বৃহস্পতিবার | আগস্ট ০৬, ২০২০ | ২২ শ্রাবণ ১৪২৭

দেশের খবর

ডিম ছেড়েছে কার্পজাতীয় মাছ

হালদা থেকে একদিনে সংগ্রহ ১৪ বছরের সর্বোচ্চ

দেবব্রত রায় চট্টগ্রাম ব্যুরো

চট্টগ্রামে হালদা নদীতে ডিম ছেড়েছে কার্পজাতীয় মাছ। গতকাল নদী থেকে ২৫ হাজার ৫৩৬ কেজি মাছের ডিম সংগ্রহ হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ২০০৭ সালের পর থেকে হালদা নদীতে পরিমাণ ডিম সংগ্রহের রেকর্ড এটিই প্রথম। নভেল করোনাভাইরাস সংক্রমণের কারণে কারখানা বন্ধ থাকায় পরিবেশ দূষণ কমে যাওয়া পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাতের কারণে এবার ডিম সংগ্রহ উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বেড়েছে। তবে নভেল করোনাভাইরাস সংক্রমণের কারণে এবার ডিম থেকে উত্পন্ন রেণু পোনা বিপণনে সমস্যা হতে পারে।

হালদা নদী দেশে স্বাদু পানির কার্পজাতীয় মাছের প্রধান প্রজননক্ষেত্র। পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে উত্পন্ন নদী চট্টগ্রামের রাউজান হাটহাজারী উপজেলার প্রায় ৯৮ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে প্রবাহিত হয়ে মিশেছে কর্ণফুলী নদীতে। সাধারণত চৈত্র থেকে আষাঢ়ের মধ্যে হালদায় পাহাড়ি ঢল নামে। সময়ে পূর্ণিমা-অমাবস্যার তিথিতে বজ্রসহ বৃষ্টিপাত তাপমাত্রা অনুকূলে থাকলে ডিম ছাড়ে রুই, কাতলা, মৃগেলসহ বিভিন্ন কার্পজাতীয় মাছ। সাধারণত এসব মাছ মধ্য এপ্রিল থেকে জুনের মধ্যে হালদায় ডিম ছাড়ে। তবে মে মাসেই বেশির ভাগ ডিম সংগ্রহ করা হয়। শিল্প-কারখানার দূষণসহ নানা কারণে হালদার বাস্তুতন্ত্র নষ্ট হচ্ছে, যার বিরূপ প্রভাব পড়ছে মাছের প্রজননে। কারণে গত বছর হালদা থেকে মাত্র সাত হাজার কেজি ডিম সংগ্রহ হয়। আর এবার একদিনেই ডিমে সংগ্রহ হয়েছে ২৫ হাজার ৫৩৬ কেজি।

২০০৭ সাল থেকে হালদায় মাছের ডিম সংগ্রহের তথ্য সংরক্ষণ করা হয়ে আসছে। তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ২০০৭ সালে নদী থেকে ২২ হাজার ৩১৪ কেজি, ২০০৮ সালে হাজার ৪০০ কেজি, ২০০৯ সালে ১৩ হাজার ২০০ কেজি, ২০১০ সালে হাজার কেজি, ২০১১ সালে ১২ হাজার ৬০০ কেজি, ২০১২ সালে ২১ হাজার ২৪০ কেজি, ২০১৩ সালে হাজার ২০০ কেজি, ২০১৪ সালে ১৬ হাজার ৫০০ কেজি, ২০১৫ সালে হাজার ৮০০ কেজি, ২০১৬ সালে ৭৩৫ কেজি (নমুনা ডিম), ২০১৭ সালে হাজার ৬৮০ কেজি ২০১৮ সালে ২২ হাজার ৬৮০ কেজি ডিম সংগ্রহ হয়।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক হালদা বিশেষজ্ঞ . মো. মনজুরুল কিবরীয়া বণিক বার্তাকে জানান, নভেল করোনাভাইরাসের কারণে চট্টগ্রামের বেশির ভাগ শিল্প-কারখানা এখন বন্ধ। বিশেষ করে এশিয়ান পেপার মিল হাটহাজারীর পিকিং পাওয়ার প্লান্ট বন্ধ থাকায় হালদার দূষণ কমেছে। নদীর পাড়ে তামাক চাষ কমে গেছে প্রায় ৭০ শতাংশ। এছাড়া সারা বছর হালদায় স্থানীয় প্রশাসনের তদারকির কারণে এবার সাড়ে ২৫ হাজার কেজির বেশি ডিম সংগ্রহ করা সম্ভব হয়েছে। সাধারণত ৪০-৫০ কেজি ডিম থেকে এক কেজি রেণু পোনা পাওয়া যায়।

তিনি বলেন, হালদাকে জাতীয় নদী হিসেবে স্বীকৃতি এবং ডলফিনের অভয়াশ্রম ঘোষণা এখন সময়ের দাবি। হালদাকে রক্ষা করা গেলে আরো বেশি পরিমাণ রাজস্ব সরকার আয় করতে পারবে। হালদা এখন দেশের জাতীয় সম্পদ। হালদা নদী রক্ষার্থে আরো কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করার অনুরোধ জানান তিনি।

হাটহাজারী উপজেলা প্রশাসনের তথ্যমতে, চবি হালদা রিসার্চ ল্যাব, মত্স্য অধিদপ্তর উন্নয়ন সংস্থা আইডিএফের তিনটি দল এবার মা-মাছের ডিম সংগ্রহের কর্মযজ্ঞ প্রত্যক্ষ এবং নিয়ন্ত্রণ করেছে। সম্মিলিত হিসাবে ২৮০টি নৌকায় ৬১৫ জন ডিম সংগ্রহকারী এবার মাছের ডিম সংগ্রহ করেছেন। হালদার কাগতিয়ার আজিমের ঘাট, খলিফার ঘোনা, বিনাজুরী, সোনাইর মুখ, আবুরখীল, খলিফার ঘোনা, সত্তারঘাট, দক্ষিণ গহিরা, পশ্চিম গহিরা, অংকুরী ঘোনা, মোবারকখীল, মগদাই, মদুনাঘাট, উরকিচর এবং হাটহাজারী গড়দুয়ারা, নাপিতের ঘাট, সিপাহির ঘাট, আমতুয়া মার্দাশা এলাকায় বেশি ডিম পাওয়া গেছে।

হাটহাজারীর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. রুহুল আমিন জানান, ডিম সংগ্রহের পর রেণু ফোটানোর কাজ শুরু হয়েছে। ডিম ফোটানোর জন্য তিনটি হ্যাচারি ৬০টি কুয়া প্রস্তুত রাখা হয়েছে। অনেকে নিজস্ব কুয়া প্রস্তুত করেছেন। হালদার পোনা দ্রুত বড় হয় বলে পোনার চাহিদা অনেক বেশি। ডিম ছাড়ার পর মাছ খুবই দুর্বল হয়ে পড়ে। সময় যাতে কেউ মাছ শিকার করতে না পারে সে লক্ষ্যে কঠোর নজরদারির ব্যবস্থা করেছে প্রশাসন।

চট্টগ্রাম জেলা মত্স্য কর্মকর্তা ফারহানা লাভলী জানান, এবার মাছের ডিম সংগ্রহ গত বছরের তুলনায় বেশি হয়েছে। আমরা এখন এই রেণু পোনা সঠিকভাবে যেন সংরক্ষণ করা যায় সে বিষয়ে কাজ করছি। মত্স্য অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে করোনাকালীন এই রেণু পোনা পরিবহনে বিশেষ পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে যারা পোনা নিতে চান তাদের উপজেলা প্রশাসন থেকে প্রত্যয়নপত্র কার্ড দেয়া হবে। এই প্রত্যয়নপত্র কার্ড থাকলে দেশব্যাপী পরিবহনে কোনো সমস্যা হবে না।

 

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন