মঙ্গলবার | জুলাই ১৪, ২০২০ | ২৯ আষাঢ় ১৪২৭

সম্পাদকীয়

দাম নেই ধানের, মান নেই কৃষকের

পরজীবিতাই যখন সম্মানের

রতন মন্ডল

‘হয় ধান নয় প্রাণ- এ শব্দে সারা দেশ দিশাহারা‘ নিরেট বিদ্রোহী কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য তার দুর্মর কবিতায় যে ধানের কথা বলেছেন, তা স্বাধীনতার এক প্রতীকী শব্দ। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলে ইংরেজদের শাসন-শোষণ, লুণ্ঠনের অংশীদারি রূপে আধিপত্যশীল সামন্ততান্ত্রিক জমিদার শ্রেণী গড়ে ওঠে। কৃষকের উৎপাদিত ফসল ধান খাজনা মহাজনি ঋণ পরিশোধে তারা ছিনিয়ে নেয়। কবিগুরুর ‘সোনার তরী’ কবিতাটির আধ্যাত্মিক ব্যাখ্যা করেন অনেকে, কিন্তু ‘ঠাঁই নাই ঠাঁই নাই, ছোট সে তরী- আমারই সোনার ধানে গিয়াছে ভরি’ এখানে ফসলহারা কৃষকের আর্তনাদের কথা কেউ ব্যাখ্যা করলে তা নিশ্চয় যথার্থ হবে। সত্যজিৎ রায়ের বিখ্যাত ছবি ‘হীরক রাজার দেশে’ এ কতোই রঙ্গ দেখি গানে বলেছেন-‘সোনার ফসল ফলায় যে তার, দুই বেলা জোটে না আহার’ কথাগুলো কাব্য-ভাবনাতে দীনহীন কৃষকের ধান হারানোর আকুতি উঠে আসে। ধানে যেমন আছে আর্থসামাজিক অবস্থার প্রতিচ্ছবি, তেমনি আছে আবেগ। ধানে আছে আবেগ, আছে অস্তিত্ব। এ আবেগ কেবল কৃষক কবির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। সে আবেগে ‘অনেক নেতা’ আত্মহারার অভিনয়ে আদিখ্যেতা দেখাতে পাণ্ডসাণ্ড বাহিনী দিয়ে পাকা ধানে মই দিতে কুণ্ঠিত হননি। গত বছরেও ধানের দাম কম হওয়ায় সে ক্ষতি পুষিয়ে দিতে অনেক আমলা কামলা সেজে মাঠে একেবারে অন্তর থেকে কৃষকের উন্নতির লক্ষ্যে প্রতীকী অর্থে ধান কাটলেও কৃষকের ভাগ্যের চাকা কি খুলে গেছে? সমস্যার মর্মমূলে ব্যবচ্ছেদ বিশ্লেষণ ও সংশ্লেষিত পথ মোতাবেক ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে কোনোকালেই স্থায়ী সমাধান হবে না।

ধানের সঙ্গে বঙ্গবাসীর সহস্র পুরুষের আত্মিক যোগাযোগ, মিশে আছে অস্তিত্বে। বাংলায় নবোপলীয় যুগে কৃষিকর্ম শুরু থেকে ধানই শীর্ষস্থান অধিকার করে। বস্তুত ধানের চাষ অস্ট্রিকগোষ্ঠীভুক্ত জাতিগুলোর অবদান। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের আগে বাংলা তথা ভারতীয় সমাজে গ্রামের সব জমিজমার ওপর অধিকার গ্রাম-সমাজের দ্বারাই নিয়ন্ত্রিত হতো। সাধারণ রাজস্বও ধার্য হতো ব্যক্তির ওপর নয়, সমগ্র গ্রামের ওপর। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি শাসন-শোষণ ক্ষমতা অধিকার করতে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদের মাধ্যমে গ্রাম-সমাজভিত্তিক কৃষি-ব্যবস্থা সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত করে ফেলে। এ ব্যবস্থায় ব্যক্তি থেকে ভূমি-রাজস্ব আদায়ে জমিদার নামের একটি মধ্যশ্রেণীর উদ্ভব ঘটে। পরবর্তী সময়ে মহাজনগোষ্ঠী, তালুকদার, জোতদার, পত্তনিদারসহ অসংখ্য মধ্যশ্রেণী পরজীবীর শোষণের নিখুঁত শৃঙ্খল গড়ে ওঠে। ফলে কৃষকরা তাদের সম্পত্তির অধিকার ফসলের তথা ধানে অধিকার হারিয়ে রূপান্তর হলো ভূমিদাসে। সৃষ্টি হলো আধারি, পত্তনি প্রথার আবির্ভাব। অপরদিকে বাংলার তাঁতে প্রস্তুত বস্ত্র গোটা ইউরোপে সমাদৃত। সেখানে তা প্রবেশে প্রবল আন্দোলন ও নিষিদ্ধ ঘোষণা করে শিল্পোন্নয়নে নজর দেয়। ধ্বংস হলো এদেশের কৃষির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ কুটির শিল্পও। বিশেষজ্ঞদের মতে, পলাশীর যুদ্ধের (১৭৫৭ সাল) পর থেকেই বঙ্গদেশের তথা ভারতবর্ষে কৃষকের কাছ থেকে লুণ্ঠিত সম্পদ দিয়ে শিল্পবিপ্লব (১৭৬০ সাল) আরম্ভ হয়েছিল। অর্থাৎ পলাশীর যুদ্ধের মাত্র তিন বছর পর থেকে।

দেশভাগের পর ১৯৫০ সালে জমিদার প্রথা উচ্ছেদে সেই পরজীবী মধ্যস্বত্বভোগী জমিদার নায়েব গোমস্তাদের শোষণ-নির্যাতন থেকে মুক্ত হলেও এবার সেই খাজনার মালিক হলো রাষ্ট্র। রাষ্ট্রের পক্ষে বকেয়া খাজনা আদায় করতে সার্কেল অফিসার ও তহশিলদাররা ঘুষ, বডি ওয়ারেন্ট, সম্পত্তি ক্রোক ইত্যাদির মাধ্যমে দায়গ্রস্ত কৃষকের ওপর নির্যাতন করে। গ্রামাঞ্চলে শুরু হলো সেই পরজীবী শ্রেণীর ঘুষ ও দুর্নীতির ব্যাপক রাজত্ব। অপরদিকে মহাজনি শোষণেরও অবসান হলো না (বদরুদ্দীন উমর, প্রবন্ধ-জমিদারি প্রথা উচ্ছেদের পরবর্তী অবস্থা)। কৃষির উন্নয়ন বিষয়ে বঞ্চিত করেছে পশ্চিম পাকিস্তান প্রচণ্ড হারে। ১৯৬৪-৬৫ সালের বাজারদর হিসেবে মণপ্রতি ধানের দর ১২.৬০ টাকা। কৃষকের নিজের শ্রমকে ধরে আয় নির্ণয় করলে মণপ্রতি ১.৭০ টাকা ক্ষতি দেখা দেয়।

বর্তমানে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ২০১৭-১৮ অর্থবছরের এক হিসাবে দেখা যায়, ধানের উৎপাদন খরচ কেজিপ্রতি ২৪.৫০ টাকা অর্থাৎ প্রতি মণে ৯৮০ টাকা। কিন্তু গত বছর ধানের বাজারদর ছিল ৬০০-৭৫০ টাকা। সর্বোচ্চ বিক্রির দাম ৮০০ টাকা ধরলেও মণপ্রতি কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হন ১৮০ টাকা। এ বছর গত ১ মে বণিক বার্তার এক প্রতিবেদনে উঠে আসে এবারো সুনামগঞ্জ হাওড় অঞ্চলে ৬০০ থেকে সবেৃাচ্চ ৭৫০ টাকা দরে ধান বিক্রি হচ্ছে বেশির ভাগ উপজেলায়, দর ৬৫০ টাকা। ২৬ এপ্রিল থেকে ধান কেনার কথা থাকলেও তখন পর্যন্ত গড়িমসিতে ক্রয় কার্যক্রম শুরু হয়নি। কিন্তু দুঃখের বিষয় অধিকাংশ কৃষককে তার উৎপাদিত বেশির ভাগ ধান বিক্রি করতে হয় ধান মাড়াই মুহূর্তে। উৎপাদন খরচে জমির মূলধন মূল্য ও পারিবারিক শ্রমের খরচ বাদ দিলে প্রত্যেকবারই ক্ষতি হয়। অপরদিকে চাতাল মালিকরা সর্বোচ্চ প্রতি মণে ৮০০ টাকা দরে ক্রয় করে প্রতি মণে যদি ২৭ কেজি চাল প্রাপ্ত হয়, তাহলে তুষ ও কুঁড়ার মূল্য ধরে মিলিং খরচ হিসাব করলে চালের দাম ৩০ টাকার বেশি হবে না। অথচ সেই চালই মজুদ করে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে যে চড়াও হয় বাজার তা সবারই জানা। অনেকেই ভাবতে পারেন সরকার, ধানের দাম মণপ্রতি ১০৪০ টাকা নির্ধারণ করে ধান ক্রয় করে কৃষকের ক্ষতির অবসান হবে। এখানেও আছে এক শুভঙ্করের ফাঁকি। সরকারের পক্ষ থেকে বল হয়, প্রকৃত কৃষকের তালিকা করে লটারির মাধ্যমে ধান ক্রয় করায় কৃষক নয় এমন কারোর বিক্রয়ের সুযোগ নেই। কিন্তু আমার কাজের সূত্রে পরখ করে বলতে পারি সেসব ধান বেশির ভাগ গুদামে পোরে ফড়িয়া দালাল। তার কারণ, প্রথমত রাজনৈতিক দলে সম্পৃক্ততার প্রভাব খাটিয়ে তালিকা করার সময় ফড়িয়া দালাল অনেক ভূমিহীন বা অকৃষক ব্যক্তিদের তালিকায় সংযুক্ত করে। দ্বিতীয়ত, সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ধান ক্রয়ে গড়িমসি করে দেরি করে। কিন্তু আমরা জানি ধান মাড়াই, সার, কীটনাশক ও পানি সেচের দাম পরিশোধ করতে প্রায় কৃষক মাড়াই মুহূর্তে বেশির ভাগ ধান বিক্রি করতে বাধ্য হয়। তৃতীয়ত, অপেক্ষার পর লটারিতে নির্ধারিত হয়ে প্রকৃত কৃষক ধান বিক্রি করতে ধানের আর্দ্রতা, তাপমাত্রা ইত্যাদি মানদণ্ড যাচাইয়ে নানারকম হয়রানির এবং দুর্নীতির শিকার হয়। তাছাড়া বিক্রির টাকা ব্যাংকে হিসাব খুলে উত্তোলন করতে ঝামেলা মনে করে। ফলে অনেক কৃষকের লটারিতে নাম উঠলেও তারা ফড়িয়াদের কাছে তা বিক্রি করে দেয়। আর এক হিসাব মিলাই, এবার বোরো মৌসুমে ২০০ লাখ টন উৎপাদন হতে সরকার কিনবে মাত্র আট লাখ টন অর্থাৎ মোট উৎপাদনের শতকরা ৪ ভাগ। আর এ ৪ ভাগের আবার কমপক্ষে ৮০ ভাগই বিক্রি করে ফড়িয়া দালালচক্র। এসব হিসাব করলে দেখা যায়, সব মিলিয়ে মৌসুমের মোট ধানের শতকরা ১ ভাগ ধান প্রকৃত কৃষক বিক্রি করতে পারে না। ফলে সরকারের প্রদানকৃত ভর্তুকির অর্থ উদোর পূর্তি করে ফড়িয়া দালাল শ্রেণী। এটা ধনতান্ত্রিক ধারারই ফলাফল। যে কৃষক প্রকৃতিকে লালন করে খাদ্য উৎপাদন তথা সম্পদ সৃষ্টি করে তারাই হারিয়ে ফেলে সে সম্পদের অধিকার। কয়েক ঘণ্টার হাত বদলে লভ্যাংশ লুটে নেয় পরজীবী শ্রেণীর রেন্ট-সিকার। রেন্ট-সিকার (জবহঃ-ংববশবৎ) যারা নিজেরা কোনো সম্পদ সৃষ্টি করে না, অন্যের সম্পদ নানা কূটকৌশলে দখলে নেয়। প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আবুল বারকাত তার ‘বাংলাদেশে কৃষি-ভূমি-জলা সংস্কারের রাজনৈতিক অর্থনীতি’ গবেষণা গ্রন্থে বলেছেন, ‘সমগ্র আর্থসামাজিক-রাজনৈতিক কাঠামোটিই এমন এক সম-স্বার্থের ত্রিভুজাকৃতির রূপ নিয়েছে, যেখানে ত্রিভুজের উপর বাহুতে আছে ওই রেন্ট-সিকার গোষ্ঠী আর নিচের দুই বাহুর একদিকে আছে রাষ্ট্র ও সরকার আর অন্য (তৃতীয়) বাহুতে আছে রাজনীতি। রাষ্ট্রে সম্মানের সব আসন দখলে এদেরই। সরকারি ধান ক্রয়েই শুধু পরজীবীর উপদ্রব নয়, বর্তমান বাজার ব্যবস্থাপনায় কয়েক স্তরের এর আবির্ভাব হয়েছে। এসব বুঝতে বাংলার আর্থসামজিক পরিবর্তনের দিকে নজর দেয়া যাক।

একসময় বাংলার প্রবাদ ছিলÑগোলা ভরা ধান, গোয়াল ভরা গরু আর পুকুরভর্তি মাছ। গত শতকের আশি-নব্বই দশকেও বেশির ভাগ কৃষক তাদের নিজস্ব হালের বলদ দিয়ে জমি চাষ করে, নিজের সংরক্ষিত বীজ বপন-রোপণ করে ধান ফলাত। সেই ধান সিদ্ধ করে শুকিয়ে ঢেঁকিতে ভাঙত। কারো দ্বারস্থ না হয়ে সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে ধান চাষ করে ঢেঁকিছাঁটা চালের ভাত খেতে পারত। যারা সারা বছরের খোরাকি ধান পেত না, তারা অবস্থাসম্পন্ন গেরস্তের কাছ থেকে চাল বা ধান ধার করত। পরে কম মূল্যে কৃষি শ্রমের বিনিময়ে বা অধিক হারে ধান ফেরত দিতে বাধ্য হতো। আমি দেখেছি অনেক প্রান্তিক কৃষক বা ভূমিহীন ব্যক্তি সাইকেলে কৃষকের কাছ থেকে ধান ক্রয় করে বাড়িতে সিদ্ধ করে শুকিয়ে মিলে ভাঙাত। সেই চাল হাটবাজারে সরাসরি ভোক্তার কাছে বিক্রি হতো। গড়ে উঠেছিল ছোট-মাঝারি অনেক চাতাল। এরা কৃষকের কাছ থেকে সরাসরি ধান ক্রয় করে সিদ্ধ চাল করে বাজারে বিক্রি করত। খুচরা চাল ব্যবসায়ীরা তা ক্রয় করে বাজারে ভোক্তার কাছে বিক্রি করত। তখন উৎপাদক ও ভোক্তার মধ্যে বেশি ফারাক ছিল না। ছিল না সিন্ডিকেটের মতো শোষণের চক্রব্যূহ। খরা-বন্যার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ ছাড়া চালের বাজার চড়াও হতো না।
সময়ের সঙ্গে পুঁজির সঞ্চয়ে গড়ে উঠতে লাগল ধান-চাল ব্যবসায়ী। এরা কৃষকের কাছ থেকে ক্রয় করে চাতাল মালিকদের কাছে বিক্রি করে এবং চাতাল মালিকের কাছে আবার চাল ক্রয় করে খুচরা বিক্রেতার কাছে বিক্রি করে। অধিক লাভে শুরু করল ধান-চাল মজুদদারি। আবার কৃষককে ঠকাতে কাঁচা ধান শুকিয়ে কমে যাবে মর্মে ৪২ কেজিতে মণ নির্ধারণ করে। শুধু কি তাই, আমি আগে হাটে ধান বিক্রি করতে দেখেছিÑবড় দাঁড়িপাল্লায় বস্তার ধান ওজন করতে ধানের বস্তার ওজনের চেয়ে মোটা কয়েকগুণ ওজনের একটা বস্তা বাটখারার পাশে দিয়ে রাখত। আর বাজার দামের ওঠানামা নিয়ে সিন্ডিকেটের ছলচাতুরী তো আছেই। ফলে কৃষক তার ধান ভ্যান ভাড়া করে বাজারে বিক্রি করতে আগ্রহ কমে যেতে থাকল। এই শূন্যস্থানে এল ক্ষুদ্র ফড়িয়ারা। অপরদিকে অধিক পুঁজিপতিরা উন্নত প্রযুক্তিসম্পন্ন অটো রাইচ মিলে কম সময়ে অল্প শ্রমিকে ঝকঝকে চাল উৎপাদন শুরু করল। ভোগবাদী ভোক্তারা অধিক দামে চাঁছাছোলা চালের ফুরফুরে ভাত খেতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করল। মুখ ফিরিয়ে নিল ঢেঁকিছাঁটা বা সাধারণ মিলের খসখসে ঘোলা চালের পুষ্টিগুণসম্পন্ন ভাত থেকে। ফলে ভূমিহীন সেসব চাল ব্যবসায়ীসহ ছোট-মাঝারি চাতাল মালিকের ব্যবসা প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে বিলীন হয়ে গেল। কার্ল মার্ক্স তার ভবিষ্যদ্বাণীতে বলেছেন, ‘কোম্পানিগুলো এত বড় হতে থাকবে তারা নিজেদের প্রতিদ্বন্দ্বীদের গ্রাস করে নেবে যতক্ষণ পর্যন্ত না তাদের একাধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়।’ আমাদের এলাকায় বেশির ভাগ সেসব ছোট-মাঝারি চাতাল ব্যবসায়ী এখন বাধ্য হয়ে পোলট্রি মুরগি পালন ব্যবসা করছেন। ফলে প্রত্যেক অঞ্চলে হাতেগোনা চাতাল মালিকরা সিন্ডিকেট করে এককভাবে নিশ্চিত মুনাফার ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। ভূমিহীন অনেক চাল ব্যবসায়ী কৃষকের ধান গ্রাম থেকে ক্রয় করে ছোট বা মাঝারি ব্যবসায়ীদের কাছে, তারা আবার বড় আড়ত ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করে। ফলে কয়েক স্তরের মধ্যস্বত্বভোগী পরজীবী শ্রেণী সৃষ্টি হয়েছে। বড় বড় অটো চাতালের চাল ভোক্তাবদি পৌঁছতেও কয়েক স্তরের মধ্যস্বত্বভোগী পরজীবীর হাতবদল হতে হয়। কয়েক ঘণ্টা বা দিনের হাতবদলের মাধ্যমে নিশ্চিত মুনাফা লাভ করে। ফলে শোষিত হচ্ছে কৃষকের শ্রম শোষণ ও ভোক্তার নগদ অর্থ। এখানে মজার বিষয় সবচেয়ে বড় গোষ্ঠী উৎপাদক ও ভোক্তার মধ্যে কোনো সংগঠন নেই। রাষ্ট্রের চাপ প্রয়োগকারী গোষ্ঠীর ভূমিকায় এরা একেবারেই অক্ষম। অথচ এদের মাঝে প্রত্যেক পরজীবী শ্রেণীর আছে বিভিন্ন সংগঠন। আছে শোষণের নিখুঁত নিরেট অভেদ্য আর্থসামাজিক-রাজনৈতিক শৃঙ্খল।

তাই হাজার কোটি অর্থের ভর্তুকি শুধু হাওয়ায় উড়িয়ে দিলে রেন্ট-সিকার তথা পরজীবীরাই উদর পূর্তি করবে। তাই সম্পদ বণ্টন ন্যায্যতা নিশ্চিত করতে প্রয়োজন আর্থসামাজিক-রাজনৈতিক মর্মমূলের ব্যবচ্ছেদ বিশ্লেষণে সঠিক সিদ্ধান্ত। কৃষি ক্ষেত্রকেও অন্যান্য শিল্পের মতো পরিষেবা ও পরিকাঠামো উন্নত করতে হবে সম্পূর্ণ সরকারি উদ্যোগে। গ্রামের রাস্তা, যান, শুকানোর চাতাল, গ্রেডিং ও প্যাকিং ব্যবস্থা, জৈব-সার-কীটনাশক ও বীজ উৎপাদন সংরক্ষণ বিজ্ঞানসম্মত কৌশল পরিষেবা ও উন্নত পরিকাঠামো তৈরি করতে হবে। কৃষি যান্ত্রিকীকরণে পরিবেশ-প্রকৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে, গ্রাম্য কৃষকদের সমন্বয়ে সরকারি ব্যবস্থাপনায় সমবায়ভিত্তিক পরিচালনা করতে হবে যাতে মধ্যস্বত্বভোগী উদ্ভব না হয় এবং পরিণত না হয় প্রযুক্তির দাসে। সরকারি ধান ক্রয়ে আর্দ্রতা ও অন্যান্য মানদণ্ড ন্যূনতম নির্ধারণ করে মাঠ থেকে সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে ক্রয়ের ব্যবস্থা নিতে হবে। ধান সংরক্ষণের মান আনয়নে সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকেই দায়িত্ব নিতে হবে। আর চাল সংগ্রহে চাতাল মালিকের ওপর নির্ভর না করে সরকারিভাবেই প্রত্যেক উপজেলায় বড় বড় অটো রাইস মিল প্রতিষ্ঠা করতে হবে, যাতে কৃষকের কাঁচা ধানও সরাসরি ক্রয় করতে পারে। অবাক বিষয়, কৃষির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খাতে সরকার কোনো অটো রাইস মিল নেই। তা থাকলে চাল ক্রয়ে চাতাল মালিকদের যে লভ্যাংশের ভার সরকারকে বহন করতে হয়, তা হতে সরকার রেহাই পাবে। অটো রাইস মিল প্রতিষ্ঠায় সরকারের একটি লাভজনক প্রতিষ্ঠান পরিণত হবে। অপরদিকে চালের বাজার নিয়ন্ত্রণে সরকার যে কোনো সময় চাল উৎপাদনে অতীব কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারবে। অলাভজনক খাত কৃষি থেকে কৃষক যেভাবে বিচ্যুত হয়ে অকৃষি শ্রমে ধাবিত হচ্ছে, তা রোধ না করতে পারলে ভবিষ্যতে পত্তনি ও চুক্তিবদ্ধ চাষের রাহুগ্রাসের কবলে পড়বে সম্পূর্ণ কৃষি ব্যবস্থা। বর্তমানে আর্থসামাজিক-রাজনৈতিক যে অবকাঠামো তৈরি হয়েছে তার পুনর্বিন্যাসে এসব কঠোর সিদ্ধান্তে আসতেই হবে। অদম্য কবি সুকান্তের পরাধীনতার শিকল ভাঙা স্বাধীনতার সুরে বলতে হবে -‘এবার লোকের ঘরে ঘরে যাবে সোনালী নয়কো, রক্তে রঙিন ধান’।

লেখক: রতন মন্ডল (কৃষিবিদ, কলাম লেখক)


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন