মঙ্গলবার | সেপ্টেম্বর ২৯, ২০২০ | ১৪ আশ্বিন ১৪২৭

শেষ পাতা

বাজেট-উত্তর সংবাদ সম্মেলনে অর্থমন্ত্রী

টাকা কোথা থেকে আসবে সেটা পরে দেখা যাবে

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রস্তাবিত ২০২০-২১ অর্থবছরের বাজেটে অর্থ কোথা থেকে আসবে সেটিকে গুরুত্ব না দিয়ে মানুষের জীবন কর্মসংস্থান রক্ষায় সর্বাধিক গুরুত্ব দেয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী মুস্তফা কামাল। তিনি বলেন, এবারের বাজেট আমরা স্বাভাবিক নিয়মে করতে পারিনি। সব অস্বাভাবিকতা বিবেচনায় নিয়ে তৈরি হলেও এটি বাস্তবায়নযোগ্য। কেউ বলতে পারবে না বাজেট গরিব বা ধনী মারার বাজেট। অতীতের অর্জন ভবিষ্যতের চিন্তা নিয়েই তৈরি করা হয়েছে বিধায় এটিকে গতানুগতিক বলারও সুযোগ নেই।

গতকাল বিকালে ভিডিও কনফারেন্সিংয়ের মাধ্যমে বাজেট-উত্তর সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন অর্থমন্ত্রী। সময় প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন তিনি।

বাজেটের নানা দিক তুলে ধরে অর্থমন্ত্রী বলেন, আগে টাকা আয় করতাম পরে ব্যয় করতাম, কিন্তু এবার উল্টোটা করছি। যে বাজেট প্রস্তাব করা হয়েছে, তাতে মূলত মানুষকে রক্ষা করার বিষয়টাকেই সর্বাধিক গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। মানুষকে খাবার দিতে হবে। চাকরি হারাদের চাকরি দিতে হবে, চিকিৎসা দিতে হবে। এবারের বাজেটে আমরা এসবকে গুরুত্ব দিয়েছি। এজন্য টাকা কোথা থেকে আসছে, সেটা পরে দেখা যাবে। আগে খরচ করব। তারপর আমরা টাকার কথা চিন্তা করব। সংগত কারণেই এবারের বাজেটে স্বাস্থ্য, কৃষি সামাজিক খাতে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। যাত্রায় শুধু মানুষকে সহযোগিতা সেবা করতে চাই।

এমন ব্যবস্থা চালু রাখা হয়েছে যে বিদেশে কেউ বিনিয়োগে যাবে নাএমন মন্তব্য করে অর্থমন্ত্রী বলেন, দেশেই তারা বিনিয়োগের জন্য আগ্রহী হবে। আবার অর্থ পাচারের আইনি কাঠামো শক্তিশালী করা হচ্ছে। আমদানি পণ্য না কিনে অর্থ পাচার কমানো হবে। পণ্য আসেনি কিন্তু টাকা গেছে, এটি আর হবে না। পুঁজিবাজার আগের অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসবে। পুঁজিবাজার ভালো করুক, চাঙ্গা থাকুক, এসব নিয়ে কোনো সরকারই সরাসরি কাজ করে না। সরকার মূলত দেশের অর্থনীতির যে ধারা চলমান থাকে, সেটির সঙ্গে পুঁজিবাজার যাচ্ছে কিনা, সে বিষয়ে দেখভাল তদারকি করে থাকে।

পুঁজিবাজারে কেন এমন পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে, সেটি সবাই জানে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এটি সামনের দিনে আরো শক্তিশালী হবে। তবে এখানে আরো বিশ্লেষণের প্রয়োজন।

দেশে কর-জিডিপি অনুপাত কম উল্লেখ করে অর্থমন্ত্রী বলেন, কথা ঠিক যে আমাদের কর-জিডিপি অনুপাত খুবই কম। এটি মাত্র ১০-১১ শতাংশ। এটাকে আমরা নতুন বাজেটের মাধ্যমে ১৫ শতাংশে নিয়ে যেতে চাই। এজন্য এনবিআরকে পুরোপুরি অটোমেশনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। যদিও করোনাকালে কার্যক্রমে কিছুটা ব্যর্থতা আছে। বাজেটে লাখ ৭৮ হাজার কোটি টাকার যে রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা দেয়া হয়েছে, সেটি পরিস্থিতিতে অর্জন করা কঠিন হবে বলে জানিয়েছেন এনবিআর চেয়ারম্যান। যদি করোনাকাল দীর্ঘ সময়ের জন্য না থাকে লক্ষ্য অর্জন করা অসম্ভব নয়। রাজস্ব আয় বাড়ানোর ক্ষেত্রে আমাদের ব্যর্থতা রয়েছে। সেটা আমরা মেনে নিচ্ছি। এর পেছনে বেশকিছু কারণ রয়েছে। যেমন আমরা কর হার বাড়িয়ে রেভিনিউ বাড়ানোর চেষ্টা করেছি। তাহলে দ্রুত রাজস্ব আয় বাড়বে আর কমবে করের হার। বর্তমানের মোবাইল কলরেট অনেক কম, তাই মাত্র শতাংশ সম্পূরক শুল্ক বাড়িয়ে ১৫ শতাংশ করা হয়েছে। এটি ব্যয়ের সক্ষমতা মানুষের আছে।

বাজেট শেকড়ে ফেরার বাজেট উল্লেখ করে অর্থমন্ত্রী বলেন, সামনের দিনে আমাদের শেকড়ে ফিরতে হবে। আমাদের শেকড় হলো কৃষি খাত। করোনা দীর্ঘায়িত হলে বিকল্প ব্যবস্থা নেয়া আছে জানিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, করোনাকাল বেশি লম্ব্বা হবে না। তার পরও যদি করোনাকাল লম্ব্বা হয়, তাহলে সবাই মিলে একসঙ্গে ভাইরাসকে মোকাবেলা করতে পারব। তার জন্য বিকল্প পরিকল্পনাও হাতে নেয়া হয়েছে।

বাজেটে দুটি জিনিসকে প্রাধান্য দেয়া হয়েছে জানিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবেলায় আমাদের করণীয় বিষয়ে পর্যাপ্ত তথ্য ছিল না। তাই অতীত অর্জনকে বিবেচনায় নিয়েছি। অতীতে আমরা যা অর্জন করেছি, তা অস্বাভাবিক। গত পাঁচ বছরে মাথাপিছু আয় সারাবিশ্বে সেরা। আমাদের সমান ছিল শুধু ভারত চীন। অর্জনগুলোকে বিবেচনায় নিয়েছি। করোনায় আক্রান্ত হওয়ার পর আমাদের নিয়ে সারাবিশ্ব নতুন করে কী ভাবছে, কী করা প্রয়োজন সেটা বিবেচনায় নিয়েছি। সবার মতামত নিয়ে বাজেট সাজিয়েছি। মানুষ আমাদের নিয়ে কী ভাবে, কী স্বপ্ন দেখে, এগিয়ে যাওয়ার জন্য তাদের যে প্রত্যয় সবকিছু আমরা মূল্যায়ন করেছি। থিংকট্যাংক থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ, অর্থনীতিবিদ, উন্নয়ন সংস্থা সবার মতামতকে প্রাধান্য দেয়া হয়েছে।

স্বাস্থ্য খাতের বরাদ্দ প্রদানের বিষয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের জন্য টাকার অভাব হবে না। কিন্তু চিকিৎসার মান বাড়াতে হবে। সেবা বাড়ানো মানে নামে সেবা বাড়ানো নয়। কার্যকরভাবে অতি দ্রুত মান বাড়াতে হবে। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা হচ্ছে স্বাস্থ্য খাতে সেবা বাড়ানোর জন্য যা কিছু করার দরকার, তা করা হবে। সেবা বাড়ানো শুধু নামে হলেই হবে না। দক্ষতার সঙ্গে যতক্ষণ বাড়ানো যাবে এবং সুযোগ থাকে বাড়ানোর, ততক্ষণ পর্যন্ত আমরা কখনো না করব না। একটি মন্ত্রণালয়ের জন্য ১০ হাজার কোটি টাকা রাখা হয়েছে। এটি মানুষের কল্যাণের জন্যই রাখা হয়েছে। উন্নত দেশের কথা বলব না, আমাদের সমমানের যেসব দেশ যে মানের চিকিৎসা সেবা দেয়, অন্তত সে মানে অতি দ্রুত চলে আসতে হবে।

সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর অর্থ উপদেষ্টা . মশিউর রহমান জ্বালানি উপদেষ্টা . তৌফিক--এলাহী চৌধুরী, কৃষিমন্ত্রী . মো. আবদুর রাজ্জাক, পরিকল্পনামন্ত্রী এমএ মান্নান, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবির, পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের সদস্য (সিনিয়র সচিব) . শামসুল আলম, অর্থ বিভাগের সচিব আবদুর রউফ তালুকদার, এনবিআর চেয়ারম্যান আবু হেনা মো. রহমাতুল মুনিম, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব আসাদুল ইসলাম, অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) বেগম ফাতেমা ইয়াসমিন সংযুক্ত ছিলেন।

স্বাস্থ্য কৃষি খাতের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার বিষয়টি উল্লেখ করে সংবাদ সম্মেলনে পরিকল্পনামন্ত্রী বলেন, দুটি খাতে যেকোনো প্রকল্প এলে তা দ্রুত অুনমোদন দিতে হবে। তবে অবশ্যই নিয়ম দক্ষতা পরিমাপ করে। তাছাড়া কৃষি খাতের জন্য সর্বাধিক গুরুত্ব দিচ্ছি। সামনের দিনে হাজার কোটি টাকার প্রকল্প অনুমোদন দেয়া হতে পারে।

সরকার ব্যাংক থেকে ৮৪ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহ করবে। সেই সামর্থ্য রয়েছে কিনা, এমন প্রশ্নের জবাবে গভর্নর বলেন, ব্যাংকগুলোতে পর্যাপ্ত তারল্য আছে। সরকারকে ঋণ দেয়ার মতো তারল্য ব্যাংকগুলোর রয়েছে। আর সরকারের প্রণোদনা প্যাকেজ বাস্তবায়নে ব্যাংকগুলোর অনাগ্রহের বিষয়ে তিনি বলেন, এটি এখনই বলাটা বেশি আগাম হয়ে যাবে।

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন