বৃহস্পতিবার | আগস্ট ১৩, ২০২০ | ২৯ শ্রাবণ ১৪২৭

সম্পাদকীয়

ধান সংগ্রহের বিকল্প প্রস্তাব ও টেকসই খাদ্য নিরাপত্তা

নিতাই চন্দ্র রায়

২০১৯ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ব বিদ্যালয়ের সবুজ চত্বরে অ্যালামনাই অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপতি মো. আব্দুল হামিদ বলেন, খাদ্য নিরাপত্তা টেকসই করতে হলে কৃষি  পণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে হবে। শুধু রাষ্ট্রপতি নন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও একথা বলেন। কৃষিমন্ত্রী ও খাদ্যমন্ত্রীও একই কথা উচ্চারণ করেন। কিন্তু কৃষক এখনও উৎপাদিত ধানের ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন না। 

ধান আমাদের প্রধান খাদ্য শস্য। মোট চাষযোগ্য জমির  শতকরা ৮০ ভাগের বেশি জমিতে  এ ফসলটির চাষ  করা হয়। লাভ না হলেও  দু’বেলা  দু’মুঠো ভাত খাওয়ার জন্য কৃষকে বাধ্য হয়েই ধান চাষ করতে হয়। 

বর্তমানে খাদ্য শস্য কেনার সরকারি নীতিমালাতে সবচেয়ে বেশি লাভবান হন মিল মালিক এবং সবচেয়ে বেশি ক্ষতির শিকার হন কৃষক। এ বছর বোরো মৌসুমে প্রতিমণ ধান উৎপাদনে কৃষকের খরচ হয়েছে ৮০০ টাকা, সেই বোরো ধান বর্তমানে বিক্রি হচ্ছে ৭০০ থেকে ৭৫০ টাকা মণ দরে। সরকারি হিসেবে ১০০ মণ ধান থেকে ৬৭ মণ চাল হয়। সে হিসাবে ১০০ মন বোরো ধানের দাম ৭৫ হাজার টাকা। ১০০ মণ ধান থেকে উৎপাদিত ৬৭ মণ ( ৪০ কেজি হিসেবে) চালের সরকারি মূল্য ৯৬ হাজার ৪৮০ টাকা। 

যদি  ধরা হয়, প্রতিমন ধান থেকে চাল তৈরি করতে মিলারদের ২০ টাকা খরচ হয় তা হলে ১০০ মন ধান থেকে চাল তৈরি করতে খরচ হবে ২ হাজার টাকা। অন্যান্য খরচ আরও  ২ হাজার টাকা  যোগ করলেও ১০০ মন ধান থেকে উৎপাদিত ৬৭ মন চাল সরকারি গুদামে সরবরাহ করে মিল মালিকের লাভ হবে (৯৬৪৮০- ৭৯০০০) ১৭ হাজার ৪৮০ টাকা। এছাড়া ১০০ মণ ধানের তুষ ও কুঁড়া বিক্রি করেও মিলমালিকেরা নেহায়েত কম টাকা   পান না। অপরদিকে সমপরিমাণ ধান বিক্রি করে কৃষকের দীর্ঘ পাঁচ মাসের পরিশ্রমের ফল হলো ৫ হাজার টাকা লোকসান। হায়রে আমার  কৃষকবান্ধব খাদ্য সংগ্রহ নীতিমালা!

 ক’দিন আগে (২০.৫.২০২০ তারিখ) বিএসএএফই ফাউন্ডেশনের এক ভার্চুয়াল মতবিনিময় সভায়  পরিকল্পনা কমিশনের সিনিয়র সচিব বিশিষ্ট কৃষি অর্থনীতিবিদ ড.শামসুল আলম বলেন,  ‘কৃষকের উৎপাদিত সব ধান কেনা সরকারের পক্ষে সম্ভব নয়। কারণ সরকারের সে ধরনের অবকাঠমো ও লোকবল নেই। সরকার উৎপাদিত ধানের কেনেন মাত্র শতকরা ৫ ভাগ । বাদবাকি ৯৫ ভাগ বেচাকেনা হয় বেসরকারি  পর্যায়ে।’  

আমি ড. শামসুল  আলমের বক্তব্যের সঙ্গে আংশিক  সহমত  পোষণ করলেও, এ ব্যাপারে আমার কিছু নিজস্ব ভাবনা, চিন্তা , মতমত   ও বিকল্প  প্রস্তাব আছে।  আমার বিশ্বাস-সরকার  উৎপাদিত ধানের শতভাগ কৃষকের কাছ থেকে কিনতে না পারলেও পরিমাণ বাড়াতে পারে। বিদ্যমান খাদ্য সংগ্রহ নীতিমালার পরিবর্তন করে কৃষকের  উৎপাদিত ধানের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে পারে। এ খাদ্য নীতি অটোরাইস মিল মালিক বান্ধব। ফড়িয়া, আড়তদার বান্ধব। খাদ্যগুদামের কর্মচারীবান্ধব।  কিন্তু কৃষকবান্ধব নয়। কৃষিবান্ধব নয়। কৃষকের স্বার্থে  খাদ্য সংগ্রহের এই  বিদ্যমান নীতিমালার আমূল পরিবর্তন প্রয়োজন। এটা সময়ের দাবি।  আমার কথা হলো- ধান সংগ্রহের  নির্ধারিত মূল্য থাকবে একটি নয়, দু’টি। একটি কৃষকের কাছ থেকে সরকারি গুদামের সংগ্রহের জন্য, অপরটি কৃষকের কাছে থেকে বেসরকারি অটোরাইস মিলে ক্রয়ের জন্য। এ কারণে বিদ্যমান খাদ্য পরিকল্পনা ও পরিধারণ কমিটিতে দেশের চার অঞ্চল থেকে ৪ জন কৃষক প্রতিনিধি ও ২ জন চালকল মালিক প্রতিনিধিকে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। কমিটি মৌসুম শুরুর কমপক্ষে ১ মাস আগে ধানের মূল্য নির্ধারণ করবে। সরকারি গুদামের জন্য ধানের যে দাম নির্ধারণ করা হবে , বেসরকারি চালকলের ক্ষেত্রে তা হবে মণপ্রতি ১০-২০ টাকা কম। এটা হলো ন্যূনতম দাম। এ দামের নিচে মিল মালিক কৃষকের কাছ থেকে কোনো ধান কিনতে পারবেন না। মিল মালিকদের সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তিতেও কৃষকের স্বার্থে কিছু পরিবর্তন আনতে হবে। চালকলগুলোকে পরিবর্তিত সরকারি নীতিমালা মেনে কৃষকের কাছ থেকে নির্ধারিত মূল্যে ধান কিনতে হবে, অন্যথায় ওইসব মিলের উৎপাদিত চাল সরকারি গুদামে  কানো অবস্থাতেই  ক্রয় করা  যাবে না। 

কৃষকের কাছ থেকে ধান কেনা এবং সরকারি গুদামে চাল সরবরাহের ক্ষেত্রে এ ধরনের  কিছু শর্ত থাকতে পারে যেমন- 

১. খাদ্য সংগ্রহ ও পরিধারণ কমিটির সিদ্ধান্ত মোতাবেক উপজেলা কৃষি ও খাদ্য বিভাগ কর্তৃক প্রণীত এবং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কর্তৃক অনুমোদিত তালিকা মোতাবেক চুক্তিবদ্ধ চালকল মালিককে কৃষকের কাছ থেকে নির্ধারিত মূলে ও সময়ে ধান ক্রয় করতে হবে। 

২. ক্রয়কৃত ধানের কৃষক ভিত্তিক তালিকা, সরবরাহের পরিমাণ, তারিখ, প্রদানকৃত মূল্য ও আর্দ্রতার হার, কৃষকের মোবাইল ফোন নাম্বার  পৃথক রেজিস্টারে লিপিবদ্ধ ও সংরক্ষণ করতে হবে।

৩. ধানের আর্দ্রতার ব্যাপারেও খাদ্য সংগ্রহ ও পরিধারণ কমিটির সুনির্দিষ্ট নির্দেশ থাকবে। যেমন- শতকরা ১৪ ভাগের ওপর  প্রতি ১ ভাগ আর্দ্রতার জন্য  কত কেজি ধানের দাম কম হবে, তা ওই নির্দেশে উল্লেখ  করতে হবে।

৪. মিল মালিককে কৃষকের কাছ থেকে  ক্রয়কৃত ধানের সংগ্রহ রশিদ এবং নগদ  টাকা সঙ্গে সঙ্গে প্রদান করতে হবে। সংগ্রহ রশিদে মিল মালিক যাকে ধান ক্রয় কাজে নিয়োগ করবেন তার স্বাক্ষর থাকতে হবে এবং নমুনা স্বাক্ষর  উপজেলা কৃষি অফিস, উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রণ অফিস ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার অফিসে সংরক্ষিত থাকবে।

৫. মিলে চাল সরবরাহের সময় কৃষকে অবশ্যই চাষি কার্ড নিয়ে আসতে হবে।  চাষি কার্ডে  সংগৃহীত ধানের পরিমাণ ও তারিখ লিখে ধান ক্রয় কাজে নিয়োজিত ব্যক্তি স্বাক্ষর দিবেন।

৬. উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক, উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা (তার প্রতিনিধি) উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (তার প্রতিনিধি) সময় সময় চুক্তিবদ্ধ চালকল পরিদর্শন করে সরকারি নিয়ম মেনে মিল মালিক কৃষকের কাছ থেকে ধান ক্রয় করছেন কিনা, মূল্য পরিশোধ করছেন কিনা- বিষয়গুলোা মূল্যায়ন করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিবেন।

৭. যদি কোনো চুক্তিবদ্ধ চালকল মালিক  শর্ত ভঙ্গ করে সরকারি নিয়ম না মেনে  ধান ক্রয়ে অনিয়মের আশ্রয় নেন, তা হলে  নিয়ম মোতাবেক তার সরকারি গুদামে চাল সরবরাহ আদেশ বাতিল করতে হবে।

 এবছর বোরো মৌসুমে  সারা দেশে প্রায় ২ কোটি টন চাল উৎপাতি হবে। ধানে রূপান্তর করলে পরিমাণ হবে  ২ কোটি ৯৮ লাখ  ৫০৭ টন।  এর মধ্যে থেকে সরকার ১ হাজার ৪০ টাকা মণ দরে কৃষকের কাছ থেকে ধান কিনবে ১০ লাখ টন। মিল মালিকদের কাছে প্রতি কেজি ৩৬ টাকা দরে কিনবে ১০ লাখ টন সিদ্ধ চাল এবং প্রতিকেজি ৩৫ টাকা দরে কিনবে ২ লাখ ২০  হাজার টন (১৮ লাখ টন ধান আকারে)। অর্থাৎ সরকার বোরো মৌসুমে কৃষক এবং মিল মালিকদের কাছ থেকে ২৮ লাখ টন ধান কিনবে, যা বোরো মৌসুমে মোট উৎপাতি ধানের  ১০.৬৬ শতাংশ। আর কৃষক শুধু  সরকারিভাবে ক্রয়কৃত ১০ লাখ টন ধানের ন্যায্য মূল্য পাবেন, যা মোট উৎপাদিত বোরো ধানের ৩.৩৫ শতাংশ।বাকি  ধান বিক্রি করতে হবে লোকসান দিয়ে।

 বাংলাদেশের বাস্তবতা হলো অটোমিল মালিকেরা কৃষকের  কাছ থেকে সাধারণত ধান ক্রয় করেন না।ফড়িয়া ও পাইকাররা  কৃষকের কাছ থেকে  ধান কেনে আড়তদারদের কাছে বিক্রি করেন। আর আড়তদাররা সেই ধান  বিক্রি করেন মিল মালিকদের কাছে ।অধিকাংশ সময় ট্যানারি মালিকদের মতো চালকল মালিকেরা ধানের মূল্য  নির্ধারণ করে আড়তদারদের জানিয়ে দেন। আড়তদারেরা সেই মোতাবেক পাইকার ও ফড়িয়াদের নিকট থেকে ধান কেনেন। সরকার ধানের মূল্য যাই নির্ধারণ করুক না কেন, ধান চালের শতভাগ বাজার নিয়ন্ত্রণ করেন ওই প্রভাবশালী মিল মালিকেরা।  এ কারণে কৃষক ধানের ন্যায্যমূল্য পান না  এবং  বিদ্যমান  ব্যবস্থার অবসান না হলে  বাংলার কৃষক কোনো দিনই ধানের ন্যায্যমূল্য পাবেন না। এই জন্য প্রয়োজন সরকারি খাদ্য সংগ্রহ  নীতিমালার  কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন। 

খাদ্যনীতি বিষয়ক আন্তর্জাতিক সংস্থা আইএফপিআরআই- এর প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, গত বছর মিল মালিকেরা কৃষকের কাছে থেকে প্রতি কেজি  ১৪ টাকা দরে হাইব্রিড ধান ক্রয় করে ৩৬ টাকা কেজি দরে সেই ধানের চাল  সরকারি গুদামে সরবরাহ করে সবচেয়ে বেশি লাভবান হন। আর কৃষক লাভ তো দূরের  কথা  ধান বিক্রি করে উৎপাদন খরচও তুলতে পারেন নাই। মণপ্রতি লোকসান দেন ১০০ থেকে ২০০ টাকা। 

আরও জানা যায়, গত বছর বাংলাদেশে ৩ কোটি ৬৩ লাখ টন চাল উৎপাদিত হয়।এর মধ্যে সরকার সংগ্রহ করেছে ১৪ লাখ ১৮ হাজার টন। ওই সংগ্রহের ৮১ শতাংশই সরবরাহ করেছে  চালকল মালিকেরা ।  বাকি ১৯ শতাংশ সরবরাহ  করেছে কৃষক।  বোরো ধানের ৫৭ শতাংশ উৎপাদন করেন ক্ষুদ্র চাষিরা। ৩৩ শতাংশ চাষি নগদ টাকায় জমি ভাড়া নিয়ে চাষ করেন,আর ২৬ শতাংশ হচ্ছেন ভাগ চাষি। অথচ কী নির্মম পরিহাস! এসব চাষিরা পদ্ধতিগত জটিলতার জন্য ব্যাংক থেকে প্রয়োজনীয় কৃষি ঋণ পান না বললেই চলে। 

দেখা গেছে,  সরকার গতবছর যখন প্রায় চার লাখ টন ধান কেনে, তখন ধানের দাম প্রায় সাড়ে ৭ শতাংশ বেড়ে যায়। আর যদি সংগ্রহের পুরোটা ধান হিসেবে কিনতো ,তাহলে ধানের দাম বাড়তো ৪৫ শতাংশ।তাই নির্দ্ধিধায় বলা যায়, সরকার নির্ধারিত মূল্যে ধান কেনার ওপরই নির্ভর করছে কৃষকের  ধানের ন্যায্য মূল্য পাওয়া ও বেঁচে থাকার সংগ্রাম।

আমার দৃঢ় বিশ্বাস সরকার যদি কৃষকের স্বার্থে খাদ্য সংগ্রহ নীতিমালার পরিবর্তন করে  এবং সরকারি খাদ্যবিভাগ  এবং বেসরকারি মিল মালিক উভয়েই যদি সরকার নির্ধারিত দামে  কৃষকের কাছ থেকে সময় মতো  সরাসরি ধান  ক্রয় করে, তা হলে  কৃষক  ধানের  ন্যায্য মূল্য পাবেন এবং টেকসই হবে দেশের  খাদ্য নিরাপত্তা।

নিতাই চন্দ্র রায়, সাবেক মহাব্যস্থাপক (কৃষি)

নর্থবেঙ্গল সুগার মিলস লিমিটেড

ইমেইল: [email protected]

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন