বুধবার | জুলাই ১৫, ২০২০ | ৩১ আষাঢ় ১৪২৭

সম্পাদকীয়

বাহক নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে অর্থনীতি চাঙ্গা হবে না

আলী ইদরিস

কভিড-১৯ বা করোনার বাহন যেমন মানুষ, রোগটির বাহকও মানুষ। রোগটি মানুষ থেকে মানুষে বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গ যেমন হাত, পা, চোখ, নাক, মুখ, হাঁচি, কাশি বা কথা বলার সময় থুথু বা জলকণার ছিটা নিঃশ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে ছড়ায়। মানুষ ছাড়াও মানুষ যেসব মেটালের, কাঠের, প্লাস্টিকের, কাগজের, কাপড়ের বা রাবারের আসবাব, তৈজসপত্র ও অন্যান্য দ্রব্য ব্যবহার করে সেগুলোর মারফতও ভাইরাসটি ছড়ায়। এজন্য মানুষকে বারবার হাত ধুতে হয়, গ্লাভস বা পিপিই পরতে হয়, ব্যক্তি থেকে ব্যক্তির দূরত্ব দুই মিটার রাখতে হয় ইত্যাদি।

কিন্তু লকডাউন থাকার সময় দেশের মানুষ এসব বিধি কতটুকু মেনেছে? গৃহ-আইসোলেশনে যারা ছিল তারা বোধ হয় স্বাস্থ্যবিধি ২৫ শতাংশও মানেনি। এরপর ১৬ মে পর্যন্ত লকডাউন উঠিয়ে দেয়ার ঘোষণা এলে মানুষ যেভাবে হাটে-বাজারে, রাস্তায়, করোনা স্বাস্থ্যবিধি, শারীরিক দূরত্ব অমান্য করেছে, গার্মেন্টস কারখানা খুলে দেয়ার পর শ্রমিকরা কারখানার ভেতরে, রাস্তায়, যানবাহনে যেভাবে শারীরিক দূরত্ব বজায় না রেখে চলেছে, তাতে সংক্রমণের হার নিঃসন্দেহে আরো বেড়েছে, বর্তমান অবস্থাই তার প্রমাণ। বলা হয়েছিল গার্মেন্টস কারখানা সীমিত পরিসরে খুলে দেয়া হবে, ঢাকার বাইরে থেকে কোনো শ্রমিক আসতে পারবে না।

বাস্তবে চাকরি হারানোর ভয়ে ঢাকার বাইরে থেকেও শ্রমিকরা এসেছেন। যাত্রীবাহী যান না থাকলে কী হবে, পণ্যবাহী যানবাহনে গার্মেন্টস শ্রমিক ছাড়াও আরো মানুষ ঢাকায় এসেছে। এদিকে দোকানপাট খোলা রাখার সময় ২টা থেকে ৪টা পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছিল। ঈদের কেনাকাটার জন্য আরো কিছু কাপড়চোপড়, জুতা ইত্যাদি পণ্যের শপিং মল বা দোকান বিকাল ৫টা পর্যন্ত খুলে দেয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে; তাতে ক্রেতাসমাগম আরো বেড়েছে, কিন্তু স্বাস্থ্যবিধি ও শারীরিক দূরত্ব খুবই কম মানা হচ্ছে। দোকানপাট ও শপিং মলের আশপাশে, রাস্তায়, ফুটপাতে মানুষ রীতিমতো ধাক্কাধাক্কি করে চলেছে, সঙ্গে বাচ্চাদের ঈদের শপিং করতে এনে ওদের সংক্রমণের সম্ভাবনা তিন গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।

রাস্তায় প্রাইভেট কার, রিকশা, মোটরসাইকেল প্রচণ্ড জ্যাম সৃষ্টি করে চলছে, পথচারীদের রাস্তা পার হতে কষ্ট হয়। ফুটপাতে কেউ কেউ গা ঘেঁষে বা ধাক্কা দিয়ে হনহন করে চলে যাচ্ছে। এমনকি ব্যাংকের ভেতরে যেখানে লাল দাগ কেটে লাইনে দাঁড়ানোর স্থান নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছে সেখানেও লাইন ছেড়ে কেউ কেউ কাউন্টারে গিয়ে অন্য একজনের গা ঘেঁষে, মুখের কাছে মুখ নিয়ে কথা বলেছেন। শিক্ষিতরা যদি এ রকম আচরণ করেন তাহলে দিনমজুর, রিকশাওয়ালা, ফেরিওয়ালার দোষ কোথায়। এবার শুরু হয়েছে ঈদ উৎসব পালন করতে গ্রামে যাওয়ার পালা।

বাস নেই, ট্রেন নেই, লঞ্চ নেই, তাতে কী হয়েছে। পায়ে হেঁটে কিছুদূর, রিকশা ভ্যানে কিছুদূর, পণ্যবাহী ট্রাকে, পিকআপে, সবাই বাচ্চাকাচ্চাসহ ছুটে চলেছে। ফেরিগুলোতে শুধু মানুষের মাথা দেখা যায়, নিঃশ্বাস-প্রশ্বাস নেয়ার জায়গাও নেই। মাথার ওপরে সূর্য, ৩৪ ডিগ্রি তাপমাত্রায় অসহ্য গরম। তবুও গ্রামে যেতে হবে, ঈদ করতে হবে। এই জনমানুষই তো করোনার বাহক। কেউ কেউ হয়তো হোম কোয়ারেন্টিন ছেড়ে বেরিয়ে পড়েছেন, কেউ কেউ হয়তো টেস্ট করতে দিয়েছেন; রেজাল্টের অপেক্ষায় আছেন, কারোর হয়তো কোনো সিনড্রোমই নেই কিন্তু ভাইরাস লুকিয়ে আছে। এরা সবাই রাস্তায়, ফুটপাতে, যানবাহনে, ফেরিতে মানুষের মধ্যে করোনা সংক্রমণের সম্ভাবনা কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে। পুলিশ, বিজিবি কী করবে, সরকার কী করবে? মানুষজনের যদি এতটুকু মৃত্যুভয় না থাকে তাহলে এদের নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। একমাত্র পুলিশের লাঠিচার্জ বা রাবার বুলেট ওদের নিয়ন্ত্রণ করতে পারত।

আমি মনে করি ঈদের জন্য এই লকডাউন শিথিল করার প্রয়োজন ছিল না। এটা ভুল সিদ্ধান্ত হয়েছে। এজন্য অনেক জেলা শহরে, অনেক উপজেলায়, ঢাকার অনেক এলাকায় ব্যবসায়ীরা নিজেরাই দোকান বা শপিং মল না খোলার সঠিক এবং যথাযথ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তাদের বিরুদ্ধে বিক্ষোভও হয়েছে। তাদের ধন্যবাদ জানাই। আসলে লকডাউন কখন, কোন জায়গায়, কোন পেশায় বা শিল্পে, কোন কারখানায় বা অফিসে ওঠানো যাবে, সেটা সরকারের জন্য বড় কঠিন সিদ্ধান্ত। অথচ অর্থনীতিকে পুনর্জাগরিত করতে হলে লকডাউন পর্যায়ক্রমে ওঠাতে হবে। কিন্তু গার্মেন্টস কারখানা খোলা নিয়ে আরো গভীরভাবে চিন্তা করা উচিত ছিল।

প্রায় ৫০ লাখ শ্রমিকের শিল্পে করোনা স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা সহজ নয়। হাটে-বাজারে ক্রেতা-বিক্রেতার করোনা স্বাস্থ্যবিধি মানার উদাসীনতা বা অবহেলা ছাড়াও রাস্তাঘাটে গার্মেন্টস শ্রমিকদের করোনা স্বাস্থ্যবিধি ও শারীরিক দূরত্ব না মানার প্রবণতা লক্ষণীয়। আপামর জনগণের মধ্যে বিধি মানার গরজ বা অভ্যাসটাই গড়ে ওঠেনি, যা হতাশাজনক। এ কারণে পর্যায়ক্রমে হলেও লকডাউন ওঠাতে অনেক সমস্যার জন্ম দেবে। অন্যদিকে ব্যক্তি দূরত্ব পালন করতে হলে কোনো কারখানায়ই বর্তমানে কর্মরত ১০০ শতাংশ শ্রমিককে কাজ করতে দেয়া যাবে না। তাহলে বাদ পড়া শ্রমিকরা বেতন পাবে না, তাদের আর্থিক সমস্যা কে মিটাবে? তাদের কি ত্রাণ দিতে হবে না?

আবার কোনো কোনো শিল্পপতি কারখানা তালা মেরে লে-অফ করতে চাইবেন। লে-অফ করতে হলে আংশিক বেতন দিতে হয়, কিন্তু মালিকরা বিভিন্ন অজুহাতে বেতন-ভাতা দেবে না। ফলে সেই বেকার শ্রমিকরা মানবেতর জীবন যাপন করবে। এদিকে ওষুধ, মুদি, কাঁচা বাজার, ফলমূল ছাড়া অধিকাংশ দোকানপাট বন্ধ আছে, তালাবদ্ধ দোকান-কর্মচারীরাও প্রায় না খেয়ে আছে। তাদেরও ত্রাণ দিতে হবে। লকডাউন পর্যায়ক্রমে খুললে যেমন ত্রাণ দেয়ার প্রশ্ন উঠবে, তেমনি বহুবিধ সমস্যা দেখা দিতে পারে, যা নিয়োগকর্তা, সরকার ও জনসাধারণের স্বাস্থ্যঝুঁকি ও আর্থিক দায়বদ্ধতা তৈরি করবে। সুতরাং যে পদ্ধতিতেই হোক লকডাউন তুলে নেয়ার সিদ্ধান্ত সরকারের জন্য একটি জটিল ও কঠিন বিষয়, যা সুচিন্তিতভাবে নেয়া প্রয়োজন। করোনা-সংক্রমিত বিদেশ থেকে এখনো প্রবাসী শ্রমিকরা বিভিন্ন ফ্লাইটে দেশে ফিরছেন। এদের মধ্যে যারা বাহক তাদের ঘরে নয়, প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টিনে রাখতে হবে।

এখন সময় এসেছে অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে হলে টেস্টের সাহায্যে বাহকদের খুঁজে বের করে তাদের প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টিনে অথবা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রাখা। সেটা জেলা, উপজেলা, ইউনিয়ন পর্যায়ে এবং ঢাকা শহরকে কয়েকটি অঞ্চলে ভাগ করে নমুনা সংগ্রহ করার জন্য জনবল ও টেস্ট বুথ নির্মাণ করে এবং প্রবলভাবে টেস্ট কিটের সংখ্যা বাড়িয়ে বাহকদের নিয়ন্ত্রণ করে। যেহেতু ১৪ দিনের মধ্যে লক্ষণ প্রকাশ পায় এবং চিকিৎসারত রোগী সেড়ে ওঠে বা মৃত্যুবরণ করে সেহেতু দিনে ৫০ হাজার নমুনা টেস্ট করতে পারলে তিন-চার সপ্তাহের মধ্যেই রোগটি নিয়ন্ত্রিত হতে পারে। সরকারের বোঝা উচিত যে চিকিৎসা ব্যয়ের চেয়ে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ করার খরচ অনেক কম এবং কম সময়সাপেক্ষ। সুতরাং বাহক শনাক্ত করে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ করাই অর্থনীতি চাঙ্গা করার একমাত্র কৌশল হওয়া উচিত।

আলী ইদরিস: চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন