মঙ্গলবার | জুলাই ১৪, ২০২০ | ৩০ আষাঢ় ১৪২৭

টকিজ

করোনাক্রান্ত ঈদ বিনোদন

রাইসা জান্নাত

স্বাধীন বাংলাদেশের বয়স ৪৯ বছর হয়ে গেছে। কিন্তু সময়কালে দেশের শিল্পাঙ্গন বর্তমান সময়ের মতো রকম অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হয়েছে কিনা, এমন নজির ইতিহাস ঘেঁটে পাওয়া যায় না। নভেল করোনাভাইরাসের মহামারীতে পুরো দুনিয়ার বিনোদন জগতে স্থবিরতা বিরাজ করছে। বাংলাদেশেও এর ব্যতিক্রম নয়। একযোগে ছোট পর্দা বড় পর্দার শুটিং, প্রেক্ষাগৃহ থেকে সিনেপ্লেক্স সবই বন্ধ, খোলা জায়গায় বিনোদনমূলক অনুষ্ঠান সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডও বন্ধ। এমনকি ঈদের মতো উৎসবেও চলচ্চিত্র, নাটক টেলিফিল্মের সরব উপস্থিতি নেই।

ঈদে নেই একটি চলচ্চিত্রও

স্বাধীনতার পর এত দীর্ঘসময় ধরে প্রেক্ষাগৃহ বন্ধ থাকা চলচ্চিত্র মুক্তি না পাওয়ার উদাহরণ নেই বললেই চলে। চলচ্চিত্র প্রদর্শক সমিতির উপদেষ্টা মিয়া আলাউদ্দিন বলেন, ১৯৭১ সালেও বেশ কয়েকটি বাংলা ছবি মুক্তি পেয়েছিল। যার মধ্যে আলমগীর কুমকুমের স্মৃতিটুকু থাক, এইচ আকবরের জলছবি, অশোক ঘোষের নাচের পুতুল, খান আতাউর রহমানের সুখ দুঃখ, আকরামের আমার বউ অন্যতম। স্বাধীনতার পর থেকে এই প্রথম প্রেক্ষাগৃহ এভাবে বন্ধ রয়েছে।


কভিড-১৯ দেশীয় চলচ্চিত্র শিল্পকে চরম বিরূপ পরিস্থিতিতে ফেলে দিয়েছে। এই প্রথম ঈদের মতো একটি বড় উৎসবে কোনো চলচ্চিত্র মুক্তি পায়নি। সাধারণত ঈদ উৎসবকে ঘিরে নির্মাতা, কলাকুশলী চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্টদের থাকে নানা প্রত্যাশা। সময় প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি দেয়া হয় নতুন সব চলচ্চিত্র। আর এসব ছবি মুক্তির সঙ্গে জড়িয়ে থাকে অনেক মানুষের স্বপ্ন।

চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্টদের মতে, দেশের চলচ্চিত্র শিল্পের অবস্থা নভেল করোনাভাইরাস প্রকোপের আগেও যে খুব ভালো ছিল তা নয়। সারা বছর অনেক প্রেক্ষাগৃহ বন্ধই থাকত। এছাড়া সাধারণ সময়ে প্রেক্ষাগৃহগুলোয় দর্শকরাও তেমন আসত না বলে জানান প্রেক্ষগৃহ সংশ্লিষ্টরা। মিয়া আলাউদ্দিনের তথ্যমতে, বাংলাদেশে সর্বশেষ চালু প্রেক্ষাগৃহের সংখ্যা ছিল ৭৪-৭৫টি। ঈদের সময় ১৫০-২০০টি প্রেক্ষাগৃহ চলে। এগুলো নিতান্ত সিজনাল, এমনিতে সারা বছর বন্ধ থাকে।

প্রেক্ষাগৃহের হিসাব থেকেই বোঝা যাচ্ছে, রকম পরিস্থিতিতে বিভিন্ন উৎসব বিশেষ করে ঈদুল ফিতরকে ঘিরে চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশার কমতি থাকে না। বছরজুড়ে তারা যেসব সংকটের মুখে পড়েন, সময় তা পুষিয়ে নিতে আশায় বুক বাঁধেন কিন্তু মহামারী নভেল করোনাভাইরাস এবার সেই পথটুকুও বন্ধ করে দিয়েছে। নভেল করোনাভাইরাসের মহামারী ঠেকাতে ১৮ মার্চ থেকে বন্ধ রয়েছে সব প্রেক্ষাগৃহ। যদিও চলতি বছরের শুরুতেই চলচ্চিত্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অনেকেই ২০২০ সালকে বাংলা চলচ্চিত্রের জন্য সুসময় বলে ধারণা করেছিলেন। ঠিক এমন সময়ই কভিড-১৯ যেন সব আশায় জল ঢেলে দিল।


বছর ঈদুল ফিতরকে ঘিরে অনেক ছবি মুক্তির পরিকল্পনা করেছিলেন নির্মাতারা। তালিকায় মিশন এক্সট্রিম, শান, পরাণ, বিদ্রোহী, দ্বিন দ্য ডে, মন দেব মন নেব, জ্বীনসহ আরো বেশকিছু চলচ্চিত্র ছিল। কিন্তু একটি ছবিও ঈদে প্রেক্ষাগৃহের মুখ দেখতে পায়নি। এবার বেশ কয়েক জন নতুন নির্মাতারও ছবি আসার কথা ছিল। কিন্তু অভিষেকেই করোনার বাধার সম্মুখীন হতে হয় তাদের। এদিকে ঈদের জন্য ঘোষিত অনেক চলচ্চিত্রের কাজও আটকে আছে। সব মিলিয়ে একটা হাতাশাজনক ঈদ পার করছে দেশের চলচ্চিত্র শিল্প। পরিস্থিতি কাটিয়ে উঠতেও বেশ সময় লাগবে বলে মনে করছেন অনেকেই। মধুমিতা প্রেক্ষাগৃহের স্বত্বাধিকারী ইফতেখারউদ্দিন নওশাদ বলেন, এখান থেকে ঘুরে দাঁড়াতে আমাদের অনেক সময় লাগবে। অন্তত ছয় মাস থেকে এক বছর তো লাগবেই। এজন্য আমাদের দরকার হবে প্রচুর ভালো ছবি আর্টিস্ট।

ছোট পর্দায় ছিল না ঈদের ব্যস্ততা

ঈদকে ঘিরে ছোট পর্দাজুড়েও এবার দেখা গেছে ভিন্নচিত্র। অন্য সময়ে ঈদকে ঘিরে নাটকপাড়ায় সীমাহীন ব্যস্ততা কাজ করে। বিরামহীনভাবে শুটিং চলে রাজধানীর বিভিন্ন শুটিং স্পটে। বিশেষ করে ঈদের আগ মুহূর্তে ব্যস্ততা কয়েক গুণ বেড়ে যায়। নতুন সব কনটেন্ট নির্মাণে নির্মাতা, কলাকুশলী সবারই একরকম নাভিশ্বাস উঠে যায়। এমনকি অনেক নির্মাতা ঈদের দিনটিও কাটিয়ে দেন এডিটিং প্যানেলে। নতুন কোনো নাটক, টেলিফিল্মের সম্পাদনার কাজ নিয়ে। তবে ছোট পর্দার চিরাচরিত চিত্র এবার পুরোই পাল্টে দিয়েছে কভিড-১৯। প্রতি বছর ঈদ উপলক্ষে প্রচুর বিশেষ নাটক, ধারাবাহিক টেলিফিল্ম নির্মিত হয়। বিভিন্ন চ্যানেলে সাত দিনব্যাপী ঈদ অনুষ্ঠানজুড়ে এসবই দেখেন দর্শকরা। কিন্তু নভেল করোনাভাইরাসের কারণে বড় পর্দার মতো ছোট পর্দারও শুটিং বন্ধ থাকার কারণে ঈদ উপলক্ষে তেমন কাজের সুযোগ ঘটেনি নির্মাতাদের। ২২ মার্চ থেকে বন্ধ রয়েছে টিভি নাটকের শুটিং। কাজেই পুরনো লকডাউনের আগে তৈরি করা কনটেন্ট দিয়েই চ্যানেলগুলোকে সাজাতে হয়েছে এবারের ঈদ অনুষ্ঠামালা।


ঈদকে ঘিরে নাট্যনির্মাতাদেরও নানা পরিকল্পনা ছিল। কেউ কেউ ভেবেছিলেন প্রতিবারের তুলনায় এবার বেশিসংখ্যক নাটক নির্মাণ করবেন। আবার অনেক নির্মাতাই ঈদের আগে আগে লকডাউনের কারণে তাদের অসমাপ্ত কাজগুলো শেষ করার চিন্তা করেছিলেন। অথচ ঈদের আগে শুটিংই করতে পারেননি তারা। যদিও বেশকিছু স্বাস্থ্যবিধি মেনে ১৭ মে টেলিভিশন নাটকের শুটিং শুরু হয়েছিল, কিন্তু একদিন পরেই তা বন্ধ হয়ে যায়। বড় পর্দার মতো ছোট পর্দার কলাকুশলীরাও ঈদ উৎসবকে ঘিরে নানা প্রত্যাশার জাল বুনেন। কিন্তু ঈদের কাজ করতে না পারায় লোকসান মুখে পড়তে হয়েছে তাদের। পরিস্থিতি শিগগিরই স্বাভাবিক না হলে সামনে আরো লোকসান গুনতে হবে বলে মনে করছেন নাট্যনির্মাতা থেকে শুরু করে শিল্পী-কলাকুশলীরা।


মঞ্চেও জ্বলেনি আলো

ঈদে থিয়েটাকর্মীদেরও ছোটাছুটি শুরু হয়ে যায়। নতুন নাটকের মহড়া, শোয়ের ব্যস্ততায় দিন পার করেন তারা। কিন্তু এবার ঈদে মঞ্চজুড়েও জ্বলেনি আলো। প্রায় তিন মাস হতে চলেছে শিল্পকলা প্রাঙ্গন শূন্য পড়ে রয়েছে। মঞ্চ নাটক এক ধরনের লাইভ পারফরম্যান্স দর্শকদের শারীরিক উপস্থিতি যেখানে মুখ্য। কাজেই অনলাইনে থিয়েটারের মূল স্বাদ আস্বাদন সম্ভব নয়। তবুও ঈদ বলে কথা। ঈদকে কেন্দ্র করে নাট্যদল বটতলা তাদের বহুল প্রশংসিত ক্রাচের কর্নেল নাটকটি অনলাইন শো করেছে নাটকটি ঈদের দিন সন্ধ্যা ৭টায় ইউটিউব চ্যানেলে প্রচারিত হয়েছে।

 

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন