শনিবার | জানুয়ারি ২৯, ২০২২ | ১৬ মাঘ ১৪২৮

খবর

করোনাকালীন দুর্যোগে ক্ষুদ্র কৃষকদের বাজারে সংযোগ করাচ্ছে এনএটিপি

সাইদ শাহীন

নভেল করোনাভাইরাসের কারণে চলমান লকডাউনে যখন সারা দেশের ক্ষুদ্র কৃষক তার উৎপাদিত পণ্যের বাজারজাতকরণ ও ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছে তখন তাদের পাশে দাঁড়িয়েছে জাতীয় কৃষি প্রযুক্তি কর্মসূচির দ্বিতীয় পর্বের প্রকল্প (এনএটিপি-২) প্রকল্প। এই প্রকল্পের মাধ্যমে কৃষিপণ্য, মাছ, দুধ, ডিম এবং মাংসের সরবরাহ চেইন ও বিপণন উন্নয়নের মাধ্যমে ক্ষুদ্র কৃষকদের বাজারে দ্রুত সংযোগ করা হচ্ছে।  

জানা গেছে, করোনাভাইরাস মহামারীর কারণে সারা দেশে লকডাউন আইন কার্যকর করায় কৃষিপণ্যের সরবরাহ চেইন এবং কৃষি বিপণন প্রত্যক্ষ ও অপ্রত্যক্ষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। স্থানীয় বাজারে পণ্যের পর্যাপ্ত চাহিদা না থাকায় এবং করোনাভাইরাসের কারণে দূরের বাজারে পণ্য পাঠানোর সীমাবদ্ধতা থাকায় কৃষকরা তাদের পণ্য, বিশেষত পচনশীল পণ্যের (শাকসবজি, ফলমূল, মাছ, দুধ, ডিম ইত্যাদি) ন্যায্যমূল্য পাচ্ছে না। করোনাভাইরাসের সংকটজনিত কারণে পরিবহনব্যয়ও দ্বিগুণ বা তিনগুণ হয়ে গেছে। এ অবস্থায় কৃষি মন্ত্রণালয়ের সবচেয়ে বড় প্রকল্প এনএটিপি-২ কৃষকের বিপণন সহযোগিতা দেয়ার মাধ্যমে কাজ করে যাচ্ছে। এই প্রকল্পের তিনটি অঙ্গ রয়েছে। কৃষি সম্প্রসারণ অঙ্গ, মৎস্য অধিদপ্তর অঙ্গ এবং প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর অঙ্গের মাধ্যমে উৎপাদন বৃদ্ধি এবং ক্ষুদ্র কৃষকদের বাজার সংযোগ উন্নয়নের লক্ষ্যে কাজ করছে।

কৃষকদের উৎপাদিত পণ্যের চাহিদা সৃষ্টি এবং পণ্যগুলোর যথাযথ মূল্য নিশ্চিত করতে ভূমিকা রাখছে। বিশেষ করে সবজির জন্য ৩০টি কেন্দ্র করা হয়েছে। যেখানে কৃষকের সবজিগুলো কিনে এনে গ্রেডিং ও বাছাই করা হয়। আবার মাছের জন্য অনলাইনে বিক্রির ব্যবস্থা করা হয়েছে। পাশাপাশি মাছের বিপণনের জন্য মোবাইল ভ্যানের ব্যবস্থা করা হয়েছে। ফলে করোনাকালীন ভোক্তারা বাজারে না গিয়ে পণ্য কিনতে পারছেন। এতে কৃষক ও ভোক্তা উভয়ই লাভবান হচ্ছেন।

এ বিষয়ে কৃষি মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব ও এনএটিপি-২ প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক মো. মতিউর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, করোনাকালে কৃষকদের পণ্যগুলো বিপণন নিশ্চিত করতে সম্বিতভাবে কাজ করা হচ্ছে। কেননা বিপণন করতে না পারলে কৃষকদের পণ্য নষ্ট হতে পারে। পাশাপাশি তারা দাম না পেলে পরবর্তী শস্য উৎপাদনে আগ্রহ হারাবে। তাই শস্য, মাছ কিংবা দুধ, ডিম থেকে শুরু করে সব ধরনের কৃষিপণ্যের ন্যায্য দাম নিশ্চিত করতে যা প্রয়োজন তাই এই প্রকল্পের মাধ্যমে আমরা করবো। উৎপাদন ও বিপণনে আমরা প্রযুক্তি ও নীতি সহায়তার পাশাপাশি টেকসই ও সময় উপযোগী পদক্ষেপগুলো মাঠ পর্যায়ে বাস্তবায়ন করছি। যাতে কৃষক লাভবান হতে পারে।

জানা গেছে, এই প্রকল্প কৃষিপণ্য সরবরাহ চেইন ও বিপণনে প্রকল্পের কৃষি সম্প্রসারণ অঙ্গ ও তার কৌশলগত অংশীদার হর্টেক্স ফাউন্ডেশন ৩০টি পূর্ব নির্ধারিত উপজেলায় ৩০টি পণ্য সংগ্রহ ও বিপণন কেন্দ্রের (সিসিএমসি) মাধ্যমে উচ্চমূল্যে কৃষকদের পণ্য বিক্রয় নিশ্চিত করতে তাদের সহায়তা করছে। লকডাউনের সময় পরিবহণ-ব্যয় বেশি থাকার কারণে দূরের বাজারের ব্যবসায়ীরা যখন আসতে পারছিলেন না, তখন হর্টেক্স কৃষকদের পণ্য স্থানীয়ভাবে বিক্রিতে সহায়তা করেছে। লকডাউন চলাকালীন তারা আদ-দ্বীন হাসপাতাল এবং বাংলাদেশ সেনাবাহিনীসহ কিছু কিছু প্রতিষ্ঠানে সংযোগ স্থাপন করেছে এবং সরাসরি কৃষিপণ্য সরবরাহ করেছে। কিছু সিসিএমসি কৃষকদের জমি থেকে তাদের উৎপাদিত পণ্য সরাসরি ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রিতে সহায়তা করেছে। এছাড়া হর্টেক্স মহামারীর সময় কৃষকসহ সংশ্লিষ্ট সবার মাঝে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা এবং স্বাস্থ্য সুরক্ষার নির্দেশিকাগুলোও গুরুত্বসহকারে প্রচার করে।

মাছের সরবরাহ চেইন ও বিপণন করতে বেশ কিচু উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এর মধ্যে লকডাউনে যখন মাছ চাষীরা দূরের বাজারগুলোতে মাছ পরিবহন করতে সক্ষম হচ্ছিলেন না তখন মাছের দাম খুব কমে যায়। এ অবস্থায় প্রকল্পের মৎস্য অধিদপ্তর অঙ্গ ২২টি উপজেলার ২২টি প্রডিউসার অর্গানাইজেশন (পিও) সদস্যদের মাধ্যমে ‘মোবাইল ফিশ মার্কেট’ এবং ‘ডিজিটাল বিপণন’ পদ্ধতি চালু করে মাছ চাষীদের বিশেষ সহায়তা প্রদান করে। ‘মোবাইল ফিশ মার্কেট’ ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হয়। 

অত্যন্ত সফল এই ‘মোবাইল ফিশ মার্কেট’ এর মাধ্যমে খুলনার ডুমুরিয়ায় কোটি কোটি টাকার মাছ এক সপ্তাহের মধ্যে বিক্রি হয়। ২০২০ সালের মে মাসে পিও-র সদস্যদের মাধ্যমে দ্রুত মাছ বিপণনের জন্য একটি আইসিটি ভিত্তিক ফিশ মার্কেটিং ওয়েবসাইট (www.pofishmarket.com) এবং মোবাইল অ্যাপস (Fish Market) চালু করা হয়। তথ্য আপডেট রাখতে পিও অফিসগুলোর পিও ব্যবস্থাপকদের কাছে মোবাইল ট্যাব বিতরণ করা হয়। এছাড়া প্রকল্পের মৎস্য অধিদপ্তর অঙ্গ করোনাভাইরাস মহামারীর মধ্যেই স্কাইপের মাধ্যমে এবং সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে এবং স্বাস্থ্য সুরক্ষার নির্দেশিকাগুলো অনুসরণ করে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করে।

এ বিষয়ে এনএটিপি-২ প্রকল্পের পরামর্শক ড. মো. মাহবুব আলম বণিক বার্তাকে বলেন, লকডাউনে বাজার বা দোকানগুলোর ব্যবসার সময় কমায় এবং বড় শহরগুলোতে প্রবেশে বিধিনিষেধ থাকায় কৃষিপণ্য অত্যন্ত স্বল্পমূল্যে বিক্রি হচ্ছে। এতে কৃষকদের ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়তে হচ্ছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তারা উৎপাদন ব্যয়ও তুলতে পারছেন না। এ সময় তাদের জন্য আশীর্বাদ হয়ে কাজ করছে এনএটিপি-২ প্রকল্প। আমাদের কার্যক্রমের মূল উদ্দেশ্য হলো কৃষিপণ্যের বাজার সুবিধা নিশ্চিত করা এবং কৃষিপণ্যের উৎপাদন উপকরণের সরবরাহ নিশ্চিত করা। পাশাপাশি করোনাভাইরাস মহামারী পরবর্তী পরিষেবাগুলো নিশ্চিত করার জন্য প্রকল্পের আর্থিক বরাদ্দের পুনর্বণ্টন।

এ প্রকল্পের আওতায় দুধ, ডিম এবং মাংসের সরবরাহ চেইন ও বিপণন করতে কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।  দুধ, ডিম এবং মাংস বাজারজাত করার জন্য প্রকল্পের প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর অঙ্গের আওতায় ৬০টি উপজেলায় ১২০টি প্রডিউসার অর্গানাইজেশন (পিও) প্রতিষ্ঠা করেছে। যখন চাষীরা তাদের উৎপাদিত দুধ, ডিম এবং মাংসের ন্যায্য দাম পাচ্ছিলেন না, তখন প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর অঙ্গের পিও সদস্যরা দারুণ একটি সমাধান নিয়ে এগিয়ে আসেন। তারা ‘মোবাইল মিল্ক মার্কেট’ এবং ‘মোবাইল মিল্ক, ডিম এবং মাংসের বাজার’ চালু করে এবং স্থানীয় গ্রাহকদের কাছে দুধ, ডিম এবং মাংস সরবরাহ করেন। স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে এই উদ্যোগের অত্যন্ত প্রশংসা করা হয় ও স্বাগত জানানো হয়। এই উদ্যোগের ফলে সাধারণ গ্রাহকরা তাদের বাড়িতে থেকেও দুধ, ডিম এবং মাংস সংগ্রহ করতে পারছেন।

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন