্তর্জাতিক খবর

বর্ণবাদ বিরোধী বিক্ষোভে সাদাদের অতি অংশগ্রহণ কি ফ্যাশন? সন্দিহান কৃষাঙ্গরা

বণিক বার্তা অনলাইন

ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার আন্দোলনে সাদাদের বেশি বেশি অংশগ্রহণ কি আদিখ্যেতা! নাকি এটা ক্রমেই একটা ফ্যাশনে পরিণত হচ্ছে। তাতে তো বর্ণ ঘৃণা রয়েই যাচ্ছে সাদাদের হৃদয়ের গভীরে। সময়মতো উপযুক্ত পরিবেশ আর প্রণোদনা পেলেই আবার উদ্যত হবে নিষ্ঠুর সাদা হাত!

পুলিশের হাতে কৃষ্ণাঙ্গ যুবক জর্জ ফ্লয়েড নিহত হওয়ার ঘটনার জেরে যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে বিক্ষোভের আগুন। অনেকটা ব্যতিক্রমভাবেই এবার বর্ণবাদ বিরোধী এ আন্দোলনে সাদাদের অংশগ্রহণ বেশ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বিশেষ করে নতুন প্রজন্মের শ্বেতাঙ্গদের অংশগ্রহণ বেশি। এই দৃশ্য দেখে কালো বিক্ষোভকারীরা বেশ আপ্লুত। তারা আনন্দিত, আশ্বাস্ত যে তাদের সঙ্গে প্রচুর সাদা মানুষও রাস্তায় নেমে আসছে। কিন্তু অনেকের মনে সন্দেহ, এই হঠাৎ অঙ্গীকার কতোদিন টেকসই হবে?

নিউইয়র্কে বেশ কয়েকটি স্থানে বিক্ষোভ আয়োজনে সংগঠকের ভূমিকায় ছিলেন চেরিশ প্যাটন। এসব বিক্ষোভে সাদাদের অংশগ্রহণ দেখে তিনি মুগ্ধ।

সম্প্রতি নিউইয়র্ক সিটিতে ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার বিক্ষোভের সময় পুলিশ এক বিক্ষোভকারীকে ধরে রাস্তায় ফেলে দেয়ার ঘটনা ঘটে। বিষয়টি তাকে এক বন্ধু এসএমএস করে জানায়। তিনি পরে সেই বিক্ষোভকারীর ব্যাপারে খোঁজ নেয়ার চেষ্টা করেন। তার পরিচয় জানার পর তো নিজেই থ! 

প্যাটন বলেন, ওহ! এই সেই সাদা মিশেল? এই মিশেল মোর‌্যান (১৮) তার সাবেক সহপাঠীনি। তার রক্ষণশীল রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে ম্যানহাটনের হাইস্কুলে প্যাটনকে সব সময় গুটিয়ে থাকতে হতো। তিন বছর তারা এ নিয়ে তর্কবিতর্ক করেছেন! সেই মিশেল এখন বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনে সামিল। ভাবা যায়!

তবে বিক্ষোভে অংশ নেয়া অনেক শ্বেতাঙ্গই বলেছেন, তারা ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার আন্দোলনের সঙ্গে অনেক আগে থেকেই সহমত পোষণ করে আসছেন। তাদের অনেকেই পরিচিত মহলে উদারপন্থি বলেই গৃহীত। আবার অনেকে বলেছেন, তাদের বিশ্বাস ছিল আসলে পুলিশ কালোদের প্রতি বৈষম্য করে না। কিন্তু ফ্লয়েডের ঘটনা তাদের সেই বিশ্বাস ভেঙে দিয়েছে। 

এই যে হঠাৎ করে কালোদের আন্দোলনে সাদাদের সমর্থনের ঢল এ নিয়ে কৃষ্ণাঙ্গ বিক্ষোভকারীদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। অনেকে বলছেন, এটা ওদের অতি আবেগের প্রদর্শন। তারা এই উৎসাহকে সন্দেহের চোখে দেখছেন।

দীর্ঘদিন ধরে এ নিয়ে আন্দোলন করে আসছেন এমন বহু কৃষ্ণাঙ্গ এই ভেবে হতাশ যে, সারা বিশ্বে মহামারী এবং এর মধ্যে পুলিশের হাতে একটা মৃত্যুর ঘটনা সাদাদের এই আন্দোলনে অংশ নিতে উৎসাহিত করলো। এতোদিন তারা কই ছিল? সাদা লোকেরা এই উৎসাহ সহমর্মিতা কতোদিন ধরে রাখতে পারে সেটাই দেখার বিষয়!

প্যাটন বলেন, আমরা দেখেছি, বহু শ্বেতাঙ্গ আমাদের ঘৃণা করেন, আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির কারণেই তারা চরম ঘৃণা করেন। এই বিক্ষোভে সাদাদেরই সামনের সারিতে দেখা যাচ্ছে। এটা দারুণ ব্যাপার যে, শ্বেতাঙ্গদের নতুন প্রজন্ম বিষয়টিকে গুরুত্ব দিচ্ছে।

তবে সাদাদের আন্তরিকতা নিয়ে সন্দিহান ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার আন্দোলনের সহ-প্রতিষ্ঠাতা ওপ্যাল টোমেটি। তিনি বলেন, এভাবে সাদাদের ঢলের ব্যাপারটা চমৎকার দেখাচ্ছে। কিন্তু এ নিয়ে আমার তেমন একটা উত্তেজনা নেই। এটা শেষ পর্যন্ত একটা হালফ্যাশনে পরিণত হয় কিনা সেটাই ভাবছি!

একই ধরনের মন্তব্য করেছেন ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার আন্দোলনের ব্রুকলিন শাখার প্রেসিডেন্ট অ্যান্থনি বেকফোর্ড। তিনি ব্রুকলিনে তার আগের অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ করে বলেন, বিক্ষোভে প্রচুর সাদা মানুষের উপস্থিতি আমার কাছে অস্বস্তিকর ঠেকছে। 

বেকফোর্ড (৩৮) বলেন, আমি চারপাশে দেখি আর আমার নিজেকে কোণঠাসা মনে হয়। আমার জীবন কি হুমকির সম্মুখীন? তার ভয়, এই সাদা বিক্ষোভকারীদের মধ্যে অনেক জাতীয়তাবাদীও ঢুকে পড়ছে। এমনকি অনেক সাদাকে তাদের অতি উৎসাহের ব্যাপারে সতর্ক করে দিতে হয়েছে বলেও জানান বেকফোর্ড।

তিনি বলেন, আমাদের যুদ্ধটা আমাদেরই। তাদের অগ্রাধিকার এই বার্তাকে শক্তিশালী করতে পারে কিন্তু তারা কখনোই আমাদের হয়ে কথা বলতে পারবে না। কিছু কিছু মুহূর্ত আসে যখন মানুষ সামনের সারিতে থাকতে চায়। আমি তাদের পেছনের সারিতে থাকতে বলেছি।

বে রিজে দুই সাদা তরুণ আন্দোলন সংগঠিত করছিল। কিন্তু বেকফোর্ড তাদের নিবৃত করেছেন। কারণ তাদের বার্তাটি ছিল এমন, হ্যাঁ, কালোদের জীবনের মূল্য আছে এবং সেই সঙ্গে পুলিশের জীবনেরও দাম আছে। বেকফোর্ড বলেন, না, আপনারা এভাবে ভাবতে পারেন, বলতে পারেন তখন, যখন আমরা আমাদের মিশন সফলভাবে সম্পন্ন করতে পারবো।

কালোদের এই বিক্ষোভ নিয়ে এরই মধ্যে বেশ কয়েকটি গবেষণা হয়েছে। সেখানে বিপুল সংখ্যক সাদাদের অংশগ্রহণ নিয়ে কালোদের মনোভাবের বিষয়টিও উঠে এসেছে। 

চলতি মাসের শুরুর দিকে প্রকাশিত এমন একটি গবেষণায় দেখা গেছে, আন্দোলনে সাদা তরুণদের অংশগ্রহণ অবিশ্বাস্য রকম বেশি। তারা উচ্চশিক্ষিত এবং উদারপন্থি। নিউইয়র্কের একাধিক বিক্ষোভে অংশগ্রহণকারীদের ৬১ শতাংশই ছিল শ্বেতাঙ্গ।  আর বর্ণবাদবিরোধী বিক্ষোভে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে ওয়াশিংটনে ৬৫ শতংশ, লস অ্যাঞ্জেলেসে ৫৩ শতাংশই সাদা মানুষ দেখা গেছে। এই চিত্র দেখে অনেক কৃষ্ণাঙ্গই বিভ্রান্ত!

নিউইয়র্ক টাইমস অবলম্বনে জাহাঙ্গীর আলম

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন