শুক্রবার | জুলাই ১০, ২০২০ | ২৫ আষাঢ় ১৪২৭

সম্পাদকীয়

পাবলিক পরীক্ষার ফলই যেখানে শিক্ষার মানদণ্ড

মাছুম বিল্লাহ

মাধ্যমিক ও সমমানের পাবলিক পরীক্ষা আমাদের শিক্ষার্থীদের জীবনে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। কারণ এই পরীক্ষার মাধ্যমেই তাদের জীবনের ভবিষ্যত কোনদিকে যাবে সেটি আমরা নির্ধারণ করা হয়। অর্থাৎ এটি শিক্ষার একটি বিশেষ মানদণ্ড। যদিও এটি নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে অনেক।

আগ্রহ ও উত্কণ্ঠার মধ্যে এবারকার এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার্থীরা তাদের ফল পাওয়ার অপেক্ষায় ছিল। সেই অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে ৩১ মে তাদের অনলাইনে তাদের ফল প্রকাশিত হয়েছে। মে মাসের প্রথম সপ্তাহে ফল প্রকাশের কথা থাকলেও করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের কারণে তা সম্ভব হয়নি। তারপরও বিশেষ ব্যবস্থায় ডাকযোগে ওএমআর শিট এনে মে মাসেই ফল প্রকাশের ব্যবস্থা  করেছে শিক্ষা বোর্ডগুলো। বিকল্প ব্যবস্থায় হলেও অবশেষে শিক্ষার্থীদের বহুল আকাঙ্খিত ফল তারা মে মাসের শেষ দিনেই জানতে পারল। ফলে, তারা এই করোনা পরিস্থিতির মধ্যে যে মানসিক চাপের মধ্যে ছিল তা থেকে রেহাই পেয়েছে, চাপ দূর হয়েছে অভিভাবকদেরও। এবার এসএসসি ও সমমানের  পরীক্ষা ১ ফেব্রুয়ারি শুরু হওযার কথা থাকলেও সরস্বতী পূজা ও ঢাকার দুই সিটির নির্বাচনের কারণে পিছিয়ে ৩ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হয়। ২৭ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত চলে তত্ত্বীয় পরীক্ষা। আর ২৯ ফেব্রুয়ারি শুরু হয়ে ৫ মার্চ শেষ হয় ব্যবহারিক পরীক্ষা। এ পরীক্ষা সারাদেশে দশটি বোর্ডের অধীনে ৩ হাজার ৫১২টি কেন্দ্রে মোট ২০ লাখ ২৮ হাজার ৮৮৪জন পরীক্ষায় অংশ নেয় এবার পরীক্ষা কেন্দ্রে কিংবা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কোন ফল পাঠানো হচেছনা। অতএব, কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে জমায়েত হয়ে শিক্ষার্থীরা যে বাঁধভাঙ্গা জোয়ারের মতো ঢোল বাদ্য বাজিয়ে শিক্ষকের সাথে আনন্দ ভাগাভাগি করে নেয়, সেই দৃশ্য ছিল অনুপস্থিত। গণভবন থেকে ভিডিও কনফাররেন্সের মাধ্যমে ফলাফল প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী। তারপর মোবাইল মেসেজ ও শিক্ষা বোর্ডগুলোর ওয়েবসাইটে এ ফলাফল তুলে ধরা হচ্ছে। ১৮ মে থেকে প্রাক-নিবন্ধন কার্যক্রম শুরু হয় যাতে শিক্ষাবোর্ডগুলো সহজে শিক্ষার্থীদের ফল জানাতে পারে। শিক্ষাবোর্ডগুলোকে এজন্য ধন্যবাদ পাওয়ার যোগ্য। 

২০২০ সালের এসএসসি পরীক্ষায় নয়টি সাধারণ বোর্ডে গড় পাস করেছে ৮৩ দশমিক ৭৫ শতাংশ শিক্ষার্থী। ২০১৯ সালের এই পাসের হার ছিল ৮২দশমিক ৮০ শতাংশ অর্থাৎ পাসের হার বেড়েছে। এবার ঢাকা বোর্ডে পাসের হার ৮২ দশমিক ৩৪ শতাংশ, যশোর বোর্ডে ৮৭ দশমিক ৩১ শতাংশ, কুমিল্লা ৮৫ দশমিক ২২, চট্টগ্রাম ৮৪ দশমিক ৭৫, সিলেট ৭৮ দশমিক ৭৯, দিনাজপুর ৮২দশমিক ৭৩ শতাংশ। ময়মনসিংহ বোর্ডে পাসের হার ৮০ দশমিক ১৩ শতাংশ, বরিশাল ৭৯ দশমিক ৭০ শতাংশ।

এবছর মোট জিপিএ-৫ পেয়েছে এক লাখ ৩৬ হাজার ৪৭ জন। গতবার জিপিএ-৫ পেয়েছিল এক লাখ ২৯ হাজার ৬৮৭ জন। জিপিএ-৫ পাওয়ার হারও বেড়েছে। রাজশাহী বোর্ডে পাসের হার ও জিপিএ-৫ এর সংখ্যা অন্যান্য বোর্ডের তুলনায় অনেক বেশি। এ বোর্ডে এবার পাসের হার ৯০.৩৭ শতাংশ আর জিপিএ-৫ পাওয়ার সংখ্যা ২৬হাজার ১৬৭জন। যশোর বোর্ডে জিপিএ-৫ পেয়েছে ১৩ হাজার ৭৬৪ জন, কুমিল্লা বোর্ডে জিপিএ-৫ পেয়েছে ১০ হাজার ২৪৫ জন, চট্টগ্রাম জিপিএ-৫ পেয়েছে ৯ হাজার ৮ জন, দিনাজপুর বোর্ডে জিপিএ-৫ পেয়েছে ১২ হাজার ৮৬ জন। ঢাকা বোর্ডে জিপিএ-৫ পেয়েছে ৩৬ হাজার ৪৭ জন।

ময়মনসিংহে জিপিএ-৫ পেয়েছে ৭ হাজার ৪৩৪ জন, বরিশাল বোর্ডে জিপিএ-৫ পেয়েছে ৪ হাজার ৪৮৩ জন। সিলেট বোর্ডে জিপিএ-৫ পেয়েছে ৪ হাজার ২৬৩ জন। ফল ঘোষণার পর পরীক্ষার্থীরা নিজ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইটে, সংশ্লিষ্ট বোর্ডের ওয়েবসাইটে ও এসএমএসে ফল জানতে পেরেছে। এসএমসএসে দুইভাবে ফল জানা গেছে। ফল প্রকাশের পর নির্ধারিত পদ্ধতিতে এসএমএস করলে ফিরতি এসএমএসে ফল চলে এসেছে তাদের মোবাইলে। এছাড়া রোল নম্বর দিয়ে আগে থেকে নিবন্ধন করে রাখলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে এসএমএস ফল চলে গেছে শিক্ষার্থী কিংবা অভিভাবকদের মোবাইলে। 

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনা মেনেই শিক্ষার্থীদের ফল সংগ্রহ করতে বলা হয়েছে। কোন অবস্থাতেই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে ফল প্রকাশের দিন জমায়েত হওয়া যাবে না, তারা জমায়েত হয়নি।

এসএমএসের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের ফল দেয়া হয়েছেছ আর শিক্ষা বোর্ডগুলোর ওয়েবসাইটে ফল প্রকাশ করেছে অর্থাৎ দেশের শিক্ষা ডিজিটালাইজেশনের দিকে এগোচ্ছে। এটি যুগের চাহিদা। তার মানে আমরা বিষয়টি রপ্ত করার পথে। 

এবারের এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার কথা ছিল ২০ লাখ ৪৭ হাজার ৭৭৯ জন পরীক্ষার্থীর। এরমধ্যে ছাত্র ১০ লাখ ২৪ হাজার ৩৬৩ জন এবং ছাত্রী ১০ লাখ ২৩ হাজার ৪১৬ জন। ২০ লাখ ৪৭ হাজার ৭৭৯ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে শুধু এসএসসি পরীক্ষার্থীর সংখ্যা ১৪ লাখ ২২ হাজার ১৬৮ জন। এরমধ্যে পরীক্ষায় অংশ নেয় ১৪ লাখ ১৬ হাজার ৭২১ জন। এবার নয়টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ড, মাদরাসা শিক্ষা বোর্ড ও কারিগরি শিক্ষা বোর্ডে গড়ে ৮২ দশমিক ৮৭ শতাংশ শিক্ষার্থী পাস করেছে। সব বোর্ডে পরীক্ষায় অংশ নিয়েছে ২০ লাখ ৪০ হাজার ২৮জন শিক্ষার্থীর এবং পাসকরেছে ১৬লাখ ৯০ হাজার ৫২৩জন। মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডে পাস করেছে ৮২ দশমিক ৫১ শতাংশ এবং কারিগরি শিক্ষাবোর্ডে পাস করেছেন ৭২ দশমিক ৭০ শতাংশ।

এবারের এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় ১০৪টি প্রতিষ্ঠান থেকে কেউ পাস করেনি, গতবছর এই সংখ্যা ছিল ১০৭টি। আর শতভাগ পাস করেছে এমন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা এবার তিন হাজার ২৩টি যা গতবছর ছিল দুই হাজার ৫৮৩টি। এ দুটোই উন্নতির সূচক কিন্তু তাই বলে আত্মতৃপ্তির সুযোগ একেবারেই নেই। কীভাবে?- ১০৪টি প্রতিষ্ঠান থেকে একজন শিক্ষার্থীও পাস করতে পারল না। এক্ষেত্রে বিদ্যালয়, কমিটি, সমাজ, শিক্ষা বিভাগ এবং সর্বোপরি রাষ্ট্রের কি কোনই দায়-দায়িত্ব নেই? প্রায় ২৯ হাজার শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে মাত্র তিন হাজার ২৩টি প্রতিষ্ঠান থেকে কেহই অকৃতকার্য হয়নি। সেটিই বা কীভাবে হয়? অভিভাবকদের ব্যয়, রাষ্ট্রীয় ব্যয়, শিক্ষকদের হাজার হাজার শ্রম ঘণ্টা শিক্ষার্থীদের লাখ লাখ ঘণ্টা ব্যয় করে যদি শতভাগ পাস করা প্রতিষ্ঠানের সংখ্য হয় মাত্র তিন হাজার সেটিও পুরোপুরি আনন্দের সংবাদ নয়।

 

পাসের হারে টানা অষ্টমবারের মতো শীর্ষে রয়েছে রাজশাহী বোর্ড এবং জিপিএ-৫ পাওয়ায় এবারও শীর্ষে রয়েছে ঢাকা র্বোড। রাজশাহী বোর্ডে সবচেয়ে বেশি ৯০.৩৭ শতাংশ এবং সিলেট বোর্ডে সবচেয়ে কম ৭৮.৭৯ শতাংশ শিক্ষার্থী পাস করেছে। সার্বিকভাবে গতবারের চেয়ে এবার পাসের হার বেশি। যেসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ফল ভাল করতে পারেনি, সেসব প্রতিষ্ঠানের খারাপ ফলের কারণ খুঁজে বের করতে হবে। এখানে প্রয়োজন পেশাগত গবেষণা। আমরা চারদিকে এত গবেষণার কথা শুনি কিন্তু এক্ষেত্রে কোন গবেষণা এবং তা সংশ্লিষ্টদের জানানোর কোন উদ্যোগ দেখতে পাই না। আমরা জানি নায়েমের একটি গবেষণা বিভাগ আছে, সেখানে গবেষণা হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব এডুকেশন রিসার্চে অনেক গবেষণা হয়। অথচ আমাদের দেশের শিক্ষাবোর্ডগুলোতে একটি থেকে আর একটিতে প্রতি বছরই দেখা যায় ফলের বিশাল পার্থক্য। এর সত্যিকারের কারণ কি তা যদি খুঁজে বের করা না হয় তাহলে উচচশিক্ষায় ভর্তি, চাকরি ইত্যাদি ক্ষেত্রে একটি অসমতা পরিলক্ষিত হবে। এত ছোট একটি দেশে এতগুলো শিক্ষা বোর্ড, জনসংখ্যার অনুপাতে হযতো ঠিক আছে কিন্তু এসব বোর্ড থেকে পাস করে শিক্ষার্থীদের ভর্তি হতে দেশের উচচশিক্ষা প্রতিষ্ঠনাগুলোতে একইসাথে প্রতিযোগিতায় নামতে হয়। সেখানে জিপিএ-৫ প্রাপ্তি ও নম্বর প্রাপ্তি ভর্তির  স্কোরকে দারুণভাবে প্রভাবিত করে। দ্বিতীয়ত, চাকরির ক্ষেত্রেও এর একটি বিশাল প্রভাব পড়ে। এটি একটি অসমতা। অথচ একটি বোর্ডে পাসের উচ্চহার বা বেশি পরিমাণে জিপিএ-৫ প্রাপ্তির যৌক্তিক তেমন কোন কারণ নেই। শুধুমাত্র খাতা পরীক্ষনের হেরফেরের ওপরই বিষয়টি বেশি নির্ভরশীল । 

যেসব প্রতিষ্ঠান থেকে কোন শিক্ষার্থীই কৃতকার্য হতে পারেনি সেগুলোর কারণ নির্ণয় করতে হবে বৈজ্ঞানিকভাবে। আমাদের দেশের শিক্ষাক্ষেত্রে যেসব গবেষণা হয় সেগুলো যদি দেশের এবং মানুষের কাজেই না লাগে তাহলে সেসব গবেষণা কতটা কৃতিত্বের দাবি রাখতে পারে সেটি একটি প্রশ্ন। এই ছোট দেশের ভেতরে মাত্র কয়েকটি জেলা নিয়ে একটি শিক্ষাবোর্ড, সবাই একই সিলেবাস অনুসরণ করছে  অথচ পাসের হারে দেখা যায় অনেক তফাৎ। এর কারণ যদি আমাদের শিক্ষা বিভাগ সংশ্লিষ্ট গবেষণা সেলগুলো বের করতে না পারে সেটি আমাদের এক বিরাট ব্যর্থতা। সকল শিক্ষার্থী যারা কৃতকার্য হয়েছো এবং যারা হতে পারোনি সবাইকে শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানাচ্ছি। তোমাদের অকৃতকার্যতার দায় তোমাদের একার নয়, এটি আমাদের সার্বিক ত্রুটির বহিঃপ্রকাশ। তোমাদের ভেঙে পড়লে চলবে না, এটি সাময়িক একটি ব্যাপার। সাফল্য তোমাদের আগামীর দিনের দিনগুলোতে কীভাবে ধরা দেবে তা তুমি আমরা কেউ জানি না। কাজেই সাহস নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে। তোমাদের  মনে রাখতে হবে’ Failure is the pillar of success.’আমাদের মনে রাখতে হবে পরিমাণগত বৃদ্ধি শিক্ষার মানোন্নয়নের স্মারক নয়। শিক্ষার্থীদের সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তোলাটাই হচেছ মুখ্য বিষয়। তাই নৈতিকতা, সামাজিক মুল্যবোধ ও শিক্ষার্থীদের সঠিক দেশপ্রেমে উদ্ধুদ্ধ করতে হবে প্রকৃতি শিক্ষার মাধ্যমে। এগুলো যথাযথ উপায়ে করতে পারলে সমাজের নানা অনাচার ও নেতিবাচক কর্মকান্ড অনেকাংশেই কমে যাবে। এক্ষেত্রে পুলিশের সংখ্যা বৃদ্ধি নয়, বৃদ্ধি করতে হবে শিক্ষার মান এবং জোর দিতে হবে নৈতিক শিক্ষার ওপর। শিক্ষার বিস্তৃতি অবশ্যই ঘটাতে হবে, তবে তা হতে হবে বৈশ্বিক মানের। আমাদের শিক্ষার্থীদের প্রতিযোগিতায় নামতে হচ্ছে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের সাথে, কাজেই তাদের সেই মানের শিক্ষা অর্জন করতে হবে।

মাছুম বিল্লাহ : শিক্ষা বিশেষজ্ঞ ও গবেষক

ব্র্যাক শিক্ষা কর্মসূচিতে কর্মরত

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন