সোমবার | আগস্ট ১০, ২০২০ | ২৬ শ্রাবণ ১৪২৭

প্রথম পাতা

বিধ্বস্ত এসএমই খাত

২ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ নিয়ে উৎকণ্ঠায় ব্যাংক

হাছান আদনান

বগুড়ার শাহজাহানপুরে রেমিকো এগ্রো নামে একটি ফিড মিল চালান উদ্যোক্তা হায়দার আলী সরকার। এক বছর আগে ব্যাংক থেকে কোটি টাকা ঋণ নিয়ে নতুন যন্ত্রপাতি বসিয়েছেন তিনি। উৎপাদন শুরু হওয়ার পর ভালোই চলছিল তার ব্যবসা। এর মধ্যেই দেশে আঘাত হানে করোনারভাইরাস, পোলট্রি ব্যবসায় নামে ধস। রেমিকো এগ্রোর উৎপাদনও নেমে আসে ২০ শতাংশে। বর্তমানে ব্যবসার অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে প্রাণপণ চেষ্টা চালাচ্ছেন উদ্যোক্তা।

হায়দার আলীর ভাষ্য, অবস্থা সর্বস্বান্ত হওয়ার মতোই। উৎপাদন বিপণন বন্ধ হওয়ার পথে। তার পরও প্রাণপণ চেষ্টা করছি টিকে থাকার। সব সঞ্চয় দিয়ে কর্মীদের বেতন-ভাতা পরিশোধ করার চেষ্টা করেছি। এখন নতুন মূলধন ছাড়া প্রতিষ্ঠান চালানোও কঠিন। ব্যাংকের কাছে সরকার ঘোষিত প্রণোদনা প্যাকেজ থেকে কোটি ২৫ লাখ টাকা চেয়ে আবেদন করেছিলাম। কিন্তু ব্যাংকের দিক থেকে কোনো সাড়াশব্দ পাচ্ছি না। নতুন মূলধন না পেলে পুরনো ঋণ কীভাবে পরিশোধ করব, সেটি ভেবেই ঘুম হারাম হয়ে গেছে।

বগুড়ার উদ্যোক্তার মতোই নাজুক পরিস্থিতি যশোরের উদ্যোক্তা কামরুল হাসান সোহেলের। এসকে ইন্টারন্যাশনাল নামের প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারী উৎপাদন করেন প্লাস্টিক মেটাল ইঞ্জিনিয়ারিং পণ্য। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, কারখানায় এখনো উৎপাদন চলছে। কিন্তু উৎপাদিত পণ্য বিক্রি নেই। উৎপাদিত পণ্যে গুদাম ভর্তি হয়ে গেছে। শ্রমিকদের বেতন-ভাতা পরিশোধ করেও মে পর্যন্ত ব্যাংকঋণের কিস্তি জমা দিয়েছি। কিন্তু জুনে এসে আর পারলাম না। সব সঞ্চয় শেষ। ডাচ্-বাংলা ব্যাংক আইডিএলসি ফিন্যান্সের মাধ্যমে সরকারি প্রণোদনা প্যাকেজের ঋণ পাওয়ার জন্য আবেদন করেছি। কিন্তু ব্যাংক কর্মকর্তারা বলেছেন, ডিসেম্বরের আগে প্রণোদনার অর্থ পাওয়া সম্ভব নয়। সে পর্যন্ত প্রতিষ্ঠান বাঁচিয়ে রাখতে পারব কিনা জানি না।

এসএমই উদ্যোক্তাদের মতো ঋণ নিয়ে উদ্বেগে আছেন ব্যাংকাররাও। তবে ব্যাংকারদের উদ্বেগ ঋণ দেয়া নিয়ে নয়গ্রাহকদের কাছ থেকে ঋণ আদায় নিয়ে। ২০১৯ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত এসএমই খাতে ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর বিতরণকৃত ঋণের পরিমাণ ছিল লাখ ১৯ হাজার ২৯৩ কোটি টাকা। বেসরকারি খাতের মোট ব্যাংকঋণের ২১ শতাংশ এসএমই খাতে। ঋণের ৭৭ শতাংশই বিতরণ করেছে বেসরকারি ব্যাংকগুলো। কভিড-১৯ ঝড়ে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত খাতগুলোর শীর্ষে রয়েছে এসএমই খাত। বর্তমান পরিস্থিতিতে খাতে বিতরণকৃত ঋণ কতটুকু আদায় হবে, তা নিয়েই উৎকণ্ঠিত ব্যাংকগুলোর শীর্ষ নির্বাহীরা।

তারা বলছেন, এসএমই খাতের উদ্যোক্তাদের বড় অংশই সর্বস্বান্ত হয়ে যাচ্ছেন। ধরে নিতে হবে, খাতে বিতরণকৃত ঋণের বড় অংশই আদায় হবে না। এখন ঋণ আদায় না হলে ব্যাংকগুলো টিকবে কীভাবে, সে চিন্তাই করতে হচ্ছে। এসএমই খাতে নতুন ঋণ দেয়া মানে ব্যাংকের ঝুঁকিকে আরো নাজুক করে তোলা। এজন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংককেই অগ্রণী ভূমিকা রাখতে হবে।

এসএমই প্রতিষ্ঠানগুলোর অন্তত অর্ধেক অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে বলে মনে করেন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের সাবেক চেয়ারম্যান মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান। তিনি বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে এসএমই ঋণের অন্তত ১৫ শতাংশ করোনা পরিস্থিতির আগেই ঝুঁকিতে ছিল। বর্তমান পরিস্থিতিতে হার বহুগুণ বাড়বে। বিভিন্ন সংস্থার জরিপ বলছে, এসএমই প্রতিষ্ঠানগুলোর ৫০-৬০ ভাগ করোনার কারণে বিলুপ্ত হয়ে যাবে। এতে বিপুল জনগোষ্ঠী যেমন চাকরি হারাবে, একই সঙ্গে ব্যাংকের বিনিয়োগও মাঠে মারা যাবে।

এসএমইদের ভাগ্য এখন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হাতে বলে মনে করেন সৈয়দ মাহবুবুর রহমান। তার মতে, বাংলাদেশ ব্যাংক যদি এসএমই ঋণ খেলাপি করার সময়সীমা বাড়িয়ে দেয়, তাহলে খাতের অনেক প্রতিষ্ঠানই ঘুরে দাঁড়াতে পারবে। বর্তমানে বড়-ছোট সব ঋণের জন্যই খেলাপি করার নীতিমালা একই। এসএমইদের জন্য খেলাপির নীতিমালা মাসের পরিবর্তে ১৮ মাস করা যেতে পারে। এতে উদ্যোক্তাদের পাশাপাশি ব্যাংকাররাও কিছুটা স্বস্তি পাবেন।

বিদায়ী বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশের বেসরকারি খাতে ব্যাংকগুলোর মোট বিনিয়োগ ছিল ১০ লাখ ৫৩ হাজার ১৫১ কোটি টাকা। এর মধ্যে লাখ ১৯ হাজার ২৯৩ কোটি টাকা ছিল এসএমই খাতে। এসএমই খাতে মোট ঋণের ৭৬ দশমিক ৬৬ শতাংশই বিতরণ করেছে বেসরকারি ব্যাংকগুলো। ডিসেম্বর শেষে বেসরকারি ব্যাংকগুলো এসএমই খাতে ঋণ দিয়েছে লাখ ৬৮ হাজার

১১৩ কোটি টাকা। রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো ৩৭ হাজার ৬৫৩ কোটি, বিশেষায়িত ব্যাংকগুলো হাজার ৭১০ কোটি এবং বিদেশী ব্যাংকগুলো হাজার ১০৩ কোটি টাকা এসএমই খাতে বিনিয়োগ করেছে। এছাড়া এসএমই খাতে ১০ হাজার ১১৪ কোটি টাকা ঋণ দিয়েছে দেশে কার্যরত আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো (এনবিএফআই)

চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত এসএমই খাতে ১১ হাজার ৬৫৫ কোটি টাকার ঋণ দিয়েছে ব্র্যাক ব্যাংক। ব্যাংকটির ঋণ পোর্টফোলিওর ৪৫ শতাংশই এসএমই খাতে বিতরণ করা হয়েছে। এর মধ্যে কুটির ছোট শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোতে ঋণ আছে হাজার ৪০০ কোটি টাকা। এসএমই খাত বিধ্বস্ত হওয়ায় সবচেয়ে বেশি উদ্বেগে আছে এমন ব্যাংকগুলোর একটি ব্র্যাক।

বিদ্যমান পরিস্থিতিতে এসএমইগুলোকে নিয়ে ব্র্যাক ব্যাংক কী ভাবছে, এমন প্রশ্নের জবাবে ব্যাংকটির চেয়ারম্যান . আহসান এইচ মনসুর বণিক বার্তাকে বলেন, পৃথিবীর সব দেশেই দুর্যোগের সময় সবার আগে এসএমই উদ্যোক্তারা মারা পড়েন। আবার সুযোগ পেলে সবার আগে এসএমই খাতই ঘুরে দাঁড়ায়। যে দুর্যোগ দেশের ওপর বয়ে যাচ্ছে, তাতে অনেক এসএমই প্রতিষ্ঠানই হারিয়ে যাবে। শুধু ব্র্যাক নয়, দেশের সব ব্যাংকের বিনিয়োগই বড় ধরনের শঙ্কার মধ্যে পড়েছে।

তার মতে, এসএমই উদ্যোক্তাদের জামানত বিক্রি করে ঋণ আদায়ের চিন্তা হলো দুরাশা। জামানত বিক্রি করে ব্যাংকের টাকা আদায় হবে না। এজন্য এসএমইগুলোকে নতুন করে ঋণ দিয়ে বাঁচাতে হবে। এজন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিমালা সংশোধন করার পাশাপাশি গঠন করতে হবে মনিটরিং সেল। একই সঙ্গে নতুন ঋণের ঝুঁকি সরকার কেন্দ্রীয় ব্যাংককে ভাগাভাগি করে নিতে হবে। অন্যথায় ব্যাংকগুলো এসএমই খাতে ঋণ বিতরণে আগ্রহী হবে না।

করোনার তাণ্ডবে ক্ষতিগ্রস্ত ক্ষুদ্র, কুটির, মাঝারি ছোট (সিএমএসএমই) উদ্যোক্তাদের স্বল্প সুদে ঋণ দেয়ার জন্য ২০ হাজার কোটি টাকার বিশেষ প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। তহবিল থেকে উদ্যোক্তারা সাড়ে শতাংশ সুদে ঋণ পাবেন। উদ্যোক্তাদের পক্ষে ঋণ বিতরণকারী ব্যাংককে সাড়ে শতাংশ সুদ পরিশোধ করবে সরকার। ব্যাংকগুলো যাতে উদ্যোক্তাদের ঋণ দিতে পারে, এজন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক ১০ হাজার কোটি টাকার একটি পুনঃঅর্থায়ন তহবিলও গঠন করেছে। তার পরও সিএমএসএমই খাতের উদ্যোক্তাদের ঋণ না দেয়ার বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগে আছে বাংলাদেশ ব্যাংকও। এজন্য সোমবার  প্রজ্ঞাপন জারির মাধ্যমে ব্যাংকগুলোকে সিএমএসএমই খাতে ঋণ বিতরণ বাড়ানোর তাগিদ দেয়া হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলেছে, মাসিক ভিত্তিতে নয়, বরং পাক্ষিক ভিত্তিতে ব্যাংকগুলোকে সিএমএসএমই খাতে ঋণ বিতরণের তথ্য কেন্দ্রীয় ব্যাংককে জানাতে হবে।

সিএমএসএমই খাতে ঋণ বিতরণ বাড়াতে গ্যারান্টি স্কিম চালুর দাবি জানিয়ে আসছিলেন ব্যাংকাররা। পরিপ্রেক্ষিতে গ্যারান্টি স্কিম চালুর উদ্যোগ নিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। তবে বিতরণকৃত ঋণের ঝুঁকি কে কত শতাংশ নেবে, তা এখনো নির্ধারণ করা সম্ভব হয়নি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র নিশ্চিত করেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক কর্মকর্তারা বলছেন, ঋণঝুঁকির মাত্রা কেন্দ্রীয় ব্যাংক বেশি নিলে যথাযথ নিরীক্ষা ছাড়াই ব্যাংকাররা ঋণ বিতরণ করতে পারেন। এতে স্কিম চালুর উদ্দেশ্যই ভেস্তে যেতে পারে।

ব্যাংকার উদ্যোক্তারা বলছেন, প্রকৃতিগতভাবেই এসএমই উদ্যোক্তাদের মূলধনের আকার ছোট হয়। ঋণ নেয়ার জন্য উদ্যোক্তারা নিজেদের বেশির ভাগ সম্পদ ব্যাংকের কাছে জামানত রাখেন। এখন এসএমই প্রতিষ্ঠানগুলো খেলাপি হয়ে গেলে ব্যাংক টাকা আদায়ের জন্য জামানতকৃত সম্পদ নিলামে তুলবে। এতে ব্যবসা হারানোর পাশাপাশি এসএমই উদ্যোক্তারা সহায়সম্পদ হারিয়ে পথে বসে যাবেন। অনেক উদ্যোক্তা দারিদ্র্যসীমার নিচেও নেমে যেতে পারেন। এজন্য সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়ে এসএমই খাতকে ঘুরে দাঁড়াতে সহায়তা করতে হবে।

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন