শুক্রবার | জুলাই ১০, ২০২০ | ২৬ আষাঢ় ১৪২৭

টেলিকম ও প্রযুক্তি

মহাশূন্যে আবার শুরু হলো রুশ-মার্কিন দ্বৈরথ!

বণিক বার্তা অনলাইন

যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম বাণিজ্যিক মহাকাশযানে আন্তর্জাতিক মহাকাশ কেন্দ্রে মানুষ পাঠানোর ঘটনা নিয়ে স্পষ্টত বেশ অস্বস্তিতে পড়েছে রাশিয়া। এ নিয়ে এরই মধ্যে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য শুরু হয়ে গেছে। রুশ কর্মকর্তারা স্পেসএক্সকে নিয়ে যেমন রসিকতা করছেন তেমনি স্পেসএক্সের সিইও ইলন মাস্কও পাল্টা জবাব দিতে ছাড়ছেন না। 

গত শনিবার কেনেডি স্পেস সেন্টার থেকে আন্তর্জাতিক মহাকাশ (আইএসএস) কেন্দ্রের উদ্দেশে উৎক্ষিপ্ত হয় স্পেসএক্সের ক্রু ড্রাগন ক্যাপসুল। নাসার আর্থিক ও কারিগরি সহযোগিতায় এ অভিযান সফলভাবে সম্পন্ন করেছে স্পেসএক্স। ১৯ ঘণ্টার দীর্ঘ ভ্রমণ শেষে গতকাল রোববার মহাকাশযানের দুই ক্রু আন্তর্জাতিক মহাকাশ কেন্দ্রে আগে থেকে অবস্থানরত মার্কিন ও রুশ মহাকাশচারীদের সঙ্গে যোগ দিয়েছেন। 

এটি এমন এক ঘটনা যেটি মহাকাশ ভ্রমণে রাশিয়ার এতোদিনের একচেটিয়া আধিপত্যের অবসান ঘটানোর ইঙ্গিত দিচ্ছে। শিগগিরই অনেক কম খরচে বাণিজ্যিক রকেটে করে মানুষ মহাকাশে ভ্রমণ করতে পারবে বলে আশা করা হচ্ছে। 

তবে রুশ কর্মকর্তারা বলছেন, এই সামান্য ঘটনাটা নিয়ে আমেরিকানরা কেন যে এতো উন্মাদনা (হিস্টিরিয়া) দেখাচ্ছে, সেটি আমাদের বুঝে আসছে না। মহাকাশে মানুষ পাঠানো তো খুবই পুরনো ঘটনা!

তারা অবশ্য যথার্থই বলছেন। কারণ রাশিয়ার সয়ুজ মহাকাশযানে করে নিয়মিতই আন্তর্জাতিক মহাকাশ কেন্দ্রে নভোচারী পাঠায় মার্কিন মহাকাশ গবেষণা কেন্দ্র নাসা। 

রাশিয়ার মহাকাশ গবেষণা প্রধান দিমিত্রি রোগোজিনের মন্তব্যটি বেশ রসালো, তবে আক্রমণাত্মক। তিনি বলেছেন, একদিন ট্রামপোলিনে করে নভোচারীদের আইএসএসে পাঠাতে ওয়াশিংটনকে বাধ্য করা হবে!

নাসার প্রশাসক জিম ব্রিডেনস্টাইনের সঙ্গে যৌথ সংবাদ সম্মেলনে অবশ্য এর মোক্ষম জবাব দিয়েছেন ইলন মাস্ক। তিনি কৌতুক করে বলেছেন, ট্রামপোলিন কিন্তু কাজ করেছে! এরপরই দুজনে হাসেন। পরক্ষণেই মাস্ক বলেন, এটা অনেক ভেতরের একটা কৌতুক।

গতকাল রোববার যখন স্পেএক্সের ড্রাগন ক্যাপসুল সফলভাবে আইএসএসে ডক করে এবং যুক্তরাষ্ট্র উল্লাসে ফেটে তখন পর্যন্ত রোগোজিন নীরব থেকেছেন। তবে নিরাপদে ডকিং সম্পন্ন হওয়ার পর তিনি নাসার ব্রিডেনস্টাইনকে ধন্যবাদ দিতে কার্পণ্য করেননি। তিনি টুইট করে লেখেন, 

সফল লঞ্চ এবং ডকিংয়ের এই মুহূর্তে আপনাকে অভিনন্দন। সাবাশ!

ইলন মাস্কের রসিকতার বিষয়ে তিনি বলেন, দয়া করে ইলন মাস্ককে (আমি তার রসিকতাটি পছন্দ করেছি) এবং স্পেসএক্স টিমকে আমার আন্তরিক শুভেচ্ছা পৌঁছে দেবেন। আরো পারস্পরিক সহযোগিতার প্রত্যাশা রইল!

২০১৪ সালে, মস্কোর বিরুদ্ধে ওয়াশিংটন নতুন নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করে, এর মধ্যে কিছু মহাকাশ শিল্পও অন্তর্ভুক্ত ছিল। তখন রাশিয়ার তৎকালীন উপ প্রধানমন্ত্রী রোগোজিন যুক্তরাষ্ট্রের মানববাহী কোনো মহাকাশ কর্মসূচি না থাকার কথা তুলে বিদ্রুপ করেছিলেন।

গতকাল রোববারও রাশিয়া যুক্তরাষ্ট্রকে অভিবাদন জানাতে গিয়ে খোঁচা দিতে ছাড়েনি। বলেছে, অনেকেই নতুন যুগের সূচনা বলে অভিহিত করে উন্মত্ততা দেখাচ্ছে। আমরা এসব দেখে বিস্মিত!

রুশ মহাকাশ গবেষণা সংস্থা রোসকসমসের মুখপাত্র ভ্লাদিমির উস্তিমেনকো বলেছেন, ক্রু ড্রাগন মহাকাশযান সফলভাবে ডকিংয়ের পর আমরা যে উন্মাদনা দেখছি তা সত্যিই বুঝতে পারছি না। এটা আর নতুন কী!

ট্রাম্পের অভিনন্দনমূলক বক্তৃতার অংশগুলো টুইট করে তিনি যোগ করেন, এটা তো অনেক দিন আগেই হওয়া উচিত ছিল।

স্পেসএক্সের ড্রাগন ক্যাপসুলের নিখুঁত উৎক্ষেপণের পর ফ্লোরিডার কেনেডি স্পেস সেন্টারে বক্তৃতায় ট্রাম্প ঘোষণা দেন, মার্কিন নভোচারীরা ২০২৪ সালে চাঁদে যাবে। সেখানে স্থায়ী উপস্থিতি নিশ্চিত করবে যুক্তরাষ্ট্র এবং মঙ্গলে অভিযাত্রার জন্য স্থাপন করা হবে লঞ্চ প্যাড।

তিনি আরো বলেন, চাঁদে প্রথম কোনো নারী গেলে তিনি হবেন একজন আমেরিকান। আর মঙ্গল গ্রহে মানুষ নিয়ে অবতরণকারী প্রথম দেশটি হবে যুক্তরাষ্ট্র। এই দুটি জিনিস আমরা হাতছাড়া করতে চাই না। 

তবে রুশ স্পেস এজেন্সিও পাল্টা গুলি ছুড়েছে! তারা বলেছে, রাশিয়াও চুপ করে হাতগুটিয়ে বসে থাকবে না।

উস্তিমেনকো টুইট করেছেন, এরই মধ্যে এবছর আমরা দুটি নতুন রকেটের পরীক্ষা করব এবং পরের বছর আমাদের চন্দ্র অভিযানের কর্মসূচি আবার চালু করব।

অবশ্য তিনি বিস্তারিত ব্যাখ্যা করেননি। যদিও রোগোজিন এর আগে বলেছিলেন, রাশিয়া এই শরতেই আঙ্গারা হেভি ক্যারিয়ার রকেটের নতুন পরীক্ষা চালুর পরিকল্পনা করেছে।

রোগোজিন আরো বলেছেন, রাশিয়া তার নতুন আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, সারমাত, যাকে ন্যাটো বলছে শয়তান-২, উন্নয়নের কাজ এগিয়ে চলছে।

২০১৮ সালে, প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন গর্ব করে বলেছিলেন, সারমাত হলো নতুন রুশ সমরাস্ত্রের একটি যা ন্যাটোর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে অকার্যকর করে দেবে।

নভোচারী বহনে একমাত্র দেশ হিসেবে রাশিয়া বহুদিন একচেটিয়া আধিপত্য করে এসেছে। শনিবারের ঘটনায় তারা একটি বিশাল অংকের আয় থেকেও বঞ্চিত হলো। রুশ মহাকাশযান সয়ুজের একটি আসনের ভাড়া প্রায় ৮ কোটি ডলার। নাসাকে নভোচারী পাঠাতে এই অর্থ খরচ করতে হয়।

রোসকসমস জোর দিয়ে বলছে, স্পেসএক্সের রকেটে আইএসএসে মানুষ পাঠাতে সক্ষম হলেও মস্কোকে আমেরিকার লাগবে। মহাকাশ স্টেশনে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে কমপক্ষে দুটি সম্ভাবনা থাকা খুব জরুরি। কারণ আপনি বিষয়টি কখনোই জানতে পারবেন না...., বলেন উস্তিমেনকো।

মস্কোর কর্মকর্তারা মার্কিন কৃতিত্বকে খাটো করে দেখানোর চেষ্টা করছে। দেশটির পার্লামেন্টের সংসদের উচ্চকক্ষের সদস্য আলেক্সি পুশকভ বলেন, এটি আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনের একটি নভোযান, মঙ্গল গ্রহে যাওয়ার জিনিস নয়।

রুশ মহাকাশ কর্মসূচিতে মহাকাশে প্রথম মানুষ পাঠায় ১৯৬১ সালে। এর চার বছর আগে প্রথম উপগ্রহ উৎক্ষেপণ করে তারা।

তবে ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ভেঙে যাওয়ার পর এ কর্মসূচি বড় ধরনের ধাক্কা খায়। বেশ কয়েকটি ব্যয়হুল কর্মসূচি মুখ থুবড়ে পড়ে।

এএফপি অবলম্বনে

>> মানুষ নিয়ে মহাকাশ স্টেশনে ভিড়ল স্পেসএক্সের রকেট, গড়ল নতুন ইতিহাস

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন