শনিবার | জুলাই ১১, ২০২০ | ২৬ আষাঢ় ১৪২৭

আন্তর্জাতিক খবর

বিশ্বের মানচিত্র পাল্টে দিয়েছিল যে গাছ

বণিক বার্তা ডেস্ক

বর্তমানে বিপন্ন এক বুনো গাছের বাকলই এক সময় হয়ে উঠেছিল ম্যালেরিয়া রোগের ওষুধের উৎস। আন্দিজ রেইনফরেস্ট অঞ্চলের গভীর থেকে আহরিত এ বৃক্ষজাত ওষুধ হাইড্রোক্সিক্লোরোকুইন এখন বিশ্বব্যাপী মহাবিতর্কের কেন্দ্রে।

দক্ষিণ-পশ্চিম পেরুর যে অঞ্চলে আন্দিজ ও আমাজনের অববাহিকা মিলিত হয়েছে সেখানেই সবুজের গালিচার ওপর ১ দশমিক ৫ মিলিয়ন হেক্টর জায়গা নিয়ে মানু ন্যাশনাল পার্ক। এর আশেপাশের আরো বহুদূর পর্যন্ত প্রকৃতির এক রহস্যময় অঞ্চল, যেখানে অনেক জায়গায় হয়তো কখনো মানুষের পদচিহ্নও পড়েনি। এখানেই কোথাও কোথায়ও দেখা যায় প্রায় ১৫ মিটার লম্বাটে ‘সিনকোনা অফিসিনালিস’ গাছ।

আন্দিজ পর্বতের পাদদেশের মানুষের কাছে এটি খুবই পরিচিত এক গাছ। এটি ঘিরে রয়েছে অনেক রূপকথা। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মানুষের ইতিহাসকে বদলে দিয়েছে বৃক্ষটি।

পেরুভিয়ান আমাজন অঞ্চলের মাদ্রে দে দিওস অঞ্চলে জন্ম ও বেড়ে ওঠা নাতালি ক্যানালেস বর্তমানে ডেনমার্ক ন্যাশনাল মিউজিয়ামের জীববিজ্ঞানী হিসেবে কাজ করছেন। সিনকোনা গাছ নিয়ে তিনি বলেন, ‘এটা হয়তো খুব সুপরিচিত গাছ নয়। কিন্তু এ গাছের উপাদানে তৈরি একটি মিশ্রণ মিলিয়ন মিলিয়ন মানুষকে বাঁচিয়ে দিয়েছে।’

সিনকোনা গাছের জেনেটিক ইতিহাস খুঁজে চলেছেন ক্যানালেস। তিনি জানান, এ গাছের বাকল থেকেই বিশ্ব প্রথম পায় কুইনাইন, যা ম্যালেরিয়ার প্রথম ওষুধ হিসেবে সমাদৃত। কুইনাইনের আবিষ্কার নিয়ে বিশ্বজুড়ে শিহরণ যেমন ছিল, তেমনি ছিল সন্দেহও। এ গাছ থেকে কাঁচামাল নিয়ে উৎপাদিত ওষুধ হাইড্রোক্সিক্লোরোকুইন নিয়ে এখন তুলকালাম চলছে। যুক্তরাষ্ট্র প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ম্যালেরিয়ার এ ওষুধকে নভেল করোনাভাইরাসের জন্য কার্যকর ওষুধ হিসেবে ঘোষণা দিয়েছেন এবং তিনি প্রতিদিন একটি করে হাইড্রোক্সিক্লোরোকুইন সেবন করেন বলেও জানিয়েছেন। এমনকি এই ওষুধটির জন্য তিনি ভারতকে হুমকিও দিয়েছেন, কারণ ভারতেই এর উৎপাদন সবচেয়ে বেশি। যদিও সম্প্রতি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ঘোষণা দিয়েছে, কভিড-১৯ রোগের জন্য হাইড্রোক্সিক্লোরোকুইন ব্যবহার নিরাপদ নয়।

উনিশ শতকে বিশ্বজুড়ে ইউরোপীয় কলোনিগুলোয় ম্যালেরিয়ার প্রকোপ বাড়তে থাকলে সিনকোনার চাহিদাও বাড়তে থাকে। ‘ম্যালেরিয়া সাবজেক্টস’ বইয়ের লেখক ড. রোহান দেব রায় জানান, বিশ্বকে শাসন করার জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণে কুইনাইন মজুদ করাটা সে সময় বেশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। সিনকোনার ছাল হয়ে ওঠে বিশ্বের সবচেয়ে মূল্যবান পণ্য।

দেব রায় বলেন, কলোনিয়াল যুদ্ধে ইউরোপিয়ান সৈন্যরা হরহামেশাই ম্যালেরিয়ায় মারা যেত। বিশেষ করে ট্রপিক্যাল অঞ্চলের কলোনিতে টিকে থাকা ও যুদ্ধে জয়লাভের ক্ষেত্রে সৈন্যদের সাহায্য করেছে কুইনাইন।

দেব রায়ের মতে, ডাচরা ইন্দোনেশিয়ায়, ফরাসিরা আলজেরিয়ায় এবং ব্রিটিশরা ভারত, জ্যামাইকা, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও পশ্চিম আফ্রিকায় সিনকোনা ব্যবহার করেছে। ১৮৪৮ থেকে ১৮৬১ সালের মধ্যবর্তী সময়ে ব্রিটিশরা বর্তমান বিনিময় হারের হিসাবে তখন প্রতি বছর ৬৪ লাখ পাউন্ড ব্যয় করে সৈন্যদের জন্য সিনকোনা আমদানি করতো। এ কারণে কুইনাইনকে অনেক ইতিহাসবিদ ‘সাম্রাজ্যবাদের অস্ত্র’ হিসেবে দেখছেন, যে অস্ত্র ব্যবহার করে দুনিয়াজোড়া বিস্তৃতি লাভ করে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য।

কিংবদন্তি বলে, ১৬৩১ সালে ম্যালেরিয়ার প্রতিষেধক হিসেবে কুইনাইন আবিষ্কার হয়। তখন পেরুর ভাইসরয়ের স্প্যানিশ স্ত্রী কাউন্টেস অব সিনকোনা প্রচণ্ড জ্বরে আক্রান্ত হন, পাশাপাশি তার শরীর মাঝে মধ্যে ঠাণ্ডা হয়ে যেত; যা কিনা ম্যালেরিয়ার মূল উপসর্গ। তাকে সুস্থ করে তুলতে মরিয়া ভাইসরয় স্ত্রীকে জেসুইট পাদ্রীদের দেয়া একটি ওষুধ খাওয়ান, যা তৈরি হয় আন্দিজ অঞ্চলের বিশেষ একটি গাছ, লবঙ্গ, গোলাপ পাতার সিরাপ ও অন্যান্য কিছু গাছের উপাদান দিয়ে। এ ওষুধটি খেয়ে সুস্থ হয়ে ওঠেন ভাইসরয়-পত্নী এবং অলৌকিকভাবে তাকে বাঁচিয়ে দেয়া এ গাছটির নামকরণ করা হয় তার সম্মানেই: সিনকোনা। আজ এটি পেরু ও একুয়েডরের জাতীয় বৃক্ষ।

মশাবাহিত ম্যালেরিয়া শতাব্দীর পর শতাব্দী বিশ্বব্যাপী মানুষকে ভুগিয়েছে। এটি রোমান সাম্রাজ্যকে দুমড়ে মুচড়ে দিয়েছিল। বিংশ শতকেও প্রাণ কেড়ে নিয়েছিল ১৫ থেকে ৩০ কোটি মানুষের। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, এখন বিশ্বের অর্ধেকেরও বেশি মানুষ যেখানে বসবাস করে সেখান এক সময় ভয়াবহ দাপট দেখিয়েছে ম্যালেরিয়া।

সূত্র: বিবিসি

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন