বুধবার | মে ২৭, ২০২০ | ১৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭

সম্পাদকীয়

দায়িত্বে কে আছেন?

ড. সাজ্জাদ জহির

কভিড-১৯ প্রস্তুতি এবং সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে মৌলিক কর্মকাণ্ডের ব্যবস্থাপনায় বিশৃঙ্খলা ব্যাপকভাবে স্বীকৃত। অনেকগুলো ক্ষেত্রে এটা দৃশ্যমান হওয়ায়, বিচ্ছিন্নভাবে সেগুলোর সামাধান খোঁজা হয়েছে এবং সেসব উদ্যোগের মাঝে সমন্বয়ের অভাব থেকেছে। দুঃখ এই যে, এমন ঘোরতর সামষ্টিক সংকটকালেও তৃণমূল-পর্যায় অবধি খাদ্যবণ্টনে কূকীর্তি চলছে, যা গণমাধ্যমে এবং সামাজিক নেটওয়ার্কের মত-বিনিময় থেকে জানা যায়। সম্প্রতি একজন মন্ত্রী সরকারি নগদ অর্থ প্রদানে ব্যবহার্য তথ্যভাণ্ডারের (ডেটাবেজের) অপর্যাপ্ততার কথা উল্লেখ করেছেন, যেখানে সম্ভবত একই মাঠ-পর্যায়ের অপকর্মকারীরা তথ্য যোগান দিয়েছিল। 

একইসঙ্গে, আরও কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা উল্লেখ্য - মাস্ক ক্রয়কে ঘিরে প্রশ্ন, স্বাস্থ্যমন্ত্রীর বক্তব্যকে ঘিরে বিতর্ক, টেস্ট কিটের কর্তৃত্ব ও ক্রয় নিয়ে দোলাচল এবং এখনও পরিপূর্ণভাবে স্বীকৃত ওষুধ না হওয়া সত্ত্বেও তা মানব ট্রায়ালের উদ্দেশ্যে বাজারজাত করার প্রয়াস। 

জাতির দুর্যোগের দিনে এ জাতীয় সব ঘটনা আগামীতে তদন্তের দাবি রাখে। এসবের পাশাপাশি, সম্পদ পেতে এবং তার ওপর অধিকার নিশ্চিত করতে আন্তঃপ্রতিষ্ঠান এবং আন্তঃমন্ত্রণালয় বিরোধ, খাত-বিশেষে নেতৃত্বের চরম অযোগ্যতাই প্রকাশ করে। আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থার সঙ্গে জাতীয় প্রশাসন সম্পৃক্ত হওয়ার প্রক্রিয়া যখন চলমান, একটি ভাইরাসের অপঘাতে সেসময়ে জাতীয় পর্যায়ের বিবিধ ব্যর্থতার সবিস্তার অনুসন্ধান ও তা থেকে শিক্ষা নেয়া জরুরি – তবে, তা ভবিষ্যতের আলোচ্যবিষয়। আমি একটি সুনির্দিষ্ট নীতির বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করছি, যা কভিডের বিরুদ্ধে আমাদের লড়াইকে বাধাগ্রস্ত করতে পরে।   

প্রধানমন্ত্রী কভিড-১৯ এর সম্মুখ যোদ্ধাদের জন্য গত ৭ এপ্রিল একটি নতুন বীমা কর্মসূচি ঘোষণা করেছেন। স্বাস্থ্য পেশাজীবী ছাড়াও এই কর্মসূচিতে মাঠ পর্যায়ের কর্মর্কতা, আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা এবং অন্য অগ্রভাগের কর্মীরা অন্তর্ভুক্ত। আলোচ্য বীমা কর্মসূচির অধীনে উপরে উল্লেখিত কর্মীরা করোনা পজেটিভ দেখানো সাপেক্ষে বেতনক্রম ও পদমর্যাদা অনুযায়ী জনপ্রতি ৫ থেকে ১০ লাখ টাকা পাবেন। পরিমাণ নিতান্ত কম নয় – একটি পরীক্ষা করিয়ে করোনা পজেটিভ এলেই যে অর্থ দেয়া হবে তা একটি নিম্ন আয়ের পরিবারকে বর্তমান বাজার-দামে পাঁচ বছরের ভরণপোষণ দিতে পারে! অথচ, এদেশের  বাকি মানুষ, যাদের কেউকেউ লকডাউনে ঘরে থাকার আদেশ মেনে অন্যদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করছে, কেউ বা স্বেচ্ছাশ্রম ও নিজস্ব অর্থে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্য-সুরক্ষা ও খাদ্য-নিরাপত্তা দিতে সচেষ্ট, আবার অনেকেই সরকার বা মালিকের নির্দেশে ভিড় ঠেলে কারখানায় যেয়ে হয় স্বেচ্ছাসেবীদের পরিধান তৈরি করছেন বা রফতানিপণ্য তৈরি করে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে সহায়তা করছেন, তাদের কেউই রোগাক্রান্ত হলেও এ ধরনের কোনো সুবিধা পাবে না! অথচ তাদের কর্মফসল থেকেই ঘোষিত ‘বীমা পেমেন্টের’ সব ব্যয়ভার বহন করা হবে ও সরকারি দেনার দায় আগামী দিনে মেটানো হবে। 

উল্লেখিত নীতির আশুপ্রভাব অধিকতর শঙ্কাজনক। করোনা পজেটিভ দেখানোর বিনিময়ে অর্থ দেয়ার নীতি দায়িত্বে থাকা অনেককেই টেস্টের জন্য ভিড় জমাতে উৎসাহিত করবে। ফলে প্রকৃত ভুক্তভোগীদের অনেকের জন্য পরীক্ষা করানো দুষ্কর হয়ে উঠবে। 

দ্বিতীয়ত, বীমা-অর্থ পেতে আগ্রহীদের মাঝে পজেটিভ দেখা গেলে তারা সীমিত হাসপাতাল ও চিকিৎসা সুবিধা পেতে চাপ সৃষ্টি করবে এবং অন্য সেবা-প্রার্থীদের চাইতে নিজেদেরকে বড় দাবিদার মনে করবে। এর ফলে, অধিক রোগাক্রান্তরা  স্বাস্থ্যসেবা প্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত হবে! মনে রাখা প্রয়োজন যে, পজেটিভ কেসের শতকরা ৮০ জনের অধিক ব্যক্তি শঙ্কামুক্ত থাকে এবং তাদেরকে নিজ নিজ বাসায় থেকে চিকিৎসা নেয়ার পরামর্শ দেয়া হয়! 

কভিড-কালীন বীমানীতির প্রভাবের সম্ভাব্য নেতিবাচক দিকগুলো যুক্তিপরম্পরায়ে তুলে ধরেছি।  আমার শঙ্কাগুলো যে যথার্থই, তার সমর্থনে একটি তথ্য উল্লেখ করবো এবং তথ্যভিত্তিক যাচাইয়ের জন্য একটি অনুসিদ্ধান্ত প্রস্তাব করবো। 

গত দু-সপ্তাহের সংবাদপত্র প্রতিবেদনে জানা যায় যে আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিপুলসংখ্যক সদস্য করোনা পজেটিভ হওয়াতে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন এবং স্বল্প কয়েক দিনের মধ্যে সুস্থ হয়ে তারা বিপুল সংখ্যায় রিলিজ পেয়েছেন (বা পাচ্ছেন)। সংখ্যাগুলো চোখে পড়ার মতো – বিশেষত, রিপোর্ট পড়লে মনে হয়, আরোগ্যলাভের সময় দু-সপ্তাহের চাইতেও কম। 

তথ্যের অভাবে সুনির্দিষ্টভাবে বলা সম্ভব নয়, তবে বিষয়গুলো খুঁটিয়ে দেখতে কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ করবো। বলার অপেক্ষা রাখে না যে, রিলিজ পাওয়ার জন্য প্রথম নেগেটিভ ফলাফলের পরীক্ষাটি ভর্তির এক সপ্তাহ পরে হওয়ার কথা এবং ন্যূনতম আরও এক সপ্তাহ পরে দ্বিতীয় নেগেটিভ পাওয়ার পরীক্ষাটি হওয়ার কথা।

কভিড-কালীন বীমানীতির প্রণোদনার কারণে অনেকেই পরীক্ষা করবার জন্য ভিড় জমাবেন এবং তাদের অনেকেই ভিআইপি পরিচয়ে অগ্রাধিকার পাবেন। এদের মাঝে যারা বীমা অর্থ পেতে আগ্রহী এবং পজেটিভ দেখাতে ব্যর্থ হবেন, তাদের অনেকেই এক সপ্তাহ বা আরো কিছু সময় পরে আবার পরীক্ষাগারে ফিরবেন। অর্থাৎ, মোট দৈনিক পরীক্ষার এক উল্লেখজনক অংশ ভিআইপি শ্রেণি থেকে আসার সম্ভাবনা রয়েছে। পরীক্ষাগারগুলোর সঙ্গে আলাপ করলেই এবিষয়ে বস্তুনিষ্ঠ তথ্য জানা যাবে, যা উপযুক্ত কর্তৃপক্ষকে যাচাই করবার অনুরোধ করবো। 

প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ্য যে, আমার শঙ্কাগুলো সঠিক হলে এবং পরীক্ষার ফলাফল প্রণোদনা নীতির দ্বারা প্রভাবান্বিত না হলে, স্বাস্থ্যবান লোকের অযথা ভিড়ের কারণে প্রাপ্ত পজেটিভ-এর শতকরা হার (প্রণোদনাহীন সময়ের) প্রকৃত হারের চাইতে কম হবে। একইসঙ্গে সুস্থ হওয়ার হার (রিকভারি রেট) অহেতুক বেশি মনে হবে!     

আমাদের মধ্যে এমন অনেকেই আছেন, যারা সম্ভবত সংক্রমিত হয়েছি (পরীক্ষা করলে পজেটিভ পেতাম), অ্যান্টিবডিও তৈরি হয়েছে এবং ভিড়ের মধ্যে হাঁটা-চলার জন্য এখন ভালোভাবে উপযুক্ত। সম্মুখভাগে কাজ করার বিষয়টি নিশ্চিতভাবে পজেটিভ হওয়ার সম্ভাব্যতা বৃদ্ধি করে এবং আমাদের স্বাস্থ্যকর্মী, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী প্রতিষ্ঠানের অসংখ্য সদস্যদের সাহসী অবদানকে খাটো করে দেখবার সুযোগ নেই। আমি বিশ্বাস করি যে, তাদের জন্য যথার্থ স্বাস্থ্য-সুরক্ষার ব্যবস্থা নিলে তারা সেবা দেয়া অব্যাহত রাখবেন। 

মৃত্যুকে কোনও দামেই মূল্যায়ন সম্ভব নয়। তাই, সম্মুখভাগ সেবাকর্মীদের অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ এবং তাদের পরিবারের নিরাপত্তা-বিধানে কভিড-জনিত মৃত্যুর জন্য ২৫ থেকে ৫০ লাখ টাকার বীমা অর্থ প্রদানের নীতির প্রতি আমার পূর্ণ সমর্থন রয়েছে। তবে পজেটিভ দেখানোর জন্য ৫ থেকে ১০ লাখ টাকা দেয়ার নীতি অকারণে কিছু লোভী-প্রকৃতির ব্যক্তিদের আকৃষ্ট করে কোভিড-বিরোধী ব্যবস্থাপনায় অহেতুক বিভ্রাট ঘটাতে পারে। আগেই যুক্তি দেখিয়েছি, কীভাবে প্রণোদন-প্রয়াসীরা আমাদের চলমান লড়াইয়ে অধিক ক্ষতি করবে।  

আমি আশা করি, যারাই দায়িত্বে আছেন তারা এই নিবন্ধে উল্লেখিত সংশয়গুলো বিবেচনায় এনে প্রয়োজনীয় তথ্যের আলোকে বীমা-নীতির প্রথম (পজেটিভ হওয়ার প্রণোদনা) অংশটি পুনর্বিবেচনা করবেন। অবশ্য আমি নিশ্চিত নই যে কার কাছে আমি এই অনুরোধ রাখবো! আমার জানামতে, দেশের সরকারি কর্মকর্তা, সংসদ সদস্য, মন্ত্রী বা সরকারের উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োজিত ভাগ্যবানদের কেউই আজ অবধি স্বপ্রণোদিতে হয়ে নিজ নিজ বেতন কম নেয়ার ঘোষণা দিতে এগিয়ে আসেনি। এমনকি শীর্ষস্থানীয় নেতৃত্ব এ ব্যাপারে নীরব থেকেছেন। উপরন্তু, অর্থ-সম্পদ ও খাদ্য বণ্টনে অপকর্মে লিপ্ত স্থানীয় পর্যায়ের জনপ্রতিনিধিদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি-ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হওয়ায় জনমনে আস্থা কমেছে। অথচ, সেই প্রশাসনের কাছে তাদেরই চলমান ভাতা কমানোর আবেদন করা প্রলাপতূল্য মনে করা অস্বাভাবিক নয় কি! আজ সত্যিই জানি না, দায়িত্বে কে আছেন!

লেখক: ড. সাজ্জাদ জহির, নির্বাহী পরিচালক, ইকোনমিক রিসার্চ গ্রুপ

[এ নিবন্ধে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব, যা প্রতিষ্ঠানের অন্যান্য সদস্যদের দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে সহমত নাও হতে পারে।]

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন