বুধবার | মে ২৭, ২০২০ | ১৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭

প্রথম পাতা

সুপার সাইক্লোন আম্পান আঘাত হানতে পারে বিকালে

নিজস্ব প্রতিবেদক

দেশে প্রতিদিনই নভেল করোনাভাইরাসে সংক্রমণ শনাক্ত মৃতের সংখ্যা বাড়ছে। বিপর্যস্ত স্বাস্থ্য খাত। অর্থনীতিও হুমকির মুখে। এমনই এক পরিপ্রেক্ষিতে উপকূলের দিকে ধেয়ে আসছে সুপার সাইক্লোন আম্পান। আবহাওয়াবিদরা বলছেন, আজ দুপুর থেকে সন্ধ্যার মধ্যে দেশের উপকূলীয় অঞ্চলে প্রচণ্ড গতিতে আঘাত হানতে পারে ঘূর্ণিঝড়টি। এর কারণে উপকূল প্লাবিত হতে পারে স্বাভাবিক জোয়ারের চেয়ে -১০ ফুটের বেশি উচ্চতার জলোচ্ছ্বাসে।

প্রতিবেদনটি লেখার আগে গতকালের আবহাওয়া অধিদপ্তরের সর্বশেষ হালনাগাদকৃত তথ্য অনুযায়ী, সুপার সাইক্লোন আম্পান পশ্চিম মধ্য বঙ্গোপসাগর তত্সংলগ্ন এলাকায় (১৭ দশমিক ডিগ্রি উত্তর অক্ষাংশ এবং ৮৭ ডিগ্রি পূর্ব দ্রাঘিমাংশ) অতিপ্রবল ঘূর্ণিঝড় আকারে অবস্থান করছে। বেলা ৩টায় এটি চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর থেকে ৭৭৫ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে, কক্সবাজার সমুদ্রবন্দর থেকে ৭৩০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে, মোংলা সমুদ্রবন্দর থেকে ৬৬০ কিলোমিটার দক্ষিণ-দক্ষিণপশ্চিমে এবং পায়রা সমুদ্রবন্দর থেকে ৬৫০ কিলোমিটার দক্ষিণ-দক্ষিণপশ্চিমে অবস্থান করছে।

দেশের উপকূল অনেক বছর পর এমন সুপার সাইক্লোনের ঘূর্ণিঝড়ের মুখোমুখি হতে যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড ভালনারেবিলিটি স্টাডিজ ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক . মাহবুবা নাসরীন বণিক বার্তাকে বলেন, দ্রুতগতির কারণে সুপার সাইক্লোন আম্পানের ধরন আলাদা। প্রবল গতির কারণে বড় জলোচ্ছ্বাসের আশঙ্কা রয়েছে। তবে দক্ষিণ-পশ্চিম থেকে আসা ঝড়গুলো অনেক সময় আঘাত হানার আগে দুর্বলও হয়ে যায়। তবে আমাদের সাবধান থাকতে হবে। এর কোনো বিকল্প নেই। নভেল করোনাভাইরাসের কারণে আম্পান মোকাবেলাও এখন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। বিশেষ করে আশ্রয়কেন্দ্রে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার বিষয়টি খুব গুরুত্বসহ দেখতে হবে।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্যমতে, ঘূর্ণিঝড়ের কেন্দ্রের ৮৫ কিলোমিটারের মধ্যে বাতাসের একটানা সর্বোচ্চ গতিবেগ ঘণ্টায় ২০০ কিলোমিটার, যা দমকা অথবা ঝোড়ো হাওয়ার আকারে ২২০ কিলোমিটার পর্যন্ত বৃদ্ধি পাচ্ছে। ঘূর্ণিঝড় কেন্দ্রের কাছে সাগর খুবই বিক্ষুব্ধ রয়েছে। কারণে মোংলা পায়রা সমুদ্রবন্দরকে নম্বর মহাবিপত্সংকেত দেখিয়ে যেতে বলা হয়েছে। একই সঙ্গে চট্টগ্রাম কক্সবাজারকে নম্বর বিপত্সংকেত দেখিয়ে যেতে বলা হয়েছে। সাতক্ষীরা, খুলনা, বাগেরহাট, পিরোজপুর, ঝালকাঠি, বরগুনা, পটুয়াখালী, বরিশাল, ভোলা, লক্ষ্মীপুর, চাঁদপুর এবং এসব জেলার অদূরবর্তী দ্বীপ চরগুলো নম্বর বিপত্সংকেতের আওতায় থাকবে। এসব অঞ্চলে -১০ ফুটেরও বেশি উচ্চতায় জলোচ্ছ্বাস হতে পারে। একই সঙ্গে এসব অঞ্চলে ১৪০ থেকে ১৬০ কিলোমিটার বেগে ঝোড়ো বাতাস বয়ে যেতে পারে। তাছাড়া ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে অতিভারি বৃষ্টিপাতও হতে পারে।

উত্তর বঙ্গোপসাগর গভীর সাগরে থাকা নৌযানগুলোকে দ্রুত নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে বলা হয়েছে বলে আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাসে জানানো হয়।

আম্পান মোকাবেলায় সারা দেশে ব্যাপক হারে প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে বলে জানান দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. মোহসীন। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, সারা দেশে ১২ হাজার ৭৮টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত করা হয়েছে। সাধারণত এর আগের কোনো দুর্যোগে এত কেন্দ্রের প্রয়োজন হয়নি। এখন করোনার কারণে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে অনেক বেশি কেন্দ্র প্রস্তুত করা হয়েছে। আন্তঃমন্ত্রণালয় সভা করে  বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। এসব কেন্দ্রে এরই মধ্যে মানুষদের নিয়ে আসা হচ্ছে। তাদের জন্য খাবারের ব্যবস্থাও করা হচ্ছে।

তিনি বলেন, ধারণা করা হচ্ছে আগামীকাল (আজ) দুপুর থেকে সন্ধ্যার মধ্যে ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানতে পারে। এজন্য আজকে আমরা ছয় থেকে সাত নম্বর বিপত্সংকেত দিয়েছি। কালই (আজ) এর গতি সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যাবে। তখন প্রয়োজন অনুযায়ী বিপত্সংকেত বাড়িয়ে থেকে ১০ নম্বরে নিয়ে যাওয়া হতে পারে। সব মিলিয়ে বলব, আমাদের প্রস্তুতি অনেক ভালো। প্রতিবেশী পার্শ্ববর্তী দেশের পশ্চিমবঙ্গের প্রস্তুতিও অনেক ভালো।

ঘূর্ণিঝড়ের কারণে দেশের ২৫টি জেলায় ফসলের বিভিন্ন মাত্রায় ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা করা হচ্ছে। ঘূর্ণিঝড়ের সম্ভাব্য আঘাত ক্ষয়ক্ষতির পরিপ্রেক্ষিতে ১১টি বিশেষ কৃষি আবহাওয়াবিষয়ক পরামর্শ দিয়েছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (ডিএই) এতে পরিপক্ব বোরো ধান, সবজি ফল দ্রুত ঘরে তুলতে বলা হয়েছে। ডিএইর বিশেষ বুলেটিনে বলা হয়েছে, ঘূর্ণিঝড়ের কারণে ২৫টি জেলার ফল ফসলের মাঠ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। জেলাগুলো হচ্ছে বাগেরহাট, বান্দরবান, বরগুনা, বরিশাল, ভোলা, চাঁদপুর, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, কুমিল্লা, ফেনী, গোপালগঞ্জ, যশোর, ঝালকাঠি, খাগড়াছড়ি, খুলনা, লক্ষ্মীপুর, মাদারীপুর, মুন্সীগঞ্জ, নড়াইল, নোয়াখালী, পটুয়াখালী, পিরোজপুর, রাঙ্গামাটি, সাতক্ষীরা শরীয়তপুর। ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে ২৫ জেলায় ঝোড়ো হাওয়া এবং হালকা থেকে ভারি বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে। দণ্ডায়মান ফসলের ওপর ঝোড়ো হাওয়া এবং ভারি বৃষ্টিপাতের নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

এদিকে বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট ঘূর্ণিঝড় আম্পানের বিষয়ে সার্বক্ষণিক মনিটরিং করছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তার নির্দেশে এরই মধ্যে উপকূলীয় এলাকাগুলো থেকে তিন লাখের বেশি মানুষকে সরিয়ে নেয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর উপ-প্রেস সচিব আশরাফুল আলম খোকন প্রসঙ্গে বলেন, প্রবল শক্তিসম্পন্ন ঘূর্ণিঝড় আম্পান মোকাবেলায় উপকূলীয় জেলাগুলোয় ১২ হাজার ৭৮টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত করেছে সরকার। এসব আশ্রয়কেন্দ্রে মোট ৫১ লাখ ৯০ হাজার ১৪৪ জন মানুষকে আশ্রয় দেয়া যাবে।

তিনি আরো বলেন, প্রধানমন্ত্রী সবাইকে স্বাস্থ্যবিধি মানার আহ্বান জানিয়েছেন।  সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করে আশ্রয়কেন্দ্রে সবাইকে নিরাপদে রাখার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। যারা আশ্রয়কেন্দ্রে আসবেন, তাদের সবাইকে মাস্ক পরে আসতে বলা হয়েছে। এরই মধ্যে স্বেচ্ছাসেবকরা মাইকিং করে সবাইকে আশ্রয়কেন্দ্রে আনার কাজ শুরু করেছেন।

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন