মঙ্গলবার | জুলাই ০৭, ২০২০ | ২৩ আষাঢ় ১৪২৭

করোনা

মহামারী নারীকে কয়েক দশক পেছনে ঠেলে দিতে পারে

বণিক বার্তা ডেস্ক

নভেল করোনাভাইরাস মারাত্মকভাবে প্রভাব ফেলতে পারে লৈঙ্গিক সমতার ওপর এবং নারীদের পিছিয়ে দিতে পারে কয়েক দশক পর্যন্ত। সম্প্রতি ব্রিটেনের সমবেতন আইনের ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষকে সামনে রেখে এমন আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন অনেক বিশেষজ্ঞ। জানা গেছে, শিশুদের যত্ন নেয়া, ঘরের কাজ সামলানো এবং চাকরি হারানোর ক্ষেত্রে পুরুষের চেয়ে নারীদের সংখ্যা অনেক বেশি। অনেক ক্যাম্পেইনার, রাজনীতিবিদ বিশেষজ্ঞরা বলছেন নারী কণ্ঠস্বরের অগ্রগতি পিছিয়ে যেতে পারে ৫০ বছর পর্যন্ত।

ফাউচেট সোসাইটির প্রধান নির্বাহী স্যাম স্মিথার্স বলেন, আমার মতে কর্মক্ষেত্রে সমতার ক্ষেত্রে সরকার যদি হস্তক্ষেপ না করে তবে নারীরা কয়েক দশক পর্যন্ত পিছিয়ে যেতে পারে। আমরা এখন দ্বিস্তরের কর্মক্ষেত্র তৈরির সম্ভাবনার কথা ভাবছি, যেখানে পুরুষরা কাজে ফিরে যাবে এবং নারী ঘরের কাজ সামলাবে। অথচ কর্মক্ষেত্রে নারীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে ২০ বছর লেগেছে। কিন্তু সেটি শেষ হয়ে যেতে লাগতে পারে মাত্র কয়েক মাস।

কাজ

দি ইনস্টিটিউট ফর ফিসক্যাল স্টাডিজ এবং ইউসিএল ইনস্টিটিউট অব এডুকেশন বলছে, গত সপ্তাহে ৪৭ শতাংশ মা স্থায়ীভাবে চাকরি হারিয়েছে অথবা স্বেচ্ছায় ছেড়ে দিয়েছে এবং সংকট শুরুর পর থেকে ১৪ শতাংশকে সাময়িকভাবে ছুটিতে যেতে হয়েছে। কডিভ-১৯-এর কারণে যে দুটি খাতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সেগুলো হলো সেবা খাত রিটেইল। দুটি ক্ষেত্রেই নারীদের ব্যাপকভাবে অংশগ্রহণ রয়েছে।

ইউকে ওমেনস বাজেট গ্রুপের রিসার্চ পলিসিপ্রধান . সারা রেইস বলেন, নারীরা সংকটের শুরুই করেছে অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে থাকা অবস্থায় থেকে। মহামারীতে নারীদের উপার্জন কর্মসংস্থানের ওপর কী প্রভাব পড়ে তা নিয়ে আমরা উদ্বিগ্ন আছি, এটি নারী বৈষম্যের পথকে আরো বেশি প্রশস্ত করবে।

স্মিথার্স বলেন, কোনো কাজের ক্ষেত্রে নারী-পুরুষ দুজনই পাল্টাপাল্টিভাবে কাজ করলে কর্মক্ষেত্রে অনেক বেশি সাম্যাবস্থা তৈরি হবে। পেছনে ফিরে আসার সুযোগ নেই।

কিন্তু রেজল্যুশন ফাউন্ডেশনের দেয়া ডাটা বলছে, কেবল ১০ জন নিম্ন উপার্জনকারী ব্যক্তির মাঝে কেবল একজন ঘরে বসে কাজ করতে পারছেন এবং নিম্ন উপার্জনকারীদের ৬৯ শতাংশই নারী। টিউসি জেনারেল সেক্রেটারি ফ্রান্সেস গ্রেডি বলেন, কর্মজীবী নারীরা করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে অগ্রগামী ভূমিকা রাখছেন কিন্তু লাখ লাখ নারী আটকে আছেন স্বল্প বেতন অনিরাপদ চাকরিতে। আমরা কীভাবে নারীদের কাজের মূল্যায়ন করছি এবং প্রতিদান দিচ্ছি তা বিবেচনা করা প্রয়োজন।

বেতনে লৈঙ্গিক বৈষম্য

করোনাভাইরাসের সংকটের কারণে সরকার কোম্পানিগুলোকে বছর বেতনে লৈঙ্গিক বৈষম্যের তথ্য দেয়ার ব্যাপারে ছাড় দিয়েছে। ফলে অর্ধেকই সে সুবিধা নিয়েছে। জেন্ডার ইকুয়ালিটি ক্যাম্পেইন ডিরেক্টর ক্যারলোটে উডওর্থ বলেন, এটা দেখা খুবই হতাশাজনক যে আইনি বাধ্যবাধকতা তুলে দেয়ার পর অনেকেই এমন পথে হেঁটেছে। এটি সংকটকালে লৈঙ্গিক সমতার প্রতি আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির একটি উদ্বেগজনক নিদর্শন তুলে ধরেছে।

বিভিন্ন ডাটা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, নারীদের প্রতি বৈষম্য কমানোর পথে সময় লেগেছে ২০০ বছর। ইকুয়ালিটি ট্রাস্টের নির্বাহী পরিচালক . ওয়ান্ডা ওয়াইপ্রোস্কা বলেন, নিঃসন্দেহে নারীদের ওপর মহামারীর সবেচেয়ে খারাপ প্রভাব পড়েছে। যা ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পেয়ে অগ্রগতিকে পেছনের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

মাতৃত্বকালীন বৈষম্য

অনেক গর্ভবতী স্বাস্থ্যকর্মী বলেছেন, সংকটকালে তাদের কাজ করতে বাধ্য করা হয়েছে, যেখানে অনেকেই বাধ্যতামূলক ছুটিতে পাঠানোর অভিযোগ এনেছেন। অনেক বিশেষজ্ঞ এমন ক্রমবর্ধমান বৈষম্যে নিজেদের ভয়ের কথা জানিয়েছেন, যেখানে এরই মধ্যে ৫৪ হাজার নারী চাকরি হারিয়েছেন।

গর্ভবতী নারীদের নিয়ে কাজ করা জোয়েল ব্রেয়ারলে বলেন, সংকটকালে চাকরিদাতারা কাজ করার জন্য প্রচলিত পথে ফিরে যান, গর্ভবতী মহিলাদের বোঝা হিসেবে দেখা হয়। যেখানে মায়েদের দেখা হয় বিক্ষিপ্ত এবং কম প্রতিশ্রুতিবদ্ধ কর্মী হিসেবে। আমরা এই সংকটকালে গর্ভবতী নারীদের কর্মসংস্থানের অধিকারের ক্ষেত্রে ব্যাপক ক্ষয় দেখতে পাচ্ছি। পরিস্থিতি উন্নতি লাভের আগে তলানিতে গিয়ে ঠেকবে।

চাইল্ডকেয়ার

বিশেষজ্ঞরা চাইল্ডকেয়ার তথা শিশুর দেখাশোনার ক্ষেত্রেও সংকট দেখতে পাচ্ছেন। ফাউচেট সোসাইটির হিসাবে দেড় লাখ চাইল্ডকেয়ার কর্মী তাদের কাজ হারাবে। যেখানে ক্ষেত্রে কাজ করাদের ৯৭ শতাংশই হচ্ছেন নারী। আর্লি ইয়ারস অ্যালায়েন্সের প্রধান নির্বাহী নেইল লিয়েচ বলেন, সরকারি বরাদ্দের অভাবে এই খাত এরই মধ্যে দিন এনে দিন খাই উপায়ে চালিত হচ্ছে। অবস্থায় অনেকেই স্থায়ীভাবে নিজেদের কাজ বন্ধ করে দেবে।

নারী মেয়েদের বিরুদ্ধে সহিংসতা

অনেক প্রতিবেদন বলছে, বিশ্বব্যাপী লকডাউনের কারণে নারীদের বিরুদ্ধে সহিংসতার পরিমাণ অনেকটাই বৃদ্ধি পেয়েছে। এই ইস্যুতে যুক্তরাজ্যে কাজ করা রিফিউজে নামক একটি সংস্থা বলছে, সাম্প্রতিক সময়ে তাদের ওয়েবসাইটে দর্শনার্থীদের সংখ্যা ১০ গুণ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। এছাড়া এপ্রিলে লকডাউনের মাঝে নারীর প্রতি সহিংসতা উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বেড়েছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো।

প্রতিক্রিয়াস্বরূপ সরকার ঘোষণা দিয়েছে, সংকটে থাকা মানুষদের ৬৭ মিলিয়ন পাউন্ড সহায়তা দেয়া হবে। যেখানে ২৭ মিলিয়ন পাউন্ড বরাদ্দ থাকবে জরুরি ঘরোয়া সহিংসতার বিরুদ্ধে কাজ করার জন্য। ওমেন্স এইডের লুসি হ্যাডলি বলেন, এটা স্বাগত জানানোর মতো ব্যাপার এবং সত্যিকার অর্থেই এটি পার্থক্য তৈরি করবে। যদিও পরিমাণটা তেমন নয় যেমনটা আমাদের প্রয়োজন। খাতে কেবল ইংল্যান্ডে প্রতি বছর ৩৯৩ মিলিয়ন পাউন্ড প্রয়োজন হয়।

তবে ঘরোয়া সহিংসতার ওপর নজর দিলে সেটি ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া নিয়ে আসতে পারে বলে মনে করেন এন্ড ভায়োলেন্স অ্যাগেইনস্ট ওমেনের পরিচালক সারাহ গ্রিন। তিনি বলেন, যদি এটি বৃহত্ভাবে বোঝাপড়া তৈরি করে যে আমাদের সবার একে অন্যের প্রতি দায়িত্ব রয়েছে, তবে এটি শক্তিশালী পরবর্তী সময়ের জন্য একটি বার্তা প্রদান করবে।

রাজনীতি

সম্প্রতি সাংসদ এবং ওমেন এন্ড ইকুয়ালিটিস সিলেক্ট কমিটির প্রধান ক্যারোলিন নোকেস প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসনকে উদ্দেশ করে বলেন, আমরা সরকারের উচ্চ পর্যায়ে নারীদের কণ্ঠস্বর শুনতে পাচ্ছি না। আমরা এমন একটি জটিল সময়ে আছি, যখন প্রচুর পুরুষ মানুষ মারা যাচ্ছে। তবে এটি নারীদের জন্য ঝুঁকি তৈরি করছে, যেখানে সামনের দিনগুলো নারীদের ওপর আরো বেশি নেতিবাচক প্রভাব পড়তে যাচ্ছে।

দ্য গার্ডিয়ান

 

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন