রবিবার | জুলাই ১২, ২০২০ | ২৭ আষাঢ় ১৪২৭

সম্পাদকীয়

করোনার অর্থনৈতিক ক্ষতি কমাতে কিছু সুপারিশ

রকিবুল হক

বাংলাদেশের অর্থনীতির ধরনের সঙ্গে মার্কিন অর্থনীতির ধরনের খুব মিল আছে, সক্ষমতা বা আকারের সঙ্গে নয় কিন্তু, এই দুই অর্থনীতিরই মূল চালিকাশক্তি হলো ভোগব্যয়। আমাদের ইকোনমি মূলত ভোগের ওপর টিকে আছে। অর্থনীতির ভাষায় বললে, ‘পারচেজিং পাওয়ার’। লোয়ার মিডল ক্লাস (নিম্নমধ্যবিত্ত) থেকে শুরু করে আপার মিডল ক্লাসের (উচ্চমধ্যবিত্ত) এই ভোগই ইকোনমিকে গতিশীল রাখছে। যত ভোগ তত বিক্রি, যত বেশি বিক্রি তত বেশি উৎপাদন এবং তত বেশি লোকের কর্মসংস্থান। কাজেই এখানে এমন কোনো কর্মসূচি হাতে নেয়া যাবে না, যা ক্রয়ক্ষমতা কমিয়ে দেয়।

আমি কিছু আপাত শর্তকে মাথায় রেখেই এ বিষয়ে আলোচনা করব। শর্তগুলো হলো:

১. বাংলাদেশের রাজনৈতিক অবস্থা আপাতত পরিবর্তনের কোনো সম্ভাবনা নেই।

২. বাংলাদেশের উন্নয়ন মডেল মোটামুটি এ রকম, যা-ই হোক না কেন, উন্নয়ন হলেই হলো এবং এই উন্নয়ন হলো যেকোনো উপায়ে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি এবং তা জারি রাখা।

৩. পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি তার উৎপাদন খরচ অথবা জনগণের আয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

এবার মূল আলোচনায় আসা যাক। বেতন কমানো বা ক্রয়ক্ষমতা কমানোর কর্মসূচি ওয়েলফেয়ার ইকোনমির জন্য কিছুটা স্বাভাবিক প্রক্রিয়া হলেও আমাদের জন্য হবে ভয়াবহ ক্ষতিকর। ওয়েলফেয়ার ইকোনমি যেমন জার্মানি, কানাডা বা স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশগুলো তাদের জনগণের মৌলিক অধিকার যেমন শিক্ষা, চিকিৎসা, বাসস্থান, খাদ্য বা এ রকম আরো সেবা রাষ্ট্রীয়ভাবে সব নাগরিককে প্রদান করে এবং তা বিনা পয়সায় বা নামমাত্র মূল্যে। অবশ্য  জনগণকেও এজন্য অনেক আয়কর দিতে হয় বৈকি। আর সোস্যালিস্ট কিউবা তো হতে পারে যেকোনো দেশের জন্যই অনুকরণীয়। অন্যদিকে যদি মার্কিন অর্থনীতির কথা ধরি, সেখানে ফিকশনাল বেকারত্ব তাদের অর্থনীতির একটা বৈশিষ্ট্য আকারেই বিদ্যমান দীর্ঘদিন ধরে। এর অর্থনৈতিক ক্ষতির দিক তো আছেই, কিন্তু রাষ্ট্রের বা বেসরকারি উদ্যোগে তা মেটানোর চেষ্টাও সেখানে বিদ্যামান। অন্তত চাকরি হারানো কাউকে সমাজচ্যুত হওয়ার শঙ্কায় ভুগতে হয় না, যেটা আমাদের এখানে চাকরি হারানোর  চেয়েও বেশি পীড়াদায়ক।

এখন আমাদের দেশের চিত্র কী? বেঁচে থাকার প্রতিটা উপকরণ এখানে আমাদের কিনতে হবে এবং তা অতি উচ্চমূল্যে। হয়তো এখানে অনেকে আপত্তি তুলবেন। বলবেন, প্রাথমিক শিক্ষা ফ্রি, সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নামমাত্র মূল্যে দেয়া হয়, তাই না? এবং তা ঠিকও বটে, এগুলোর মানের কথা না-হয় না-ই বললাম। শুধু সেবা গ্রহণের যে অপরচুনিটি কস্ট (সুযোগ ব্যয়), তাও অনেক বেশি, মানে এডুকেশনের দিকে গেলে কাজে যাওয়া যায় না। তাই আয় কমে যায় আবার সরকারি চিকিৎসা খরচ কম হলেও তা নিতে একজনকে শহরে আসতে হয়, থাকতে হয়, ওষুধ ক্রয় করতে হয়, যার একটা বড় ব্যয় আছে। খুবই  সীমিত আকারে ভর্তুকি মূল্যে খাদ্য বিক্রির সরকারি প্রক্রিয়া বাদে বিপুল অংশের জনগণকে তাদের খাদ্য প্রায় পুরোটাই বাজারমূল্যে কিনে খেতে হয়। বাসস্থানের ব্যবস্থা করে নিতে হয় নিজেকেই, সে ফুটপাতে থাকার জন্য পুলিশ বা মাস্তানকে টাকা দেয়াই হোক, আর দশ ফুট বাই দশ ফুট ঘর দশজনে মিলে ভাড়া নেয়াই হোক- প্রায় সব ক্ষেত্রেই চালু আছে এক স্বীকৃত বা অস্বীকৃত কেনাবেচা। এই কেনাবেচাই এখনকার অর্থনীতি এবং এর চালিকাশক্তি। এখন ধরুন বেতন কমানো হলো, কিন্তু বাকি সব অবস্থা আগের মতোই থাকল, তাহলে একজন নাগরিককে তার আয়ের পুরোটাই ব্যয় করতে হবে মৌলিক চাহিদার পেছনে। মানে বেঁচে থাকার জন্য, কারণ কোনো পণ্যের দাম কমানোর নিকট সম্ভাবনা যেহেতু নেই। ফলে তার অন্য সবকিছু কেনা থেকে সে বিরত থাকতে বাধ্য হবে।

আর এই অন্য সব কেনাকাটাই আমাদের অর্থনীতি। একটু বেশি কাপড় কেনা বা ভালো কাপড় কেনা, একটু বিনোদন, একটা ফার্নিচার কেনা বা এ রকম হাজারো কিছু কেনা তাকে একেবারে বন্ধ করে ফেলতে হবে। ফলে ওইসব সেক্টরের বিক্রি কমে যাবে, বিক্রি কমে যাওয়ায় মুনাফা কমে যাবে। ফলে লোকে চাকরি হারাবে। চাকরি হারালে লোকের আয় কমে যাবে। এতে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা আরো কমে যাবে। শেষমেশ যেটা হবে, বিপুল পরিমাণ লোক দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যাবে। এই দুষ্টচক্রে একবার পড়লে তা থেকে বের হওয়াটা অনেক কঠিন হবে।

মনে রাখতে হবে আমাদের দেশের সিংহভাগ কর্মসংস্থান হয় অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে। আর যার প্রায় পুরোটাই বলা যায় একজন মানুষের জীবনধারণের  আবশ্যকীয় প্রয়োজনের বাইরের কিছু। গ্রামীণ ক্ষুদ্র দোকান, অটো চালানো, এমনকি বাদাম বিক্রি বা ফুটপাতে মনিহারি দোকান, হোটেল-রেস্তোরাঁয় কাজ, রঙমিস্ত্রি,  কাঠুরে, কামার-কুমার, ট্যুরিজম খাতের নানা কাজ এ রকম অপ্রাতিষ্ঠানিক সেক্টরেই মোট কর্মজীবীর সিংহভাগ কাজ করেন। সবচেয়ে দুঃখজনক হলো, কৃষি, যা এখনো একক সর্বোচ্চ কর্মসংস্থানের খাত, তা এখানে অপ্রাতিষ্ঠানিক খাত হিসেবেই রয়ে গেছে। কৃষি বাদে বাকি সব অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের কেনাবেচা স্বাভাবিক থাকে, যখন মধ্যবিত্ত বা উচ্চমধ্যবিত্তের হাতে তার মৌলিক চাহিদা পূরণের পরেও খরচ করার মতো টাকা থাকে। যখন নিম্নমধ্যবিত্ত থেকে উচ্চমধ্যবিত্ত সবাই বেতন কর্তনের শিকার হবে বা একটি অংশ চাকরি হারাবে, তখন তার হাতে উদ্বৃত্ত টাকার সংস্থানও কমে যাবে। ফলে এসব খাতের কেনাবেচা বন্ধ হবে বা প্রকটভাবে কমে যাবে। দেশ প্রকৃত অর্থেই মন্দায় পড়বে এবং তা দীর্ঘস্থায়ীও হবে।

এই করোনাকালীন স্থবিরতা থেকে বাঁচার জন্য কোনো সেক্টরের বেতন কমানো বা কর্মী ছাঁটাইয়ের তো প্রশ্নই ওঠে না; বরং আরো বেশি করে কর্মসংস্থান সৃষ্টিই কেবল দ্রুততম উত্তরণের একমাত্র পথ।

এজন্য অবশ্য সরকারকে কিছু তদারক করতে হবে। নয়া উদারনীতির পথ ছেড়ে জনবান্ধব অর্থনীতির পথ ধরতে হবে। যেমন, ১. সরকার এক দশক ধরে ব্যাংকিং খাত থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ ঋণ নিয়ে নিজেই অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগ করে যে ক্রাউডিং আউট ইফেক্ট তৈরি করেছে, যার ফলে বেসরকারি খাত বিনিয়োগের জন্য যথেষ্ট অর্থ জোগান পাচ্ছে না, এ অবস্থা থেকে বের হয়ে আসতে হবে। বেসরকারি বিনিয়োগ যেন সরকারি বিনিয়োগের কারণে বাধাগ্রস্ত না হয়, সেটা নিশ্চিত করতে হবে।

২. আমাদের রেডিমেড গার্মেন্ট খাত, যা আসলে ইউরোপ, আমেরিকার মধ্যবিত্ত বা নিæবিত্তের পোশাক তৈরি করে, তার অর্ডার সাময়িকভাবে কমলেও আসলে তা খুব একটা কমার কোনো কারণ নেই। যদি ধরে নেই ‘উন্নত’ বিশ্বের আয় কমে যাবে এবং সেখানে মানুষের ক্রয়ক্ষমতাও কমে যাবে, তাহলে তারা আরো বেশি কম দামি পোশাক কিনবে; যা আমাদের গার্মেন্ট খাতের অর্ডার বাড়াবে বৈ কমাবে না। ফলে এ খাতে করোনার অজুহাতে বেতন কমানোর বা শ্রমিক ছাঁটাই করে কম মজুরিতে আবার শ্রমিক নিয়োগের পাঁয়তারা বন্ধ করার পদক্ষেপ নিতে হবে।

৩. খাদ্যসামগ্রী যেমন চাল উৎপাদনে আমরা স্বয়ংসম্পূর্ণ এবং সারা বিশ্বে মাছ চাষেও তৃতীয়, সবজিও প্রয়োজনীয় পরিমাণে উৎপাদন হয়। এর বাইরেও বিশাল সমুদ্র রয়েছে, যেখান থেকে প্রচুর মাছ আহরণ সম্ভব। মোট কথা, প্রায় ১৮ কোটি মানুষের খাদ্য অভ্যন্তরীণ উৎস থেকেই জোগান দেয়া সম্ভব। প্রয়োজন শুধু সিস্টেম লস ও সিন্ডিকেটের মাধ্যমে মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণে রাখা। পর্যাপ্ত আধুনিক গুদামজাতের ব্যবস্থা করা, যাতে উদ্বৃত্ত খাদ্য নষ্ট না হয়। তাছাড়া আধুনিক কৃষিপণ্য প্রক্রিয়া করে ব্যবসাকে আরো উদ্বুদ্ধ করা যেতে পারে।

৪. ব্যাংকিং খাতের সব রাজনৈতিক খেলাপি ঋণের আদায় নিশ্চিত করতে হবে। অন্তত আমরা যদি ধরেও নিই যে প্রাথমিক পুঁজি পুঞ্জিভূত করার স্তরে বাংলাদেশ রয়েছে, যেটা এখানে লুটপাটের বৈধতা দেয়ার জন্য অনেকেই ব্যবহার করেন যে উন্নয়নের প্রাথমিক স্তরে এমনটা সব দেশেই হয়, তাহলে এটাও মনে রাখতে হবে যে ক্ল্যাসিকাল পুঁজিবাদী রাষ্ট্রে বা উন্নত রাষ্ট্রে বাংলাদেশকে রূপান্তর করতে হলে সেসব রাষ্ট্রের মতো লুটপাটের টাকা দেশেই যাতে বিনিয়োগ হয়, সে ব্যবস্থাও করতে হবে। এটা উন্নত রাষ্ট্র হতে চাওয়ার প্রাথমিক শর্তের মতোই অনেকটা।

৫. রফতানিতে বৈচিত্র্য আনতে হবে। রেডিমেড গার্মেন্টের বাইরে আমাদের সবচেয়ে বেশি রফতানি আয় আনা সম্ভব যে পাটজাত পণ্যের মাধ্যমে, তার দিকে নজর দিতে হবে। এক্ষেত্রে বিশেষভাবে উলে­খযোগ্য, পাট থেকে পলিথিন তৈরির যুগান্তকারী আবিষ্কারের কথা। এই এক পণ্য দিয়েই আমাদের অর্থনীতি অনেক শক্তিশালী হতে পারে।

৬. অপ্রয়োজনীয় পণ্যের আমদানি খরচ কমাতে হবে। যেমন পারমাণবিক রিঅ্যাক্টর,  বিলাসবহুল গাড়ি ইত্যাদি।

৭. যেসব রফতানি খাত মূলত বিদেশী কাঁচামালনির্ভর, তার কাঁচামাল যেন দেশেই উৎপাদন করা হয়, এক্ষেত্রেও গার্মেন্ট শিল্পের কথা ধরা যায়।

মোদ্দাকথা, যদি দুর্নীতির লাগাম টানা যায় এবং দেশ থেকে টাকা পাচার রোধ করা যায়, তাহলে আমি মনে করি, আমাদের অর্থনীতির কিছুই হবে না এই করোনায়। উপরন্তু, চীন থেকে অনেক ব্যবসা সরে আসবে, আমরা সেটাকে কাজে লাগাতে পারলে অর্থনীতি আগের চেয়েও আরো শক্তিশালী হবে।

লেখক: অর্থনীতি গবেষক

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন