বুধবার | জুলাই ১৫, ২০২০ | ৩১ আষাঢ় ১৪২৭

প্রথম পাতা

করোনা সংক্রমণের ঊর্ধ্বগতি

বিদেশী বিনিয়োগকারীদের আস্থা হারাচ্ছে বাংলাদেশ?

বদরুল আলম ও মেহেদী হাসান রাহাত

দেশে নভেল করোনাভাইরাসের সংক্রমণ শুরুর পর অতিক্রান্ত হয়েছে প্রায় তিন মাস। সাধারণ ছুটিও তুলে নেয়া হয়েছে ৩১ মে। যদিও রোগটির সংক্রমণ এখনো নিয়ন্ত্রণ করা যায়নি। দেশের অর্থনীতির জন্য বিষয়টি চরম হতাশাজনক বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, স্থানীয় বিনিয়োগকারীদের হতাশা এখন বিদেশীদের মধ্যেও সংক্রমিত হচ্ছে। বাংলাদেশের ওপর ক্রমেই আস্থা হারাচ্ছেন বিদেশীরা। 

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চলমান করোনা পরিস্থিতিতে দেশের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার ফাঁকগুলো প্রকট হয়ে উঠেছে। এতে করে অচিরেই রোগটির সংক্রমণ থেমে যাওয়া বা ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন নিয়ে খুব একটা আশাবাদী না স্থানীয় বিনিয়োগকারীরা। একই অবস্থা বিদেশীদেরও। বাংলাদেশের করোনা পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন তারা। দেশে সংক্রমণের গতি-প্রকৃতি নিয়ে ক্রমেই হতাশ হয়ে পড়ছেন তারা।

বিদেশী বিনিয়োগকারীদের অনেকেই এরই মধ্যে দেশের কভিড-১৯ পরিস্থিতি নিয়ে হতাশা জানিয়েছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গিয়েছে। বিভিন্ন দেশের সরকারের পদক্ষেপেও এর ছাপ দেখা যাচ্ছে। সম্প্রতি বাংলাদেশসহ আরো বেশ কিছু দেশ থেকে জাপানে প্রবেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে টোকিও। এতে করে বিদেশী বিনিয়োগকারীদের মধ্যে হতাশা আরো বেড়েছে। চলমান সংক্রমণ পরিস্থিতিতে অনেক বিনিয়োগকারীর মধ্যেই বাংলাদেশে ফেরা নিয়ে আতঙ্ক বিরাজ করছে। তাদের অনেকেই বিষয়টি বাংলাদেশী অংশীদারদের জানিয়েছেনও।

বিদেশি বিনিয়োগ সংশ্লিষ্টরা জানান, গোটা পৃথিবীই এতদিন থমকে ছিল। কেউ কোথাও যাচ্ছিলেন না। বন্ধ ছিল বিমানবন্দরগুলোও। বর্তমানে পরিস্থিতি পাল্টাতে শুরু করেছে। দেশে দেশে কিছু সংখ্যক বিমানবন্দর খুলে দেয়া হচ্ছে। আস্তে আস্তে সব দেশই বহির্বিশ্বের জন্য নিজ দুয়ার খুলে দিতে যাচ্ছে, কিন্তু বাংলাদেশের জন্য তা বন্ধই থাকবে। কারণ সংক্রমণের বর্তমান পরিস্থিতিতে এখান থেকে কাউকে ঢুকতে দেয়ার প্রশ্নই আসে না। আবার বিদেশিরাও বাংলাদেশে আসতে চাইছেন না। বহির্বিশ্বের সঙ্গে এভাবে যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বাংলাদেশী ব্যবসায়ীদের জন্য ব্যবসা করাটাই মুশকিল হয়ে দাঁড়াবে। 

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চীনারা ভারত থেকে তাদের লোকজন সরিয়ে নিচ্ছে। এর কারণ হিসেবে ভারতের সংক্রমণ পরিস্থিতিকেই দায়ী করছে তারা। একই ভাবে বাংলাদেশ থেকেও নিজেদের লোকজন সরিয়ে নিয়ে যাবে তারা। এরই মধ্যে অনেক বিদেশীই তাদের পরিবার এদেশ থেকে সরিয়ে নিয়েছে। অবস্থায় বড় প্রকল্প সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সরিয়ে নেয়া শুরু হলে তা বড় ধরণের উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠবে। 

এক মাসের মধ্যেই বিদেশিদের অনাস্থার বিষয়টি দৃশ্যমান হয়ে উঠবে বলে মনে করছেন পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক . আহসান এইচ মনসুর। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, বহির্বিশ্ব এখন স্বাভাবিক হওয়ার পথে। পরিস্থিতিতে আমরা হয়ে যাবো অস্পৃশ্য। বিদেশিদের কাছে আস্থা হারিয়ে ফেলবো। ফলশ্রুতিতে কেউ এখানে আসবে না। আবার আমাদেরও  কোথাও যেতে দেবে না। আমাদের দেশ থেকে বিদেশী নাগরিকদের সরিয়ে নেয়া হবে। এর বড় প্রভাব পড়বে দেশের বিনিয়োগ পরিস্থিতিতে। এমনকি পুঁজিবাজারেও এর প্রতিফলন দেখা যাবে। 

নভেল করোনাভাইরাসের কারণে দেড় মাসের বেশি সময় ধরে দেশের পুঁজিবাজারে লেনদেন বন্ধ ছিল। দুই দিন আগে আবার তা চালু হলেও দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকায় বাংলাদেশ শ্রীলঙ্কার পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারী বিদেশী ফান্ডগুলো এরই মধ্যেই তাদের বিনিয়োগ নিয়ে সতর্ক প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছে। আপত্কালীন পরিস্থিতিতে দুই দেশের পুঁজিবাজারের ভঙ্গুরতার বিষয়টি বিদেশী ফান্ডগুলোকে বিনিয়োগ প্রত্যাহারের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। এসব তহবিলের কর্মকর্তারাও সম্প্রতি ব্লুমবার্গের কাছে বাংলাদেশ শ্রীলঙ্কার পুঁজিবাজার থেকে বিনিয়োগ প্রত্যাহার করে নেয়ার কথা জানিয়েছেন।

ব্লুমবার্গের খবরে বলা হয়, করোনার কারণে মার্চ থেকে হাতেগোণা যে কয়টি দেশের পুঁজিবাজার বন্ধ রয়েছে, তার অন্যতম হলো বাংলাদেশ শ্রীলঙ্কা। বিশ্বব্যাপী এপ্রিলে পুঁজিবাজারকে ঘুরে দাঁড়াতে দেখা গেলেও, বন্ধ থাকায় দুই দেশের বিনিয়োগকারীরা এক্ষেত্রে বঞ্চিত হয়েছেন।

বিষয়ে টেলিমার দুবাইয়ের ইক্যুইটি স্ট্র্যাটেজির প্রধান হাসনাইন মালিক বলেন, এটি একটি তিক্ত অভিজ্ঞতা। এত দীর্ঘ সময় ধরে বাজার বন্ধ থাকায় অনেক বিনিয়োগকারী এখান থেকে চলে যাবে। হয়ত একেবারে সব বিনিয়োগ প্রত্যাহার হবে না। এক্ষেত্রে বিদেশীরা ধীরে ধীরে তাদের বিনিয়োগ প্রত্যাহার করে নেবেন।

পুঁজিবাজার সংশিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যত দ্রুত অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াবে, তত দ্রুততার সঙ্গে শেয়ারবাজারের বিদেশি বিনিয়োগকারীরা ফিরে আসবেন। এখন যেহেতু বাজারে শেয়ারমূল্য অনেক কম, সময় বিদেশিদের কাছে বাজার আকর্ষণীয়। স্বাভাবিক বিশ্লেষণাত্মক দৃষ্টিকোণ থেকে সময়ে বিদেশিদের আসা উচিত্। কিন্তু এক্ষেত্রে বড় অন্তরায় হলো কভিড-১৯ 

বিশেষজ্ঞরা জানান, বিনিয়োগের আগে যেকোনো বিদেশী বিনিয়োগকারী বাংলাদেশে এসে নানা ধরনের বিশ্লেষণ করে থাকেন। এজন্য তারা সংশ্লিষ্ট ব্যাংক দফতরগুলোয় যান। পরিস্থিতি যাচাই-বাছাইয়ের পর নিয়ে প্রতিবেদন তৈরি করেন তারা। বর্তমান পরিস্থিতিতে তাদের পক্ষে এভাবে এসে পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করা সম্ভব নয়। আর বিশ্লেষণ না করে তারা বিনিয়োগও করবেন না। 

বিষয়ে সংশ্লিষ্ট এক বিশেষজ্ঞ আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, এখন পর্যন্ত আমরা ফ্রন্টিয়ার মার্কেটের তালিকায় আছি। কিন্তু স্বাস্থ্য অব্যবস্থাপনার কারণে অর্থনীতি যদি ভালো না থাকে বা আমাদের যদি বের করে দেয়! এসব কারণেই একটা রিস্ক ফ্যাক্টর আছে। বিদেশি বিনিয়োগ আমরা কিভাবে আনবো, যদি সংক্রমণকে আমরা নিয়ন্ত্রণ করতে না পারি?

দীর্ঘ ৬৫ দিন বন্ধ থাকার পর রোববার চালু হয় দেশের পুঁজিবাজার। দীর্ঘদিন পর লেনদেন শুরু হওয়ায় এদিন বিনিয়োগকারীদের মধ্যে উচ্ছ্বাস দেখা যায়, যার প্রভাবে সেদিন সব সূচক বেড়েছে। অন্যদিকে একই দিনে দেশে একদিনে সর্বোচ্চ সংখ্যক রোগীর কভিড-১৯ সংক্রমণ শনাক্ত মৃত্যুর ঘটনা ঘটে।  এতে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে করোনা পরিস্থিতির আরো অবণতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ফলে গতকাল দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) সার্বিক সূচক ডিএসইএক্সের পতন হয়েছে দেড় শতাংশ। করোনা আতঙ্কসহ বিদেশী বিনিয়োগকারীদের মধ্যে শেয়ার বিক্রির প্রবণতাও দরপতনে ভূমিকা রেখেছে।

বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, রোববারের তুলনায় গতকাল দেশের পুঁজিবাজারে বিক্রয় প্রবণতা ছিল বেশি। ব্যক্তিশ্রেণীর পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরাও নিজেদের নগদ অর্থের প্রয়োজন মেটাতে শেয়ার বিক্রি করেছেন। বিদেশী বিনিয়োগকারীরাও তাদের পোর্টফোলিওর শেয়ার বিক্রি করেছেন। পাশাপাশি বিদেশীরা শেয়ার কিনেছেনও। এছাড়া কভিড-১৯-এর কারণে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর আয় কমে যাওয়ার সম্ভাবনার বিষয়টিও বিনিয়োগকারীদের শেয়ার বিক্রির ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলেছে।  

শুরু থেকেই নভেল করোনাভাইরাসের বিস্তার ঠেকানোর প্রধান উপায় হিসেবে সর্বোচ্চ সংখ্যক নমুনা পরীক্ষা এবং শনাক্তকৃত সংক্রমিতদের আলাদা করে রাখার ওপর জোর দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। কিন্তু বিষয়টি বাংলাদেশে শুরু থেকেই উপেক্ষিত। এরই মধ্যে বাংলাদেশ সর্বোচ্চ করোনা সংক্রমিত দেশগুলোর তালিকায় ২১ নম্বরে চলে এসেছে

সংক্রমণে শীর্ষ ৩০টি দেশের মধ্যে জনসংখ্যার অনুপাতে সবচেয়ে সবচেয়ে কম করোনা পরীক্ষা করা হয়েছে বাংলাদেশে। দক্ষিণ এশিয়ায়ও সংখ্যায় সবচেয়ে পিছিয়ে বাংলাদেশ। প্রতি ১০ লাখ মানুষের বিপরীতে নভেল করোনাভাইরাসের সংক্রমণ পরীক্ষা হয়েছে মাত্র হাজার ৯৫১টি। যেখানে প্রতিবেশী ভারতে ১০ লাখ মানুষের বিপরীতে পরীক্ষা হয়েছে হাজার ৭৮৩টি করে। পাকিস্তানে ১০ লাখ মানুষের বিপরীতে করোনা পরীক্ষা হয়েছে হাজার ৫৪৫টি। প্রতি ১০ লাখ মানুষের বিপরীতে ২২ হাজার ৪৯৯টি পরীক্ষা করে ভূটান। শ্রীলঙ্কায় এই সংখ্যা হাজার ৫৩। এমনকি নেপালও প্রতি ১০ লাখ মানুষের বিপরীতে হাজার ৩৮২ জনের করোনা পরীক্ষা করেছে।

বাংলাদেশে করোনা সংক্রমনের সার্বিক পরিস্থিতি প্রসঙ্গে বিদেশি বিনিয়োগকারি সংশিষ্ট বাণিজ্য সংগঠনগুলো বলছে, কভিড-১৯-এর প্রাদুর্ভাব বৈশ্বিক। আর বিশ্বের কোনো দেশই ভাইরাসটির সংক্রমণ রোধে যথাযথভাবে ভূমিকা পালন করতে পারেনি। বাংলাদেশও ব্যতিক্রম নয়। এখানে প্রস্তুতির ঘাটতি ছিলো। আর এখন ব্যবস্থাপনার ঘাটতিও অন্য অনেক দেশের মতোই। পরিস্থিতিতে বাংলাদেশে বিদেশী বিনিয়োগকারীরা শঙ্কায় থাকলেও এখনো তা পরিপূর্ণ অনাস্থা সৃষ্টি করেনি। তবে এটা ঠিক যে বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনায় যে বড় ধরণের ত্রুটি রয়েছে, তা এখন গোটা বিশ্বের কাছেই স্পষ্ট। 

বিষয়ে ফরেন ইনভেস্টরর্স চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এফআইসিসিআই) সভাপতি রূপালী চৌধুরী বণিক বার্তাকে বলেন, কভিড-১৯ প্রেক্ষাপটে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মনোভাব নিয়ে মন্তব্য করার সময় এখনও আসেনি। সাধারণ দৃষ্টিকোণ থেকে দেশে বসবাস করা সব মানুষের জন্যই আমাদের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার ঘাটতি দূর করা প্রয়োজন। আর শুধু বিদেশী বিনিয়োগকারীদের বিষয়ে বলতে গেলে আমাদের এখন অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোর সফল উন্নয়ন দেখানো প্রয়োজন, যা বিদেশী বিনিয়োগকারীদের ধরে রাখতে অবশ্যই সহায়ক ভূমিকা পালন করবে।

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন