মঙ্গলবার | জুলাই ১৪, ২০২০ | ২৯ আষাঢ় ১৪২৭

ফিচার

মহামারীর সমান্তরাল ক্ষতির খতিয়ান

ভাইরাসে নয়, বেশি প্রাণহানি ঘটবে অন্য একাধিক কারণে!

বণিক বার্তা অনলাইন

সারা দুনিয়া যখন করোনাভাইরাস নিয়ে ব্যস্ত তখন ব্যাপকবিস্তৃত দুর্ভিক্ষ বা ক্যানসার চিকিৎসার অভাবের মতো বিষয়সহ সব মিলিয়ে যে সমান্তরাল ক্ষতির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে তা ভাইরাসের কারণে মৃত্যুকে ছাড়িয়ে যেতে পারে। এমন আশঙ্কাই করছেন বিশেষজ্ঞরা।

বর্তমান পরিস্থিতির কয়েকটি দৃষ্টান্ত তুলে ধরলেই তা স্পষ্ট হবে।

গিনির মধ্যাঞ্চলের মেলিয়ান্দোতে বাড়ির কাছে এক জঙ্গলে খেলছিল দুই বছরের মিশু এমিল উয়ামুনো। এই জঙ্গলে আরেকটি প্রাণি বাস করে যেটি শিশুরা প্রায়ই ধরে এবং বাড়িতে এনে কাবাব বানিয়ে খায়। সেটি হলো বাঁদুর।

২০১৩ সালের ২৮ ডিসেম্বর ছোট্ট এমিলি অসুস্থ হয়ে পড়ে। এক অজানা রহস্যময় রোগে সে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়ে। তার মা, বোন এবং দাদিও দ্রুতই আক্রান্ত হন। এই পরিবারের শেষকৃত্যের পর ক্রমেই রোগটি আশেপাশে ছড়িয়ে পড়ে। 

২০১৪ সালের ২৩ মার্চ ৪৯ জন আক্রান্ত এবং ২৯ জন মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়। ততোদিনে বিজ্ঞানীরা এ রোগ ইবোলা বলে চিহ্নিত করেছেন। এর পরবর্তী সাড়ে তিন বছর সারা দুনিয়া এ রোগের তাণ্ডব দেখেছে। ১১ হাজার ৩২৫ এর বেশি প্রাণ নিয়েছে ইবোলা ভাইরাস। তবে এই ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব যখন চলছিল তখন সমান্তরালে শুরু হয় আরেক মর্মান্তিক ঘটনা।

ইবোলা ভাইরাসের দ্রুত বিস্তার স্থানীয় স্বাস্থ্যসেবা কাঠামোকে দুমড়ে মুচড়ে ফেলে। বহু স্বাস্থকর্মী মারা যান, বহু হাসপাতাল বন্ধ হয়ে যায় এবং যেকটি চালু ছিল সেখানে রোগীর চাপে শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থা, ভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতেই হিমশিম তারা। ওই ভাইরাসে সর্বাধিক আক্রান্ত তিন দেশ ছিল- সিয়েরা লিওন, লাইবেরিয়া এবং গিনি।

হঠাৎ সংক্রমণ ও চোখের সামনে মানুষ মারা যেতে থাকে। মানুষ যেকোনো মূল্যে স্বাস্থ্যকর্মীদের এড়িয়ে চলতে শুরু করে। এ রহস্যময় রোগ নিয়ে ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে মানুষ। একই সঙ্গে তারা ডাক্তারদেরও ভয় পেতে শুরু করে। চিকিৎসাকর্মী ও ডাক্তারদের আপাদমস্তক সাদা সুরক্ষা পোশাক আর মানুষের আকস্মিক মৃত্যুর সময় শুধু তাদের উপস্থিতি সাধারণ মানুষের মধ্যে এক ভীতিকর সংস্কার উসকে দেয়। এ কারণে মানুষ আর চিকিৎসাকর্মীদের কাছে যেতে চাইত না।

এতে পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ হলো। ২০১৭ সালের এক বিশ্লেষণে দেখা যায়, ইবোলা মহামারীর কারণে স্বাস্থ্যসেবার জনপ্রিয়তা ব্যাপকভাবে কমে যায়। সন্তান জন্মদানের জন্য চিকিৎসক বা স্বাস্থ্যকর্মীর সহযোগিতা নেয়ার প্রবণতা কমে যায় ৮০ শতাংশ, টিকাদান হারও কমে এবং ম্যালেরিয়া আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে ৪০ শতাংশেরও কম হাসপাতালে ভর্তি হয়। এই মহামারী সামলাতে ব্যাপকভিত্তিক আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টার পরও দেখা গেল, সমান্তরাল ক্ষতির পরিমান ইবোলার চেয়ে বেশি!

এই ২০২০ সালে এসেও একই চিত্র ক্রমশ উন্মুক্ত হতে শুরু করেছে। 

কভিড-১৯ মহামারীর শুরুর দিকে বেশিরভাগ দেশই রাষ্ট্রীয় সম্পদের ব্যবহার এই ভাইরাস সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে ব্যবহারেই অগ্রাধিকার দিয়েছে। নতুন হাসপাতাল তৈরি, শয্যা ও ভেন্টিলেটরের ব্যবস্থা করা, অপ্রমাণিত ওষুধের মজুদ বাড়ানো, হাজারে হাজারে চিকিৎসককে হঠাৎ করে পূর্ব প্রস্তুতি ছাড়াই রেসপিরেটরি ওয়ার্ডে দায়িত্ব দেয়া- এসবে জোর দেয়া হয়। যুক্তরাজ্য মহামারী মোকাবেলায় স্বাস্থ্যবিভাগের জন্য যা দরকার সব কিছু দেয়ার অঙ্গীকার করেছে।

একই ধরনের পদক্ষেপ অন্যান্য দেশেও নেয়া হয়েছে। সংক্রমণ হার নিয়ন্ত্রণে অনেক কঠোর পদক্ষেপ নিচ্ছে তারা। যা কিছুই এই মুহূর্তে জরুরি নয় বলে মনে করা হচ্ছে সেসব বাস্তবায়নে হয় দেরি করা হচ্ছে নয়তো স্থগিত রাখা হচ্ছে। নির্দিষ্ট কিছু সার্জারি থেকে যৌন স্বাস্থ্যসেবা, ধূমপান বিরোধী কর্মসূচি, মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা, দাঁতের চিকিৎসা, টিকাদান কর্মসূচি, ক্যানসার স্ক্রিনিং এবং নিয়মিত স্বাস্থ্যপরীক্ষা সবই প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে।

এই মুহূর্তে এসব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় কারো নজরে থাকছে না। তাছাড়া এরজন্য অতিরিক্ত চিকিৎসক বা চিকিৎসা কর্মী নেই। ফলে একটি শত্রুর ওপর দৃষ্টি নিবদ্ধ করার কারণে এর কিছু ভয়ানক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া এরই মধ্যে প্রকাশ পেতে শুরু করেছে।

বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, কলেরা বা এ ধরনের অসুস্থতায় মৃত্যু কভিড-১৯ এ মৃত্যুকেও ছাড়িয়ে যেতে পারে।

সারা বিশ্বেই বিভিন্ন হাসপাতালে নন-কভিড রোগীদের প্রত্যাখ্যাত হওয়ার খবর পাওয়া যাচ্ছে। এমনকি ক্যানসার চিকিৎসা, কিডনি ডায়ালাইসিস এবং জরুরি অঙ্গপ্রতিস্থাপনের মতো সার্জারিও বন্ধ রাখার কথা জানা যাচ্ছে। বিশেষ করে বাংলাদেশে সর্দি-কাশি-জ্বরের মতো লক্ষণ থাকলেই হাসপাতালে রোগী ভর্তি না নেয়ার ঘটনা ঘটছে অহরহ। এভাবে বিনাচিকিৎসায় মারা যাওয়া অনেক রোগীর পরবর্তী নমুনা পরীক্ষায় করোনাভাইরাস নেগেটিভ রিপোর্ট আসার প্রমাণও আছে অনেক।

বলকান অঞ্চলে নারীরা অত্যন্ত বিপজ্জনক এক চিকিৎসা পদ্ধতি অনুসরণ করছেন। তারা পরীক্ষামূলকভাবে নিজেরাই গর্ভপাতের পদ্ধতি অবলম্বন করছেন। যুক্তরাজ্যে ঘরেই দাঁতের চিকিৎসা করার ঘটনা বাড়ছে। এমনকি দাঁতের চিকিৎসায় চুইংগাম, ওয়্যারকাটার এবং সুপারগ্লু ব্যবহারের মতো ঘটনা ঘটছে। ম্যালেরিয়ার ওষুধ হাইড্রোক্সি ক্লোরোকুইন কভিড-১৯ চিকিৎসায় ইতিবাচক ফল দেয়ার খবর প্রকাশের পর বাজারে এ ওষুধের মারাত্মক সঙ্কট দেখা দিয়েছে। প্রচুর মানুষ ঘরে মজুদ করেছেন।

সব কিছু মিলিয়ে এ মহামারীতে সবচেয়ে বেশি বিপদে পড়তে যাচ্ছে দরিদ্র দেশগুলো। বিজ্ঞানীরা সতর্ক করেছেন, কিছু অঞ্চলে এইচআইভি, যক্ষ্মা এবং ম্যালেরিয়ার মতো রোগ মোকাবেলার কাযক্রম ব্যাহত হওয়ার কারণে সরাসরি করোনাভাইরাসের সমান জানমালের ক্ষতি হয়ে যেতে পারে।  একইভাবে কলেরার কারণে মৃত্যু কভিড-১৯-কেও ছাড়িয়ে যেতে পারে।

টিকাদান কর্মসূচি নিয়ে বিশেষভাবে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন বিশেষজ্ঞরা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এরই মধ্যে বিবৃতি দিয়ে জানিয়েছে, মহামারীতে কমপক্ষে ৬৮টি দেশে টিকা কর্মসূচি ব্যাহত হওয়ার কারণে এক বছরের কমবয়সী কমপক্ষে ৮ কোটি শিশু ডিপথেরিয়া, পোলিও এবং হামের ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে পোলিও আবার ফিরে আসার আশঙ্কা করা হচ্ছে। যেখানে কয়েক দশক ধরে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার খরচ করে এ রোগটিকে নির্মূল করার চেষ্টা চলছে। নির্মূলের তালিকায় এখন আছে একমাত্র গুটিবসন্ত।

এদিকে জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির নির্বাহী পরিচালক ডেভিড বিসলি গতমাসেই বলছেন, বিশ্ব ক্রমেই ভয়ানক দুর্ভিক্ষের দিকে এগোচ্ছে। খাদ্যাভাবে অভুক্ত থাকার ঝুঁকিতে রয়েছে ১৩ কোটি মানুষ, যেখানে সাড়ে ১৩ কোটি মানুষ এ পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে মহামারীর আগে থেকেই।

পাশাপাশি বিশ্বব্যাপী লকডাউন ও পরবর্তী অর্থনৈতিক বিপর্যয় তথাকথিত হতাশা থেকে মৃত্যুর ঘটনা বাড়িয়ে দিতে পারে। এর মধ্যে অ্যালকোহল আসক্তি এবং আত্মহত্যার ঘটনা বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

বিবিসি অবলম্বনে জাহাঙ্গীর আলম

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন