বুধবার | মে ২৭, ২০২০ | ১৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭

সম্পাদকীয়

দেওয়ানি আদালতে বিচারকের স্থানীয় পরিদর্শনের ক্ষমতার নতুন ভাবনা

মো: ফরিদুজ্জামান

বাংলাদেশের দেওয়ানি আদালতসমূহ বৃটিশদের কমন ল আইন ব্যবস্থা মেনে বিচার করে। এই ব্যবস্থায় বিচারক শুধুমাত্র একজন রেফারি। বিচার প্রক্রিয়ার মূল কার্যক্রম পরিচালনা করেন আইনজীবীগণ। বিভিন্ন সময় পক্ষগণ আদালতের নিকট বিভিন্ন প্রকার দাবী নিয়ে দরখাস্ত দিয়ে থাকেন। এসব চাওয়ার মধ্যে বেশিরভাগ সময় চিরস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা এবং স্বত্ব ঘোষণার মোকদ্দমায় যখন তখন স্থানীয় পরিদর্শনের প্রার্থনা করে থাকেন। ভাবটা এমন যেন আইনজীবীগণ চাইলেই আদালত পরিদর্শন আদেশ দিতে বাধ্য। আবার, কখনো আদালত নিজেই দিয়ে বসেন। আসলে পরিদর্শন বিষয়ে বাংলাদেশের আইন কী বলে? আদালত কোন পরিস্থিতিতে এমন আদেশ দিতে পারেন?

আদালতের স্থানীয় পরিদর্শন বিষয়ে দেওয়ানি কার্যবিধি,১৯০৮ এ দুটি বিধান আছে। আদেশ ৩৯ এর বিধি ৭ এবং আদেশ ১৮ এ বিধি ১৮। আদেশ ৩৯ এর বিধি ৭ এর অধীনে আদালতের স্থানীয় পরিদর্শনের ক্ষমতার বিধান আলোচনা করা হয়েছে। দুটি বিধানের ক্ষেত্রেই ধারা ৭৫ এবং আদেশ ২৬ এর বিধান মানা হয়।

বিচারপতি মোহাম্মদ হামিদুল হক তাঁর ‘দেওয়ানি ও ফৌজদারি বিচার প্রক্রিয়া বইয়ে আদেশ ৩৯ এর বিধি ৭ স্থানীয় পরিদর্শন বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। তিনি বলেছেন, যখন বিরোধীয় সম্পত্তি অপর পক্ষের দখলে থাকে তখন আদালত স্থানীয় পরিদর্শনের আদেশ দিতে পারেন। এক্ষেত্রে আদালত একজন কমিশনার নিয়োগ দিবেন। তিনি বিরোধীয় সম্পত্তিতে প্রবেশ করে তা আটক, সংরক্ষণ ও পরিদর্শন করতে পারেন [আদেশ ৩৯, বিধি ৭ এর উপবিধি ১ এর (ক)-(গ) দফা] । স্থানীয় পরিদর্শন বিশদভাবে ব্যাখ্যা করার জন্য বিচারপতি মোহাম্মদ হামিদুল হক ১২ বি.এল.টি এর ২০২ পৃষ্ঠায় বর্ণিত মোঃ বজলুর রহমান ও অন্যান্য বনাম মোছাঃ আছমা খাতুন ও অন্যান্য মামলায় বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেছেন। ঐ মামলায় আপিল বিভাগ বলেছেন যে, কমিশনার কোন সম্পত্তিতে প্রবেশ করতে পারবেন; তাতে কতটুকু ক্ষতি সাধন হয়েছে দেখতে পারবেন; সম্পত্তির বয়স অনুমান করতে পারবেন; সম্পত্তির উপরিস্থ স্থাপনার সংখ্যা উল্লেখ করতে পারবেন এবং সম্পত্তির কোনো অংশে অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞার আদেশ ভায়োলেশন হয়েছে কিনা প্রতিবেদনে উল্লেখ করতে পারবেন। তবে বিরোধীয় সম্পত্তি কার দখলে আছে তা কমিশনার প্রতিবেদনে উল্লেখ করতে পারবেন না। কারণ দখলে কে আছে তা নির্ধারিত হবে আদালতের সামনে উপস্থাপিত সাক্ষ্য পর্যালোচনার মাধ্যমে। কমিশনার শুধু পরিদর্শন মাফিক অনুমান করবেন [ সুকুমার সেন ও অন্যান্য বনাম গৌরাঙ্গ বিজয় দাস ও অন্যান্য ৯ বি.এল.ডি (আপিল বিভাগ),১৬২]।

বাংলাদেশের দেওয়ানি আদালতসমূহ নির্দিষ্ট বিরোধীয় বিষয় স্পষ্টীকরণের উদ্দেশ্যে স্থানীয় পরিদর্শনের আদেশ দিতে পারেন। আদালত নিজে বিরোধীয় স্থাবর বা অস্থাবর সম্পত্তি উপরোক্ত বিধান অনুসারে পরিদর্শন করতে পারেন না। ফলে, আদালতকে বিরোধীয় যে কোনো পক্ষের আবেদনের ভিত্তিতে কমিশনারের মাধ্যমে তাদের ইচ্ছামাফিক তৈরিকৃত প্রতিবেদনের উপর ভিত্তি করেই বিরোধ নিষ্পত্তি করতে হয়। এক্ষেত্রে বিচারক নিজস্ব বিচারবুদ্ধি, পরিদর্শন প্রতিবেদন আর অন্যান্য দলিলাদি এবং মৌখিক সাক্ষ্য পর্যালোচনা করে বিরোধের সঠিক কারণ অনুমান করতে পারেন ১০০ ভাগের মধ্যে ৫০-৬০ ভাগ। ফলে এটা ন্যয়বিচার পুরোপুরি নিশ্চিত করতে পারে না। পক্ষদ্বয়ের মধ্যকার বিরোধ আরোও গভীরভাবে অনুধাবনের জন্য বিদ্যমান আইনি ব্যবস্থায় বিকল্প আর কোনো সুযোগ নেই।

একইভাবে, আদেশ ১৮ এর বিধি ১৮তেও আদালতের স্থানীয় পরিদর্শনের ক্ষমতার বিধান আলোচনা করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে,‘ বিরোধীয় সম্পত্তি বা বিষয় নিয়ে যে সব প্রশ্ন ওঠে সে সব বিষয়ে আদালত মোকদ্দমার যে কোনো পর্যায়ে ঐ বিরোধীয় সম্পত্তি বা বিষয় স্থানীয়ভাবে পরিদর্শন করতে পারেন। বিধানটি আদালতের স্বেচ্ছাধীন ক্ষমতা। আদালত ন্যায়বিচারের স্বার্থে বিরোধীয় বিষয় স্পষ্টভাবে বোঝার জন্য মোকদ্দমার বিরোধীয় বিষয় পরিদর্শন করতে পারেন। এখানে আদালতের বিচারক নিজে ওইসব স্থানে যাবেন নাকি আইনজীবীদের কমিশনার হিসেবে পাঠাবেন তাও আদালতের নিজের অভিজ্ঞানের উপর নির্ভর করে। যদি আদালতের বিচারক নিজে যেতে চান; সেই সুযোগ আছে কিনা? মাহুমুদুল ইসলাম ও প্রবির নিয়োগী এ বিষয়ে তাঁদের রচিত প্রখ্যাত আইন গ্রন্থে (দেওয়ানি কার্যবিধি আইন- ভলিউম-২,২০০৬) ভারতীয় এবং বাংলাদেশী সুপ্রিম কোর্টের বেশ কিছু নজির তুলে ধরেছেন। Ugam Vs Kesrimal,AIR 1971 SC 2540  মোকদ্দমার রায়ে আদালতের বিচারকের নিজের পরিদর্শন সম্পর্কে চমৎকার বিশ্লেষণ করা হয়েছে। যখন বিচারক তার সামনে উপস্থাপিত কোনো সাক্ষ্য মূল্যায়ন করার জন্য কোনো স্থান পরিদর্শন করবেন এবং যদি তিনি পরিদর্শন করার পর কেবলমাত্র তার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার উপর ভিত্তি করে রায় না লেখেন, তবে রায়টি কোনোভাবেই পক্ষপাতদুষ্ট হবে না। আবার, Md. Ishaq Vs Balmakund,AIR 1929 AII 116 মোকদ্দমার রায়ে বলা হয়েছে, যদি পক্ষদ্বয় আদালতের স্থানীয় পরিদর্শনের ফলে মোকদ্দমায় আপোষ করতে রাজী হয় তবে সেটা বৈধ এবং তাদের উপর বাধ্যকর। কিন্তু আদালত এক্ষেত্রে নিজে সালিশকারীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে পারবেন না। আদালতের এরূপ রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করা যাবে।

একইভাবে,বিচারপতি গোলাম রব্বানী তাঁর দেওয়ানি কার্যবিধি (ইংরেজি ভার্সন), ২০০৮ গ্রন্থে আদেশ ১৮ এর বিধি ১৮ নিয়ে আলোচনা করেছেন। তিনি বলেছেন, আদালত এই বিধির অধীনে স্বশরীরে কোনো বিরোধীয় বিষয় স্থানীয়ভাবে পরিদর্শন করতে পারেন। কিন্তু উদ্দেশ্য হবে পক্ষগণ কর্তৃক প্রদত্ত কোনো সাক্ষ্য স্পষ্টীকরণের নিমিত্তে; নতুন কোনো সাক্ষ্য সৃষ্টি করার জন্য নয়।

আবার, ২৮ ডি.এল.আর (১৯৭৬) এর ৩৪৪ পৃষ্ঠায় বর্ণিত গ্লাডস্টোন বনাম সায়েস্তা খান মামলার রায়ে বলা হয়,‘ বিধি ১৮ এর উদ্দেশ্য প্রদত্ত সাক্ষ্য বিশ্লেষণের জন্য; নতুন কোনো সাক্ষ্যের জন্য নয় এবং বিচারক এমন পরিদর্শনের সাথে সাথে এ বিষয় আদেশ লিপিবদ্ধ করবেন।

আদালতের স্থানীয় পরিদর্শন বিষয়ে দেওয়ানি কার্যবিধি,১৯০৮এর আদেশ ৩৯ এর বিধি ৭ নিয়ে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টে অসংখ্য নজির থাকলেও আদেশ ১৮ এ বিধি ১৮ নিয়ে নতুন নজির নেই। তাই বিধি ১৮ এর প্রায়োগিক প্রক্রিয়া এবং আইনগত ফলাফল নিয়ে খোদ বিচারকদের মাঝেই মতভেদ আছে। কোনো কোনো বিচারক এই বিধানের অধীনে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করার জন্য নিজেই বিরোধীয় সম্পত্তি বা বিষয় পরিদর্শনের পক্ষে; আবার একদল এই ব্যবস্থার ঘোরবিরোধী। তাঁদের মত এতে বিচারকের নিরপেক্ষতা হারাতে পারে। কিন্তু, উপরের আলোচনা হতে এটা বলা যায়, আদালত চাইলে নিজে পরিদর্শনে যেতে পারেন। সেক্ষেত্রে তাঁকে অবশ্যই সতর্ক থাকতে হবে। শর্তসমূহ মানতে হবে। পরিদর্শনের উপাদান কোনোভাবেই রায়ের পর্যবেক্ষণের অংশ হবে না। বিচারক নিজে পরিদর্শনের উপাত্ত থেকে মোকদ্দমায় সাক্ষী হবেন না। যাওয়া যাবেই না এমনটা বলা যাবে না; প্রয়োজন হওয়া স্বত্বেও না গেলে সেটাই বরং আইনের লঙ্ঘণ হবে!

ভারতের বিভিন্ন প্রদেশের হাইকোর্ট এমন পরিদর্শন এবং বিচারিক পরিণাম সম্পর্কে ভিন্ন ভিন্ন মতামত দিয়েছে। তবে, শেষমেষ তাঁরা কেন্দ্রীয়ভাবে একটি সিদ্ধান্তে এসেছে। তারা বিচারকের স্পট ভিজিটের পক্ষে এবং এটা সংবিধান লঙ্ঘণ নয় বলে মত দিয়েছে। ডি.এফ মুল্লার দেওয়ানি কার্যবিধি আইন (১৯৯৯) গ্রন্থে বলা হয়েছে, ন্যায়বিচারকে এগিয়ে নিতে বিচারকের এমন পরিদর্শন দরকার।এমনকি ভারত ১৯৭৯ সালে আইন সংশোধন করেছে। এখন বিচারকের স্পট পরিদর্শন বিষয়ে রায়ের গর্ভে নোট লিখে রাখা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। অথচ বাংলাদেশে বিজ্ঞ বিচারক এবং আইনজীবীদের মধ্যে বিষয়টি নিয়ে অস্পষ্টতার সাথে সাথে পক্ষে বিপক্ষে মতভেদ আছে। আছে নিরপেক্ষতা হারানোর ভয়। শতাব্দী প্রাচীন সময় ধরে প্রচলিত ধ্যান ধারনার হঠাৎ পরিবর্তনের সাথে মানিয়ে নেয়ার ঝুঁকিও আছে।

যাহোক, উপরে আলোচিত দুটি বিধান নিয়ে অস্পষ্টতা আর মতানৈক্যের কারণে বাস্তবে মোকদ্দমাসমূহ সুচারুরূপে নিষ্পত্তি করার ক্ষেত্রে সহায়ক হয় না। বাস্তবে স্থানীয় পরিদর্শন কেন ব্যর্থ হয় তা উদাহরণ দিলে বিষয়টি আরো পরিষ্কার হবে। ধরা যাক, ‘ক নামক ব্যক্তি ‘খ এর বিরুদ্ধে চিরস্থায়ী নিষেধাজ্ঞার মোকদ্দমা দায়ের করেছেন; যাতে ‘খ নামক ব্যক্তি ‘ক এর ৪ শতক জমি থেকে অবৈধভাবে উচ্ছেদ করতে না পারে। মোকদ্দমা দায়ের করার পর স্থানীয় পরিদর্শনের আবেদন দুভাবে আসতে পারে। প্রথমত, মোকদ্দমা শুরু হওয়ার সাথে সাথে ‘ক নামক ব্যক্তি ‘খ এর বিরুদ্ধে অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞার আদেশের প্রার্থনা করতে পারেন এবং নিজের বিদ্যমান দখল প্রমাণের জন্য আদালতের সামনে দলিলাদি উপস্থাপন করতে পারেন বা স্থানীয় পরিদর্শনের প্রার্থনা করতে পারেন। দ্বিতীয়ত, মোকদ্দমায় চূড়ান্ত শুনানি শুরু হলে যে কোনো পক্ষ স্থানীয় পরিদর্শনের প্রার্থনা করতে পারেন। ধারণা করা হয়, যখন এক পক্ষ এরূপ আবেদন করেন এবং কোন আইনজীবীকে কমিশনার হিসেবে এই উদ্দেশ্যে নিয়োগ দেয়া হয়; প্রতিবেদন ঐ পক্ষের ইচ্ছামতই আদালতে আসে। কারণ, বিজ্ঞ আইনজীবী-কমিশনার (বর্তমানে আদালত যেভাবে চলছে) আবেদনকারীপক্ষে পক্ষপাতদুষ্ট থাকেন;এমনটা স্বাভাবিক না হলেও অপরপক্ষ এমন অভিযোগ করে থাকেন। প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে আপত্তি দাখিলের সুযোগ থাকে। আবার, অপরপক্ষও পাল্টা পরিদর্শনের আবেদন করে নিজের দখল প্রমাণের চেষ্টা করেন। যদি বিদ্যমান আইনি বিধান মেনে বিরোধীয় সম্পত্তি নিয়ে কমিশন করানোও হয়, বিচারককে রায় প্রদানের সময় দ্বিধায় থাকতে হয়। কারণ উভয়পক্ষই নিজ নিজ দখলের বিষয় প্রমাণ করার জন্য একদিকে কমিশনার নিয়োগের জন্য প্রার্থনা করতে পারে। অন্যদিকে, অপরপক্ষ দরখাস্তকারীপক্ষের দাখিলকৃত প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে আপত্তি দাখিল করে প্রতিবেদনের সাক্ষ্যগত মূল্য দুর্বল করার চেষ্টা করে। অথবা অপরপক্ষ নিজেরা আলাদাভাবে কমিশনার নিয়োগ দিয়ে নিজেদের দখল প্রমাণের জন্য পাল্টা প্রতিবেদন আদালতে জমা দিতে পারে। ফলে, আদালত রায় প্রদান করার সময় কোন পক্ষে রায় দেবেন তা নিয়ে ধোঁয়াশার মধ্যে থাকেন। আমাদের দেশের বিরোধাত্বক বিচারব্যবস্থায় চিরস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা বা স্বত্ব প্রচারের মোকদ্দমায় উভয়পক্ষে দাখিলকৃত কাগজপত্র বেশিরভাগ সময়েই আদালতকে সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে সাহায্য করে না। আমাদের সবার জানা আছে,বাংলাদেশে ভূমিব্যবস্থাপনায় জাল- জালিয়াতিমূলে দলিল দস্তাবেজ তৈরি প্রায় স্বাভাবিক ব্যাপারে পরিণত হয়ে গেছে।

উপরের সমস্যা থেকে উত্তরণের উপায় কী? যদি আদালত দখল সংশ্লিষ্ট বিরোধের প্রকৃতি বোঝার জন্য উভয়পক্ষে একত্রে আবেদনের ভিত্তিতে একজন মাত্র আইনজীবীর মাধ্যমে স্থানীয় পরিদর্শন করান, তাহলে কী ঘটবে? আদালতে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়ার ফল বেশ আশাব্যঞ্জক। আমার আদালতে যা ঘটেছে তা সংক্ষেপে তুলে ধরা যাক। একটি চিরস্থায়ী নিষেধাজ্ঞার মোকদ্দমায় সাক্ষ্য গ্রহণ চলছে। বাদীপক্ষ সাক্ষ্য প্রদান করেছে। বিবাদীপক্ষ বাদীপক্ষের সাক্ষীকে জেরা করেছে। বিবাদীপক্ষও বাদীপক্ষকে জেরা করেছে। উভয়পক্ষই দাবী করেছে, নালিশী জমি উভয়ের দখলে আছে। আদালতের সামনে যেসব দলিল উপস্থাপন করা হয়েছে তাও যথেষ্ট নয়। এরকম অবস্থায় আদালত কীভাবে রায় প্রদান করবেন? বাংলাদেশের উচ্চ আদালত এ ব্যাপারে বিভক্ত রায় বিভিন্ন সময় প্রদান করেছেন। কোন রায়ে বলা হয়েছে, যদি বাদীপক্ষ বা বিবাদীপক্ষ কেউই উপযুক্ত তথ্য প্রমাণ আদালতে উপস্থাপনে ব্যর্থ হয় তবে বাদী হেরে যাবেন। চিরস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা বিষয়ক কোন কোন রায়ে বলা হয়, যখন দুপক্ষের মধ্যে স্বত্ব প্রমাণে অসমতা আছে কিন্তু দখল একপক্ষে স্পষ্ট তখন রায় হবে দখল যার তার পক্ষে। এই মতামত নিয়েও মতভেদ আছে। আবার, কোন কোন রায়ে বলা হয়, যখন দুপক্ষই উত্কৃষ্ট স্বত্ব প্রমাণে ব্যর্থ তখন নিরঙ্কুশ দখল যে পক্ষ প্রমাণ করতে পারবে রায় সে পক্ষে যাবে। ফলে, চিরস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা বা স্বত্ব প্রচারের মোকদ্দমায় শুনানির একপর্যায়ে এসে পক্ষদ্বয় যেনতেন প্রকারে দখল প্রমাণ করতে উত্সাহিত হয়। অনেক সময় জোরপূর্বক কেউ কেউ দখল করে সাজানো ব্যক্তিকে দিয়ে দখল বিষয়ে সাক্ষ্য প্রদান করেন। ফলে দখল বিষয়ক সাক্ষ্য প্রমাণ এরূপ মোকদ্দমায় সিদ্ধান্ত নেওয়ার অন্যতম উপাদান হয়ে যায়। আবার বিজ্ঞ আইনজীবীগণও এ ব্যাপারে পেশা ও যশের খাতিরে আদালতকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দেন।

ফলে আদালত উভয়পক্ষকে নির্দেশ দেন কমিশনার নিয়োগ করার। সনদপ্রাপ্ত বিজ্ঞ আইনজীবীদের মধ্য হতে একজনকে আদালত বাঁছাই করে দেন। তাঁকে নির্দেশ দেয়া হয় তিনি উভয়পক্ষে কমিশনার হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত হলেন। একই প্রতিবেদনে তাঁকে উভয়পক্ষের সম্মতি নিয়ে আদালতে স্থানীয় পরিদর্শনের প্রতিবেদন দাখিল করতে হবে। বলা হয় কমিশনারের যাওয়া-আসার খরচ উভয়পক্ষ বহন করবে। ফলে তখন কোনো পক্ষই আইনজীবীকে প্রভাবিত করে প্রতিবেদন তৈরি করাতে পারেন না। কারণ আদালতের নিকট আইনজীবীর দায়বদ্ধতা বেড়ে গেছে। আবার প্রকাশ্য আদালতে দুপক্ষই যেহেতু ঐ আইনজীবীর মাধ্যমে কমিশন করানোর ক্ষেত্রে সম্মত হয়েছিলেন, তাই আদালতে পরে তারা আর আপত্তি দাখিল করতে সাহস করেন না বা করেন না। এই বিকল্প উপায় অবলম্বন করার কারণে বেশ কিছু মোকদ্দমা সাক্ষ্যগ্রহণ পর্যায়ে এসে বা সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে বিকল্প উপায়ে যথা আপোসের মাধ্যমে নিষ্পত্তি হয়েছে। ফলে আদালতের সময় যেমন বেঁচেছে; তেমনই মোকদ্দমা দ্রুত নিষ্পত্তি হয়েছে।

বাংলাদেশের বিদ্যমান আইনে এ সংক্রান্ত কোনো বিধান নেই। এমনকি উপমহাদেশের কোনো সংসদই দেওয়ানি কার্যবিধিতে এমন বিধান রাখে নি। ফলে আদালতে উপস্থিত বিজ্ঞ আইনজীবীদের মধ্যে সিনিয়র( যাদের অনেকেই সুপ্রিম কোর্টে প্র্যাকটিস করেন) দের মতামত নেওয়া হয়। তারা বলেন, আইনে যেহেতু এমন বিধান নেই সেহেতু আইনের ব্যাখ্যায় বিষয়টি দ্বারা আইনের লঙ্ঘণও হচ্ছে না আবার মোকদ্দমা দ্রুত নিষ্পত্তি হচ্ছে। এতে আইনজীবীদের আপত্তি নেই। এই বিধান বাংলাদেশের অধস্তন সব আদালতে অনুশীলন করা হলে চলমান ব্যবস্থার মধ্যে থেকেও বিশাল মামলা মোকদ্দমার বোঝা কিছুটা হলেও কমবে বলে আশা করা যায়।

মো:ফরিদুজ্জামান

সহকারি জজ, জেলা ও দায়রা জজ আদালত

ঝিনাইদহ

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন