শুক্রবার | জুলাই ১০, ২০২০ | ২৬ আষাঢ় ১৪২৭

ফিচার

করোনা মোকাবেলায় আফ্রিকার সফলতার গল্প কেন উপেক্ষিত

বণিক বার্তা অনলাইন

নভেল করোনাভাইরাস মহামারীর প্রথম দিকে ভাইরাসটি দারিদ্র্যপীড়িত আফ্রিকা মহাদেশে আঘাত হানলে কতটা ভয়ঙ্কর পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে- তা নিয়ে জল্পনা ছিল। যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন ও ইতালির মতো উন্নত দেশের তুলনায় স্বল্প আয় ও অধিক জনসংখ্যার দেশগুলো দুর্বল স্বাস্থ্যব্যবস্থা নিয়ে কীভাবে কভিড-১৯ মোকাবেলা করবে, সেটা নিয়ে ছিল গভীর উদ্বেগ।

বহু আফ্রিকান দেশ প্রাথমিকভাবে উপলব্ধি করেছিল যে ব্যয়বহুল পরীক্ষা, দ্রুত হাসপাতালে ভর্তি এবং এত বেশি জনসংখ্যার চিকিৎসার ব্যবস্থা করা তাদের পক্ষে কঠিন। সুতরাং সৃজনশীল পন্থা অবলম্বন করা ছাড়া তাদের পক্ষে আর কোনো বিকল্প ছিল না।

যেমন আফ্রিকার দেশ সেনেগাল এক ডলার মূল্যের কভিড-১৯ টেস্টিং কিট তৈরি করেছে। আশা করা হচ্ছে কিটটি ১০ মিনিটেরও কম সময়ে মুখের লালার অ্যান্টিজেন বা অ্যান্টিবডির মাধ্যমে বর্তমান ও পূর্ববর্তী সংক্রমণ শনাক্ত করতে পারবে। অথচ অন্য দেশগুলোতে পরীক্ষা করা পলিমারেজ চেইন রিঅ্যাকশনের (পিসিআর) একেকটি পরীক্ষায় কয়েকশ ডলার ব্যয় করতে হয়। 

গার্ডিয়ানের কলাম লেখক আফুয়া হারশ বলেন, গত সপ্তাহে লন্ডনে একটি লিফলেটের মাধ্যমে ২৫০ ডলারে আমাকে একটি পিসিআর টেস্টিং কিট সরবরাহের অফার দেয়া হয়েছিল। সুতরাং যুক্তরাজ্য যেখানে ২৫০ ডলারে একজন পরীক্ষা করতে পারবে, এই টাকায় সেনেগালের কিট দিয়ে ২৫০ জনের পরীক্ষা করা সম্ভব।

তাছাড়া সেনেগাল এখন পর্যন্ত ভালো অবস্থানে আছে। কভিড-১৯ প্রাদুর্ভাবের পর আন্তর্জাতিক সতর্কতার সঙ্গে সঙ্গে জানুয়ারির প্রথম দিকেই দেশটি আন্তরিকভাবে পরিকল্পনা শুরু করে। সরকার সীমান্ত বন্ধ করে দেয়, কন্ট্যাক্ট ট্রেসিংয়ের একটি বিস্তৃত পরিকল্পনা শুরু করে এবং প্রতিটা হাসপাতাল ও কমিউনিটি ক্লিনিকে কভিড-১৯ স্বাস্থ্যসেবার ব্যবস্থা করে। ফলস্বরূপ ১ কোটি ৬০ লাখ জনসংখ্যার এ দেশটিতে এখন পর্যন্ত কেবল ৩৯ জন মৃত্যুবরণ করেছে এবং আক্রান্তের সংখ্যা প্রায় ৩ হাজার। প্রতিটা মৃত্যু সরকার স্বতন্ত্রভাবে স্বীকার করেছে এবং পরিবারগুলোর প্রতি সমবেদনা জানিয়েছে।

অন্যদিকে ৩ কোটি জনসংখ্যার দেশ ঘানাতে এখন পর্যন্ত ৩১ জন মারা গেছেন। কন্ট্যাক্ট ট্রেসিংয়ের বিস্তৃত ব্যবস্থা, বিপুল সংখ্যক স্বাস্থ্যকর্মী ও স্বেচ্ছাসেবকদের ব্যবহার এবং ‘পুল টেস্টিং’ এর মতো উদ্ভাবনী কৌশলের কারণে এমন সাফল্য পাওয়া গেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। পুল টেস্টিংয়ে একাধিক জনের রক্তের নমুনা একসঙ্গে করে পরীক্ষা করা হয় এবং সেটি পজিটিভ পাওয়া গেলে পুনরায় সবার আলাদা আলাদা করে পরীক্ষা করা হয়। এ পদ্ধতিটা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও (ডব্লিউএইচও) পরীক্ষা করে দেখছে। 

ব্যয়বহুল চিকিৎসা পণ্যগুলোর স্বল্পতার কারণে আফ্রিকা মহাদেশজুড়ে ঐতিহ্যবাহী ভেষজ প্রতিকারও খুঁজে দেখা হচ্ছে। বিশেষ করে ডেইজি পরিবারের অন্তর্গত আর্টেমিসিয়া আনুয়া বা সুইট ওয়ার্মউড নামের উদ্ভিদটি নিয়ে মাদাগাস্কারের প্রেসিডেন্ট অ্যান্ড্রি রাজোয়েলিনা দাবি করেছেন, এটি দিয়ে কভিড-১৯ এর নিরাময় সম্ভব। যদিও এটা ট্রাম্পের মতো পরামর্শ মনে হতে পারে এবং ডব্লিউএইচও আরো পরীক্ষা-নীরিক্ষার আগে এটি সেবনের বিষয়ে সতর্ক করেছে। 

তবে জার্মানির নামকরা ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক ইনস্টিটিউট অব কলোয়েডস অ্যান্ড ইন্টারফেস এ গাছের বিভিন্ন প্রজাতি নিয়ে ক্লিনিকাল ট্রায়াল শুরু করেছে। এখন অবধি ফলাফলকে ‘খুব আকর্ষণীয়’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক পিটার সিবার্গার। তাই এটা দিয়ে মানব ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল পরিচালনার সম্ভাবনা রয়েছে।

আফ্রিকার ২০টিরও বেশি দেশ মাদাগাস্কারের প্রেসিডেন্টের দাবিকে সমর্থন করেছেন। অ্যান্ড্রি রাজোয়েলিনা উদ্ভিদটি থেকে তৈরি বাদামি ভেষজ পানীয়ের বোতল নিয়ে সভা ও টেলিভিশনে উপস্থিত হয়ে সেটির উপকারিতা তুলে ধরছেন। এবং তিনি আফ্রিকার উদ্ভাবনের বিষয়ে বাকি বিশ্বের নেতিবাচক মনোভাব নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি ফরাসি টিভিতে প্রশ্ন করেছিলেন, এ উদ্ভাবন যদি ইউরোপীয় কোনো দেশ করতো, তাহলে কি সন্দেহ করা হতো?

নিবন্ধের লেখক আফুয়া হারশ বলেন, এখন বিজ্ঞানীদেরই বলতে হবে এ উদ্ভাবন সত্যিই কাজ করে কিনা। আর সমস্যা থেকে বেরিয়ে আসার উপায় উদ্ভাবনে আফ্রিকার এক দুর্দান্ত ইতিহাস রয়েছে। কেবল মোবাইল ব্যাংকিং আর ফাইন্যান্সিয়াল টেকনোলজি (ফিনটেক) কীভাবে একটি অংশকে বিশ্বের অন্যতম ডিজিটাল সচেতন অঞ্চলে পরিণত করতে পারে আফ্রিকায় তার উদাহরণ রয়েছে। যদিও আফ্রিকা কভিড-১৯ পরাস্ত করার পাঠ থেকে আমরা শিখবো না এটা নিশ্চিত। কারণ এই ধরনের মানসিকতাই আমাদের মধ্যে সেট হয়ে গেছে।

দ্য গার্ডিয়ান অবলম্বনে

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন