বুধবার | মে ২৭, ২০২০ | ১৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭

পণ্যবাজার

বিশ্বজুড়ে মহামারীর প্রভাব

দীর্ঘমেয়াদি মন্দার মুখে জ্বালানি তেলের বৈশ্বিক চাহিদা

বণিক বার্তা ডেস্ক

নভেল করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের পর থেকে দেশে দেশে অর্থনৈতিক কার্যক্রম শ্লথ হয়ে পড়েছে। অর্থ, শিল্প পরিবহন খাতে ধস নেমেছে। বিশ্বজুড়ে অর্ধেকের বেশি মানুষ লকডাউনে আবদ্ধ হয়ে পড়েছে। একটি বড় ধরনের মন্দার হুমকিতে ঝুলছে বিশ্ববাজার। পরিস্থিতি অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের চাহিদায় ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে। জ্বালানিটির বৈশ্বিক চাহিদা অপ্র্যাশিতভাবে কমে গেছে। সঙ্গে পাল্লা দিয়ে কমেছে পণ্যটির দাম। সমস্যার শিগগিরই কোনো সমাধান দেখছেন না খাতসংশ্লিষ্টরা। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বিনিয়োগ ব্যাংকিং কোম্পানি র্যামন্ড জেমস সম্প্রতি এমন পূর্বাভাস দিয়ে জানিয়েছে, ২০২২ সালের আগে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের বৈশ্বিক চাহিদা ২০১৯ সালের সমপর্যায়ে আসার সম্ভাবনা ক্ষীণ। খবর এসঅ্যান্ডপি গ্লোবাল প্ল্যাটস অয়েলপ্রাইসডটকম।

অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের বাজার নিয়ে র্যামন্ড জেমসের সর্বশেষ প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, নভেল করোভাইরাস সংক্রমণ রোধে এখন পর্যন্ত কার্যকর কোনো ভ্যাকসিন বা চিকিৎসা আবিষ্কার হয়নি। ফলে মহামারী পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেবে তা এখনো অনিশ্চিত। স্বাভাবিকভাবেই জ্বালানি তেলের বাজার খুব সহসাই মহামারী থেকে প্রভাবমুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা নেই। পরিস্থিতিতে চলতি বছর তো বটেই, ২০২১ সাল নাগাদ জ্বালানি পণ্যটির বৈশ্বিক চাহিদায় নিম্নমুখী প্রবণতা বজায় থাকতে পারে।

প্রতিষ্ঠানটির পূর্বাভাস অনুযায়ী, মাহামারীর প্রাদুর্ভাব না ঘটলে ২০২১ সালে জ্বালানি তেলের বৈশ্বিক চাহিদায় যে প্রবৃদ্ধি প্রত্যাশা করা হচ্ছিল, সে তুলনায় দৈনিক গড়ে ৫০ লাখ ব্যারেল কমতির দিকে থাকতে পারে। এর পর থেকে বছরপ্রতি পণ্যটির বৈশ্বিক চাহিদা দৈনিক গড়ে ১২ লাখ ৫০ হাজার ব্যারেল কমে যেতে পারে।


র্যামন্ড জেমসের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০২১ সালে জেট ফুয়েল খাতে জ্বালানির চাহিদা প্রত্যাশার তুলনায় দৈনিক গড়ে ২০ লাখ ব্যারেল কমে যেতে পারে। সড়ক পরিবহন খাতে পেট্রল ডিজেলের চাহিদা কমে যেতে পারে দৈনিক গড়ে ১৬ লাখ ব্যারেল। এছাড়া বিভিন্ন শিল্প পেট্রোকেমিক্যাল খাতে জ্বালানি তেলের চাহিদা কমে যেতে পারে দৈনিক গড়ে ১০ লাখ ব্যারেল। নৌ-পরিবহন খাতে জ্বালানিটির চাহিদা কমে যেতে পারে দৈনিক গড়ে চার লাখ ব্যারেল। সব মিলিয়ে ২০২১ সাল পর্যন্ত পণ্যটির বাজার নিম্নমুখী প্রবণতার মধ্য দিয়ে যেতে পারে। তবে চলতি বছরের প্রথম কয়েক মাস জ্বালানি তেলের বাজার যে খারাপ অবস্থার মধ্য দিয়ে গেছে, সে তুলনায় আগামী বছরের বাজার পরিস্থিতি তুলনামূলক চাঙ্গা হয়ে উঠতে পারে।

চলতি বছরের শুরুতেই বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে নভেল করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব। চীনের উহান থেকে ছড়িয়ে পড়া ভাইরাস অল্প দিনের মধ্যেই বৈশ্বিক মহামারীতে রূপান্তরিত হয়। সংক্রমিত ভাইরাসটির কোনো কার্যকর প্রতিষেধক এখন পর্যন্ত আবিষ্কৃত না হওয়ায় সংক্রমণ থেকে রক্ষা পাওয়ার একমাত্র উপায় একে অন্যের থেকে বিচ্ছিন্ন থাকা। ফলে ভাইরাসটির সংক্রমণ রোধে প্রায় সব দেশই লকডাউন পন্থা বেছে নিয়েছে। এতে বিশ্বের প্রায় অর্ধেক মানুষ ঘরে আবদ্ধ হয়ে পড়েছে। ভেঙে পড়েছে আকাশ, স্থল, নৌপথসহ বৈশ্বিক পরিবহন ব্যবস্থা। স্থবির হয়ে পড়েছে পণ্য আমদানি-রফতানিসহ বিভিন্ন শিল্প খাত। দেশে দেশে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সংকুচিত হয়ে পড়েছে। পরিস্থিতির সামগ্রিক প্রভাব পড়তে শুরু করে জ্বালানি তেলের বাজারে। বছরের শুরুতেই পণ্যটির বৈশ্বিক চাহিদায় ধস নামতে শুরু করে। সঙ্গে পাল্লা দিয়ে কমতে শুরু করে পণ্যটির দাম।

অবস্থায় এক পর্যায়ে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের বৈশ্বিক চাহিদা এতই কমে আসে যে ২০ এপ্রিল ইতিহাসে প্রথমবারের মতো পণ্যটির দাম কমতে কমতে শূন্যেরও নিচে চলে যায়। ওইদিন যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রতি ব্যারেল (১৫৯ লিটার) অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম দাঁড়িয়েছিল মাইনাস ৩৭ দশমিক ৬৩ ডলারে। সর্বশেষ কার্যদিবসে আন্তর্জাতিক বাজার আদার্শ প্রতি ব্যারেল ব্রেন্ট ক্রুডের দাম দাঁড়িয়েছে ৩৪ ডলার ৩১ সেন্ট, আগের দিনের তুলনায় যা ডলার ৭৫ সেন্ট বা দশমিক ৮৫ শতাংশ কম। সময় যুক্তরাষ্ট্রের বাজার আদর্শ প্রতি ব্যারেল ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েটের (ডব্লিউটিআই) দাম দাঁড়িয়েছে ৩১ ডলার ৯৬ সেন্ট। আগের দিনের তুলনায় পণ্যটির দাম কমেছে ডলার ৯৬ সেন্ট বা দশমিক ৭৮ শতাংশ।

এদিকে জ্বালানি তেলের বাজারে চাঙ্গা ভাব ফেরাতে আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছে অর্গানাইজেশন অব পেট্রোলিয়াম এক্সপোর্টিং কান্ট্রিজ (ওপেক) এর মিত্র দেশগুলো। পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে ইতিহাসের সর্বোচ্চ জ্বালানি তেল উত্তোলন হ্রাস চুক্তি সই করেছে ওপেক নন-ওপেক দেশগুলো। চুক্তির আওতায় চলতি আগামী মাসে ওপেক নন-ওপেক দেশগুলো সক্ষমতার চেয়ে দৈনিক গড়ে ৯৭ লাখ ব্যারেল জ্বালানি তেল উত্তোলন কমিয়ে আনার বিষয়ে একমত হয়েছে। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রসহ জোটরে বাইরের অন্যান্য শীর্ষ উত্তোলনকারী দেশও পণ্যটির উত্তোলন কমিয়ে আনবে বলে জানিয়েছে।

শুধু র্যামন্ড জেমস নয়, আগামীতে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের বৈশ্বিক চাহিদা পূর্বাভাস কমিয়ে এনেছে বেশির ভাগ খাতসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানই। ওপেকের সর্বশেষ প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, ২০২০ সালে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের বৈশ্বিক চাহিদা দৈনিক গড়ে ৯০ লাখ ৭০ হাজার ব্যারেল বা দশমিক শতাংশ কমে যেতে পারে। একই কথা জানিয়েছে ইউএস এনার্জি ইনফরমেশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (ইআইএ)

 

 

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন