শনিবার | জুলাই ১১, ২০২০ | ২৬ আষাঢ় ১৪২৭

সম্পাদকীয়

নিম্নমুখী বিদেশী বিনিয়োগ

সঠিক কর্মকৌশল গ্রহণ ও তার বাস্তবায়নের বিকল্প নেই

বিশ্ব অর্থনীতির বিনিয়োগ বাণিজ্যের প্রচলিত ছকগুলো বদলে দিয়েছে কভিড-১৯। স্বাস্থ্যঝুঁকির দিকগুলোকে গুরুত্ব দিয়ে ভাইরাসের বিস্তার রোধ করে বিনিয়োগের যথাযথ পরিবেশ তৈরিতে কোন দেশ কতটা দক্ষতার সঙ্গে বিনিয়োগকারীদের আকর্ষণ করতে পারে, তা নিয়ে চলছে জোর প্রতিযোগিতা। ভারত, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, শ্রীলংকার মতো বাংলাদেশের প্রতিযোগী দেশগুলো বৈদেশিক বিনিয়োগ প্রবাহ বৃদ্ধির লক্ষ্যে এরই মধ্যে বিভিন্ন কর্মকৌশল নিয়ে অগ্রসর হয়েছে। চীন থেকে চলে আসা বিদেশী প্রতিষ্ঠানগুলোকে আকর্ষণ করতে ভারত যেমন ব্যবসা শুরুর ব্যয় হ্রাস, কোম্পানি বা সমিতির নিবন্ধনে ইলেকট্রিক স্মারকলিপি ব্যবহার একাধিক সরকারি সংস্থাকে অনলাইনে সংহতকরণের মতো পদক্ষেপ নিয়েছে। এছাড়া বিনিয়োগের অবকাঠামোগত পরিবেশের দিক বিবেচনা করে উন্নতি ঘটিয়েছে বন্দর সরঞ্জাম অবকাঠামোর, যা তাদের পণ্য রফতানি আমদানির প্রক্রিয়াগুলো সহজ দ্রুত করেছে। এছাড়া সহজ ভিসার নিয়ম, প্রতিষ্ঠান শুরু, পরিচালনা ব্যাংক হিসাব খোলার সহজ প্রক্রিয়া নিয়ম তৈরি করে চীন থেকে তারা নিজেদের এগিয়ে রেখেছে। কভিড-১৯ নিয়ন্ত্রণে ভিয়েতনামের কঠোর অবস্থান রোগটি বিস্তার কমাতে শতভাগ সফল, তাই অর্থনৈতিক কার্যক্রমের ধারাবাহিকতাও বজায় রাখতে সফল হয়েছে তারা।

এমন অবস্থায় গতকাল দৈনিক বণিক বার্তায় প্রকাশিত করোনার আগেই নিম্নমুখী ছিল বিদেশী বিনিয়োগ শীর্ষক প্রতিবেদনটি বাংলাদেশের বিনিয়োগ পরিবেশের নাজুক অবস্থাকে তুলে ধরে। অবস্থায় আমাদের গ্যাস-বিদ্যুতের মতো ভৌত অবকাঠামোগত সম্পদের ঘাটতির পাশাপাশি বিনিয়োগের সার্বিক পরিবেশে অস্বস্তিগুলোকে কাটিয়ে ওঠা জরুরি। বিনিয়োগ মন্দা পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের লক্ষ্যে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনার বিষয়ে কাজ করতে হবে। তাই অবকাঠামো উন্নয়ন, বাজার সম্প্রসারণ, রফতানি পণ্য বহুমুখীকরণ, রফতানি পণ্যের গুণগত মানোন্নয়ন, নতুন উদ্যোক্তা তৈরিতে বিশেষ প্রণোদনার ব্যবস্থা, কর কাঠামো ব্যবসাসংক্রান্ত আইনি প্রক্রিয়া সহজ করা, পুঁজিবাজারে আস্থার পরিবেশ তৈরি করা, বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল উন্নয়নে পদক্ষেপ নেয়া, গুচ্ছ বিনিয়োগের নতুন ক্ষেত্র তৈরি প্রণোদনা দেয়া, গ্রামীণ বিনিয়োগ বাড়ানোর দিকে গুরুত্ব দিতে হবে। প্রতিযোগীদের সঙ্গে একই কাতারে আসতে আমাদের নিজেদের সক্ষমতা বৃদ্ধির বিকল্প নেই।

করোনা বিশ্ব অর্থনীতির চিত্র বদলে দেয়ার পাশাপাশি বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য নতুন কিছু সুযোগও তৈরি করে দিয়েছে। পণ্যসামগ্রীর কাঁচামালের জন্য চীনের ওপর যে অতিনির্ভরতা তৈরি হয়েছে, করোনা পরিস্থিতির কারণে অনেক কোম্পানিই বিকল্প খুঁজছে। ট্যারিফসহ নানামুখী কারণে চীনা কোম্পানিগুলোও রি-লোকেট করছে। ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে জাপান থেকে অনেক কোম্পানি চলে আসছে। ইন্দোনেশিয়ায় এরই মধ্যে ২৭টি আমেরিকান কোম্পানি রি-লোকেট করছে। কভিডের পাশাপাশি ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বিনিয়োগের সম্ভাবনাগুলো আমাদের কাজে লাগতে হবে। কেননা সঠিক বিদেশী বিনিয়োগ দেশের অর্থনীতির কাঠামো পাল্টে দিয়ে বিস্ময়কর গতিশীলতা নিয়ে আসে। বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ তথ্য বলছে, নভেল করোনাভাইরাসের আঘাত আসার আগে থেকেই নিম্নমুখী ছিল আমাদের এফডিআই প্রবাহ। এক বছরের ব্যবধানে এফডিআই কমেছে ৭৩ কোটি ৯৩ লাখ ডলার। আশঙ্কা, নভেল করোনাভাইরাসের প্রভাবে চলতি বছর বিদেশী বিনিয়োগ আরো কমে ২০০ কোটি ডলারের নিচে নেমে আসতে পারে।

যদিও বিশ্বব্যাংকের ডুয়িং বিজনেসের তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান সামাজিক উন্নয়ন সূচক, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাণিজ্যের প্রতিবন্ধকতাগুলো মোকাবেলা করে এগিয়ে যাওয়ার ইঙ্গিত দেয়। তাই ভারতের গৃহীত উল্লিখিত উদাহরণগুলো আমরাও বিবেচনায় নিতে পারি। কেননা অর্থনৈতিক সামাজিক সূচকে এগিয়ে থাকলেও বাংলাদেশ এখনো দুর্বল ব্যবসায়িক পরিবেশের ইমেজ সংকট দূর করতে ব্যস্ত। তাছাড়া কভিড-১৯-এর সংক্রমণ বিস্তার রোধে আমরা ভিয়েতনাম বা শ্রীংলকার মতো সফলতা দেখাতে পারিনি। পাশাপাশি জমি সমস্যার ওয়ান স্টপ ফ্যাসিলিটির অকার্যকারিতার মতো সমস্যা রয়ে গেছে। অপর্যাপ্ত অবকাঠামো দুর্বল যোগাযোগ ব্যবস্থা, জটিল কর কাঠামো, বন্দরে কালক্ষেপণ ইত্যাদি সীমাবদ্ধতার পাশাপাশি ঘুষ-দুর্নীতির ছড়াছড়ি বৈদেশিক বিনিয়োগ আসার অন্যতম অন্তরায় এখানে। এসব জটিলতার ফলে বিনিয়োগের অনুমোদন পেতেও সময়ক্ষেপণ হয়। তাছাড়া এখানে ব্যবসা করার জন্য নানা ধরনের বাড়তি ব্যয়ও বহন করতে হয়। এতে বিদেশী বিনিয়োগকারীরা স্বাভাবিকভাবেই অনুৎসাহিত হয়ে পড়েন।

দীর্ঘদিন  ধরে আমরা প্রধানত তৈরি পোশাকই রফতানি করছি। একক পণ্যের ওপর অতিনির্ভরতা কমিয়ে চামড়া পাটজাত, সিরামিক, হস্তশিল্পসহ বিভিন্ন অপ্রচলিত পণ্যের রফতানি বাড়াতে উদ্যোগ বাড়ানো প্রয়োজন। তথ্যপ্রযুক্তি সেবা খাতেও উল্লেখযোগ্য বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের সুযোগ রয়েছে। ভারতে যেমন গত বছর ১৬ শতাংশ বেড়ে এফডিআই প্রবাহের আনুমানিক পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪৯ বিলিয়ন ডলার। বিনিয়োগের বেশির ভাগই এসেছে সেবা তথ্যপ্রযুক্তি খাতে। উন্নয়নশীল দেশগুলোর মোট এফডিআই প্রবাহ কমলেও ভারতের ক্ষেত্রে বিপরীত চিত্র লক্ষণীয়। আমাদের মনে রাখতে হবে করোনা প্রাদুর্ভাব বৈশ্বিক বিনিয়োগের গতি-প্রকৃতিতে বড় পরিবর্তন আনতে পারে। সেখানে নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণে বাংলাদেশের সম্ভাবনা যেমন আছে, তেমনি ভুল কৌশলে এগোলে এফডিআই প্রবাহ কমে যাওয়ার বিষয়টিও উল্লেখ করেছেন বিশেষজ্ঞরা। অবস্থায় দেশের নীতিনির্ধারকদের সঠিক বিনিয়োগ কৌশল গ্রহণ করা জরুরি। বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের সঙ্গে বাণিজ্য বাড়াতে নতুন বাজারে প্রবেশের কৌশল খুঁজতে হবে। অগ্রসর হতে হবে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির লক্ষ্যে। বিনিয়োগকারীদের জন্য করমুক্ত সুবিধা, বিনিয়োগ প্রণোদনা নির্ধারণসহ নানামুখী নীতিনির্ধারণ করার এটাই উপযুক্ত  সময়।  প্রস্তুতি নিয়ে পরিপূর্ণ একটি পরিকল্পনা তৈরি করার বিকল্প নেই। প্রতিদ্বন্দ্বীরা কীভাবে এফডিআই আকর্ষণ করছে, তা লক্ষ রেখে আমাদের কৌশল নির্ধারণ করতে হবে।

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন