বুধবার | মে ২৭, ২০২০ | ১৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭

সম্পাদকীয়

হার্ড ইমিউনিটি: বাংলাদেশ কি সিঙ্গাপুর হতে পারবে?

অনিন্দ্য সাইমুম ইমন

বিশ্বে নভেল করোনাভাইরাস সংক্রমণ শনাক্তের সাড়ে পাঁচ মাস পেরিয়েছে। এরই মধ্যে চীন ছাড়িয়ে পুরো বিশ্বে মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়েছে প্রাণঘাতি এ ভাইরাস। দেশে দেশে লকডাউন, কারফিউ, সামাজিক দূরত্ব- কোন কিছুই সংক্রমণ ঠেকাতে সন্দেহাতীতভাবে কার্যকর প্রমাণিত হয়নি। প্রতিদিনই বাড়ছে আক্রান্তের সংখ্যা। বাড়ছে মৃত্যু। তাই করোনা প্রতিরোধে ভ্যাকসিন আবিষ্কারের আপ্রাণ চেষ্টা করছেন বিজ্ঞানীরা। চলছে গবেষণা। মাঝে মাঝে আশার আলো চোখের সামনে এলেও এখন অবধি কার্যকর ও দৃশ্যমান কোনো ফলাফল মিলেনি। এ পরিস্থিতিতে যে তত্ত্বটি বারবার সামনে এসেছে সেটি হলো, হার্ড ইমিউনিটি (Herd Immunity)।

যুক্তরাষ্ট্রের জনস হপকিনস ইউনিভার্সিটির এক নোটে বলা হয়েছে, মহামারীর সময় একটি জনগোষ্ঠীর বেশিরভাগ মানুষকে ইচ্ছাকৃতভাবে সেই রোগে আক্রান্ত হতে দিয়ে তাদের শরীরে সংশ্লিষ্ট রোগ কিংবা ভাইরাসের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ব্যবস্থা (ইমিউনিটি) তৈরির প্রক্রিয়া হলো হার্ড ইমিউনিটি বা গোষ্ঠীগত প্রতিরোধ ব্যবস্থা। সহজ ভাষায় বলতে গেলে, একটি দেশের ৮০ শতাংশ মানুষ বা প্রতি পাঁচ জনের চার জন করোনায় আক্রান্ত হলো। তাহলে শেষ পর্যন্ত যারা বেঁচে থাকবেন তাদের শরীরে ইমিউনিটি সিস্টেম গড়ে উঠবে। ফলে তাদের থেকে অপরের আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি ন্যূনতম পর্যায়ে নেমে আসবে। এক পর্যায়ে মহামারীর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সংশ্লিষ্ট দেশটি জয়ী হবে। 

হার্ড ইমিউনিটির মাধ্যমে দুইভাবে সংক্রমণ কমানো যায়। প্রথমত, অধিকাংশ মানুষকে (ন্যূনতম ৬০%) সংশ্লিষ্ট প্যাথোজেন বা ভাইরাস প্রতিরোধের ভ্যাকসিন দেয়া। দ্বিতীয়ত, ভাইরাস আক্রান্ত হতে দিয়ে প্রাকৃতিকভাবে প্রতিরোধ সক্ষম বানিয়ে। বর্তমান করোনা পরিস্থিতিতে কবে ভ্যাকসিন তৈরি হবে তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। বিজ্ঞানীরা অক্লান্ত পরিশ্রম করছেন। তবে নভেল করোনাভাইরাসও দেশে দেশে দ্রুত চরিত্র বদলাচ্ছে। তাই ভ্যাকসিন তৈরি করা গেলেও সেটা আদতে কার্যকর হবে কিনা, সেটা নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়ে যাচ্ছে। 

মূলত এ অনিশ্চয়তা থেকেই হার্ড ইমিউনিটির তত্ত্ব বারবার সামনে আসছে। কেননা, দীর্ঘদিন টানা লকডাউন চললে বিশ্ব অর্থনীতি ভেঙে পড়বে। বিশেষত অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোয় চরম আর্থ-সামাজিক সংকট দেখা দেয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। দেখা দিতে পারে দুর্ভিক্ষ। ফলে শিগগিরই খুলে দিতে হবে কলকারখানা, গণপরিবহন, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। গতি ফেরাতে হবে অর্থনীতির। এ পরিস্থিতিতে করোনা সংক্রমণ ন্যূনতম পর্যায়ে নেমে না এলে জনস্বাস্থ্য বিষয়ক বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে বিশ্ববাসী। 

তাই অনেক বিশেষজ্ঞ হার্ড ইমিউনিটির কৌশল বেছে নেয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন। তবে এর সমালোচনাও রয়েছে অনেক। কেননা এটা অনেক ঝুঁকিপূর্ণ একটি কৌশল। বর্তমান মহামারী পরিস্থিতিতে একটি দেশ যখন হার্ড ইমিউনিটির পথে যাবে, তখন দেশটিতে এক লাফে করোনা সংক্রমণ কয়েকগুণ বেড়ে যাবে। তাই চিকিৎসা ব্যবস্থা অত্যন্ত আধুনিক ও ব্যাপক বিস্তৃত না হলে বাড়তি রোগীর চাপ সামাল দেয়া কঠিন হয়ে পড়বে। অনেক মানুষ মারা যাবে। 

বিট্রিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন শুরুর দিকে হার্ড ইমিউনিটির পক্ষে ছিলেন। তবে ওই সময় দেশটির স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা তাকে এ কৌশল না নিতে অনুরোধ করেন। তাদের দাবি, বিপুল পরিমাণ করোনা রোগীর চাপ সামলানোর মতো সক্ষমতা ব্রিটেনের স্বাস্থ্য অবকাঠামোর নেই। তাই এ কৌশল ঝুঁকি ডেকে আনবে। পরে সরকার সে অবস্থান থেকে সরে আসে। প্রধানমন্ত্রী জনসনও করোনা আক্রান্ত হয়ে ফিরে এসেছেন।

এশিয়ার দেশ সিঙ্গাপুর সম্প্রতি হার্ড ইমিউনিটি কৌশলের বিরুদ্ধে অবস্থানের কথা জানিয়ে দিয়েছে। শুরুর দিকে নিয়ন্ত্রণে থাকলেও গত কয়েক সপ্তাহে দেশটিতে হঠাৎ করে করোনা সংক্রমণ বেড়ে গেছে। বিশেষত সিঙ্গাপুরের প্রবাসী শ্রমিকদের ডরমেটরিগুলোয় নভেল করোনাভাইরাসের সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। এরপরও হার্ড ইমিউনিটি কৌশল বাস্তবায়নের পরিকল্পনা নাকচ করে সিঙ্গাপুর সরকার বলছে, এখন হার্ড ইমিউনিটি কৌশল গ্রহণ করলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ সক্ষমতার বাইরে চলে যেতে পারে। এতে বিপদ আরো বাড়বে। এর বদলে করোনা শনাক্তে পরীক্ষার (টেস্ট) সক্ষমতা পাঁচগুণ বাড়ানোর চিন্তা করছে দেশটি। নিজেদের সক্ষমতা বিবেচনায় নিয়ে হার্ড ইমিউনিটি কৌশলের বদলে ব্যাপকভিত্তিক পরীক্ষার পথে হাঁটতে চাইছে সিঙ্গাপুর সরকার। 

এখন কথা হলো, শিরোনামে কেন বাংলাদেশকে সিঙ্গাপুরের সঙ্গে তুলনা করলাম? কিছুদিন আগেই দেশের একজন আইনপ্রণেতা বলেছিলেন, আকাশ পথে যাতায়াতের সময় উড়োজাহাজের জানালা দিয়ে ঢাকা শহর দেখলে তার সিঙ্গাপুর মনে হয়। এখন তার কথা অনুযায়ী আমরা যদি ধরেও নিই বাংলাদেশের অবকাঠামো ও স্বাস্থ্যসেবাসহ বিভিন্ন খাতের সক্ষমতা সিঙ্গাপুরের সমতুল্য, তাহলেও করোনা পরিস্থিতিতে আমাদের কৌশল দ্বিতীয়বার ভেবে দেখার সুযোগ রয়েছে। দেশে এরই মধ্যে সরকারি ছুটি বাড়ানো হলেও অঘোষিত লকডাউন শিথিল করা হয়েছে। ঈদের আগে খুলে দেয়া হয়েছে বাজার, শপিং সেন্টার, সেলুন, বিউটি পার্লার। সরকারি ছুটি চলা সত্ত্বেও সারা দেশে মানুষ ঘর ছেড়ে প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে বেরিয়ে আসছেন। গত কয়েকদিনে ঢাকার রাজপথে যানজটের দেখা মিলেছে। সামনে ঈদ। ওইসময় গণপরিবহন বন্ধ থাকলেও ঘরমুখো মানুষের চাপ সামাল দেয়া কঠিন হয়ে যাবে। 

শুরুর দিকে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মানুষকে লকডাউন ও সামাজিক দূরত্ব মানতে বাধ্য করতে তৎপর ছিল। এখন তাদের এসব উদ্যোগেও ভাটার টান পড়েছে। এসব কারণে এখন প্রতিদিনই গড়ে হাজার করোনা রোগী শনাক্ত হচ্ছে। বেড়েছে মৃত্যুহার। ঈদের পরপরই দেশে করোনা পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। 

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে করোনা পরিস্থিতি সামাল দিতে বাংলাদেশের অবস্থা সবচেয়ে নাজুক। এখনকার অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে সরকার ইচ্ছাকৃত কিংবা অনিচ্ছাকৃতভাবে হার্ড ইমিউনিটি কৌশলের পথে হাঁটছে। লকডাউন শিথিল করে মানুষকে পথে নামার সুযোগ করে দিয়ে বিপুল জনগোষ্ঠীকে করোনা আক্রান্ত হওয়ার পথ করে দেয়া হচ্ছে। অথচ এই করোনাকালেই আমাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা, অক্ষমতা এবং অব্যবস্থাপনার দিকগুলো চোখের সামনে উঠে এসেছে। তাই শুধু রাজনৈতিক বক্তব্য দেয়ার সময় বাংলাদেশকে সিঙ্গাপুরের সঙ্গে তুলনা না করে দেশের ভঙ্গুর স্বাস্থ্যখাতকে অন্তত সিঙ্গাপুরের পর্যায়ে সক্ষম করে তুলুন। স্বল্প সময়ে সেটা সম্ভবও নয়। 

তাই করোনা নিয়ন্ত্রণে আপাতত সিঙ্গাপুরের মতো ব্যাপকমাত্রায় পরীক্ষার কৌশল গ্রহণ করুন। হার্ড ইমিউনিটির চিন্তা ছাড়ুন। করোনার টেস্টিং কিট আমদানির উদ্যোগ নিন। দেশে উদ্ভাবিত টেস্টিং কিট স্বল্প দামে ও দ্রুত সাধারণ মানুষের হাতের কাছে পৌঁছে দেয়ার ব্যবস্থা করুন। স্বাস্থ্যসেবা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, গণমাধ্যমসহ যেসব খাতের কর্মীরা সম্মুখ সারিতে থেকে করোনা যুদ্ধে নিয়োজিত রয়েছেন, তাদের ঝুঁকি ন্যূনতম পর্য়ায়ে নামাতে ব্যবস্থা নিন। একই সঙ্গে লকডাউন কঠোর করতে, করোনা নিয়ে সাধারণ মানুষকে ভীতির বদলে সচেতন করতে এখনই কার্যকর উদ্যোগ নিন। তবেই বিপুল সম্ভাবনাময় এদেশ সত্যি সত্যি সিঙ্গাপুর হতে পারবে। তা না হলে বিদ্যমান ভঙ্গুর ও সক্ষমতাবিহীন স্বাস্থ্য খাত নিয়ে করোনা মোকাবেলায় হার্ড ইমিউনিটির কৌশল বেছে নেয়া আত্মঘাতী হবে। 

লেখক: অনিন্দ্য সাইমুম ইমন, সাংবাদিক

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন