শুক্রবার | জুলাই ১০, ২০২০ | ২৫ আষাঢ় ১৪২৭

শেষ পাতা

‘বডি কন্ট্রাক্টে’ যেতে গুনতে হয় ৫ লাখ টাকা

প্রাণঝুঁকি জেনেও লোভনীয় গন্তব্য লিবিয়া

তাসনিম মহসিন

একই দেশে মুখোমুখি একাধিক সরকার। বিরাজ করছে যুদ্ধাবস্থা। রয়েছে মানবপাচারকারী চক্রের সদস্যদের হাতে নির্দয়-নিষ্ঠুরভাবে খুন হওয়ার ঝুঁকিও। তবুও অবৈধ উপায়ে ইউরোপে অভিবাসনের জন্য ট্রানজিট পয়েন্ট হিসেবে গমনেচ্ছুদের কাছে এখনো আকর্ষণীয় গন্তব্য হয়ে আছে লিবিয়া। যদিও দেশটি হয়ে ইউরোপে যাওয়া শেষ পর্যন্ত অধরাই থেকে যায় অনেকের। প্রতিনিয়তই বৈধ-অবৈধ উপায়ে লিবিয়ায় যাচ্ছেন বাংলাদেশীরা। তাদের মধ্যে অন্তত ১০ শতাংশের আর কখনো ইউরোপে যাওয়া হয় না।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গিয়েছে, ঢাকা থেকে লিবিয়া হয়ে ইউরোপ যেতে স্বেচ্ছায় মানবপাচারের শিকার একেক বাংলাদেশীকে হাতবদল হতে হয় কমপক্ষে পাঁচবার। আর ইউরোপ পর্যন্ত বডি কন্ট্রাক্ট পদ্ধতিতে অবৈধ অভিবাসনে একেক বাংলাদেশীকে গুনতে হয় কমপক্ষে লাখ টাকা।

বাংলাদেশ থেকে এতদিন বিভিন্ন পন্থায় মানবপাচার হয়ে এসেছে। তবে গত কয়েক বছরে পাচারকারীরা নতুন এক পদ্ধতি চালু করেছেবডি কন্ট্রাক্ট। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, পদ্ধতিতে ইউরোপ যেতে আগ্রহী বাংলাদেশীদের শুধু দেহটি থাকলেই যথেষ্ট বলে দাবি করে পাচারকারীরা। তাদের ভাষ্যমতে, প্রয়োজনীয় নথি থেকে শুরু করে বাকি সব ব্যবস্থা করে দেবে দালাল চক্র।

২০১৫ সাল থেকে ইউরোপে অবৈধ অভিবাসনে সবচেয়ে আকর্ষণীয় রুট হয়ে উঠেছে লিবিয়া। দেশটিতে বর্তমানে বৈধ-অবৈধ কয়েকটি শাসন ব্যবস্থা এবং যুদ্ধ পরিস্থিতি থাকার কারণে সার্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা ঢিলেঢালা। তাই লিবিয়া দিয়েই ইউরোপে প্রবেশ অন্যান্য গন্তব্যের তুলনায় সহজ। তবে এতে ঝুঁকি অনেক বেশি নিতে হয়। শুধু ১০ শতাংশের ক্ষেত্রে ভিন্ন ঘটনা ঘটলেও বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ইউরোপে প্রবেশে সক্ষম হয় বাংলাদেশীরা।

জানা গিয়েছে, কয়েকটি পথ ধরে লিবিয়া হয়ে ইউরোপে প্রবেশ করে বাংলাদেশীরা। এর প্রথমটি হলো ঢাকা থেকে দুবাই হয়ে লিবিয়া। তারপর সেখান থেকে ইউরোপ। দ্বিতীয়টি হলো তুরস্ক হয়ে সরাসরি ইউরোপ প্রবেশের চেষ্টা করে ব্যর্থ হলে আবার লিবিয়া হয়ে যাওয়ার চেষ্টা। আরেকটি হলো দক্ষিণ সুদানের মরুভূমি থেকে লিবিয়া হয়ে ইউরোপ প্রবেশ।

পথগুলো দিয়ে গমনেচ্ছুরা ঢাকা পার করার সময় এসব বাংলাদেশীকে একটি চক্রের অধীনে রাখা হয়। এরপর দুবাই বা ইস্তাম্বুল অথবা সুদানে তাদের হস্তান্তর করা হয় দ্বিতীয় চক্রের হাতে। সেখান থেকে উড়োজাহাজে করে লিবিয়া যাওয়ার পর তৃতীয় চক্রের হাতে যায় বাংলাদেশীরা। সেখান থেকে নৌকায় উঠিয়ে দেয়ার পর চতুর্থ চক্র সর্বশেষ ইউরোপ নেমে পঞ্চম চক্রের হাতে পড়ে বাংলাদেশীরা। পথগুলো দিয়ে লিবিয়া পৌঁছতে জনপ্রতি - লাখ টাকা করে খরচ হয়।

প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী সব স্থানে অর্থ পরিশোধ করা না হলে অভিবাসনপ্রত্যাশীদের মুক্তিপণ অপহরণের মতো ঘটনাও ঘটে থাকে। আবার কখনো কখনো মানবপাচারকারী চক্রের হাতে নির্দয়-নিষ্ঠুর পরিণতি বরণ করে নিতে হয় অভিবাসনপ্রত্যাশীদের।

ত্রিপোলি ঢাকার কূটনৈতিক সূত্রে জানা গিয়েছে, ২৮ মে লিবিয়ার দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর মিজদাহতে কমপক্ষে ২৬ বাংলাদেশীকে গুলি করে হত্যা করে লিবিয়ান মিলিশিয়ারা। ঘটনার মূলে ছিল এসব বাংলাদেশীর অধৈর্য হয়ে ওঠা। ধারণা করা হচ্ছে, তাদের হয়তো আরো আগে ইউরোপের উদ্দেশে রওনা করানোর কথা ছিল। তবে পরিস্থিতির কারণে তা সম্ভব হয়ে না ওঠায় সেখানে দালালদের সঙ্গে হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। পরিপ্রেক্ষিতে তাদের সবাইকে গুলি করে হত্যা করা হয়। পাচারকারীদের কাছে সেখানে বাংলাদেশী ছাড়াও অন্য দেশের বেশকিছু নাগরিক আটক ছিল। তারা অক্ষত অবস্থায় রয়েছে।

বিষয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, ঘটনায় মুক্তিপণ আদায়ের লক্ষ্যে জিম্মিকারীরা অমানবিক নির্যাতন চালানোর সময় এক পর্যায়ে অপহূত ব্যক্তিদের হাতে মূল অপহরণকারী লিবীয় নাগরিক মারা যায়। এর প্রতিশোধ নিতে লিবীয় মিলিশিয়া বাহিনী অপহূতদের ওপর এলোপাতাড়ি গুলি চালায়, যাতে আনুমানিক ২৬ জন বাংলাদেশী নিহত হন। হাতে-পায়ে, বুকে-পিঠে গুলিবিদ্ধ হন আরো ১১ বাংলাদেশী।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বণিক বার্তাকে বলেন, লিবিয়ায় বৈধ সরকারের পতন হওয়ার পর ২০১৫ সালে প্রথম লিবিয়া যাওয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। তবে উচ্চ আদালতের এক আদেশের পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৬ সালের মে থেকে ক্ষেত্রবিশেষে লিবিয়া যাওয়ার ক্ষেত্রে অনাপত্তিপত্র দিতে থাকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। তারপর থেকেই লিবিয়া গমনের উদ্দেশ্যে অনাপত্তিপত্র সংগ্রহে ভিড় বাড়ে মন্ত্রণালয়ে। করোনা পরিস্থিতির কারণে মার্চের সরকারি ছুটি ঘোষণার আগে মন্ত্রণালয়ের কনস্যুলার শাখা থেকে দৈনিক ১০০ জন করে সেবা নিচ্ছিলেন। এর মধ্যে ৬৫-৭০ শতাংশই থাকত লিবিয়া গমনে অনাপত্তিপত্রের আবেদন। এক্ষেত্রে সার্বিক নথিপত্র যাচাই-বাছাই করে ব্যবস্থা নিতেন কর্মকর্তারা।

মন্ত্রণালয়ের ওই কর্মকর্তা জানান, লিবিয়া গমনে বাংলাদেশ থেকে ইউরোপ পর্যন্ত কয়েকটি সংঘবদ্ধ চক্র কাজ করে থাকে। একটি ঘটনার উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, চার বাংলাদেশী অনাপত্তিপত্র নিতে এলে নথি পর্যাপ্ত সন্তোষজনক না থাকায় তাদের আবেদন খারিজ করা হয়। এর কিছুদিন পরই তারা তুরস্ক হয়ে লিবিয়ার দিকে রওনা দেন। অনাপত্তিপত্র না থাকায় তুরস্কের ইমিগ্রেশন তাদের আটকে দেয়। পরবর্তী সময়ে মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে তুরস্ক থেকে তাদের ফেরত নিয়ে আসতে হয়। এখানে প্রশ্ন থেকে যায়, মন্ত্রণালয়ের অনাপত্তিপত্র ছাড়া মানুষগুলো বাংলাদেশের ইমিগ্রেশন পার করল কীভাবে?

জানা গেছে, বর্তমানে লিবিয়ায় তিনটি সরকার রয়েছে। এর একটি ত্রিপোলিভিত্তিক এবং জাতিসংঘ সমর্থিত জিএনএ সরকার। আরেকটি জেনারেল হাফতারের নেতৃত্বাধীন পূর্বাঞ্চলভিত্তিক সরকারি বাহিনী। আর তৃতীয়টি হচ্ছে মরুভূমিকেন্দ্রিক মিলিশিয়া বাহিনী। যেখানে ২৬ বাংলাদেশী নিহত হয়েছেন, সে মিজদাহ শহরে এখন যুদ্ধাবস্থা বিরাজমান। অঞ্চলটি এখন দুটি শক্তিশালী পক্ষের যুদ্ধক্ষেত্রের মধ্যে রয়েছে। কিছুদিন আগে ত্রিপোলিভিত্তিক জাতিসংঘ সমর্থিত জিএনএ সরকার অঞ্চলটি দখল করে নেয়। অন্যদিকে জেনারেল হাফতারের নেতৃত্বাধীন পূর্বাঞ্চলভিত্তিক সরকারি বাহিনী দুই দিন আগেও শহরটিতে বোমাবর্ষণ করেছে। এর আগ পর্যন্ত ত্রিপোলিভিত্তিক সরকারের অঞ্চলের ওপর নিয়ন্ত্রণ ছিল অত্যন্ত ক্ষীণ। বর্তমানে এমনকি ত্রিপোলি শহরেও বিরোধীপক্ষ মাঝেমধ্যে বোমাবর্ষণ করছে। দুটি শক্তিশালী পক্ষ যুদ্ধরত থাকায় এখানকার জীবনযাত্রা মোটেও স্বাভাবিক নয়। কারণে নিরাপত্তা ব্যবস্থা নাজুক। সীমান্ত নজরদারিও নেই বললেই চলে। ফলে পথ দিয়ে ইউরোপ পাড়ি দেয়া অন্য যেকোনো রুটের চেয়ে সহজ।

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন