বৃহস্পতিবার | আগস্ট ১৩, ২০২০ | ২৯ শ্রাবণ ১৪২৭

প্রথম পাতা

দেশে পতিত জমি ১১ কোটি শতক

সাইদ শাহীন

কভিড-১৯-এর কারণে সামনের দিনে ভেঙে পড়তে পারে বৈশ্বিক খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থা। কোনো কোনো অঞ্চলে দুর্ভিক্ষ দেখা দিতে পারে, এমন আভাসও দিচ্ছে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থা। বিদ্যমান পরিস্থিতিতে বাংলাদেশে এক ইঞ্চি জমিও যাতে অনাবাদি পড়ে না থাকে, সে নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। এক্ষেত্রে নতুন সম্ভাবনার পথ দেখাতে পারে ১১ কোটি শতক পতিত জমি, যা মোট জমির প্রায় ৫ শতাংশ।

 

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) গত বছর প্রকাশিত ‘রিপোর্ট অন এগ্রিকালচার অ্যান্ড রুরাল স্ট্যাটিসটিকস ২০১৮’শীর্ষক প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, দেশে মোট ব্যবহূত জমির পরিমাণ ২২৬ কোটি ৫১ লাখ ৭৪ হাজার শতক। পরিবারপ্রতি জমির পরিমাণ প্রায় ৮২ শতক। এসব জমির মধ্যে বসতবাড়ি, পুকুর, স্থায়ী ফসলি জমি, অস্থায়ী ফসলি জমির পাশাপাশি পতিত জমিও রয়েছে। এর মধ্যে পতিত জমি রয়েছে দুই ধরনের—অস্থায়ী পতিত এবং স্থায়ী পতিত জমি, যার পরিমাণ প্রায় ১০ কোটি ৮৫ লাখ ১৫ হাজার শতক।

 

অস্থায়ী পতিত জমি বলতে বোঝায় যেসব জমিতে চলতি বছরে আবাদ বা কোনো ধরনের শস্য উৎপাদন হয়নি কিন্তু তার আগের বছরে জমিটিতে আবাদ হয়েছে। এমন জমির পরিমাণ প্রায় ১ কোটি ৫৩ লাখ ৫৫ হাজার শতক। পরিবারপ্রতি এ ধরনের জমি রয়েছে গড়ে প্রায় এক শতক। অন্যদিকে কখনই কোনো ধরনের আবাদ ও শস্য উৎপাদন হয়নি এমন জমিকে বলা হয় স্থায়ী পতিত জমি, দেশে যার পরিমাণ প্রায় ৯ কোটি ৩১ লাখ ৫৯ হাজার শতক। পরিবারপ্রতি এ ধরনের পতিত জমি রয়েছে গড়ে প্রায় তিন শতক।

 

বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) মহাপরিচালক ড. কেএএস মুরশিদ বণিক বার্তাকে বলেন, খাদ্য ও পুষ্টিনিরাপত্তায় জমিগুলোকে কাজে লাগানো যায়। এখন প্রয়োজন কৌশল নির্ধারণ করা। সেটি করতে হলে আগে জমি পতিত থাকার কারণগুলো জানতে হবে। সেটা কি মালিকানা নাকি অনুৎপাদনশীলতার কারণে পতিত রয়েছে, সে বিষয়ে বিশ্লেষণ করে পদক্ষেপ নিতে হবে। সেখানে বিনিয়োগ ও প্রযুক্তির প্রয়োজন হলে সেটি দিতে হবে। ক্রপিং প্যাটার্ন পরিবর্তনের কিংবা প্রশিক্ষণের প্রয়োজন হলে, সেটিও দিতে হবে। জমি পতিত থাকার পেছনে বিপণন ব্যর্থতা আছে কিনা, সেটি পর্যবেক্ষণ করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে। তাহলেই জমিগুলোকে উৎপাদনশীল রাখা সম্ভব হবে।

 

চলমান করোনা পরিস্থিতিতে সামনের দিনে খাদ্য সংকট মোকাবেলার পাশাপাশি দেশকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ রাখতে প্রতি ইঞ্চি জমিকে কাজে লাগানোর নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সেই নির্দেশের আলোকে কৃষি মন্ত্রণালয় থেকে উদ্যোগ নেয়া শুরু করেছে। এরই মধ্যে বসতবাড়িতে সবজি আবাদে প্রণোদনা দেয়া শুরু হয়েছে। প্রতিটি গ্রামের কয়েকটি পরিবার বা খানাকে সবজি উৎপাদনের মডেল বসতি তৈরি করে দেয়া হবে। আগ্রহীদের বীজ সহায়তা থেকে শুরু করে সার এমনকি বেড়াও তৈরি করে দেয়া হবে। পতিত জমিকে আবাদি জমিতে রূপান্তরের কার্যক্রম শুরু হয়েছে।

 

কৃষিমন্ত্রী ড. মো. আব্দুর রাজ্জাক এ বিষয়ে বণিক বার্তাকে বলেন, কৃষি উৎপাদনের বর্তমান ধারা অব্যাহত রাখার পাশাপাশি সামনের দিনে তা আরো বৃদ্ধি করতে আমরা নিরলসভাবে কাজ করছি। কোনো জমি যাতে পতিত না থাকে এবং আবাদযোগ্য জমির সর্বোচ্চ ব্যবহার যাতে নিশ্চিত হয়, সেজন্য দক্ষতার সঙ্গে কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে। সবজি আবাদ সম্প্রসারণ করতে পারিবারিক সবজি বাগান নামে বিশেষ কর্মসূচি নেয়া হয়েছে। আউশ আবাদে প্রণোদনা দেয়া হচ্ছে। অস্থায়ী পতিত জমিতে আউশ আবাদ বাড়ানোর সুযোগ কাজে লাগানো হচ্ছে। এখানেও বড় ধরনের প্রণোদনা কার্যক্রম চলমান রয়েছে। প্রকৃতি সহায়ক হলে খাদ্য উৎপাদনের প্রবৃদ্ধির ধারা সামনের দিনে বেশ বেগবান হবে।

 

বিবিএসের তথ্যমতে, দেশে বসতবাড়ি রয়েছে ২১ কোটি ২৯ লাখ ৬৩ হাজার শতক। পরিবারপ্রতি বসতবাড়ি জমির পরিমাণ প্রায় আট শতক। অন্যদিকে মোট পুকুর রয়েছে ৫ কোটি ৫৪ লাখ ৮১ হাজার শতক। পরিবারপ্রতি পুকুরের জমির পরিমাণ প্রায় ২ শতক। স্থায়ী ফসল (যেমন ফল, বাগান) বা জীবত্কাল এক বছরের বেশি এমন ফসলের আবাদি জমির পরিমাণ ১২ কোটি ৩৪ লাখ ৩৮ হাজার শতক। অন্যদিকে অস্থায়ী ফসলি (জীবত্কাল এক বছরের নিচে এমন) জমির পরিমাণ ১৭৬ কোটি ৪৭ লাখ ৭৭ হাজার শতক। মূলত নিয়মিত যেসব কৃষিশস্য বা ফসল আবাদ করা হয় এমন জমিগুলোকেই অস্থায়ী ফসলি জমি বলা হয়। পরিবারপ্রতি এমন জমির পরিমাণ প্রায় ৬৪ শতক।

 

দেশে চাষযোগ্য ফসলি জমি এখন প্রায় ১৭৮ কোটি ১ লাখ ৩৩ হাজার শতক। ফলে পরিবারপ্রতি ফসলি জমির পরিমাণ প্রায় ৬৫ শতক। এর মধ্যে এক ফসলি জমি এখনো ৫০ কোটি ৪৮ লাখ ৪৬ হাজার শতক। অন্যদিকে দোফসলি জমির পরিমাণ ১০৫ কোটি ৫৬ লাখ ১১ হাজার শতক। এছাড়া তিন ফসলি জমি রয়েছে ২০ কোটি ৬২ লাখ শতক এবং চার ফসলি জমি রয়েছে ১ কোটি ৩৪ লাখ ৭১ হাজার শতক। এক ফসলি জমিগুলোকে দোফসলি জমিতে রূপান্তর করা এবং দোফসলি জমিগুলোকে তিন ফসলি জমিতে রূপান্তর করতে পারলে শস্যের উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

 

বিশ্বব্যাপী নভেল করোনাভাইরাস হানা দেয়ার পর বিভিন্ন দেশ খাদ্যশস্য রফতানি বন্ধের ঘোষণা দিয়েছে। ফলে সামনের দিনে খাদ্যশস্য বিশেষ করে দানাদার খাদ্যের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সীমিত হয়ে পড়বে। এ অবস্থায় এখন এক ইঞ্চি জমিও পরিত্যক্ত রাখা মোটেও যৌক্তিক হবে না। সেজন্য পতিত জমিকে কাজে লাগাতে কৃষক থেকে শুরু করে সবাইকে উদ্বুদ্ধ করতে একটি সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। কেউ যদি তার নিজের জমি চাষ না করেন তবে তিনি অন্যকে বর্গা বা অন্য কোনো উপায় অবলম্বন করে জমিকে উৎপাদনশীল রাখতে পারেন। তা না হলে আইন অনুসারে পতিত জমিগুলোকে খাস করে আবাদের আওতায় আনতে পারে স্থানীয় প্রশাসন। 

 

কৃষি সচিব মো. নাসিরুজ্জামান এ প্রসঙ্গে বলেন, কেউ যদি দীর্ঘদিন কোনো জমি চাষাবাদ না করে পতিত রাখেন, তবে ১৯৫০ সালের রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইনে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের বিধান রয়েছে। তিন বছর পতিত রাখলে প্রজাস্বত্ব আইনে সেই জমিকে সরকার খাস হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করতে পারে। স্থানীয় প্রশাসন সেটা করতে পারে। সেটিতে আমরা এখনই যেতে চাই না। আবার কৃষিজমি কোনোভাবেই পড়ে থাকুক, সেটাও আমরা চাইব না। এজন্য কৃষকদের সরকারি প্রণোদনা কার্যক্রমের মাধ্যমে উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে। পাশাপাশি পর্যায়ক্রমে প্রয়োজনীয় ও সম্ভাবনাময় জমিগুলোকে এক ফসল থেকে দুই এবং দুই ফসল থেকে তিন ফসলে রূপান্তর করার জন্য শস্য জীবনচক্র কৃষকদের দেয়া হচ্ছে। একটি সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণের মাধ্যমে জমিগুলোকে সর্বোত্তম ব্যবহার করা হচ্ছে।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন