মঙ্গলবার | জুলাই ১৪, ২০২০ | ৩০ আষাঢ় ১৪২৭

দেশের খবর

নভেল করোনাভাইরাস

চট্টগ্রামে সাধারণ ওষুধ বিক্রি হচ্ছে অস্বাভাবিক দামে

ওমর ফারুক, চট্টগ্রাম ব্যুরো

দেশে নভেল করোনাভাইরাসে আক্রান্তের সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলছে। কারণে বাজারে ঠাণ্ডাজনিত রোগ জ্বর, সর্দি, গলাব্যথা, কাশির ওষুধের চাহিদা বেড়ে গেছে। চট্টগ্রামের ওষুধের পাইকারি বাজার হিসেবে পরিচিত হাজারী গলিসহ বিভিন্ন স্থানে সাধারণ হিসেবে পরিচিত এসব ওষুধ পাওয়া যাচ্ছে না। কোথাও কোথাও ওষুধ মিললেও দাম রাখা হচ্ছে কয়েক গুণ বেশি।

সরেজমিন হাজারী গলিতে গিয়ে দেখা যায়, অনেকে বিভিন্ন দোকানে জ্বর, সর্দি ঠাণ্ডাজনিত রোগের ওষুধের খোঁজ করছেন। কিন্তু বেশির ভাগ দোকানে এসব ওষুধের সরবরাহ নেই বলে জানিয়ে ক্রেতাদের ফিরিয়ে দেয়া হচ্ছে। বিশেষ করে প্যারাসিটামল, অ্যান্টিবায়োটিক, অ্যান্টিহিস্টামিন, আইভারমেকটিন, অ্যান্টিম্যালেরিয়া ভিটামিন সি-জাতীয় ওষুধের সংকট দেখা দিয়েছে বেশি।

যেসব দোকানে ঠাণ্ডাজনিত রোগের ওষুধ মিলছে সেখানে দাম রাখা হচ্ছে সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য থেকে দু-তিন গুণ বেশি। যেমন প্যারাসিটামল গ্রুপের ৬৬৫ মিলিগ্রামের এক পাতা ট্যাবলেটের সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য ১৫ টাকা হলেও বর্তমানে ৪০ টাকা, অ্যাজিথ্রোমাইসিন গ্রুপের ৩৫০ টাকা দামের ৫০০ মিলিগ্রামের ক্যাপসুল ৭০০-৮০০ টাকা ডক্সিসাইক্লিন গ্রুপের ১০০ মিলিগ্রামের ২২ টাকা দামের প্রতি পাতা ক্যাপসুল ৮০-১০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। করোনা প্রতিরোধে কার্যকর এমন প্রচারের পর ১৫০ টাকা দামের আইভারমেকটিন গ্রুপের মিলিগ্রামের প্রতি পাতা ট্যাবলেট ৪০০-৫০০ টাকা ৩০০ টাকা দামের ১২ মিলিগ্রামের প্রতি পাতা ট্যাবলেট ৭০০-৮০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া ভিটামিন সি গ্রুপের ২০ টাকার প্রতি পাতা ট্যাবলেট ৩০-৪০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

ঠাণ্ডাজনিত রোগের ওষুধের পাশাপাশি কয়েক গুণ বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে জীবাণুনাশক হ্যান্ড স্যানিটাইজার। হাজারী গলির বেশির ভাগ দোকানে এসব জীবাণুনাশক পাওয়া যাচ্ছে না। তবে দোকানের সামনে ছোট ছোট টুকরি নিয়ে কয়েক গুণ বেশি দামে বিক্রি করা হচ্ছে বিভিন্ন কোম্পানির জীবাণুনাশক, হ্যান্ড স্যানিটাইজার, মাস্ক গ্লাভস। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের (চমেক) সামনে কিছু দোকানে এসব পণ্য বেশি দামে বিক্রি করতে দেখা গেছে।

বাড়তি দাম নেয়ার বিষয়ে স্যাভলন ব্র্যান্ডের জীবাণুনাশকের বিপণনকারী প্রতিষ্ঠান এসিআই লিমিটেডের জোনাল ম্যানেজার মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম বলেন, করোনা পরিস্থিতিতে স্যাভলনসহ প্রয়োজনীয় কোনো ওষুধের দাম বাড়ায়নি কোম্পানি। এর পরও বিভিন্ন ফার্মেসিতে সর্বোচ্চ মূল্যের চেয়ে বাড়তি দামে ওষুধ বিক্রির অভিযোগ আমরা শুনেছি। কোম্পানি না বাড়ালেও ফার্মেসিগুলোয় বাড়তি দামে ওষুধ বিক্রি ঠেকাতে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের পদক্ষেপ নেয়া উচিত।

ফার্মেসি মালিকদের অভিযোগ, চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়া এসব ওষুধ প্রস্তুতকারী বিপণনকারী কোম্পানি থেকে সরাসরি ফার্মেসি পর্যায়ে সরবরাহ কমিয়ে দেয়া হয়েছে। কিন্তু কালোবাজারে বেশি দামে এসব ওষুধ বেচাকেনা হচ্ছে।

হাজারী গলির মেসার্স আল রাজী ফার্মাসির স্বত্বাধিকারী মো. নুরুল আবছার বলেন, বাজারে ঠাণ্ডাজনিত বেশ কয়েকটি ওষুধের সংকট রয়েছে। যেহেতু কালোবাজার থেকে বেশি দামে এসব ওষুধ কিনে আবার বাড়তি দামে বিক্রি করতে হয়। তাই আমরা এসব ওষুধ রাখছি না।

চমেকের পূর্ব গেটের একজন ফার্মেসি মালিক জানান, তাদেরও বাড়তি দামে কিনতে হচ্ছে। ফলে বিক্রি করতে হচ্ছে বেশি দামে।

বিষয়ে বাংলাদেশ কেমিস্ট অ্যান্ড ড্রাগিস্ট সমিতির চট্টগ্রাম জেলা সমিতির সাধারণ সম্পাদক লায়ন আশীষ ভট্টাচার্য বলেন, কয়েক সপ্তাহ ধরে শহরের বেশির ভাগ ফার্মেসিতে জ্বর, কাশি, সর্দি, গলাব্যথা শ্বাসকষ্টের ওষুধ সংকট। খুচরা বাজারে যে অর্ডার সে অনুপাতে কোম্পানি দিতে পারছে না। তবে সরবরাহ সংকটের কারণে বাড়তি দাম রাখার অভিযোগ সত্য নয়। কারণ বাইরে যারা বিক্রি করছেন তারা ভাসমান বিক্রেতা। এদের দৌরাত্ম্য বন্ধের জন্য আমরা প্রশাসনের কাছে লিখিত অভিযোগ করেছি। ক্রেতাদের কাছে অনুরোধ করব, রাস্তা থেকে এসব ওষুধ পণ্য না কেনার জন্য। দোকান থেকে কিনে অবশ্যই রসিদ নেবেন। যাতে বেশি দাম কেউ নিলে আমরা ব্যবস্থা নিতে পারি।

কনজিউমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)-এর চট্টগ্রাম বিভাগীয় সভাপতি এসএম নাজের হোসাইন বলেন, যখনই খবর ছড়িয়ে পড়ল করোনা প্রতিরোধে আইভারমেকটিন ডক্সিসাইক্লিন কার্যকর, তখনই স্যাভলন, ডেটল হ্যান্ড স্যানিটাইজারের মতো এসব ওষুধ গায়েব হয়ে গেছে।  ব্যবসায়ীরা যে যেভাবে পারছে সেভাবে দাম নিচ্ছে। করোনার এই পরিস্থিতিতে প্রয়োজনীয় এসব ওষুধের দাম নিয়ন্ত্রণ রাখতে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের কঠোর নজরদারি প্রয়োজন।

ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর চট্টগ্রামের সহকারী পরিচালক হোসাইন মোহাম্মদ ইমরান বলেন, ইভেরা স্ক্যাভো এগুলো করোনার ওষুধ নয়। এগুলো কৃমির ওষুধ হিসেবে ব্যবহূত হতো। সরকার এখনো এসব ওষুধের বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেনি। এসব ওষুধের যদি ডিমান্ড থাকে, তাহলে সরকার এমনিতে বানাবে। একটা রিউমার ছড়িয়ে পড়েছে। যেকোনো ওষুধ বাড়তি দামে বিক্রির অভিযোগ পেলে আমরা ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে ব্যবস্থা নেব। তাছাড়া আগে থেকেই সরকারি নির্দেশনা রয়েছে কোম্পানিগুলো যেন সরাসরি রিটেইলারের কাছে ওষুধ বিক্রি করে।

জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মুহাম্মদ হাসানুজ্জামান বলেন, বাড়তি দামে ওষুধ বিক্রির অনেক অভিযোগ এসেছে। স্যাভলন, ডেটল, স্ক্যাভো-, ইভেরা-১২ ইত্যাদি নিয়ে অভিযোগ প্রচুর। এছাড়া দোকানে ওষুধ বিক্রি না করে রাস্তা ফুটপাতে একজনকে বসিয়ে দিয়ে বিক্রি করা হচ্ছে সেটাও লক্ষ করেছি। দু-একদিনের মধ্যে এসব বন্ধে অভিযান পরিচালনা করা হবে।

চট্টগ্রাম মা শিশু হাসপাতালের মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. রজত শংকর রায় বিশ্বাস বলেন, স্ক্যাভো- ইভেরা-১২ (আইভারমেকটিন গ্রুপ) ডক্সিসাইক্লিন এসব ওষুধ এখন মানুষ বেশি কিনছে। অনেকে কিনে স্টকে রেখেছেন। অনেকে খেয়েছেন। কিন্তু এসব ওষুধের কোনোটিই করোনাভাইরাস প্রতিরোধ করে এটা শতভাগ এখনো নিশ্চিত নয়। তবে গবেষণা চলছে। স্ক্যাভো- ইভেরা-১২ মূলত কৃমিনাশক ওষুধ। ওষুধ নিজের মতো কিনে না খেয়ে রেজিস্ট্রার্ড চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে সেবনের পরামর্শ দেন তিনি।

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন