শুক্রবার | জুলাই ১০, ২০২০ | ২৬ আষাঢ় ১৪২৭

ফিচার

করোনাভাইরাসের রহস্যময় ‘নীরব’ সংক্রমণ

বণিক বার্তা ডেস্ক

নভেল করোনাভাইরাসের সংক্রমণজনিত মহামারী কভিড-১৯ নিয়ে বিশ্বব্যাপী সংকট যতই বাড়ছে বিজ্ঞানীরাও এ নিয়ে বিস্ময়কর ও উদ্বেগজনক তথ্য-প্রমাণ ততই বেশি জড়ো করতে পারছেন। যদিও সংক্রমণের উপসর্গ নিয়ে ধাঁধাঁর জট খুলছেই না। অনেকেই কভিড-১৯ সংক্রমণের উপসর্গ হিসেবে জ্বর, সর্দি, কার্শি এবং স্বাদ ও গন্ধ গ্রহণের ক্ষমতা কমে যাওয়ার কথা বলেন। কিন্তু অনেকের মধ্যেই কোনো উপসর্গই দেখা যায় না এবং তারা বুঝতেই পারেন না যে কভিড-১৯ আক্রান্ত হয়েছেন।

গবেষকরা বলছেন, এটা জানা খুবই গুরুত্বপূর্ণ যে উপসর্গ আছে এমন ব্যক্তি দ্বারা কতজন আক্রান্ত হচ্ছেন এবং কতজন আক্রান্ত হচ্ছেন ‘নীরবে’, উপসর্গহীন রোগীর দ্বারা। 

গত ১৯ জানুয়ারি সিঙ্গাপুরের একটি গির্জায় যখন কতগুলো মানুষ জড়ো হলেন তখন কেউই ভাবতে পারেননি যে এই সম্মেলনটি নভেল করোনাভাইরাস ছড়ানোর ক্ষেত্রে এতটা বড় প্রভাব ফেলবে। রোববারের এই ধর্মসভায় অন্যদের মধ্যে ছিলেন এক দম্পতি, যাদের দুজনেরই বয়স ৫৬ এবং ওইদিন সকালেই এসেছেন চীন থেকে।

দুজনই নিজেদের আসনে বসলেন এবং তাদের স্বাস্থ্য দেখে কেউই মনে করেননি যে তারা ভাইরাস বহন করতে পারেন। ওই সময় পর্যন্ত করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার অন্যতম উপসর্গ ছিল কাশি এবং ধারণা করা হতো, কাশির মাধ্যমেই এটি ছড়িয়ে থাকে। রোগটির কোনো উপসর্গ দেখতে না পাওয়ার মানে এটি ছড়ানোর সম্ভাবনাও নেই।

গির্জায় ধর্মীয় কর্মসূচি শেষ হওয়ার পরপরই চীনা দম্পতি চলে গেলেন। কিন্তু খুব শিগগিরই ঘটনা এমনভাবে মোড় নিল যা দ্বিধাদ্বন্দ্বেরও জন্ম দিল। ২২ জানুয়ারি স্ত্রীর মধ্যে অসুস্থতা দেখা দিতে শুরু করে, দুদিন পর তার স্বামীও। তারা যেহেতু করোনাভাইরাসের উৎপত্তিস্থল উহান থেকে এসেছেন তাই অসুস্থ হওয়াটা কাউকে অবাক করেনি। 

পরের সপ্তাহে তিনজন স্থানীয় নাগরিকও কোনো কারণ ছাড়াই অসুস্থ হয়ে পড়েন, যা কিনা সিঙ্গাপুরের ক্ষেত্রে নভেল করোনাভাইরাস নিয়ে প্রথম পরীক্ষার মুখোমুখি হওয়া। তখনই কারণ খোঁজাও শুরু হয়ে গেল যে কীভাবে করোনাভাইরাস সফলভাবে নতুন শরীরে প্রবেশ করতে পারে।

সিঙ্গাপুর স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সংক্রামক রোগ বিভাগের প্রধান ডা. ভারনন লি বলেন, ‘আমরা পুরোপুরি কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে যাই।’ তিনি জানান, অসুস্থতার কোনো লক্ষণ না থাকলেও যেসব মানুষ একে অপরকে চেনেন না তারাও একে অন্যকে সংক্রমিত করতে পারেন। তখন কভিড-১৯ নিয়ে মানুষের যে জ্ঞান তাতে সিঙ্গাপুরের ওইসব মানুষের আক্রান্ত হওয়ার কোনো অর্থ খুঁজে পাননি তারা।

সিঙ্গাপুরে তখন থেকেই শুরু হয়ে যায় সাঁড়াশি অভিযান। ডা. লি ও তার সহকর্মী বিজ্ঞানী, পুলিশ কর্মকর্তা ও অবস্থান শনাক্তকরণ বিশেষজ্ঞদের নিয়ে এক অনুসন্ধানের সূচনা করা হয়। আক্রান্ত ব্যক্তিরা কোথায় কখন অবস্থান করছিলেন তার বিস্তারিত তথ্য খুঁজে বের করে আনেন তারা। সিঙ্গাপুরে তখনই ‘কন্টাক্ট ট্রেসিং’ প্রযুক্তি ব্যবহৃত হয়, যা কিনা এখন যুক্তরাজ্যে ব্যবহৃত হচ্ছে। প্রাদুর্ভাবের সঙ্গে জড়িত প্রত্যেককে খুঁজে বের করার মধ্য এটিকে ছড়ানোর আগেই থামিয়ে দেয়ার জন্য এটি দারুণ এক পদ্ধতি। এ কাজে সিঙ্গাপুরের মুন্সিয়ানার কথা সবারই জানা। তারা দ্রুতগতিতে এ কাজটি করেছে। 

এরপর খুব কম সময়ের মধ্যেই তদন্তকারীরা গির্জায় আসা-যাওয়া করা ১৯১ জনের সঙ্গে কথা বলেন এবং রোববার গির্জায় হাজির থাকা ১৪২ জনকে শনাক্ত করেন। দ্রæতই তারা এটাও জানতে পারলেন, যে দুজন সিঙ্গাপুরিয়ান আক্রান্ত হয়েছেন তারা চীনা দম্পতির সঙ্গে ওইদিন গির্জায় ছিলেন। ডা. লি বলেন, ‘গির্জার অনুষ্ঠানের সময় তারা হয়তো একে অপরের সঙ্গে কথা বলেছেন, শুভেচ্ছা বিনিময় করেছেন।’

মূল উপসর্গ ছাড়াও কভিড-১৯ কীভাবে একজন থেকে আরেকজনের দেহে ছড়াতে পারে সেটি উপলব্ধির জন্য এ ঘটনাটি হতে পারে উৎকৃষ্ট এক উদাহরণ। দুজন চীনা নাগরিকের মধ্যে করোনার কোনো উপসর্গ না থাকলেও কীভাবে তারা গির্জায় অবস্থানকালে অন্যদের মধ্যে রোগটি ছড়িয়ে দিলেন, সেই প্রশ্নের উত্তর মিলছে না এখনো। 

এটা বিরাট এক ধাঁধাঁও। সিঙ্গাপুরের তৃতীয় ব্যক্তি হিসেবে ৫২ বছর বয়সী এক নারী আক্রান্ত হলেন, যিনি রোববার গির্জার সেই অনুষ্ঠানে অংশ নেননি। তবে হ্যাঁ, ওইদিন একই গির্জায় পরের আরেক ধর্মসভায় তিনি অংশ নেন। তাহলে কীভাবে তিনি ভাইরাসটি দ্বারা আক্রান্ত হলেন?

সিঙ্গাপুরের তদন্তকারীরা আশ্চর্যজনকভাবেই দেখতে পেলেন, চীনা দম্পতি যে সিট দুটিতে বসেছিলেন, পরের অনুষ্ঠানে গিয়ে সিঙ্গাপুরের নারীটি তারই একটি সিটে বসেন এবং আক্রান্ত হন! ভিডিও ফুটেজ থেকে এটি দেখতে পেয়ে কর্মকর্তারা যেন বিশ্বাসই করতে পারছিলেন না। 

যাই হোক, অসুস্থতার লক্ষণ কিংবা কোনো উপসর্গ ছাড়াই চীনা দম্পতি কভিড-১৯ ছড়িয়েছেন। হয়তো ভাইরাস তাদের হাতে ছিল এবং তারা হাত দিয়ে সিট স্পর্শ করেছেন কিংবা তাদের শ্বাসপ্রশ্বাসের মাধ্যমে বের হওয়া ভাইরাস সিটে লেগে ছিল। কোনো কিছুই পরিষ্কার নয়। তবে এ ঘটনার প্রভাব ছিল অনেক অনেক।

পরে দেখা গেল, উপসর্গ-পূর্ব সংক্রমণও হয়ে থাকে। উপসর্গ না থাকায় একজন মানুষ জানতেই পারলেন না যে তিনি আক্রান্ত, কিন্তু তিনি অন্যদের মধ্যে রোগটি ছড়িয়ে চলেছেন। গবেষণায় দেখা যায়, যাদের মধ্যে রোগের উপসর্গ দেখা যায় তারাও উপসর্গ প্রকাশ পাওয়ার ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টার আগে থেকেই এটি ছড়াতে সক্ষম এবং তারা খুব বেশি মাত্রায় সংক্রামক হয়ে উঠতে পারেন। 

সূত্র: বিবিসি

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন