মঙ্গলবার | জুলাই ১৪, ২০২০ | ৩০ আষাঢ় ১৪২৭

শিল্প বাণিজ্য

বাংলাদেশের পোশাকে শুল্কারোপ চেয়ে বস্ত্রমন্ত্রীকে ভারতের গার্মেন্ট শিল্প মালিকদের চিঠি

বদরুল আলম

করোনা পরবর্তী বাজার পরিস্থিতি বিবেচনায় স্থানীয় শিল্প সুরক্ষা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ থেকে তৈরি পোশাক আমদানিতে শুল্ক আরোপের তাগিদ দিয়েছে ভারতের দি ক্লদিং ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্ডিয়া (সিএমএআই)। গত ২২ মে ভারতের মিনিস্ট্রি অব টেক্সটাইলসে পাঠানো এক চিঠিতে এ দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি। 

ভারতের বস্ত্রমন্ত্রী স্মৃতি জুবিন ইরানিকে পাঠানো চিঠিতে সিএমএআই- এর পক্ষে সভাপতি রাকেশ বিয়ানি বলেছেন, আপনি জানেন যে, বাংলাদেশ থেকে শুল্কমুক্ত গার্মেন্টস আমদানির বিপদ নিয়ে আমরা অনেক আগে থেকেই সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করে আসছি। পাশাপাশি বাংলাদেশ হয়ে চীনা কাপড় ভারতে আমদানির মাধ্যমে অতিক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র ও মাঝারি অভ্যন্তরীণ গার্মেন্ট শিল্পের ওপর শুল্কমুক্ত আমদানির গুরুত্বপূর্ণ প্রভাবের বিষয়টিও অবগত করেছিলাম। 

বক্তব্যের সপক্ষে ভারতের বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রণালয়ের বরাতে দেশটিতে বাংলাদেশ থেকে মোট আমদানির বছরভিত্তিক পরিসংখ্যানও তুলে ধরা হয়েছে চিঠিতে। সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে, ভারতের মোট তৈরি পোশাক আমদানিতে বাংলাদেশের অংশ ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ছিল ২৪ শতাংশ, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ২৬ শতাংশ  এবং ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ৩৩ শতাংশ। চলতি ২০১৯-২০ অর্থবছরে আনুমানিক হিসাবে ভারতের মোট পোশাক আমদানিতে বাংলাদেশের অংশ ৩৪ শতাংশ। অর্থাৎ সাম্প্রতিক সময়ে ভারতের মোট তৈরি পোশাক আমদানির এক তৃতীয়াংশ হয়েছে বাংলাদেশ থেকে। 

এটি দেশীয় শিল্পের বিকাশ ব্যাহত করছে উল্লেখ করে চিঠিতে বলা হয়েছে, একাধিক আলোচনায় সরকার বলেছে, বাংলাদেশ ও দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের সঙ্গে চুক্তি থাকায় শুল্কারোপের বিষয়টি বেশ কঠিন। তারপরও কভিড- ১৯ প্রাদুর্ভাব পরিস্থিতির পরবর্তী নাটকীয় পরিবর্তনের প্রেক্ষাপট বিবেচনার তাগিদ জানিয়েছে সিএমএআই।

চিঠিতে বলা হয়েছে, কভিড- ১৯ এর প্রভাবে ভারতীয় টেক্সটাইল শিল্পেও রফতানিতে মারাত্মক প্রভাব পড়েছে। অভ্যন্তরীণ বাজারেও বিক্রি কমে গেছে। 

সিএমএআই- এর সর্বশেষ সাম্প্রতিক জরিপ অনুযায়ী, কভিড- ১৯ সংক্রমণ ঠেকাতে লকডাউনের প্রভাবে ভারতের অভ্যন্তরীণ বাজারে পোশাকের চাহিদা ৪০ শতাংশের বেশি কমেছে। এর প্রভাবে আয় কমে শিল্পের সার্বিক কার্যক্রম কমে আসার পাশাপাশি ইউনিট বন্ধ হয়ে কাজ হারানোর ঘটনা ঘটবে বলে চিঠিতে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে।

সরকার কিছু পণ্যের ওপর অতিরিক্ত আমদানি শুল্ক আরোপের বিষয়ে ভাবছে, এমন তথ্য উল্লেখ করে সিএমএআই ভারতের টেক্সটাইলস মন্ত্রীকে বলেছে, এটি সরকারের একটি কার্যকরী পদক্ষেপ। আমরা চাই, বস্ত্র মন্ত্রণালয় যেনো সব ধরনের গার্মেন্টস এবং ফ্যাব্রিকের আমদানির ওপর শুল্কারোপ করে। 

বিশেষ করে যে দেশগুলোর সঙ্গে মুক্তবাণিজ্য চুক্তি বা শুল্কমুক্ত আমদানি চুক্তি আছে সেই দেশগুলো থেকে গার্মেন্টস এবং ফ্যাব্রিকের আমদানির ওপর শুল্কারোপে বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়েছে সিএমএআই- এর চিঠিতে।

কভিড- ১৯ এর সঙ্গে লড়তে শুল্কারোপের মাধ্যমে সরকার প্রায় ১০ থেকে ১৫ কোটি ডলার সংগ্রহ করতে পারবে বলে একটি হিসাব দিয়ে, ১২ মাসের জন্য এ শুল্কারোপের পদক্ষেপ নেয়ার পরামর্শ দিয়েছে সিএমএআই।

এদিকে ভারতীয় শিল্প উৎপাদকদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে এখনই কিছু করণীয় নেই বলে জানিয়েছেন সরকার সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, আনুষ্ঠানিকভাবে ভারত সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হলে যথাযথ পদক্ষেপ নেয়া যাবে। তবে ভারতীয় শিল্পোদ্যাক্তাদের তৎপরতা প্রসঙ্গে প্রাথমিকভাবে বাংলাদেশের ভারতীয় হাইকমিশনকে বিষয়টি অবগত করে রাখা হবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি বণিক বার্তাকে বলেন, সরকারিভাবে এ প্রসঙ্গে আমরা এখনও কিছু শুনতে পাইনি। বিষয়টি তাই এখনই বিবেচনায় আনতে চাই না।

তবে বাংলাদেশের পোশাক খাত সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, সিএমএআই- এর চিঠি বাংলাদেশসহ সাফটার আওতাভুক্ত দেশগুলোর জন্য অশনিসংকেত। সংগঠনের চিঠিতে ১২ মাসের জন্য অতিরিক্ত শুল্কারোপের বিষয়ে বলা হয়েছে। তবে বাংলাদেশের মাধ্যমে তাদের দেশীয় শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে তারা যে পরিসংখ্যান দিয়েছেন তার ভিত্তিতেও সেটি প্রমাণ হয়নি। যেখানে দেশটির মোট আমদানির মাত্র ৩৪ শতাংশ বাংলাদেশ থেকে আমদানি হয়।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বিজিএমইএ সভাপতি ড. রুবানা হক বণিক বার্তাকে বলেন, কভিড-১৯ এ স্থানীয় বাজারের প্রভাব প্রেক্ষাপট বিবেচনায় আবেদন করেছে সিএমএআই। এ বিষয়ে আমাদের সহানুভূতি রয়েছে। কিন্তু এটা একটা বাস্তবতা যে, প্রায় ৪১ লাখ শ্রমিক বাংলাদেশের পোশাক খাতের ওপর নির্ভরশীল। প্রতিবেশী হিসেবে এটা বিবেচনায় নিয়ে আমাদের এখন দীর্ঘমেয়াদি সহযোগিতায় মনোনিবেশ করতে হবে, বিশ্বের কাছে যৌথ প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে আঞ্চলিক বাজারকে ভালোভাবে তুলে ধরতে হবে। কভিড- ১৯ পরবর্তী প্রেক্ষাপটে টিকে থাকতে সহযোগিতামূলক কর্মসূচিতে আন্তঃআঞ্চলিক বিনিয়োগ করে প্রতিযোগিতা ও অনিশ্চয়তার বিষয়গুলো বিবেচনায় আনা উচিত হবে। ‘কম্পিটিশন’ নয় বরং ‘কো-পিটিশন’ বা ‘কোলাবরেটিভ কম্পিটিশনে’ মনোযোগী হতে হবে বলে উল্লেখ করেন রুবানা হক।

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন