বুধবার | মে ২৭, ২০২০ | ১৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭

সম্পাদকীয়

তামাক নিয়ে উভয়সঙ্কট

জাহিদুর রহমান পলাশ

প্রধানমন্ত্রী যেখানে ২০৪১ সালের মধ্যে ধূমপানমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার নীতি ঘোষণা করেছেন, সেখানে শিল্প মন্ত্রণালয় কর্তৃক সিগারেটকে অত্যাবশ্যকীয় পণ্য ঘোষণা করাটা পূর্ণাঙ্গভাবেই সাংঘর্ষিক। যদিও তারা প্রধানমন্ত্রীর এই ঘোষণার নীতিকে পূর্ণাঙ্গভাবে সমর্থন করার কথা বলছেন এবং এ লক্ষ্যে কাজ করার কথা জানিয়েছে। 

আসলে প্রকৃত বিষয়টা রাজস্ব ঘাটতির আশংকা। সমস্যাটা সরকারের জন্য একটা ত্রাহি অবস্থা। দীর্ঘদিনের তারল্য সংকটের চলমানতার মধ্যে ‘মড়ার উপর খাড়ার ঘা’ এর মতো করোনা সংকটের আকস্মিকতায় যেখানে প্রায় এক লক্ষ কোটি টাকার প্রণোদনা ঘোষণা করা হল অর্থের কোনো ধরনের জোগান ছাড়াই, সেখানে তামাক শিল্পের সাময়িক নিষেধাজ্ঞা রাজস্ব আহরণে বড় ধরনের আরেকটা ধাক্কা তৈরি করবে। 

একদিকে করোনার মাত্রা বৃদ্ধি পাবে এমনটা মাথায় রেখেই গার্মেন্টস খুলে দেয়া হল, অন্যদিকে স্বাস্থ্যঝুঁকি হুমকির মুখে থাকার পরেও সিগারেটের উৎপাদন অব্যহত রাখাটা কতটা চেক অ্যান্ড ব্যাল্যান্স রক্ষা করবে এর কোনো প্রজেকশন আছে বলে আমার মনে হয় না। তবে হার্ড ইমিউনিটির যে কথাটা বলা হচ্ছে যেখানে জনসংখ্যার ৭০ শতাংশ আক্রান্ত হওয়ার পর ভাইরাস তার কার্যকারিতা হারায়, সেটাই যদি বর্তমান সংকট থেকে উত্তরণের অনিবার্য পন্থা হয়ে থাকে তবে গার্মেন্টস খোলা রেখে, সিগারেট চালু রেখে নামমাত্র লকডাঊন দিয়ে যতো তাড়াতাড়ি সম্ভব ৭০ শতাংশের কোটা পূরণ করার দিকেই যদি আমাদের রাস্তা হয় তবে সরকারের এই সিদ্ধান্ত যথার্থই বটে! সেক্ষেত্রে সিগারেট আসক্তি অব্যাহত রেখে ৭০ শতাংশের মধ্যে স্থান করে নেয়ার ব্যাপারে আগ্রহীরা সরকারের এই ইউটার্নে সন্তুষ্ট হতেই পারেন।

আসলে নিষেধাজ্ঞা কোনো স্থায়ী সমাধান না, বরং একে উৎসাহিত করে। স্থায়ীভাবে সমাধান চেষ্টা হবে নিরুৎসাহিত করার মাধ্যমে। প্রথমত, নৈতিকভাবে, দ্বিতীয়ত, উচ্চ কর আরোপের মাধ্যমে এবং তৃতীয়ত, আইনের প্রয়োগের মাধ্যমে।

নৈতিকভাবে নিরুৎসাহিত করার ব্যাপারটি এরই মধ্যে বেশ কিছু পদক্ষেপের মাধ্যমে শুরু হয়েছে। যেমন, সিগারেটের প্যাকেটে “ ধূমপান স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর” লেখাটি বাধ্যতামূলক করা, তামাক জাতীয় পণ্যের বিজ্ঞাপন নিষিদ্ধ করা। নাটক সিনেমাতে ধূমপানের অনিবার্য কোনো দৃশ্য থাকলে, সেই দৃশ্যের বিরুদ্ধে সেলফ ক্রিটিসিজম স্ক্রলে সংযুক্ত করা। নিরুৎসাহিত করার এতগুলো ব্যবস্থা থাকার পরেও এটা খুব একটা কার্যকর প্রভাব রাখতে সক্ষম হয়েছে বলে মনে হয় না। 

বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় টোবাকো কোম্পানি ব্রিটিশ আমেরিকান টোবাকোর মার্কেট শেয়ার ৭২ দশমিক ৯১ শতাংশ । কোম্পানিটির ২০১৯ সালের সিগারেট বিক্রি ছিল ২৬,৯৮৫ কোটি টাকা যেখানে ২০১৮ সালের বিক্রি ছিল ২৩ হাজার ৩১১ কোটি টাকা। অর্থাৎ, বিক্রি ঊর্ধ্বগামী যেখানে নৈতিক নিয়ন্ত্রণ ব্যর্থ।

বাকি থাকল উচ্চ কর আরোপের ব্যাপারটি। ২০১৯ সালের বিক্রয়লব্ধ ২৬ হাজার ৯৮৫ কোটি টাকার মধ্যে কোম্পানির মোট মুনাফা ছিল ২৪ হাজার ১০ কোটি টাকা যার মধ্যে সরকারি কোষাগারে কর হিসাবে জমা দিয়েছে ২২ হাজার ৬৩০ কোটি টাকা । এটি ২০১৯ সালের বাংলাদেশের জাতীয় বাজেট ৫ লাখ ২৩ হাজার ১৯০ কোটি টাকার ৪ দশমিক ৩২ শতাংশ এবং রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ৩ লাখ ৭৭ হাজার ৮১০ কোটি টাকার ৫ দশমিক ৯৯ শতাংশ ।

যেহেতু ধূমপানকে নৈতিকভাবে নিরুৎসাহিত করার ব্যাপারটি তেমন কোনো কার্যকর ভূমিকা রাখতে ব্যর্থ, তাই স্বাভাবিকভাবেই পর্যায়ক্রমে আরও বেশি কর আরোপের মাধ্যমে তামাকের মরণঘাতী ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। এখানে একটা ভিন্নমত আসতে পারে এইভাবে যে এতে করে সরকারের রাজস্ব আয় কমে আসবে এবং বাজেট ঘাটতি বাড়বে। কিন্তু বিষয়টা মোটেও তা না। এতে করে তামাকের ব্যবহার যে পরিমাণ কমবে, বাড়তি করহারের মাধ্যমে তা পুষিয়ে যাবে। উপরন্তু তামাকের ব্যবহার হ্রাসের কারণে যে স্বাস্থ্যঝুঁকি কমবে, তার বিপরীতে তামাকজনিত স্বাস্থ্যখাতের প্রাক্কলিত ব্যয় একই খাতের অন্যক্ষেত্রগুলোতে ব্যয় করা সম্ভব হবে।

তৃতীয় যে বিষয়টি অত্যন্ত কঠোরভাবে আরোপ করা উচিত তা হলো আইনের ব্যবহার। তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন অনুযায়ী যে কোনো ওপেন প্লেসে ধূমপান দণ্ডনীয় অপরাধ। কিন্তু এই আইনটির কোনো ব্যবহারিক অস্তিত্ব একেবারেই অনুপস্থিত।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক টোবাকো গবেষণা সংস্থা “Campaign for Tobacco free Kids” এর বাংলাদেশ ভিত্তিক গবেষণা মতে, একজন ধূমপায়ীর ধোঁয়ার মাধ্যমে তার পাশের অধূমপায়ীর আক্রান্তের হার ৪৯ শতাংশ । একে পরোক্ষ ধূমপান বা Second Hand Smoking বলে। এই পরোক্ষ ধূমপানের মাধ্যমে নিজের অজান্তেই ধূমপানজনিত রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন অধূমপায়ীরা। 

তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন ২০০৫ এবং ২০১৩ এর সংশোধনীর মাধ্যমে সকল ধরনের পাবলিক প্লেসে ধূমপান নিষিদ্ধ করে এর জন্য শাস্তির বিধান করা হয়েছে, যার কার্যকারিতা একেবারেই শূন্য। আর এই অকার্যকারিতার মাশুল গুণতে হচ্ছে অধূমপায়ীদের, বিশেষ করে শিশুদের। যেখানে ধূমপায়ীর ধোঁয়ার মাধ্যমে অধূমপায়ীর আক্রান্তের হার ৪৯ শতাংশ  সেখানে শুধু শিশুদের ক্ষেত্রে এই হার ৫৯ শতাংশ  এবং এর বড় অংশই হচ্ছে তার নিজের বাড়িতে।

ধূমপান নিয়ন্ত্রণে করহারের ভিত্তি বাড়ানো হবে কিনা তা নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্তের ব্যাপার। কিন্তু নৈতিক মূল্যবোধের উন্নয়ন ও বর্তমান আইনের কার্যকারিতাকে বাস্তবায়ন করাটা খুব একটা কঠিন হবে বলে মনে হয় না।

তথ্য সূত্র:

The Daily Star

www.tobaccofreekids.org

www.batbangladesh.com

Baqngladesh Gazette Act No. 16 of 2013

Annual Report of British American Tobacco Bangladesh for 2019

লেখক: জাহিদুর রহমান পলাশ, ব্যাংকার

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন