বুধবার | জুলাই ১৫, ২০২০ | ৩১ আষাঢ় ১৪২৭

প্রথম পাতা

এশিয়ায় আতঙ্ক বাড়াচ্ছে গুজব ও ভুয়া খবর

বণিক বার্তা ডেস্ক

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নামসর্বস্ব কিছু অনলাইন মিডিয়ার কারণে ছড়িয়ে পড়া ভুয়া খবর গুজব এখন ভয়ংকর বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। অবস্থা এমন যে খবরের চেয়ে গুজবই এখন বেশি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। ভুল তথ্য মিথ্যা খবর এশিয়ায় নভেল করোনাভাইরাস নিয়ে মানুষের আতঙ্ক আরো বাড়িয়ে দিচ্ছে।

এশিয়ায় চীনের বাইরে অন্যান্য দেশের সরকার করোনা প্রতিরোধে লকডাউন জারি করতে শুরু করে গত ফেব্রুয়ারিতে। সে সময় থেকে এখন পর্যন্ত এশিয়ায় লকডাউন-সম্পর্কিত অন্তত ১৫০টি প্রতিবেদন করেছে এএফপি। এসব প্রতিবেদন পর্যালোচনায় দেখা যায়, ভিন্ন ভিন্ন শ্রেণীর মানুষ ভিন্ন ভিন্ন অভিপ্রায়ে গুজব ছড়ায়। কারো কারো উদ্দেশ্য সরকারকে হেয়প্রতিপন্ন করা। কেউ আবার ধর্মীয় বিভেদ বাড়িয়ে দিতে চায়। কেউ আবার নিছক মজার ছলেই ভুয়া খবর ছড়িয়ে দেয়।

দেশে দেশে গুজব

গত এপ্রিলে ফিলিপাইনে ফেসবুকে একটি গুজব ছড়িয়ে পড়ে। এতে বলা হয়, করোনার সংক্রমণ প্রতিরোধে মানুষের চলাচল নিয়ন্ত্রণে স্থাপিত একটি চেকপোস্ট অমান্য করে যাওয়ার সময় একজন মোটরসাইকেল চালককে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। -সংক্রান্ত একটি ভিডিও ছড়িয়ে দেয়া হয় অন্তর্জালে। মুহূর্তেই ভিডিওটির ভিউয়ারের সংখ্যা কয়েক লাখ ছাড়িয়ে যায়। তবে প্রকৃত বিষয় হলো, ভিডিওটি ছিল পুলিশের প্রশিক্ষণ চলাকালীন একটি মহড়ার।

ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পর কিছু দর্শক ঘটনায় ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানায়। এমনিতেই মাদকবিরোধী অভিযান নিয়ে ফিলিপাইনের প্রেসিডেন্ট রদ্রিগো দুতার্তের কঠোর অবস্থান নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। এসব অভিযানে বিচার-বহির্ভূত বেশকিছু হত্যাকাণ্ড ঘটেছে, যার বিরুদ্ধে মানবাধিকার সংস্থাগুলো সোচ্চার। অবস্থায় পুলিশের ওই মোটরসাইকেল চালককে হত্যার ঘটনা বিতর্ক আরো উসকে দেয়। এছাড়া ফিলিপাইনে আরো যেসব গুজব ছড়িয়েছে, সেগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো চিকিৎসকদের পক্ষ থেকে লকডাউনের মেয়াদ বাড়ানোর পরামর্শ দেয়ার খবর।

এদিকে থাইল্যান্ডে কঠোর লকডাউন আরোপের পর ফেসবুকে একটি ভিডিও ছড়িয়ে দেয়া হয়। এতে দেখা যায়, মালয়েশিয়ার একটি সুপারমার্কেটে হন্যে হয়ে পণ্য কিনছেন আতঙ্কিত ক্রেতারা। থাইল্যান্ডে ফেসবুক ব্যবহারকারীদের মধ্যে মুহূর্তেই ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ে। তারা এমনও মন্তব্য করে যে থাইল্যান্ডেও মালয়েশিয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।

আসলে ওই ভিডিওর ঘটনাটি মালয়েশিয়ারই ছিল না। সেটি ছিল ব্রাজিলের একটি সুপারমার্কেটে ব্ল্যাক ফ্রাইডে উপলক্ষে চলা ছাড়ের সময় ক্রেতাদের ভিড়ের ছবি।

আমাদের দক্ষিণ এশীয় দেশ পাকিস্তানে সম্প্রতি লকডাউনের বিধিনিষেধ কিছুটা শিথিল করা হয়েছে। অবস্থায় একটি ভিডিও অন্তর্জালে ছড়িয়ে দেয়া হয়, যেটি একটি দোকানের দৃশ্য বলে দাবি করা হয়। ভিডিওতে দেখা যায়, ওই দোকানের ক্রেতারা দিগ্বিদিকশূন্য হয়ে পালিয়ে যাচ্ছে। কারণ তারা জানতে পেরেছে, লকডাউন উপেক্ষা করায় সেখানে অভিযান চালানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে পুলিশ।

আসলে ঘটনাটি ছিল ২০১৫ সালে একটি পতিতালয়ে পুলিশের অভিযানের। অনেক পাকিস্তানিই ধরতে পেরেছে যে ভিডিওটি পুরনো ঘটনার। তবে ততক্ষণে ভিডিওটি ফেসবুক, টুইটার, ইউটিউব হোয়াটসঅ্যাপে লাখ লাখবার দেখা হয়ে গেছে।

ভ্রান্ত খবর ছড়িয়ে দেয়ার নজির রয়েছে ভারতেও। এমনিতেই সাম্প্রতিক সময়ে দেশটিতে ধর্মীয় ইস্যুতে উত্তেজনাকর পরিস্থিতি দেখা গেছে। এর মধ্যেই লকডাউন চলাকালে একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে, যাতে দাবি করা হয় যে ইসলামী চরমপন্থীরা একজন হিন্দুকে কুঠার দিয়ে আঘাত করে মেরে ফেলছে। আসলে ভিডিওতে যেটি দেখানো হয়েছে, সেটি ছিল পাকিস্তানের একটি ঘটনা। সেটিকেই রংচং মাখিয়ে গ্রাফিক্যাল প্রেজেন্টেশনের মাধ্যমে ধর্মীয় আবেগে আঘাত হানার মাধ্যমে দাঙ্গা উসকে দেয়ার চেষ্টা চালানো হয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা কী বলেন?

ইউনিভার্সিটি অব ফিলিপাইনের সাংবাদিকতা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ইভোনি চুয়া বলেছেন, ভুল তথ্য মানুষের মনে অনিশ্চয়তা উদ্বেগ তৈরি করছে।

অস্ট্রেলিয়ার কুইন্সল্যান্ড ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজির মিডিয়া প্রফেসর এক্সেল ব্রুনস বলেছেন, যখন জনগণের সঙ্গে সরকারের যোগাযোগ অপ্রতুল হয়, তখনই অনলাইনে ছড়িয়ে পড়া গুজব প্রভাব ফেলতে পারে। তিনি আরো বলেন, ভুয়া তথ্য ছড়ানো তখনই বেড়ে যায়, যখন জনগণ আশপাশে কী ঘটছে তা জানতে চায় কিন্তু তার কোনো জবাব পায় না। যখন তারা আনুষ্ঠানিক সূত্র থেকে কোনো সন্তোষজনক তথ্য পায় না, তখন তারা অন্যান্য সূত্রে খোঁজখবর রাখা শুরু করে।

যা রটে, তার কিছু কি ঘটে?

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যা কিছু ছড়ায়, তার সবই কি ভুল, মিথ্য বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত? থাইল্যান্ডে মানুষের চলাচলে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয় গত মার্চে। এর পরই গুজব ছড়িয়ে পড়ে যে যারা জনসমাগমের জায়গায় মাস্ক পরবে না, তাদের ২০০ থাই বাথ ( ডলার) জরিমানা করা হবে। গুজবটি দ্রুত ফেসবুক, টুইটার অন্যান্য মেসেজিং অ্যাপের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। পরে থাই পুুলিশ বাধ্য হয়ে সংবাদ সম্মেলন করে জনগণকে জানায় যে এমন কোনো সিদ্ধান্তই নেয়া হয়নি। এটি পুরোপুরি ভুয়া একটি খবর। তবে এর এক মাসের মধ্যেই দেখা যায়, দেশটির কিছু প্রদেশে মাস্ক না পরার কারণে দিব্যি জরিমানা করা হচ্ছে। এমনকি এর আগে যে খবর ছড়িয়েছিল, জরিমানার অংকটি তার চেয়ে অনেক বেশি। এএফপি

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন