মঙ্গলবার | জুলাই ১৪, ২০২০ | ২৯ আষাঢ় ১৪২৭

আন্তর্জাতিক খবর

গুপ্তচরবৃত্তির সন্দেহে চীনা শিক্ষার্থী ও গবেষকদের তাড়াবে যুক্তরাষ্ট্র!

বণিক বার্তা ডেস্ক

নভেল করোনাভাইরাস নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে সৃষ্ট স্নায়ুযুদ্ধের প্রভাব পড়তে যাচ্ছে দুই দেশের অর্থনীতি, ভূ-রাজনীতি, কূটনীতিসহ সর্বত্র। তবে অবিশ্বাস্য হলেও সত্য, এই নির্মমতার শিকার হতে যাচ্ছে হাজার হাজার চীনা শিক্ষার্থী, যারা যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছে। যেসব চীনা নাগরিক যুক্তরাষ্ট্রে গবেষণা করেন তাদেরও তাড়াবে ট্রাম্প প্রশাসন। যুক্তরাষ্ট্রের একদল আইনপ্রণেতা দেশটির বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে চীনের মূল ভূখন্ডের শিক্ষার্থীদের নিষিদ্ধ করার একটি বিল উত্থাপন করতে চলেছেন। জাতীয় নিরাপত্তার জন্য চীনা শিক্ষার্থীদের হুমকি হিসেবে দেখছেন তারা। এই বিল উত্থাপন ও পাস হলে চীনা শিক্ষার্থীদের মতো তাদের নিয়ে বড় বিপাকেই পড়বে যুক্তরাষ্ট্রের বহু বিশ্ববিদ্যালয়। আর দেশটিতে থাকা চীনা গবেষকদের বিরুদ্ধে রয়েছে তথ্যচুরির অভিযোগ।

দুজন সিনেটর ও প্রতিনিধি পরিষদের এক সদস্য মনে করছেন, নিরাপদ ক্যাম্পাস আইন কাজে লাগিয়ে চীনা শিক্ষার্থীদের যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা প্রদান বন্ধ করা যাবে; যারা মূলত বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও গণিত নিয়ে পড়াশোনা করতে দেশটিতে আসেন। তাইওয়ান ও হংকংয়ের শিক্ষার্থীরা অবশ্য এই আইনের আওতায় আসবে না।

এই বিলের অন্যতম উদ্যোক্তা ও বেইজিংয়ের কড়া সমালোচক আরকানসাস থেকে নির্বাচিত রিপাবলিকান সিনেটর বিল কটন বলেন, ‘‘যুক্তরাষ্ট্রে গুপ্তচরবৃত্তির কাজে আমেরিকান বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে দীর্ঘদিন ধরেই ব্যবহার করে এসেছে চীনা কমিউনিস্ট পার্টি। সবচেয়ে খারাপ বিষয় হলো, তারা এটির পুরো সদ্ব্যবহার করছে। এখন এটি বন্ধ করার সময় এসেছে। ‘সিকিউর ক্যাম্পাস অ্যাক্ট’ আমাদের জাতীয় নিরাপত্তাকে রক্ষা করবে এবং গবেষণা নিয়ে আমেরিকান চেতনাকে সমুন্নত রাখবে।’’

বিশ্বব্যাপী মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়া নভেল করোনাভাইরাস চীনের গবেষণাগারে তৈরি বলে অভিযোগ তোলেন ট্রাম্প। এ নিয়ে শুরু হয় দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক যুদ্ধ, যা এখন চরমে পৌঁছেছে। যুক্তরাষ্ট্রে আক্রান্তের সংখ্যা ১৭ লাখ আর মৃত্যুর সংখ্যা ১ লাখ ছাড়িয়ে গেছে। এমন মহাবিপর্যয়ের পেছনে আমেরিকানদের অনেকেই চীনকে দায়ী করেন। আমেরিকান সরকারের নীতিনির্ধারকরাও চীনকে দায়ী করেন। এ নিয়ে দুই দেশের মধ্যে স্নায়ুযুদ্ধ চরমে, যার বলি হতে চলেছেন চীনা শিক্ষার্থীরা।

বিশ্বের দুই শীর্ষ অর্থনীতির দেশ অবশ্য আগেই বাণিজ্যযুদ্ধে লিপ্ত হয়েছে। দুই বছর ধরে চলা এ যুদ্ধে নতুন মাত্রা যোগ করেছে কভিড-১৯। এছাড়া সংখ্যালঘু উইঘুর মুসলিমদের ওপর দীর্ঘ নিপীড়ন ও হংকংকে শোষণের জন্য বৃহস্পতিবার জাতীয় নিরাপত্তা আইন পাস করায় চীনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কে আরো ফাটল তৈরি হলো। বৃহস্পতিবারই মিত্র দেশ যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া ও কানাডাকে নিয়ে দেয়া এক যৌথ বিবৃতিতে চীন কর্তৃক চাপিয়ে দেয়া এ আইনের তীব্র নিন্দা জানায় যুক্তরাষ্ট্র।

যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে, হংকংকে নিয়ে চীনের এই পদক্ষেপ দুই দেশের সম্পর্কে বড় ধরনের প্রভাব ফেলবে। আমেরিকান বিশ্ববিদ্যালয়ে চীনা শিক্ষার্থীদের আটকানোর মধ্য দিয়েই কি জবাব দেয়া শুরু করবে যুক্তরাষ্ট্র? শিগগিরই এটি সিনেট ও প্রতিনিধি পরিষদে বিল আকারে উত্থাপন করা হবে। পাশাপাশি আরেকটি আইন পাস করে বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে বিদেশি এক্সপার্ট নিয়োগ করার ক্ষেত্রেও বাধার মুখে পড়বে চীন। যেমন, বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক গবেষনা, শিল্প উদ্যোগ ও উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে বিদেশি এক্সপার্ট নিয়োগ করে চীন, যার মধ্যে বড় অংশ থাকে যুক্তরাষ্ট্রের। নেচার ইনডেক্স-এর হিসাবমতে, গবেষণার ক্ষেত্রে এ দুটি দেশ আবার সবচেয়ে বড় সহযোগী। এ জায়গাটিতেও চীনকে বিপাকে ফেলতে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র।
যুক্তরাষ্ট্রের বিজ্ঞান সম্প্রদায়ের বিশিষ্টজনরা অবশ্য সম্ভাব্য এমন আইনের ঘোরতর বিরোধী। তারা বিদেশি বংশোদ্ভূত সহকর্মীদের আসন্ন বিপদ দেখে উদ্বিগ্ন। এমন আইনকে অন্যায্য হিসেবে আখ্যা দেন তারা। এছাড়া এমন আইন পাস হলে তা ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রের বিশ^বিদ্যালয়ে বিদেশি মেধাবীদের পড়তে আসাকে অনুৎসাহিত করবে বলে মনে করেন তারা।

গবেষকদের, বিশেষকরে চীনা গবেষকদের আটকানোর পরিকল্পনা অবশ্য গত বছরই নেয়া হয়। ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বর মাসে বিজ্ঞান বিষয়ক যুক্তরাষ্ট্রের নীতি নির্ধারকদের কাছে পাঠানো এক চিঠিতে দেশটির বিজ্ঞানী ও গবেষকদের বিভিন্ন সংগঠনের সংঘ লিখেছে, ‘অবশ্যই আমরা আমাদের গবেষণার কাজকে নিরাপত্তাবেষ্টনীর মধ্যে রাখব, কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র যেন সারা বিশ্ব থেকে গবেষকদের জন্য একটি কাঙ্খিত ও স্বপ্নের গন্তব্য হিসেবে টিকে থাকে সেটাও আমাদের নিশ্চিত করতে হবে।’

গবেষকদের আটকানো সংক্রান্ত বিলটি কবে নাগাদ পাশের জন্য উত্থাপন করা হতে পারে, এ নিয়ে নির্দিষ্ট দিনক্ষণ ঠিক হয়নি। এ বিষয়টি নিয়ে অবশ্য যুক্তরাষ্ট্র সরকারের উদ্বেগ বহুদিনের। তাদের ধারণা, গবেষণা ও বিভিন্ন কর্মসূচির নামে তাদের মেধাস্বত্ত্ব চুরি করে নেয় চীন।

যুক্তরাষ্ট্রের আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ও শিক্ষা বিষয়ক সংস্থা আরেকটি গুরুতর অভিযোগ নিয়ে কাজ করছে। অভিযোগ রয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি তহবিলে পরিচালিত গবেষকদের সঙ্গে বিদেশি সরকারের যোগসাজশ রয়েছে। এমন গবেষকদের চিন্তিত করে শাস্তির মুখোমুখি করার পরিকল্পনাও আছে।

‘থাউজ্যান্ড ট্যালেন্ট প্রোগ্রাম’ এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন খাতের তথ্য চুরি করে চীন, এমন অভিযোগ রয়েছে। এই কর্মসূচির সঙ্গে জড়িত থাকার সন্দেহে গত ফেব্রুয়ারিতে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের কেমিস্ট্রি ও কেমিক্যাল বায়োলোজি বিভাগের চেয়ারম্যান প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ অধ্যাপক চার্লস লিয়েবারকে গ্রেফতার করে যুক্তরাষ্ট্র এই বার্তাটিই দেয়, এ ব্যাপারে তারা কতটা কঠোর হতে চলেছে। যদিও ওই সময় তার গ্রেফতার নিয়ে নিন্দার ঝড় বয়ে যায়।

সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন