মঙ্গলবার | অক্টোবর ২০, ২০২০ | ৫ কার্তিক ১৪২৭

করোনা

ব্র্যান্ডিংয়ের পথে মাস্কের যাত্রা

শ্রীদীপ

ভাইরাসের ড্রপলেট থেকে নিজেকে বাঁচাতে মাস্ক এখন অবশ্য পরিধেয় বস্তুতে পরিণত হয়েছে। ব্র্যান্ডেড কোম্পানির তৈরি অন্য যেকোনো পরিধেয়, যা কিনা আমাদের দেহকে অলংকৃত করে রাখে তার চেয়ে একটি মাস্ক এখন অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি মাস্ক এখন সম্ভবত আমাদের সত্তাকেও সংজ্ঞায়িত করছে। শহরগুলোতে মাস্ক পরিহিত মুখ এখন স্বাভাবিক বিষয়ে পরিণত হয়েছে। আমাদের ভোগবাদী যে দৃষ্টিভঙ্গি তা এখন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। আমরা এখন চলাফেরাকে ত্যাগ করতে শিখছি সামাজিক যেসব মেলামেশা তা বন্ধ করে দিয়েছি।

এটা অনেকটা নিশ্চিত যে আগামী এক বছর বা তারও বেশি সময় মাস্ক আমাদের বন্ধু হিসেবে থাকবে, আমরা যেখানেই যাই না কেন। পাশাপাশি এটা কেবল সময়ের ব্যাপার যে পরিচিত বিখ্যাত ব্র্যান্ডগুলো করোনাকালের সবচেয়ে আলোচিত, ব্যবহূত এই পণ্যকে নিজেদের লোগো লাগিয়ে বাজারে আনবে। চাহিদাসম্পন্ন পণ্য কখনো একলা পড়ে থাকে না। দৃশ্যমানতা এবং  জায়গা দখল হচ্ছে ভোগবাদের কেন্দ্রবিন্দু। তাই এটা বিশ্বাস করার কোনো কারণ নেই যে মাস্ক ভোগবাদী মানসিকতার আওতার বাইরে থেকে যাবে। বরং লুই ভিঁতো, গুচি, প্রাডা এরই মধ্যে মাস্ক বানানোর ঘোষণা দিয়েছে।

শিগগিরই মাস্ক অন্যান্য পণ্যের মতো আমাদের কাপড়ের তাকে আকাঙ্ক্ষিত বস্তুতে পরিণত হবে কিংবা আমাদের অনলাইন কেনাকেটার লিস্টে জায়গা করে নেবে। বৈচিত্র্যময়, বিস্তৃত নকশা এবং ছাপানো মাস্কের কথা কল্পনা করুন। সে সঙ্গে কল্পনা করুন নানা মাপ, রঙ, সেলাই, স্ট্র্যাপ, ফ্যাব্রিকস বোতামের মাস্কগুলোর কথা। ভাবুন মাস্কের শ্রেণীবিভাগগুলোর কথা, যা কিনা সর্বোচ্চ মূল্যমানের ব্যাপারে সম্ভাব্য একটি ধারণা দিতে পারে। একটি ম্যাগাজিন তাদের প্রচ্ছদ করেছে সুপারমডেলকে মাস্ক পরিয়ে। যা কিনা মাস্কের বাণিজ্যের নতুন একটি দিককেই তুলে ধরছে।

তবে মাস্কের বাণিজ্যিক কর্তৃত্ব গ্রহণ মোটেই কাল্পনিক কিছু নয়, বরং এটা অনিবার্য। মাস্ক এখন দুনিয়ার অন্যতম জনপ্রিয় বিষয়ের একটি। মাস্ক ব্যক্তির ভোগের একককে প্রকৃত উপায়ে দেখিয়ে দিচ্ছে। একবার তার উপযোগিতার ভূমিকা পালনের পর কিংবা কার্যকরী দায়িত্ব পালনের পর মাস্ক অবশ্যই ফ্যাশনের অনুষঙ্গে পরিণত হবে। দেখা যাবে মাস্ক উপযোগিতার পাশাপাশি একই সঙ্গে তার প্রতীকী সম্ভাবনাগুলোকেও তুলে ধরছে; আমরা মাস্ককে ব্যবহার করব এবং এটি প্রদর্শন করব। মাস্কের গায়ে স্বাচ্ছন্দ্যে টেক্সট ছবি ব্যবহার করা যাবে, কারণ এর একটি পৃষ্ঠ খালি থাকে। মাস্কের বাইরের অংশ এখন লেবেল এবং বার্তা দ্বারা ভর্তি হওয়ার অপেক্ষায় আছে। সব মিলিয়ে ব্যবহার-মান থেকে মাস্কের আকাঙ্ক্ষিত বস্তুতে পরিণত হওয়াটা এখন সময়ের ব্যাপার।

মাস্ক এখন এমন একটি প্লাটফর্ম হতে পারে যা কিনা জনপ্রিয় সংস্কৃতির নতুন দিক দেখাতে পারে। শিগগিরই এটি উপভোগ্য, আকাঙ্ক্ষিত এবং অভিজ্ঞতার বিষয়ে পরিণত হতে পারে।

নকশা করা মাস্কগুলো কাজ করতে পারে নির্দিষ্ট শ্রেণীগত ধারণার সঙ্গে। মধ্য নিচু সারির ব্র্যান্ডগুলো পারে বৈচিত্র্যময় নানা ধরনের মাস্ক নিয়ে আসতে। এটি ব্যবহারকারীদের অবশ্যই খুঁজে পাবে, যেহেতু মাস্ক আমাদের জনসম্মুখে উপস্থিতি, নিয়মিত কাজ, পেশাগত কাজে এবং বিরতিকালেও আকর্ষণের কেন্দ্রে থাকবে। যেখানে অংশগ্রহণ থাকবে সব শ্রেণীর মানুষের।

মাস্ক মূলত লুকিয়ে রাখে। এটি আমাদের মুখের অর্ধেকের বেশি অংশকে ঢেকে রাখে। এটি মানুষের প্রাথমিক পরিচয়, যা ব্যক্তির চেহারার মাধ্যমে প্রকাশিত হয়, তাকে আটকে রাখে। যা আমাদের অচেনা করে রাখার পাশাপাশি একটা স্বতন্ত্র স্বীকৃতিও অনুসন্ধান করে। এটি যেভাবে আমাদের মুখে ঢাল হিসেবে ব্যবহূত হয়। মানুষের একটা প্রবণতা থাকে এটা ঘোষণা করার যে আমরা কে এবং আমরা কী বিশ্বাস করি। মুখের ওপর মাস্ক যুক্ত করে এটা করা সহজ হয়ে যাবে। মাস্কের ওপর যে লেবেল বা বার্তা লেখা থাকে তা বেশ পার্থক্য তৈরি করে দিতে পারে। এটি বিচক্ষণতা ব্যতিক্রমের একটা ধারণা প্রদান করতে পারে এবং সে সঙ্গে আকর্ষণীয়ও করে তুলতে পারে।

পদমর্যাদাসম্পন্ন বিকশিত গ্রাহক সমাজে পণ্যের ব্যবহারের মধ্য দিয়ে একটা বার্তা দেয়ার প্রচল আছে। সংহতি সীমাবদ্ধকরণ হচ্ছে স্বতন্ত্র এজেন্ডার দুটি দিক। মুখোশগুলোর ক্ষেত্রে সমতার শক্তি পার্থক্যকারী শক্তির চেয়ে বড় অথবা বিপরীতও হতে পারে।

প্রশ্ন হচ্ছে স্টাইলের অতিরঞ্জন কি মাস্কের উপযোগিতাকে ছাপিয়ে যাবে? নাকি দুটো একই সঙ্গে চলবে? এখন সেটি দেখার জন্য আমাদের অপেক্ষা করতে হবে। তবে এটা অসম্ভব যে বাজার মাস্কের ব্র্যান্ডিং বাণিজ্যিকীকরণের সুযোগ গ্রহণ করবে না এবং শূন্যস্থান পূরণ করবে না।

সার্জিকাল মাস্ক নিশ্চয়ই একঘেয়ে, অনাকর্ষনীয়। মানুষ বৈচিত্র খুঁজতে গিয়ে মাস্কে মিম, এক লাইনের বার্তা, নকশা, বক্তব্য, উক্তি যোগ করতে চাইবে। দিন শেষে মাস্ক হয়ে উঠবে মতামত, শ্রেণীগত ঐক্য কিংবা বিভক্তির প্রকাশ। যুগ হবে চেহারাহীন দেহের দুনিয়া, ভিড়ের মাঝেও একাকী মানুষের হেঁটে যাওয়া।

মাস্কের ক্ষেত্রেও কি বছর শেষে একটা কিনলে আরেকটা ফ্রি প্যাকেজ অফার করা হবে? বড় ব্র্যান্ডগুলো কি মাস্কের বাণিজ্যকে করোনা সংশ্লিষ্ট দান খয়রাতের সঙ্গে যুক্ত করবে? এসব প্রশ্নের উত্তর এখনই পাওয়া যাচ্ছে না। তবে সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি হল- আমরা কি কোনো কারণ সহ কিংবা ছাড়াই মাস্ক দিয়ে ব্র্যান্ডেড হতে আগ্রহী কিনা?

ওপেন ম্যাগাজিন

 

 

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন