বৃহস্পতিবার | আগস্ট ০৬, ২০২০ | ২২ শ্রাবণ ১৪২৭

ফিচার

হাইড্রোক্সিক্লোরোকুইন বিতর্কের পেছনে স্বপন দেশাইয়ের নামমাত্র প্রতিষ্ঠান

বণিক বার্তা অনলাইন

হাইড্রোক্সিক্লোরোকুইন কভিড-১৯ রোগীর মৃত্যুঝুঁকি বাড়িয়ে তোলে- ব্রিটিশ মেডিকেল জার্নাল ল্যানসেটে প্রকাশিত একটি গবেষণা প্রতিবেদনে এমন দাবি করা হয়েছিল। এটির ভিত্তিতে এ ওষুধ করোনার চিকিৎসায় ব্যবহার না করার পরামর্শ দেয় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। বেশ কয়েকটি ট্রায়ালও বন্ধ করে দেয়া হয়। কিন্তু কিছু দিন পরেই গবেষণাটিতে ব্যবহৃত তথ্য-উপাত্তের নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। গবেষণা প্রতিবেদনটি শেষ পর্যন্ত প্রত্যাহার করেন তিন গবেষক। ল্যানসেটের ইতিহাসে এটি বিরল। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও মত বদলায়। গত কয়েক দিন এ নিয়ে দুনিয়াজুড়ে বয়ে গেছে আলোচনার ঝড়। মজার ব্যাপার হলো, এমন বিতর্কের গোড়ায় রয়েছে সার্জিস্ফেয়ার নামের শিকাগোভিত্তিক ছোট্ট একটি ডাটা অ্যানালিটিক্স সংস্থা। 

গত বৃহস্পতিবার তথ্য-উপাত্তের মান ও সত্যতা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করে ল্যানসেটে প্রকাশিত প্রতিবেদনটি প্রত্যাহার করেন প্রতিবেদনটির তিনজন লেখক। একই কারণে নিউ ইংল্যান্ড জার্নাল অব মেডিসিনে প্রকাশিত আরেকটি গবেষণাও প্রত্যাহার করে নেয়া হয়। 

সার্জিস্ফেয়ারের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী ডা. স্বপন দেশাই ২০১২ সালে ইউটাহ ওয়েস্টার্ন গভর্নর ইউনিভার্সিটিতে সমাবর্তন বক্তৃতা দিয়েছিলেন। সেখানে তিনি সান জু’র আর্ট অব ওয়ার বই থেকে উদ্ধৃতি দিয়ে গ্র্যাজুয়েটদের উদ্দেশে বলেছিলেন, ‘সুযোগ একবার হাতের মুঠোয় ধরতে পারলে বহুগুনে বর্ধিত হয়।’ এমবিএ, মেডিকেল এবং পিএইচডি ডিগ্রি অর্জনকারী দেশাই চীনা সমর কৌশলবিদের এ পরামর্শ সম্ভবত নিজের ক্যারিয়ারেই প্রয়োগ করার চেষ্টা করেছেন! 

৪১ বছর বয়সী এ সার্জন ও উদ্যোক্তা বিশ্বব্যাপী স্বাস্থ্য বিষয়ে বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন। তার ডাটা সংস্থা সার্জিস্ফেয়ারের সরবরাহ করা উপাত্তের ভিত্তিতেই হাইড্রোক্সিক্লোরোকুইনের ক্ষতিকর প্রভাবের তথ্য উঠে আসে এবং যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ম্যালেরিয়ার ওষুধটির ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল স্থগিত করে। এ ঘটনার পর থেকেই সার্জিস্ফেয়ারের ডাটা নিয়ে সন্দেহ ঘণীভূত হতে থাকে। কারণ স্বল্প-পরিচিত এ সংস্থাটি কীভাবে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের ১ হাজার ২০০টি হাসপাতালের রোগীর সংবেদনশীল তথ্য সংগ্রহের বিষয়ে চুক্তিতে পৌঁছতে পারলো- তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। এছাড়া দাবি অনুযায়ী মাত্র ১১ জন কর্মী নিয়ে পরিচালিত সংস্থাটির এত দ্রুত ডাটা পাওয়া ও প্রসেস করা নিয়েও সন্দেহ দেখা দিয়েছে।

গত সপ্তাহে ২০০ জনের বেশি বিজ্ঞানীর স্বাক্ষর সম্বলিত একটি চিঠিতে হাসপাতালগুলো থেকে সংগ্রহ করা রোগীদের ডাটা এবং বিশ্লেষণের পদ্ধতির তালিকায় অসঙ্গতি ও অনিয়ম উদ্ধৃত করে সে বিষয়ে স্বচ্ছ ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছিল। এর প্রতিক্রিয়ায় সার্জিস্ফেয়ার তাদের ক্লায়েন্ট ও গোপনীয়তা চুক্তির দোহাই সম্পূর্ণ ডাটাসেট এবং অন্যান্য তথ্য দিতে অস্বীকার করে। পরে গত বৃহস্পতিবার ল্যানসেট থেকে গবেষণা প্রতিবেদন প্রত্যাহার করেন গবেষণাটির তিনজন লেখক মন্দ্বীপ মেহরা, ফ্রাঙ্ক রুশিৎজকা এবং অমিত পাতিল। কারণ হিসেবে তারা বলেন, গবেষণাটির উপাত্ত সরবরাহকারী সংস্থা সার্জিস্ফেয়ার প্রাথমিক তথ্য উৎসগুলোর সত্যতার পক্ষে কোনো প্রমাণ দিতে পারেনি।

তবে গবেষণাটির চতুর্থ লেখক সার্জিস্ফেয়ারের প্রধান নির্বাহী ডা. স্বপন দেশাই এ প্রতিবেদন প্রত্যাহার নিয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। নিউ ইংল্যান্ড জার্নাল অব মেডিসিনে প্রকাশিত এ সংক্রান্ত গবেষণারও সহ-লেখক তিনি।

গবেষণা প্রতিবেদন প্রত্যাহারের আগে দেশাই তার এক যুগ পুরনো প্রতিষ্ঠানের পক্ষেই কথা বলেন। তিনি ব্লমবার্গকে বলেন, আমরা তথ্য প্রক্রিয়া করতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং মেশিন লার্নিংয়ের ওপর নির্ভর করেছি। এ কাজ সম্ভব করতে এটাই একমাত্র উপায়।

তিনি বলেন, এ ডাটাবেজের প্রকৃতি বোঝা গুরুত্বপূর্ণ। আমরা উৎস সম্পর্কিত তথ্যের জন্য দায়বদ্ধ নই। এ ধরনের ডাটা ইলেকট্রনিক হেলথ রেকর্ড থেকে সংগ্রহে...কঠোর পরিশ্রমের দরকার হয়, এরপর এটা আমাদের ডাটা ডিকশনারির প্রয়োজনীয় ফরম্যাটে রূপান্তর করা হয় এবং স্বাস্থ্যসেবা অংশীজনদের মাধ্যমে সম্পূর্ণরূপে ডাটা ডি-আইডেন্টিফাইং করা হয়। 

শিকাগোর পশ্চিমে একটি আবাসিক বাড়িতে সার্জিস্ফেয়ারের সদরদপ্তর। প্রতিষ্ঠানটির দুইটি শাখা রয়েছে, যেখানে একটিতে ডাটা সংগ্রহ এবং অন্যটিতে মেশিন লার্নিং সফটওয়্যারের কাজ করা হয়।

দেশাইয়ের লিঙ্কডইন প্রোফাইল অনুসারে, ডিউক ইউনিভার্সিটির সার্জারি রেডিডেন্সির পর দেশাই অন্তত চারটি মেডিকেল সেন্টারে কাজ করেছেন। সবশেষ গত ফেব্রুয়ারিতে তিনি ইলিনয়ের নর্থ-ওয়েস্ট কমিউনিটি হাসপাতালের চিকিৎসকের চাকরি ছেড়ে দেন। কাগজপত্র অনুযায়ী দেশাই সার্জিস্ফেয়ারের একমাত্র মালিক। সংস্থাটির বোর্ড বা বৈজ্ঞানিক কমিটি রয়েছে কিনা সে বিষয়ে তিনি কোনো প্রশ্নের জবাব দেননি। 

দুই বছর আগে সার্জিস্ফেয়ারের প্রোগ্রাম তৈরিতে খণ্ডকালীন কাজ করেছিলেন আইভো গেলভ। তিনি বলেন, বিভিন্ন দেশের মেডিকেল ডাটাতে তাদের প্রবেশাধিকার সম্পর্কে কোনো ধারণা নেই। 

বিজ্ঞানীরা ল্যানসেটের গবেষণায় ব্যবহৃত ইলেকট্রনিক পেশেন্ট রেকর্ড থেকে পাওয়া আফ্রিকার উচ্চ সংখ্যক ডাটাকে অবাস্তব হিসেবে অভিহিত করেছেন। এছাড়া রোগীর তথ্য সুরক্ষার ব্যাপারে এতো কঠোর ইউরোপ, সেখানকার রোগীদের তথ্য সার্জিস্ফেয়ারের হাতে যাওয়ার ব্যাপারেও সন্দেহ প্রকাশ করেছেন বিজ্ঞানীরা। 

এ বিষয়ে দেশাই বলেন, মহামারীর শুরুতে সরকারিভাবে আক্রান্তদের সংখ্যা কম দেখানো হয়ে থাকতে পারে, ফলে আমরা যখন হাসপাতাল পর্যায়ে কভিড-১৯ আক্রান্তদের সত্যিকার পরিসংখ্যান সংগ্রহ করেছি, তখন দেখতে পেয়েছি সেটা সরকারি সংখ্যার চেয়ে বেশি। এটা ডাটার আসল উৎস।

তবুও সার্জিস্ফেয়ারের ডাটাগুলো অত্যন্ত অস্বাভাবিক ছিল। একাধিক মহাদেশজুড়ে গোপনীয়তা আইনের অধীনে ইলেকট্রনিক মেডিকেল রেকর্ড সিস্টেম ব্যবহার করে শত শত বেনামি হাসপাতালের তথ্য দ্রুত সংগ্রহের দাবি করেছে সংস্থাটি। আরো আশ্চর্যের বিষয় হলো, বিপুল পরিমাণ  ডাটা সংগ্রহ, সংকলনের দাবি করলেও প্রতিষ্ঠানটিতে তালিকাভুক্ত কোনো বায়ো-স্ট্যাটিস্টিশিয়ান নেই।

আরো সাধারণভাবে বললে, চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা যখন এ ধরনের গবেষণা করেন, তারা সরকারি ডাটার ওপর নির্ভর করেন। কিন্তু সার্জিস্ফেয়ার বলছে, কভিড-১৯ আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের খুব নির্দিষ্ট একটি দলের ইলেকট্রনিং হেলথ রেকর্ডের নথি থেকে তাদের তথ্যগুলো এসেছে। কোন চিকিৎসা সেবা সংস্থা বা প্রতিষ্ঠান থেকে ডাটা পেয়েছে, তাদের নাম সরবরাহ করেনি সার্জিস্ফেয়ার। 

১ মে নিউ ইংল্যান্ড জার্নাল অব মেডিসিনে প্রকাশিত সমীক্ষাটিও প্রত্যহার করা হয়েছে। জার্নালটি দাবি করেছিল, ফ্রান্সের পাঁচটি হাসপাতাল থেকে ত্বকের বর্ণের ভিত্তিতে জাতিগত তথ্যসহ ১০৭ জন রোগীর তথ্য রয়েছে। যদিও ফ্রান্সে এ জাতীয় তথ্য সংগ্রহ করা বেআইনি। এছাড়া দেশটিতে হাসপাতাল ও রোগীর ডাটা বিক্রি কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত এবং গোপনীয়তা পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা সিএনআইএল থেকে অনুমোদন নেয়ার প্রয়োজন হয়।

সিএনআইএল ব্লমবার্গকে জানিয়েছে, সার্জিস্ফেয়ারের কাছ থেকে এ ধরনের কোনো অনুরোধ আসেনি। এ বিষয়ে ফরাসি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ও তাৎক্ষণিকভাবে ই-মেইলের জবাব দেয়নি। 

সার্জিস্ফেয়ারের ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, অস্ত্রোপচার পরবর্তী জটিলতা এবং উচ্চ সংক্রমণ হার বিষয়ে ডাটাভিত্তিক সমাধান খুঁজতে সংস্থাটি স্কটল্যান্ডের ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিসের (এনএইচএস) সঙ্গে কাজ করেছে। যদিও এএইচএস এমন কোনো সম্পর্ক থাকার বিষয়টি অস্বীকার করেছে। এনএইচএস বলেছে, তাদের ডাটায় সার্জিস্ফেয়ারের প্রবেশাধিকার থাকার প্রশ্নই আসে না।

ব্লুমবার্গ অবলম্বনে শিহাবুল ইসলাম

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন