বুধবার | জুলাই ১৫, ২০২০ | ৩১ আষাঢ় ১৪২৭

শেয়ারবাজার

করোনা আক্রান্ত শেয়ারবাজারে যেসব খাতে সুখবর

শফিকুল ইসলাম

বিশ্বজুড়ে এখন চলছে করোনা মহামারীর দাপট। ধনী-গরিব সব দেশেই প্রতিদিন মানুষ মরছে অকাতরে। সারা বিশ্বে সাড়ে তিন লাখেরও বেশি মানুষ এ ভাইরাসের ফলে মারা গেছে। প্রতিদিন এ সংখ্যা বাড়ছে। বেশ কয়েক মাস ধরে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড স্থবির হয়ে পড়েছে। অধিকাংশ মানুষ ঘরবন্দি। করোনাভাইরাস বিস্তার নিয়ন্ত্রণ ও রোগ প্রশমনবহির্ভূত বেশির ভাগ পণ্য ও সেবার চাহিদা ও সরবরাহে ভাটা পড়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন যে বিশ্ব অর্থনীতি মহামন্দায় পড়তে যাচ্ছে। এর প্রভাব হতে পারে এ শতাব্দীর ত্রিশের দশকের মন্দার চেয়েও ভয়াবহ। এরই মধ্যে তার আলামত সুস্পষ্ট। পৃথিবীর প্রায় সব দেশের শেয়ারসূচকে ব্যাপক পতন ঘটেছে। বাংলাদেশও তার ব্যতিক্রম নয়। এমনিতেই নানা কারণে বাংলাদেশের শেয়ারবাজার কয়েক বছর ধরেই কঠিন সময় অতিক্রম করছিল। বিশেষ করে ২০১৯ সালে বছরজুড়ে শেয়ারদরে পতন হয়েছিল। সূচক ৬ হাজার পয়েন্টের কাছাকাছি থেকে পড়ে ৪ হাজারের কাছাকাছি নেমে এসেছিল। সে পতন ঠেকাতে রেগুলেটরি সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সহায়তায় সরকার নানাবিধ প্রণোদনার ব্যবস্থা করেছিল। বিশেষ করে বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক শিডিউলড ব্যাংকগুলোকে শেয়ার ক্রয় বাবদ অতি কম সুদে দীর্ঘমেয়াদে পরিশোধযোগ্য ২০০ কোটি টাকার ঋণ সহায়তা বাজারে নতুন আশার সঞ্চার করেছিল। এমনই প্রেক্ষাপটে এ বছরের জানুয়ারি থেকেই নানা দেশে করোনা সংকট ধীরে ধীরে তীব্র হতে থাকে।

মার্চের ১১ তারিখে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কর্তৃক করোনা পরিস্থিতিকে মহামারী স্তর থেকে বৈশ্বিক মহামারী স্তরে ঘোষণা করা হয়। তারপর বাংলাদেশের বাজারও দ্রুত পড়তে থাকে এবং কয়েক দিন পর বাংলাদেশে করোনা কেস ধরা পড়ায় ১৮ মার্চ ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের ডিএসইএক্স সূচক রেকর্ড পরিমাণ কমে ৩৬০০ পয়েন্টের কাছাকাছি এসে দাঁড়ায়। সে অবস্থা ছিল এমন, যাকে বলে ফ্রি-ফল। বিশ্বের অন্যান্য দেশে শেয়ারসূচক একদিন নামলে হয়তো পরের দিন বাড়ে। কিন্তু বাংলাদেশের শেয়ারবাজার সাম্প্রতিক কালে শুধু নিচেই নেমেছে। ১৮ মার্চের পর শেয়ারের সম্ভাব্য ফ্রি-ফল রোধে অনেকেই ফিলিপাইনের মতো বাংলদেশেও পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়া পর্যন্ত মার্কেট বন্ধ রাখার পরামর্শ দেন। তারপর বিএসইসি মার্কেট বন্ধ না করে একটি উদ্ভাবনী ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে মার্কেটের অতিরিক্ত পতন রোধ করে। ১৯ মার্চ পূর্ববর্তী ৫ ট্রেডিং দিবসের ক্লোজিং প্রাইসের গড়কে রেফারেন্স বা ভিত্তিমূল্য ধরে তাকে সার্কিট ব্রেকারের সর্বনিম্ন মূল্য গণ্য করার নির্দেশনা দেয়া হয়। সে নির্দেশনার পর মাত্র কয়েক দিন মার্কেট খোলা ছিল। তারপর করোনা পরিস্থিতির অবনতির প্রেক্ষাপটে দেশব্যাপী লকডাউন ও সাধারণ ছুটির কারণে মার্কেট দুই মাসেরও বেশি সময় বন্ধ ছিল। করোনা পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়া সত্ত্বেও দীর্ঘদিন পর আবার শেয়ার মার্কেট চালু করা হয়েছে। যেহেতু ফ্লোর প্রাইস বেঁধে দেয়া হয়েছে, সেহেতু সূচক আরো কমার বা কোনো শেয়ারের দাম তার ১৯ মার্চের ক্লোজিং দরের নিচে নামার আপাতত সুযোগ নেই। তবে এতে সূচকের পতন রোধ করা গেলেও শেয়ারের ক্রেতা কতটা থাকবে, তা নিয়ে শঙ্কা রয়েছে। মার্কেট লিকুইডিটি অনেক কমে যেতে পারে। চাহিদা ও জোগানের পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়ার মাধ্যমে বাজারমূল্য নির্ধারণের স্বাভাবিক যে প্রক্রিয়া, তাতে কৃত্রিমভাবে হস্তক্ষেপের ফলাফল দেখার জন্য আমাদের আরো কিছুদিন অপেক্ষা করতে হতে পারে। তবে বাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থার ধারণা যে যেহেতু করোনা মহামারীর কারণেই এ দৈন্যদশা, তাই করোনা পরিস্থিতির উন্নতি হলেই মার্কেট ঠিক হয়ে যাবে, যখন কোনো কৃত্রিম সাপোর্টেরও আর প্রয়োজন হবে না। 

বাংলাদেশের শেয়ার মার্কেটের সাধারণ বিনিয়োগকারীরা বর্তমানে খুবই হতাশার মধ্যে আছেন। এমনিতেই দীর্ঘ সময় ধরে মন্দা মার্কেটে তারা নিজ পুঁজির বড় অংশ হারিয়েছেন। এবারের ঈদ সবার জন্যই নিরানন্দময় ছিল। তবে শেয়ার ব্যবসায়ীদের জন্য তা ছিল খুবই হতাশাজনক। এখন করোনার ফলে তারা যে কোম্পানির শেয়ারে বিনিয়োগ করে বসে আছেন, আগামী দিনে তার অবস্থা কী হবে তা নিয়ে শঙ্কার শেষ নেই। সেসব শেয়ারের দাম আদৌ কি আগের অবস্থায় ফিরবে? প্রত্যাশিত ডিভিডেন্ড কি তারা দিতে পারবে? কবে নাগাদ করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে? কবে পৃথিবীর অবস্থা আবার আগের মতো হবে? আদৌ কি হবে? করোনা-পূর্ববর্তী বিশ্ব আর করোনা-পরবর্তী বিশ্ব কি একই রকম থাকবে? এসব জটিল প্রশ্নের উত্তর হয়তো কারোরই জানা নেই। তবে এ-যাবত্ করোনার কারণে সংঘটিত তাণ্ডবে বিশেষজ্ঞরা পূর্বাভাস দিচ্ছেন যে করোনা পৃথিবীর অনেক কিছুতেই—অর্থনৈতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক ব্যবস্থায় পরিবর্তন ঘটাবে। ই-কমার্সের আরো বিকাশ ঘটবে, অনুজীব বিজ্ঞান খাতে আগ্রহ ও অর্থ বরাদ্দ বাড়বে, হেলথকেয়ার খাতসংশ্লিষ্ট কোম্পানির আয় বাড়বে, অর্থনীতির বিভিন্ন খাত-উপখাতের মধ্যকার ভারসাম্যে পরিবর্তন আসবে, ইত্যাদি আরো কত কী! এতসব জটিল সমীকরণের মাঝে পড়ে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের মনে হয়তো প্রশ্ন জাগবে, করোনা-পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের শেয়ারবাজার কীরূপ হবে? কোন খাতের শেয়ারদরে ঊর্ধ্বগতি হবে আর কোন কোন খাত মুখ থুবড়িয়ে পড়বে? এসব প্রশ্নের সরলরৈখিক কোনো উত্তর নেই। তবু নির্মোহ বিশ্লেষণের মাধ্যমে উপলব্ধি করা যেতে পারে সম্ভাব্য প্রকৃত অবস্থা। তার ভিত্তিতে নেয়া যেতে পারে সঠিক বিনিয়োগ স্ট্র্যাটেজি। সে বিশ্লেষণের জন্য প্রয়োজন বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অবস্থা, উত্পাদন কাঠামো এবং বিশ্ব বাণিজ্য ব্যবস্থায় দেশের সংশ্লিষ্টতার ধরন সম্পর্কে সম্যক ধারণা অর্জন।


আমরা সবাই জানি যে বাংলাদেশের রফতানি বাণিজ্য মূলত গার্মেন্টস তথা তৈরি পোশাকের ওপর নির্ভরশীল। রফতানির বাজারও মূলত দুটি—ইউরোপ আর আমেরিকা। গার্মেন্টসগুলো তাদের প্রয়োজনীয় সুতা, কাপড়, ডাইং, প্রিন্টিং ইত্যাদি কাজের জন্য টেক্সটাইল ও তদসংশ্লিষ্ট অ্যাকসেসরিজ ইন্ডাস্ট্রির ওপর নির্ভরশীল। সেসব টেক্সটাইল ও অ্যাকসেসরিজ ইন্ডাস্ট্রির আওতাভুক্ত অনেকগুলো কারখানা দেশের পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত। কিন্তু বর্তমানে করোনার কারণে ইউরোপ-আমেরিকা সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দীর্ঘদিন সেসব দেশের নাগরিকরা লকডাউনে ছিল। বর্তমানে লকডাউন কিছুটা শিথিল করা হলেও পরস্থিতি মোটেই স্বাভাবিক নয়। 


সহসা সে অবস্থার পরিবর্তন হওয়ার কোনো আশাও দেখা যাচ্ছে না। এরই মধ্যে প্রায় ৪০০ কোটি ডলারের তৈরি পোশাকের অর্ডার বাতিল হয়েছে বলে বিজিএমইএ জানিয়েছে। করোনা পরিস্থিতির ফলে এরই মধ্যে দেশের গার্মেন্টস রফতানি ব্যাপকভাবে কমে গেছে। এ অবস্থায় দেশের গার্মেন্টস আর টেক্সটাইল মিলগুলোর দশা আগামী দিনগুলোয় কী হতে পারে, তা সহজেই অনুমেয়। এমনিতেই তালিকাভুক্ত টেক্সটাইল মিলগুলোর অধিকাংশ লোকসানে রয়েছে বা সামান্য লাভের মধ্যে আছে, অন্তত তাদের নিজ হিসাব মোতাবেক। তাই পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে তাদের অবস্থা বোঝার জন্য সাধারণ জ্ঞানই যথেষ্ট। ঋণখেলাপি আর তারল্য সংকটে বেশ কিছুদিন ধরেই ভুগছে বাংলাদেশের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো। করোনার কারণে তাদের অবস্থা খারাপ বৈ ভালো হওয়ার কথা নয়। দেশের প্রধান রফতানি খাত তৈরি পোশাকের বাজার সংকুচিত হলে এবং সেই সঙ্গে ফরেন রেমিট্যান্স কমলে তার কুপ্রভাব নিশ্চিতভাবেই ব্যাংকগুলোর ওপর পড়বে। ব্যাংকের কমিশন তথা আয় কমবে। এয়ারলাইনস ইন্ডাস্ট্রির বড় অংশ দেউলিয়া হয়ে যেতে পারে। করোনার কারণে অর্থনীতি মন্দাক্রান্ত হলে তার প্রভাব দেশের নির্মাণ খাত, পর্যটন, হোটেল ব্যবস্থাপনা, পরিবহনসহ নানা দিকের ওপর পড়বে। এরই মধ্যে তা পড়েছেও। মানুষের কর্মসংস্থান না থাকলে আয়ও কমে যায়। তখন মানুষ বিলাসদ্রব্য আর এ মূহূর্তে আবশ্যক নয় এমন সব পণ্য ও সেবা ভোগের চিন্তা বাদ দেয়। তবে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য ও সেবার চাহিদা ঠিক রাখতে হয় জীবন রক্ষার তাগিদেই। আর সে কারণেই ওষুধ খাতের চাহিদা ঠিক থাকবে। বিদ্যুত্, পানি ও গ্যাস কোম্পানিগুলোর আয়ও তুলনামূলকভাবে ঠিক থাকবে।  করোনাভাইরাস থেকে বাঁচতে মানুষ ঘরে থাকছে, সোস্যাল ডিসট্যান্সিং করছে। সন্দেহভাজনরা হোম কোয়ারেন্টিনে থাকছে। সেসব কারণে মানুষের সার্বক্ষণিক সঙ্গী ইন্টারনেট তথা ইউটিউব, ফেসবুক, আর অনলাইন নিউজ পোর্টাল। এটা করোনা আসার আগেও ছিল। তবে করোনার কারণে সাধারণ মানুষের ইন্টারনেট ব্যবহারের মাত্রা অনেক গুণ বেড়ে গেছে। মানুষের এই নতুন অভ্যস্ততা আগামী দিনগুলোয় ইন্টারনেট প্লাটফর্ম আর ই-কমার্সের সঙ্গে জড়িত কোম্পানিগুলোর ব্যবসা বৃদ্ধিতে সহায়তা করবে বলে ধারণা করা যায়।

বাংলাদেশসহ বিশ্বের প্রায় সব দেশ বর্তমানে করোনার সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত। এ যুদ্ধের প্রধান অস্ত্র হচ্ছে অক্সিজেন সিলিন্ডার, ভেন্টিলেটর, মাস্ক, হ্যান্ড স্যানিটাইজারসহ ডাক্তার-নার্সদের ব্যবহার্য বিশেষ সুরক্ষা পোশাক। আর এসব পণ্যের উত্পাদন, বিতরণ আর বাজারজাতের সঙ্গে জড়িত ফার্মাসিউটিক্যাল ও কেমিক্যাল কোম্পানিগুলোর ব্যবসা যে তুঙ্গে, তা বলাই বাহুল্য। করোনা মহামারী শুরুর পর জ্বর, সর্দি, কাশির সাধারণ ওষুধ যেমন—প্যারাসিটামল, অ্যান্টিহিস্টামিন, অ্যান্টিম্যালেরিয়াল, এজিথ্রোমাইসিনের সংকট দেখা দেয় এবং তা অনেক চড়া মূল্যে বাজারে বিক্রি হয়। এর মাধ্যমে লিস্টেড ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানিগুলো আর্থিকভাবে কতটা লাভবান হয়েছে, তা পরবর্তী সময়ে তাদের ফিন্যান্সিয়াল রিপোর্টসে বোঝা যাবে।

পরিশেষে বলব, বিশ্বব্যাপী নতুন তাণ্ডব করোনাভাইরাস পরিস্থিতির ফলে ওষুধ, ইন্টারনেট, পাওয়ার, এসেন্সিয়াল প্রডাক্টস রিলেটেড কোম্পানিগুলো লাভবান হবে এবং অন্যান্য সেক্টর ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তাই সে বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে দেশের সাধারণ বিনিয়োকারীদের উচিত হবে তাদের কমনসেন্স প্রয়োগ করা এবং তদনুযায়ী নিজ বিনিয়োগ পোর্টফোলিও ঢেলে সাজানো।

লেখক: অতিরিক্ত সচিব (পিআরএল)


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন