মঙ্গলবার | জুলাই ১৪, ২০২০ | ৩০ আষাঢ় ১৪২৭

প্রথম পাতা

দেশে কভিড-১৯-এর প্রভাব

পোশাক খাতের চেয়ে কৃষিতে ক্ষতি বেশি

সাইদ শাহীন

নভেল করোনাভাইরাসের প্রভাবে দেশের রফতানিমুখী শিল্পে সবচেয়ে বড় ক্ষতির শিকার তৈরি পোশাক শিল্প, এমনটাই দাবি পোশাক শিল্প মালিকদের। বিজিএমইএর দেয়া তথ্যমতে, চলতি বছরের মার্চ থেকে মে তিন মাসে গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৪৪৮ কোটি ডলারের পোশাক রফতানি কম হয়েছে। প্রতি ডলারের বিনিময়মূল্য ৮৫ টাকা ধরলে তিন মাসে ৩৮ হাজার কোটি টাকার ব্যবসা হারিয়েছে পোশাক খাত। করোনায় তৈরি পোশাকসহ শিল্প খাতের ক্ষতির বিষয়টি নিয়ে বেশ আলোচনা থাকলেও এক্ষেত্রে অনেকটা অনালোচিতই থেকে গেছে দেশের কৃষি খাত। যদিও ব্র্যাকের এক গবেষণা বলছে, কভিড-১৯-এর প্রভাবে দেড় মাসে কৃষকের ক্ষতি হয়েছে ৫৬ হাজার কোটি টাকারও বেশি।

বিশ্লেষকরা বলছেন, কৃষি খাতের প্রত্যক্ষ ক্ষতির পাশাপাশি পরোক্ষ ক্ষতিও রয়েছে। কৃষকের ক্ষতির কারণে কোনো শস্যের আবাদ বা উৎপাদন কমে গেলে সেটি আমদানির মাধ্যমে পূরণ করতে হবে। ফলে দেশের বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় বেড়ে যাবে। আবার উপকরণের সুযোগ ব্যয়ও রয়েছে, যে কারণে রাষ্ট্রীয় অর্থের বড় ধরনের ব্যয় হয়।

নভেল করোনাভাইরাস সংক্রমণের পর গত ২৬ মার্চ থেকে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হলে বন্ধ হয়ে যায় গণপরিবহন চলাচল। অঘোষিত এই লকডাউনে ভেঙে পড়ে কৃষিপণ্যের বিপণন। বিক্রি না হওয়ায় ক্ষেতে পড়ে থাকে সবজি, পুকুরে মাছ খামারে মুরগি দুধ। যেসব কৃষক কোনো রকমে বিক্রি করতে পেরেছেন, তারাও পাননি ন্যায্য দাম।

অন্যদিকে চলতি বছরের শুরু থেকেই পোশাক রফতানির পরিস্থিতি টালমাটাল ছিল। ক্রেতারা ক্রয়াদেশ কমিয়ে দিচ্ছিলেন। তাদের বিক্রয়কেন্দ্রগুলো একের পর এক বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ক্রয়াদেশ প্রাপ্তির পরিমাণও ছিল তুলনামূলক কম। ক্রয়াদেশ যতটুকু দেয়া হচ্ছিল, সেগুলোর দামও পাওয়া যাচ্ছিল কম। প্রবণতা ইউরোপের বাজারগুলোতেই তুলনামূলক বেশি। আবার এসব বাজারের ভোক্তা আচরণেও বেশ পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে এখন। অবস্থায় দেশের তৈরি পোশাক খাতের ওপর বড় ধরনের আঘাত হয়ে প্রাদুর্ভাব ঘটেছে কভিড-১৯-এর।

কভিড- ১৯ বৈশ্বিক ব্যবসার চেহারা পাল্টে দিয়েছে। প্রেক্ষাপটে বর্তমানে বাংলাদেশের পোশাক খাতের বাস্তবতা বেশ নাজুক। মে মাসে পোশাক রফতানি কমেছে ৬২ শতাংশ। এপ্রিলে কমেছিল ৮৪ শতাংশ। মার্চ থেকে মে এই তিন মাসে বিলিয়ন ডলারের রফতানি কমেছে।

বিজিএমইএর তথ্য বলছে, গত এপ্রিলের শেষ পর্যন্ত হাজার ১৫০ কারখানার মোট ৩১৮ কোটি ডলারের ক্রয়াদেশ বাতিল স্থগিত হয়েছে। এসব ক্রয়াদেশের আওতায় ছিল ৯৮ কোটি ২০ লাখ পিস পোশাক। অন্যদিকে এসব কারখানার কর্মরত শ্রমিকের সংখ্যা ২২ লাখ ৮০ হাজার।

এদিকে ব্র্যাকের গবেষণার তথ্য বলছে, কভিড-১৯ সৃষ্ট মহামারীর প্রভাবে দেড় মাসে শস্য খাতে প্রায় ১৫ হাজার এবং মত্স্য খাতে ৩৯ হাজার কোটি টাকা ক্ষতি হয়েছে। এতে গড়ে প্রতিজন কৃষকের লোকসান হয়েছে প্রায় লাখ হাজার টাকা। গতকাল বিকালে এক ডিজিটাল সংবাদ সম্মেলনে গবেষণার আওতায় করা দুটি সমীক্ষার ফলাফল তুলে ধরে ব্র্যাক।

কৃষি খাতে এবং সামগ্রিক খাদ্যনিরাপত্তার ওপর কভিড-১৯-এর প্রভাব সম্পর্কে জানতে উৎপাদন সরবরাহ ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের মতামতের ভিত্তিতে এই সমীক্ষা দুটি পরিচালিত হয়। সারা দেশের হাজার ৫৮১ জন কৃষক (ফসল, শাকসবজি, হাঁস-মুরগি, মাছ দুগ্ধ উৎপাদনকারী) এতে অংশগ্রহণ করেন। মার্চের শেষ সপ্তাহ থেকে মে মাসের প্রথম দিক পর্যন্ত ক্ষতির হিসাব উঠে এসেছে গবেষণায়।

এতে দেখা যায়, মহামারী শুরুর দিকে ত্রাণ বিতরণকারী সংস্থাগুলোর ব্যাপক চাহিদা এবং ভোক্তাদের আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পণ্য কেনার কারণে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য, বিশেষ করে মোটা চাল, মসুরের ডাল ইত্যাদির দাম বিক্রি বেড়ে যায়। চাল মসুরের ডালের দাম ৩০ থেকে ৩২ শতাংশ এবং ব্যবসায়ীদের এই পণ্যগুলোর বিক্রি ৩০০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়। বাজারে চাহিদা বাড়লেও তা কৃষকদের কোনো উপকারে আসেনি। কারণ মহামারীর আগেই তারা তাদের মজুদ বিক্রি করে দিয়েছিলেন।  

অন্যদিকে ত্রাণবহির্ভূত পচনশীল পণ্যগুলোর উৎপাদন অব্যাহত রাখা এবং বিক্রি করা কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। কারণে ৮৮ শতাংশ কৃষক (মাছচাষীদের ১০০) আর্থিক ক্ষতির কথা জানিয়েছেন। কৃষকরা যেসব সমস্যার কথা বলেছেন তার মধ্যে সবার আগে উল্লেখযোগ্য হলো পণ্যের ন্যায্যমূল্য না পাওয়া। প্রায় ৬৬ শতাংশ কৃষকই পণ্যের ন্যায্যমূল্য পাননি। সীমিত সময়ের জন্য বাজার খোলা থাকার কারণেও ক্ষতি হচ্ছে, এমন কৃষকের সংখ্যা ৫২ শতাংশ। উৎপাদনের উপকরণের উচ্চমূল্য, এমন দাবি করেছেন ৪৫ শতাংশ এবং শ্রমিক সংকটের কথা বলেছেন ২৮ শতাংশ কৃষক।

এই দেড় মাসে পণ্যের ক্ষতি কম দামের কারণে প্রত্যক কৃষকের লোকসান হয়েছে গড়ে প্রায় লাখ হাজার ৯৭৬ টাকা। সেই হিসাবে সারা দেশে কৃষির প্রতিটি উপখাতের সব কৃষকের সংখ্যার ওপর ভিত্তি করে লোকসান দেখানো হয়েছে ৫৬ হাজার ৫৩৬ কোটি ৬৮ লাখ টাকা। এর মধ্যে শস্য খাতে ১৫ হাজার ২৫০ কোটি টাকা, মত্স্য খাতে ৩৮ হাজার ৯৪১ কোটি টাকা, পোলট্রি খাতে হাজার ৭৬৯ কোটি এবং প্রাণিসম্পদ খাতে প্রায় ৫৮৫ কোটি টাকা ক্ষতি হয়েছে কৃষকের।

গতকাল ব্র্যাকের গবেষণার ফল প্রকাশ অনুষ্ঠানে প্যানেল আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য পরিকল্পনা কমিশনের সাবেক সদস্য ইমেরিটাস অধ্যাপক . এমএ সাত্তার মন্ডল, প্রাণ গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইলিয়াস মৃধা, এসিআই এগ্রিবিজনেসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রধান নির্বাহী পরিচালক . ফা আনসারী ব্র্যাকের ডেইরি অ্যান্ড ফুড এন্টারপ্রাইজের পরিচালক মোহাম্মদ আনিসুর রহমান। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন ব্র্যাকের অ্যাডভোকেসি ফর সোস্যাল চেঞ্জ কর্মসূচির  ঊর্ধ্বতন পরিচালক কেএএম মোর্শেদ।

বক্তারা বলেন, দেশের যেসব এলাকায় করোনার আক্রমণ কম, সেসব এলাকায় কৃষকদের স্বাভাবিক কার্যক্রম চালাতে সহায়তা করতে হবে। মহামারী শুরুর পর ব্যাপক হারে চাহিদা কমে গেছে। কৃষকরা কৃষিকাজ ছেড়ে দিলে বা কমিয়ে ফেললে দেশের খাদ্যনিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়বে। পদ্ধতিগত বাধাগুলো কমিয়ে ঋণ বিতরণ ব্যবস্থাকে কৃষকবান্ধব করার সুপারিশ করা হয়েছে।

. ফা আনসারী বলেন, আগামী বছরের বাজেটে কৃষি খাতের জন্য ব্যতিক্রমী উদ্যোগ প্রয়োজন। বরাদ্দ প্রদানের ক্ষেত্রে যান্ত্রিকীকরণ সম্প্রসারণকর্মীদের বিশেষ বরাদ্দ দিতে হবে। বিশেষ করে কৃষকের সঙ্গে ডিজিটাল মাধ্যমে সব ধরনের সরকারি বেসরকারি সম্প্রসারণকর্মীদের দক্ষতা বাড়াতে বাজেটে এক হাজার কোটি টাকা রাখতে হবে। কৃষিজাত পণ্য প্রক্রিয়াকরণের প্রযুক্তিকে গুরুত্ব দিতে হবে।

অনুষ্ঠানে জানানো হয়, তথ্য প্রদানকারী কৃষকদের ৪২ শতাংশ কৃষক জানিয়েছেন, সংকট মোকাবেলার কোনো উপায় তাদের ছিল না। খাদ্যশস্য সবজি উৎপাদনকারী ৬০ শতাংশ কৃষক বলেছেন যে তাদের সম্পূর্ণ লোকসানই মেনে নিতে হয়েছে। মোট কৃষকের ১১ শতাংশ এবং পোলট্রি কৃষকের মধ্যে ১৭ শতাংশ তাদের উৎপাদন কমিয়েছিলেন। উৎপাদন বন্ধ করে দিয়েছেন শতাংশ খামারি।

মুরগির দাম শুরুতে কমে গেছে প্রায় ৪৪ শতাংশ। চাহিদা কমার কারণে পোলট্রি খামারিরা উৎপাদনও কমিয়ে দেন। এতে সরবরাহের ঘাটতি দেখা দেয়ার কারণে পরে দাম বৃদ্ধি পেয়েছে। দুগ্ধ উৎপাদনকারী কৃষকের পণ্যের চাহিদা ৩৩-৬০ শতাংশ হ্রাস পায় এবং খুচরা স্তরে (কৃষক পর্যায়ে ২২ শতাংশ) গড়ে দাম ১২. শতাংশ কমে যায়। দুগ্ধ উৎপাদনকারী কৃষকদের ১৬ শতাংশ তাদের উৎপাদন কমিয়ে দেন।  

৬৯ শতাংশ মাছচাষী সামনের দিনে বেঁচে থাকার জন্য ঋণের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন। ১৪ শতাংশ তাদের বিকল্প আয়ের উেসর ওপর নির্ভর করার কথা বলেছেন, ১৮ শতাংশ তাদের সঞ্চয় ভেঙে বা সম্পদ বিক্রি করে চলার কথা বলেছেন। আর ১৮ শতাংশ জানিয়েছেন তাদের কোনো পরিকল্পনা নেই। শতাংশ বলেছেন, উৎপাদনে না ফিরতে পারলে তারা পেশাই বদলে ফেলবেন।

৬৬ শতাংশ কৃষক সহজ শর্তে ঋণ পেতে চান। ৫৬ শতাংশ কৃষক উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য দাম চার। কম খরচে উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় উপকরণ চান ৪৮ শতাংশ কৃষক। সমীক্ষায় অন্তর্ভুক্ত ৬৪ শতাংশ কৃষক সরকারের ঘোষিত প্রণোদনা সম্পর্কে জানেন। তবে এই সুবিধা কীভাবে পাওয়া যায় সে সম্পর্কে ৭৯ শতাংশ কৃষকের কোনো ধারণা নেই বা ভুল ধারণা আছে। ব্যাংক থেকে আনুষ্ঠানিক ঋণ নেয়ার অভিজ্ঞতা রয়েছে মাত্র ২০ শতাংশ কৃষকের।

প্রণোদনার বিষয়ে . এমএ সাত্তার মন্ডল বলেন, এটি করোনার মতো সংক্রামক হয়ে গেছে। প্রয়োজন না থাকলেও চেয়ে বসছি। কৃষি উৎপাদনে বিপণন ব্যবস্থায় জোর দিতে হবে। সেখানে সব ধরনের মধ্যস্বত্বভোগীদের বিশেষ করে আড়তদার, পাইকার, ফড়িয়াদের গুরুত্ব দিতে হবে, সবাইকে কাজে লাগাতে হবে।

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন