শুক্রবার | জুলাই ১০, ২০২০ | ২৬ আষাঢ় ১৪২৭

সম্পাদকীয়

বাণিজ্যিক ব্যাংক: আবারও কি গড়ে উঠবে মন্দঋণের পাহাড়?

মামুন রশীদ

প্রণোদনা সহায়তা বিতরণে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তদের বের করে যথাযথ ঝুঁকি পর্যালোচনা করে ঋণ দিয়ে আবার ফেরত আনার সম্ভাব্য সমস্যার কথা মনে করিয়ে দিতেই তির্যক মন্তব্য করলেন এক গুরুজন। তার মতে, ব্যাংকের কাজই তো হচ্ছে ঋণ বিতরণ করে অর্থনীতির চাকাকে সচল রাখা। আবার ক্ষুদ্র ও মাঝারি খাতে বিশেষ ঝুঁকি এবং ব্যাংকগুলোর অনীহা বা দক্ষতার অভাব বিবেচনায় ক্রেডিট গ্যারান্টি স্কিমের কথা বললে অগ্রজতুল্য অনেকেই তাদের অতীত অভিজ্ঞতায় আমাকে ভুল বললেন। ক্রেডিট গ্যারান্টি স্কিম হলে নাকি মন্দঋণের ঢল নামবে।

কার্যকর বা সরাসরি ব্যাংকিং ছেড়ে দিয়েছি প্রায় অনেক বছর। তবুও বিভিন্ন প্রশিক্ষণ কার্যক্রমে তরুণ ব্যাংকাররা প্রায়ই আমাকে প্রশ্ন করেন, কেন একটি ঋণ মন্দে পরিণত হয়? কীভাবে আমরা ঋণ ক্ষতি এড়াতে পারব? রিস্ক অফিসার হিসেবে আমি ব্যাংকিং জীবনের ২৬ বছরের মধ্যে প্রায় ১৫ বছর কাজ করেছি। দীর্ঘদিনের কাজের অভিজ্ঞতা আমাকে একটি বিষয় শিখিয়েছে-ঋণ সাধারণত মন্দ হয় যেসব কারণে তাহলো - ১. ঋণ প্রয়োজনীতার দুর্বল মূল্যায়ন, ২. ঋণসংশ্লিষ্ট ভুল পরিকল্পনা, ৩. প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা বা জামানতের ঘাটতি, ৪. ব্যবসায় অভ্যন্তরীণ নগদ অর্থের দুর্বল জোগান পুরনো বকেয়ার পুনরাবৃত্তি ঘটায়, ৫. ব্যবসার ভিত্তি, কিংবা ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা অথবা এমনকি ধারাবাহিকতার দিকে না তাকিয়ে শুধু ঋণগ্রহীতার নামের ওপর ভর করে ঋণ প্রদান, ৬. প্রতিযোগিতা অথবা উদীয়মান প্রতিযোগিতা সম্পর্কে ব্যাংক কর্মকর্তার অজ্ঞতা, ৭. অর্থনৈতিক মন্দা অথবা মূলধারা বাদ দিয়ে অন্যান্য কম গুরুত্বপূর্ণ ব্যবসায় বিনিয়োগ।
এ কারণগুলোর সঙ্গে আরো যোগ করতে হবে দুর্বল ঋণ মূল্যায়ন, বৈদেশিক মুদ্রা বিনিময়ের ঝুঁকি বুঝতে না পারার ব্যর্থতা, ঋণ কর্মকর্তাদের দুর্নীতি বা ব্যর্থতা, ন্যূনতম প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণ করতে না পারলেও ঋণ দেয়া অথবা যথাযথ নজরদারির অভাব।

ইন্দোনেশিয়ায় ঋণ কর্মকর্তার বৈদেশিক মুদ্রা রূপান্তর বা মুদ্রা বিনিময় হার ওঠা-নামার ঝুঁকি বুঝতে না পারার ব্যর্থতায় অনেক ঋণকে মন্দ হতে দেখেছি আমি। মেয়াদি প্রকল্পের অর্থায়নের কাজে স্বল্পমেয়াদি চলতি ঋণের ব্যবহার মালয়েশিয়ায় অনেক ঋণ মন্দ হতে দেখেছি, এ পরিস্থিতি অনেকটাই বাংলাদেশের মতো। তাইওয়ানে অনেক মিডেল মার্কেট ঋণ মন্দ হয়ে গিয়েছিল, এর কারণ ছিল ট্রেড সাইকেলের তুলনায় ঋণ পরিশোধে সময় কম দেয়া। ভারতে তীব্র প্রতিযোগিতার কারণে জামানতে ঘাটতি নিয়েও ব্যাংকগুলো ঋণ দিয়েছে।

পূর্ব আফ্রিকার বেশির ভাগ ঋণ মন্দ হওয়ার পেছনে অন্যতম কারণ ব্যাংক কর্মকর্তাদের ব্যবসায়ের ঝুঁকি নিরূপণের দক্ষতার অভাব। এজন্য ঋণগ্রহীতারা মিথ্যা তথ্য দিয়ে মোটা অংকের অর্থ তুলে নিয়ে যায়।

এমনকি সম্প্রতি আমরা বাংলাদেশে দেখেছি কীভাবে শিল্পঋণ শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করা হচ্ছে। পাকিস্তানে ‘নেম লেন্ডিং’ বা ‘ইনফ্লুয়েন্সড লেন্ডিং’ অনেক ব্যাংককে দেউলিয়া হওয়ার পথে ঠেলে দিয়েছে। এক্ষেত্রে লাতিন আমেরিকার ঘটনাগুলো আবার বৈদেশিক মুদ্রার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা সংশ্লিষ্ট, যখন ইউরোপ, এমনকি উত্তর আমেরিকার ঘটনাগুলো সংশ্লিষ্ট অন্তর্নিহিত সম্পত্তি মূল্যের চরম পতন, যা সেখান থেকে বের হয়ে আসাকে প্রায় অসম্ভব করে দেয়।

গ্রাহক যে-ই হোন অথবা যে ব্যবসাই করুক না কেন, ঋণ কর্মকর্তাকে ব্যবসার জন্য গ্রাহকের কী পরিমাণ অর্থ প্রয়োজন এবং কী আদলে তা দেয়া হবে তা নিয়ে অবশ্যই গভীরভাবে পর্যালোচনা করতে হবে। কথায় বলে আপনি যদি একবার টুথপেস্ট থেকে অতিরিক্ত পেস্ট বের করে ফেলেন, তবে তা আর ভেতরে প্রবেশ করাতে পারবেন না। একইভাবে যদি আপনার কানে কিছু পানি প্রবেশ করে, তবে ওই পানিকে বের করার জন্য আপনাকে আরো কিছু পানি প্রবেশ করাতে হবে। তাই ঋণ দেয়ার আগে ঋণ কর্মকর্তাকে বিজনেস মডেলের দিকে তাকাতে হবে, দেখতে হবে অনুমিত টার্নওভার কত, এন্ড টু এন্ড ট্রানজিকশনের মেয়াদ বা ধরন, এবং এরপর সব হিসাব মিলিয়ে একটি অংক দাঁড় করাতে হবে এবং অবশ্যই জানতে হবে এ অংকের কতটা ব্যাংক অর্থায়ন করবে এবং কতটা মালিক বা ঋণগ্রহীতা। আমি এ-ও দেখেছি, গ্রাহকের ১৫০ দিনের জন্য ঋণ দরকার অথচ ব্যাংক সময় দিচ্ছে মাত্র ১২০ দিনের, এ কারণেও কিন্তু ঋণ মন্দ হয়ে পড়ে। ট্রেড সাইকেলের পাশাপাশি আরো কিছুদিন সময় দিয়ে ঋণ পরিশোধের সময় বা কাঠামো ঠিক করা উচিত।

আমরা প্রায়ই দেখি মার্কেটিং বা রিলেশনশিপ ম্যানেজাররা কিছু অনুমোদিত জামানত শর্তের ওপর ভিত্তি করে ঋণ নিয়ে প্রচারণা চালান এবং অনেক সময় কিছু প্রক্রিয়া বাকি রেখেই ঋণ ছাড় করে দেন। যদি ‘অনুমোদন শর্ত’ মনিটরিং সিস্টেম না থাকে, তবে হয়তো নিরাপত্তা/জামানত সম্পাদন বছরের পর বছর ঝুলে থাকে এবং শেষমেশ মন্দে পরিণত হতো। ঋণ কর্মকর্তাকে অবশ্যই সবসময় চেষ্টা করতে হবে সবচেয়ে ভালো জামানত জমা নিতে। অন্যদিকে, জামানতের নিয়মিত মূল্য নির্ধারণ ঋণ সংস্কৃতির অংশ হওয়া উচিত।

বর্জ্য নিষ্কাশন ব্যবস্থা থাকতে হবে, নদী দূষণ করা যাবে না-কর্তৃপক্ষের এ ধরনের বাধ্যবাধকতা না মানার কারণেও ঋণ মন্দে পরিণত হতে দেখা যায়। এসব নিয়ম না মানলে সামাজিক গোষ্ঠীগুলো এসব কারখানা বন্ধ করতে কর্তৃপক্ষকে বাধ্য করে বা করতে পারে। ভুল ভূমি অধিগ্রহণ, যেমন স্কুল বা প্রার্থনার জায়গা নিয়ে কারখানা স্থাপন করতে গেলে বাধা আসতে পারে। এর ফলে কোম্পানিকে কারখানা অন্য কোথাও সরিয়ে নিতে হতে পারে, যার ফলে অবধারিতভাবে প্রকল্প ব্যয় বেড়ে যায়। এছাড়া মূল ব্যক্তির মৃত্যু হলে এবং তার কোনো যোগ্য উত্তরসূরি না থাকলে অনেক ঋণই ঝুঁকিতে পড়ে।

আরেকটি বিষয় হলো, উদ্যোক্তা যেসব খাতে শক্তিশালী, তার বাইরের ব্যবসা করলে তা ঋণ পরিশোধের ঝুঁকি বাড়ায়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো প্রতিটি ব্যবসায়িক বিনিয়োগ নিজ নিজ ক্ষেত্রে জয়ী প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তির সঙ্গে থাকতে হবে, পরাজিতদের সঙ্গে নয়। কেউ যদি কিছুটা ছাড় দিয়ে গ্রাহকের পছন্দনীয় খাতে ঋণ দিতে চায়, তবে মূল্যে বা সুদের হারে এ অন্তর্নিহিত ঝুঁকিটিকে প্রতিফলিত করতে হবে অথবা সরকারকে অবশ্যই ওইসব খাতে অর্থের প্রবাহকে উৎসাহিত করতে ভর্তুকি দিতে হবে।

বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত মন্দ ঋণে জর্জরিত। বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয়া হলেও খেলাপি ঋণ ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর পিছু ছাড়ছে না। ডিসেম্বর ২০১৯ সালে দেশের ব্যাংকিং খাতে মোট মন্দঋণের পরিমাণ ছিল ৯৪ হাজার ৩৩১ কোটি টাকা। মোট ১০ লাখ ১৮ হাজার কোটি টাকা ঋণের প্রায় ৯ দশমিক ৩২ শতাংশ। একই সময়ে আবার অবলোপিত ঋণের পরিমাণ ছিল ৫৫ হাজার ৫৫ কোটি টাকা। তবে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল বা আইএমএফ চলে গেল আরো গভীরে। তাদের মতে, ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বরে ১ লাখ ১২ হাজার ৪২৫ কোটি টাকা মন্দ বা অনাদায়ী ঋণের বাইরে কোর্ট ইঞ্জাঙ্কশনের কারণে ৬৭৫ জন বৃহৎ ঋণগ্রহীতার কাছে আটকে ছিল ৭৯ হাজার ২৪২ কোটি টাকার ঋণ। স্পেশাল মেনশন অ্যাকাউন্টে ছিল আরো ২৭ হাজার ১৯২ কোটি টাকা। সেই সঙ্গে রিশিডিউল করা ২১ হাজার ৩০৪ কোটি টাকা তো ছিলই। মোট হিসাবে তাহলে মন্দ বা প্রশ্নবিদ্ধ ঋণ দাঁড়িয়েছিল ২ লাখ ৪০ হাজার ১৬৭ কোটি টাকা, যেটি মোট ঋণের প্রায় ২২ শতাংশ। তার অর্থ আমাদের ব্যাংকিং খাতে মন্দঋণ এরই মধ্যে প্রকাশিত পরিমাণের চেয়ে দ্বিগুণেরও বেশি। সেই সঙ্গে খাতায় চলমান কিন্তু আসলে পাচার হয়ে গেছে এমন ঋণ যোগ করলে অনেকের মাথা ঘুরে যেতে পারে আবার বয়স্কদের আশির দশকের কথা মনে করিয়ে দেবে।

একটু সংক্ষেপে বলতে গেলে বাংলাদেশের ব্যাংকে ঋণ সাধারণত মন্দে পরিণত হয়-১) ঋণ দেয়ার আগে করা দুর্বল মূল্যায়ন অথবা পদ্ধতিগত দুর্বলতা ২) যে খাতে ঋণ দেয়া হচ্ছে সেখানকার অন্তর্নিহিত ঝুঁকি সম্পর্কে বুঝতে না পারার ঋণ কর্মকর্তার ব্যর্থতা ৩) ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল লোনকে অনেকটা খামখেয়ালিভাবে টার্ম লোনে পরিণত করা ৪) চাপের কারণে দেয়া ‘নেম লেন্ডিং’ অথবা ‘পুশ লেন্ডিং’ ৫) রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংক, এমনকি কিছু বৃহৎ বেসরকারি ব্যাংকের ‘ডিকটেটেড’ বা ‘ম্যানেজড লোন’ ৬) সময়মতো নজরদারির অভাব এবং এজন্য পরিস্থিতি সামাল দেয়ার জন্য সময়মতো কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া যায় না। আমাদের নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ এবং আর্থিক খাতে সংস্কার প্রকল্প পরিচালনার জন্য বিশ্বব্যাংক, উভয়ই ধন্যবাদের প্রাপ্য। উভয়ই আমাদের সাহায্য করেছে আর্থিক খাতে ঋণ নজরদারি বৃদ্ধি, প্রয়োজনীয় মূল্যায়ন জোরদার, ঝুঁকির ভিত্তিতে সুদহারের পার্থক্য করতে এবং এরা যে ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা নির্দেশনা দিয়েছে, তা ব্যাংকিং খাতে ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা সংস্কৃতিকে আরো উন্নত করেছে। তবে আমাদের প্রতিটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানে আরো শক্তিশালী ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। এমনকি করোনাকালেও ঋণঝুঁকি বিশ্লেষণে ন্যূনতম নিয়মকানুন পরিপালন না করতে পারলে আবারও গড়ে উঠবে মন্দঋণের পাহাড়। কেন্দ্রীয় ব্যাংক তারল্য জোগাচ্ছে, বেশ ভালো, কিন্তু মেয়াদ শেষে ঋণের টাকা ফেরত আনার পুরো দায়িত্ব কিন্তু এখনো ব্যাংক কর্মকর্তাদের কাঁধে।

লেখক: মামুন রশীদ, ব্যাংকার ও অর্থনীতি বিশ্লেষক

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন